মো: আবদুস সালিমআজ তোমরা ছোট রঙচঙে বনচর পাখি নীল শুমচা সম্বন্ধে জানবে। ভালো খবর হচ্ছে, এ পাখি বাংলাদেশেও দেখা যায়। আরো দেখা যায় মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশে। সারা পৃথিবীতে নীল শুমচার আবাস প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার।
নীল শুমচার পেট ডোরাকাটা। পিঠ ঘননীল। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ সেন্টিমিটার। ডানা প্রায় ১২ সেন্টিমিটার। পা প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। ঠোঁট ২.৪ সেন্টিমিটার। আর ওজন মাত্র প্রায় ১০৮ গ্রাম। কিছুটা পার্থক্য রয়েছে স্ত্রী ও পুরুষ নীল শুমচার চেহারায়। ঘন নীল পুরুষ পাখির পিঠ। মাথার পেছনে ও ঘাড়ের পেছনে শোভা পায় লাল। একটি কালো চিকন মধ্যডোরা দেখা যায় কপালে। সবুজাভ ধূসর কপাল ও মাথার সামনের দিক। একটি চওড়া কালো ডোরা চলে গেছে ঠোঁট থেকে চোখ হয়ে ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত। একটি কালো অস্পষ্ট দাগ চোখে পড়ে গলায়। হালকা হলুদ গাল, গলা ও ভ্রƒর কিছু অংশ। ডানার শেষ অংশের পালক কালচে। দেহের পেছনের অংশ ডানা ও লেজের উপরের ঢাকনি নীল। অসংখ্য ঘন নীল তিলা ডোরা দেখতে পাওয়া যায় সাদা দেহতলের পুরোটায়। এগুলোকে দেখতে অনেকটাই মাছের আঁশের মতো লাগে। তবে স্ত্রী শুমচার বেলায় এ সংক্রান্ত কিছু পার্থক্য রয়েছে। স্ত্রী পাখির ঘাড়ের পেছনের পট্টির রঙ কমলা ও ছোট। কালচে জলপাই রঙ কাঁধ-ঢাকনি। কোমর নীল। নীলাভ জলপাই লেজের উপরের ঢাকনি ও ডানা। স্ত্রী-পুরুষের ক্ষেত্রে এসংক্রান্ত কিছু মিলও রয়েছে। যেমন চোখ কালচে। কিছুটা লালচে-বাদামিও মনে হয়। ঠোঁট বা চঞ্চু সোজা ও কালো। পা বেশ শক্তিশালী। এ জন্য এরা শিকারে বেশ পটু। কালচে বাদামি অপ্রাপ্ত বয়স্ক পাখির পিঠের অংশ। ঘন ফিকে ডোরা চোখে পড়ে দেহের নিচে। লেজ কিন্তু নীল।
নীল শুমচাদের বিচরণ করতে দেখা যায় চিরসবুজ বনতলে ঘন গুল্ম, বাঁশঝাড় ও বনের ধারে। সচরাচর থাকে একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায়। এরা লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খুঁজে বেড়ায় অন্ধকার বনে লতা-পাতায়। পোকামাকড় খুঁজে খায় নরম মাটি ঠোঁট দিয়ে খুঁচিয়ে। এরা বেশি পছন্দ করে শামুক, গোবরে পোকা, কীট, পিঁপড়াসহ অন্যান্য পোকামাকড়। এরা বেশি কর্মচঞ্চল বা তৎপর থাকে ভোরে আর সন্ধ্যায়। খুবই চঞ্চল স্বভাবের পাখি এরা। সব সময় ছটফট করতেই থাকে। ভয় পেলে এরা উড়ে চলে যায় গাছের মগডালে। মাঝে মধ্যে এরা মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে নানারকম মধুর আওয়াজ করতে থাকে।
নীল শুমচারা ডিম দিয়ে থাকে সাধারণত মে-জুলাই মাসে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায় স্থানভেদে। এ সময়ে এরা বাসা বানায় চিরসবুজ বনে। শুনলে অবাক হবে, এরা অনেক সময় ডিম দেয় উন্মুক্ত স্থানের মাটিতে। বাসা তৈরি করে ঘাস, বাঁশপাতা ইত্যাদি জোগাড় করে। ডিম পাড়ে ৪-৫টি। রঙ সাদা।
নীল শুমচার উপপ্রজাতির সংখ্যা তিনটি। এগুলো হলো পিসি সিয়ানা, পিসি আউরানটিয়াকা ও পিসি উইলোরি। সিয়ানা বেশি চোখে পড়ে মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে। আউরানটিয়াকা বেশি দেখা যায় দক্ষিণ-পঞ্চিম কম্বোডিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব-থাইল্যান্ডে। আর উইলোরির
বিস্তৃতি হচ্ছে উত্তর ভিয়েতনাম ও মধ্য লাওসে।
নীল শুমচার বৈজ্ঞানিক নাম পিট্টা সিয়ানা। আর ইংরেজি নাম ব্লু পিট্টা। এ পাখির আরেক নাম আসমানি শুমচা বা পিট্টিডি। এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থই নীল শুমচা। পৃথিবীতে এদের সংখ্যা কত তা হিসাব করে দেখবে পাখি বিশেষজ্ঞরা। বিগত কয়েক দশকে এদের সংখ্যা কমেছে। তবে তা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি।