শুভ নববর্ষ ১৪২৭! বাংলা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব হল বাংলা নববর্ষ। তাই প্রতি বছরই গোটা বাঙালি জাতি সব ধর্ম, বর্ণ, বিভেদ ভুলে উদযাপন করে বাংলা নতুন বছরকে। সব গøানি, বেদনা, অপ্রাপ্তি ভুলে আনন্দে ভাসবে গোটা দেশ এমনটাই ভাবনা ছিল সবার। তবে এবারই প্রথম বাংলা নতুন বছরকে ঘরে বসে বরণ করতে হবে আমাদেরকে। বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। তাই অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও চলছে নিষেধাজ্ঞা, লকডাউন। জনসমাগম এড়াতে সব প্রকার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামসহ স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই নেই রঙ-সাজসজ্জা, নেই পান্তা ইলিশ কিংবা শোভাযাত্রা- মেলার আয়োজন। কয়েক শত বছর (১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের) ধরে চলে আসা এবারের নববর্ষ উদযাপন যেন বাঙালির সম্পূর্ণ অচেনা, এক অজানা আশঙ্কায় মোড়ানো ভিন্নমাত্রা।
তবে, উৎসবপ্রিয় বাঙালির রঙ এবার সোস্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোতেও তেমন আঁচড় কাটেনি। সরকার ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেছে। সেই সঙ্গে সারা দেশের দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ থাকবে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশাখকেন্দ্রিক বেচাবিক্রি নেই। বৈশাখী বিক্রি বন্ধ হওয়ায় দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বছরের দুটি বড় উৎসব ঈদ ও পয়লা বৈশাখ। এ সময়ে পোশাকের কেনাবেচা জমে ওঠে। ফলে সারা বছরই এ দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে চলে বিভিন্ন প্রস্তুতি। তৈরি করা হয় রঙ-বেরঙের নতুন নতুন ডিজাইনের নানা পোশাক। যার প্রস্তুতি এবারো প্রায় শেষ। বেচাকেনায় জন্য চলছিল নানা আয়োজন। করোনা ভাইরাসের আঘাতে সব বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশাখী বাণিজ্য এবার শেষ। এমন অবস্থায় ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পয়লা বৈশাখের পর ঈদ বাণিজ্যেও বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছর যে রকম জমজমাট প্রস্তুতি থাকে, এবারে সে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। যার একটি প্রভাব পড়েছে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাজারের ওপর। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে মানিকগঞ্জের গ্রামীণ জনপদের মানুষজনের চৈত্রসংক্রান্তি থেকে বৈশাখজুড়ে বিভিন্ন স্থানে বসত বৈশাখী মেলা। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নববর্ষের বৈশাখী মেলা। আর এ মেলাকে সামনে রেখেই জেলার প্রায় ২৫ হাজার তাঁত, হস্ত, মৃৎশিল্পী আর মিষ্টির কারিগড়রা সারা বছরের উপার্জনের মাধ্যমে লাভের মুখ দেখত। মানিকগঞ্জের মৃৎ, ঘোষ কারু ও তাঁতিপল্লীতে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখের আগে কারিগরদের দম ফেলার সময় হতো না। এবার তাদের হাতে কোনো কাজ নেই। একের পর এক অর্ডার বাতিল হওয়ায় মহাজনরাও বিপাকে পড়েছেন। তারা না পারছেন ঋণ পরিশোধ করতে, না পারছেন এসব পেশায় জড়িদের মজুরি দিতে। একই অবস্থা বাংলাদেশের অন্য এলাকারও।
মৃৎশল্পীরা বৈশাখী মেলার জন্য মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরি করতেন কিন্তু করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সবাই বাড়িতে অবস্থান করছে। পণ্যসামগ্রী উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করতে না পারায় তারা মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করছে। জেলার ৭টি উপজেলাতেই রয়েছে কম বেশি তাঁতশিল্প। বৈশাখী শাড়ি, লুঙ্গি, বাহারি রঙের গামছা তৈরির কাজে ইতোঃপূর্বে মানিকগঞ্জের তাঁত শিল্পীদের চোখে ঘুম থাকত না। এবারো চোখের ঘুম হারাম, কিন্তু তা হতাশায় আর লোকসানে। এ ছাড়াও মানিকগঞ্জের সিল্ক, মসলিন, থানকাপড় ও কারু কাজ সমৃদ্ধ শাড়ির কদর দেশজুড়ে। মানিকগঞ্জের তাঁত মালিক আবদুল বাসেত মিয়া জানান, মালিক-শ্রমিক মিলে প্রায় ১০ হাজার লোক এ পেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আগে এই সময় কয়েক শত কাপড়ের অর্ডার থাকত, লাখ টাকা ইনকাম ছিল। এখন তাদের পণ্য বিক্রি করার কোনো অবস্থা নেই। এই রকম দুই মাস থাকলে আমাদের পথে বসতে হবে।
কুটির শিল্পীরা বাঁশ বেত সামগ্রী, রঙিন হাতপাখা, মোড়া, টেবিলম্যাট, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ফুলদানি, ছাইদানি, শিশুদের খেলনা সামগ্রীসহ ঘর গৃহস্থালীর নানাবিধ উপকরণ তৈরিতে জেলার প্রায় ২ হাজারেরও বেশি পরিবার। কাটিগ্রাম এলাকার মো: শামসুল মিয়া জানান, এবার হাতে কাজ নেই, মেলা নেই, হাট নেই। সংসার কিভাবে চলব তা আল্লায় জানে।
১৬ থেকে ৩০০ জনের কম কর্মীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানা অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আওতায় পড়ে। বাংলাদেশের মোট শিল্পের ৯৩ শতাংশই এমন ধরনের উদ্যোগ। এসব শিল্প মূলত স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন পণ্য সরবার করে, পাশাপাশি রফতানিতেও কিছুটা ভূমিকা রাখে। পুঁজি কম এবং সঞ্চয় সীমিত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষমতাও কম। তাই করোনা বিপর্যয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ায় মারাত্মক হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো।
মাই ক্র্যাফট ফ্যাশনের উদ্যোক্তা শাহনাজ পারভীন বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে যে শোরুমগুলোতে পণ্য দিতাম সেগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কবে থেকে দেশ আবার স্বাভাবিক হবে সেটা বুঝতে পারছি না। তাই সেখানে থেকে কোনো টাকাও পাচ্ছি না। যার কারণে আমরা সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
আপন ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সারা বছরের দুই ঈদ ও নববর্ষ উপলক্ষে আমাদের সবচেয়ে কেনা বেচা হতো। আমাদের এই পরিস্থিতিতে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। পয়লা বৈশাখে আমরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেলাম। এ পরিস্থিতি থেকে কখন মুক্তি পাবো তা জানি না। আমাদের জন্য সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং হবে করোনা ইস্যু শেষে। তখন যদি আমাদের দেশের জনগণ দেশীয় পণ্যমুখী হন। সে ক্ষেত্রে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো অনেক বেশি সহজ হবে।
এনপিআই ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের লেকচারার মেহজাবিন আক্তার বলেন, এই সময় সঙ্কট বিবেচনায় অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য একটি বিশেষ প্যাকেজ এক দিকে থাকবে, তাদের যে লোন সেটা এক বছরের জন্য রিশিডিউল করে দেয়ার জন্য। পাশাপাশি একটা ফান্ড গড়ে তুলতে হবে। সেই ফান্ড থেকে কম সুদে স্বল্পকালীন লোন নিতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্প্রতি জুন মাস পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ বন্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। করোনার সঙ্কটকালেও অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখতে বিপণন কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে অনলাইনভিত্তিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় জোর দেয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
গৃহবধূ গীতা সরকার বলেন, এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই একটা প্ল্যান থাকে যে নতুন কাপড় কেনার। এবারো ভেবেছিলাম নতুন শাড়ি, মাটির গয়না পরে বের হবো। কিন্তু এর কিছুই আসলে হবে না। কারণ সবাই বাসায় বন্দী। উৎসবের আনন্দটা এবার নেই। সবাই আতঙ্কিত।
বর্ষবরণকে ঘিরে পুরো দেশের অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লেনদেনের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার মতো। এর ওপর ভিত্তি করে শহর ও গ্রামের ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা বিকাশ লাভ করেন। দেশে করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে থমকে গেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানো এসব উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে নীতি নির্ধারকদের। প্রয়োজন মতো সরবরাহ করতে হবে সহজ শর্তের ঋণ, এমনকি প্রণোদনা। প্রান্তিক এই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের এগিয়ে আসা দরকার। হ