হাসানের ঘুম খুব পাতলা। রাত শেষ না হতেই বিছানায় উঠে বসে। ডাকতে থাকে মাকে। সারা দিনের সংসারী পরিশ্রমে মা সজাগ পান না। ক্লান্তদেহে ঘুমের জড়তা কাটতে চায় না মা’র। ছেলের খুত্খুতানি হালকা কান্না আবছা আবছা তার কানে আসে। তার বাবাকে ডাকে। বাবারও একই দশা। প্রাইভেট স্কুলে চাকরি। হাড় ভাঙা পরিশ্রম। এমনিতেই ক্লান্ত। তার ওপর বড্ড আলসে। বিছানায় শুয়ে এপাস ওপাস করে।
থাকার ঘরের অপর পাশে রান্নাঘর। ঘরের এক কোণে মুরগির খোঁয়াড়। অনেক মুরগি। ঘরের দক্ষিণ কোনটায় ইলেকট্রিকের বাল্ব জ্বালানো থাকে সারা রাত। সকাল মনে করে মুরগি তার ছোট ছোট বাচ্চাসহ বাইরে বের হয়ে আসে। টেও টেও করতে থাকে। মনে করে সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু বাড়ির চারদিকে ঘেরাও থাকায় বাইরে দূরে কোথাও মুরগি তার বাচ্চা নিয়ে যেতে পারে না।
ঘরের ভেতরে নাতির খুত্খুতানি আর বাইরে মুরগির টেও টেও শব্দ। দুটোই দাদা-দাদীর কানে যায়। আবার এদিকে মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে, ‘আস্ সালাতু খাইরুম মিনান না-উম।’ ঘুম থেকে নামাজ উত্তম।
দাদা আর বিছানায় থাকতে পারে না। নামাজ আদায়ের জন্য উঠে পড়ে। তখনো খুত্খুতানি কান্নার আওয়াজ ঘর থেকে আসছেই। দাদা ডাকে-
: ও দাদু! দাদু আমার ... কাঁদছ কেন?
কী হয়েছে আমার দাদুর? দাদুর ক্ষিদে পেয়েছে? বউ মা, আমার দাদুকে দুধ দাও। নামাজ শেষ করে দাদুকে নিয়ে বাহিরে ঘুরব। মুরগির কয়টি বাচ্চা দেখাবো... দাদু কত ভালো। দাদু আরেকটু শুয়ে থাকো। ফর্সা হোক। ভোরের আলো ফুটুক...
না, ওর খুত্খুতানি কান্না শেষ হয় না। নামাজ সেরে এসে দাদু কোলে নিয়ে ঘরের বাইরে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করে। মুরগি ও মুরগির বাচ্চাগুলো দেখে কান্না থেমে যায়। দাদুর কোল থেকে মাটিতে নামতে চায়। কিন্তু দাদু ঠাণ্ডা মাটিতে নামায় না। নিউমোনিয়া হতে পারে। গাছ দেখায়। ফুল দেখায়। পাখি দেখায়। নানা গল্পে ওসব ভুলিয়ে দেয়। ততক্ষণে মা-বাবার ঘুম ভাঙে।
মা শানু ডাকতে থাকে,
আমার ময়না পাখি কই? আমার সোনা কই?
বাবা আমার কান্না করছে? দেন, আমার কোলে দেন।
বাবার বড্ড খিদে পেয়েছে। বাবা আমার এখন খিচুড়ি খাবে। খিচুড়িতে অনেক অনেক পুষ্টি আছে। ছোটদের জন্য পুষ্টি খুব জরুরি। সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে শানু ছেলেকে খাওয়ায়।
ভোরের আলো অনেকটা ছড়িয়ে গেছে। সূর্যের আলোও উঁকি ঝুঁকি মারছে। পাখিগুলো কিচিরমিচির শুরু করে দিয়েছে।
শানু ছেলেকে পুষ্টি খাওয়ানো শেষ করে। সরিষার তেল হাতে পায়ে মুখে মেখে নতুন জামা কাপড় পরিয়ে বাঁশিওয়ালা জুতা পায়ে পরায়। ছেলেকে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে সংসারের লোকদের জন্য সকালের নাশতা তৈরিতে হাত দেয়।
ছেলে এক পা দুই পা করে হাঁটে। চাপ লেগে জুতার বাঁশি প্যাঁ পোঁ শব্দ করে। বড্ড খুশি হয়। খিলখিল করে হাসে। তার ছোট ফুপি হাত এগিয়ে দেয়। তার হাতে আঙ্গুল ধরে উঠোনময় হাঁটতে থাকে। জুতোর বাঁশির শব্দে সারাবাড়ি প্যাঁ পোঁর আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কেউ ওসব মনে করে না। বরং সবাই তার সাথে খুনসুটিতে আনন্দ উপভোগ করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাড়িটা যেন প্রাণবন্ত থাকে। দাদু ছোট্ট নাতির হাতে একটি পতাকা তুলে দেয়। বলেন, দাদু চলো আমরা জানান দেই সবাইকে, এ মাস স্বাধীনতার মাস। মুক্তি সংগ্রামের মাস।
