মুখোশ বাংলার এক উল্লেখযোগ্য লোকশিল্প ঐতিহ্য। সুপ্রাচীনকাল থেকে বাংলায় বিভিন্ন লোক চিত্রকলা ও লোক সংস্কৃতিতে বিশেষ করে লোকগানে মুখোশের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। মানব-মানবীর মুখাবয়বসদৃশ অথবা দেব-দেবীর মুখের আদলে তৈরি এক ধরনের খোলসই হলো মুখোশ। মুখোশে যেসব চিত্রকলা করা হয় তাকে বলে মুখোশচিত্র। অতীতে মুখোশ পরে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে গাজনের গান পরিবেশন তথা শিব-কালী নৃত্য পরিবেশন ছিল আবহমান গ্রাম বাংলার এক অন্যতম ঐতিহ্য। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি গ্রামের লোকেরা সেসব মুখোশনৃত্য দেখে প্রচুর আনন্দ পেত। এখন সে ধারা অত্যন্ত ক্ষীয়মান। তাই মুখোশের প্রয়োজনও বোধ হয় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজকাল অবশ্য কোথাও কোথাও গম্ভীরা, জারি গান পরিবেশনে মুখোশ ব্যবহৃত হয়। তবে আধুনিক মুখোশের বেশি ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে সাম্প্র্রতিককালের বৈশাখী মেলা ও নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। মুখোশ শিল্প এখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। এটি এখন চারুকলার একটি একাডেমিক বিষয়।
গ্রামীণ ও লোকজ মেলায় যেসব মুখোশ বিক্রি হয় সেগুলো শিশুদের খেলনা হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়। সেগুলো শোলার তৈরি। শোলা ছাড়াও কাঠ, মাটি, কাপড়, কাগজের মণ্ড এমনকি লাউয়ের খোল দিয়েও মুখোশ তৈরি করা হয়। এখন আর শুধু মানব-মানবীর মুখের আদলে মুখোশ তৈরি করা হয় না, বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশও তৈরি করা হয়। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে মুখোশের বেশ কিছু নমুনা সংরক্ষিত আছে। চারুকলার শিক্ষার্থীরা প্রতি বছরই নানা রঙের ও ঢঙের বৃহৎ আকৃতির মুখোশ তৈরি করে ও সেগুলো বিক্রিও হয়। মুখোশে লাল, হলুদ, কালো ইত্যাদি রঙের প্রাধান্য থাকে। মুখোশের চিত্রাঙ্কন কৌশল অনেকটা পটচিত্রের মতো, যা আমাদের লোক ঐতিহ্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। চারুকলায় মুখোশ তৈরির চর্চা থাকলেও গ্রামীণ মুখোশ শিল্পীদের হাতে এখন খুব কমই মুখোশ তৈরি হয়। সে জায়গা এখন দখল করে ফেলেছে প্লাস্টিকের তৈরি মুখোশ ও খেলনা। ফলে বাংলার এই লোককলা এখন বিলুপ্তির পথে।