প্রথম অধ্যায়...
অনুপ্রেরণার উৎস ক্ষেত্র-০১
.................................................................
লেখালেখির ভাবনা যদি
হঠাৎ করে মাথায় আসে...
মনের ভেতর সম্ভবত
এমন কিছু প্রশ্ন ভাসে...
কী লিখব? কেন লিখব?
কিভাবে লিখব? কখন লিখব?...
প্রশ্নগুলোর জবাব পেয়েই
লেখালেখির ধরন শিখব।...
হ্যাঁ, কথাগুলো মেনে লেখালেখি শুরু করলে মন্দ হয় না। কিন্তু লেখার ভূত যদি মাথায় ঢোকে, তা হলে ওসব... কী? কেন? কিভাবে? কখন?... এগুলো ভাবার অবকাশ থাকে না।
আসলে এভাবে কেউ লেখালেখির যাত্রা শুরু করেন বলে মনেও হয় না।
বড় লেখকদের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয়Ñ আপনার লেখালেখির শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?
তাহলে উত্তর দিতে একটু ভাবতে হবে। কেউ বলতে পারেন, ঠিক মনে পড়ছে না।
কেউ বলতে পারেন, হঠাৎ কিভাবে যেন হয়ে গেছে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, পাঠ্যবইয়ের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমারও মনে হয়েছে, আমিও লিখতে পারব। এভাবে চেষ্টা করতে করতে সত্যি সত্যিই একদিন একটা লিখেই ফেললাম।
আবার কেউ বলতে পারেন, মা আমার প্রথম অনুপ্রেরণা।
অবশ্যই কোনো একটা অনুপ্রেরণা তো থাকেই। এমনি এমনি কোনো মহৎ কাজে মানুষ হাত দেয় না। কারো উৎসাহ অবশ্যই থাকে। তো লেখালেখি মহৎ কাজ? শতভাগ মহৎ কাজ। যারা লেখালেখি করেন, তারা সুন্দরের দরবেশ বা সাধক। সাধনা করতে হয় সাধনা ছাড়া হয় না। কোনো একটা অনুপ্রেরণা থেকেই কেউ শৈশবেই, কিংবা কেউ হয়তো একটু পরিণত বয়সেও, অর্থাৎ কলেজে পড়ার সময়েও লেখালেখিতে আত্মস্থ হয়ে থাকতে পারেন।
অনেক সময় সাহিত্যপ্রিয় পরিবারের অনুপ্রেরণায় লেখালেখিতে অনেকে উৎসাহী হয়ে থাকেন। কেউ বা হয়তো তার সাহিত্যমনা শিক্ষকের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে লেখার প্রতি ঝুঁকেছেন। এমন ঘটনাই বেশি ঘটে থাকে। খোদ রবীন্দ্রনাথ তার গৃহশিক্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখতে শুরু করেন একেবারে শিশু বয়সেই।
আরো একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করি বাংলা সাহিত্যের চার বিখ্যাত প্রতিভার লেখক হয়ে ওঠার গল্প থেকে। গল্প নয়, জলজ্যান্ত সত্যি ঘটনা। এ ঘটনা ঘটেছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং ছান্দদিক কবি কাজী কাদের নওয়াজের ক্ষেত্রে।
নজরুল, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহপাঠী। তাঁরা পড়তেন বর্ধমানের মাথরুন ইংরেজি মাধ্যমিক স্কুলে। ওদের থেকে বয়সে দশ-বারো বছরে ছোট হলেও একই স্কুলের ছাত্র ছিলেন ছান্দসিক কবি কাজী কাদের নওয়াজও।
তখন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সুবিখ্যাত পল্লী প্রকৃতির কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। তাঁর কবিতা দেশের বিখ্যাত পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। স্কুলের বাংলা পাঠ্যবইয়েও তাঁর কবিতা আছে। প্রিয় শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রায়ই তাঁর নতুন ছাপা হওয়া কবিতাটি ছাত্রদের শোনান।
ছাত্র তো অনেক, কিন্তু এই চার ছাত্রের মধ্যে কবিতা লেখার একটা ঝোঁক আগে থেকেই ছিল, আর ক্লাসে নিয়মিত শিক্ষকের কবিতা শোনার পর তাদের সুপ্ত ঝোঁকটা ভালোভাবেই জেগে ওঠে। সেই থেকে তাঁরাও শুরু করে দেন লেখালেখি। সবার শুরুটাই হয়েছিল কবিতা দিয়ে, তবে শৈলজানন্দ পরে গল্প-উপন্যাসে ঝুঁকে পড়েন। বাংলা সাহিত্যের এই চার মহারথীর অনুপ্রেরণার উৎস ক্ষেত্রটি এক ও অভিন্ন। প্রধান শিক্ষক কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকই তাদের মূল অনুপ্রেরক।
অবশ্য এখন লেখক হয়ে ওঠার শুরুর অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র অনেক। অনেকটা ছবি আঁকার মতো। আজকাল শিশুশ্রেণী থেকে ছবি আঁকা শেখানো হয়। এ জন্য প্রতি বিদ্যালয়ে অঙ্কন শিক্ষক থাকেন। আর শিশুদের ছবি আঁকার আলাদা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা পাঠশালাও আছে অনেক। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকেই। একেবারে গ্রামপর্যায় থেকে সব শহরেই এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
অভিভাবকরা তাঁর প্রিয় শিশুকে আনন্দচিত্তে প্রতিযোগিতাস্থলে নিয়ে যান। সব শিশুই বড় আঁকিয়ে হয়ে উঠবে না, কিন্তু এই সহস্র শিশুর মধ্য থেকেই হয়তো বা ভবিষ্যতের জয়নুল, সুলতান, রফিকুন নবী, হাশেম খান কিংবা ধ্রুব এষের মতো দেশখ্যাত শিল্পী উঠে আসবে।
শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো অবশ্য শিশুদের লেখালেখির কোনো প্রশিক্ষণশালা বা পাঠশালা গড়ে ওঠেনি। তবে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান সূচিতে শিশুদের আবৃত্তি ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আয়োজনই থাকে। পাশাপাশি দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোর ছোটদের পাতায় শিশুদের নির্দিষ্ট বিভাগ থাকে। এ ছাড়া শিশু-কিশোর মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতেও ছোটদের লেখার সুযোগ রয়েছে। এসব মাধ্যমে শিশুরা লেখা পাঠালে অভিজ্ঞ সম্পাদক ভুলত্রুটিগুলো শুধরে তা ছাপিয়ে দেন। নবীন শিশুর-কিশোর লেখকরা লেখাটি প্রকাশের পর যেমন খুশি হয়, তেমনি বুঝতে পারে কোথায় কোথায় তার ত্রুটি ছিল। এভাবেই শখের লেখালেখি থেকেই এই শিশুরা ভবিষ্যতে বড় লেখক হয়ে উঠবে। [চলবে]
