মানুষ। এই শব্দটির উচ্চারণে পৃথিবীর সমান ভার বহন করতে হয় মনের গহিনে। সৃষ্টির সেরা জীব হলো মানুষ, মানুষ নদী নয় বৃক্ষ নয় জল নয়। আকাশ নয় মাটি নয়। অথচ এসবই মানুষের করতলে, অনুগত ও অধীন। যদিও মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব মিশে যাবে মাটিতেই। মানুষ সব প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ কারণ বিশ^ভ্রমাণ্ডে যতসব অসংখ্য প্রাণিকুল আছে তাদের তুলনামূলক জীবনচর্চা বা অভ্যাসের মধ্যে মানুষের মতো আর কোনো প্রাণীর ভাবনায় কর্মের ভবিষ্যৎ বিবর্তনে অত বিকশিত নেই।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই মানুষ হিং¯্র প্রাণীকে বধ করে বা বশ মানায়, মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের বর্ম বুকে ধারণ করে জল স্থল অন্তরীক্ষে ক্ষমতার পতাকা উড়াতে পারে। মানুষ তার সব ধী-শক্তি দ্বারা পৃথিবীর সব অর্জনের পাশপাশে অন্য গ্রহের খবরদারিত্ব বা অংশীদারিত্ব নেয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তো মানুষ যে সৃষ্টির সেরা তা প্রমাণের জন্য বিজ্ঞ সমাজ সচেতন ব্যক্তির নিকট কোনো যুক্তিই আশা করি এই লেখার পরিসর বৃদ্ধির জন্য আবশ্যক নয় এবং এভাবেই মানুষের শ্রেষ্ঠ কর্মই পৃথিবী ধ্বংসের পূর্ব পর্যন্ত থেকে যাবে।
তো সেই মানুষের স্বরূপ শুরু হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিবর্তন থেকেই। যেমন মানুষ শিশু, মানুষ কিশোর-যুবক এবং একসময় পরিপূর্ণ পরিপক্বতার খোলশে সে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। এই যে ক্রমবর্ধমান পরিক্রমায় তার বেড়ে ওঠা এবং মানুষে রূপান্তরিত হওয়া, তার ভেতরই প্রকৃতপক্ষে সকল কর্ম ভাবনা ভবিষ্যৎ লুকায়িত থাকে।
যখন মানুষ তার সফল কর্মের প্রকাশ ঘটাতে পারে অর্থাৎ সে অন্যের হয়ে ওঠে, সমাজের হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রের হয়ে ওঠে, নিপীড়িত শোষিত অসহায়ের জন্য হয়ে ওঠে তখনই সে শ্রেষ্ঠ এবং শ্রেষ্ঠ এবং শ্রেষ্ঠ। মানুষ তখন শ্রদ্ধেয় পুজ্য এবং সম্মানে আসীন হয়ে অন্য সম্প্রদায়ের কাছে বৃহৎরূপে নিজের প্রকাশ-অবস্থান পরিষ্কার করতে পারে।
কিন্তু আজকাল মানুষ কী তা করতে সমর্থ? তার শ্রেষ্ঠত্ব আজ পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ। তাকে বৃদ্ধি বিবেক ভাবনা, কিছু কিছু অদূরের ভবিষ্যৎ দৃষ্টি দান করা হলেও সে উৎকৃষ্ট উপায় ব্যবহার না করে নিকৃষ্টদের তালিকায় নিজের নাম লিখছে। এমন সব অপকর্ম, তার ঘৃণিত সংযোজন সংশ্লিষ্টতার অপরিমিতিবোধ অতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে তা অন্য সব নিকৃষ্ট প্রাণী বা পশুও করতে পারে না বা করে না। মানুষই ভুলে যাচ্ছে তার পরিবারের সম্মান, শিশুর মর্যাদা, বালিকা বা নারীর সম্ভ্রমের মূল্য। অন্যসব প্রাণী/হিংস্র পশু প্রকৃত পক্ষেই প্রতারক শঠ জবরদখল দুর্নীতি হত্যা ধর্ষণ ক্রিয়ায় কদাচিত জড়িত নয়। অন্যসব প্রাণী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ব্যথায় ব্যথিত হয়, যেমন ঝাঁকে ঝাঁকে পিঁপড়া, কাকের মিছিল দেখলে তা সহজেও অনুমেয়। ওদের অন্তরে স্বজাতির জন্য আবেগ মায়া দায়িত্ব আজকাল মানুষের অপকর্মের পরিধিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ফলে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে আস্ফালন করতে পারে না। তার গৌরব ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। তার সম্মান নিয়ে তিরস্কারের পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছে। সমাজে সমাজে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সর্বত্র মানুষের যে জয়গান রচিত ছিল তার সাফল্যের আর্কাইভ রক্ষিত ছিল তাতে অনাচার অবিচার অনৈতিকতার কালিমা চিহ্ন বসতে যাচ্ছে। কিছু ভালো মানুষ ও সমাজবিজ্ঞানী শঙ্কায় ডুবেন থাকেন অন্যসব অমানুষদের হত্যা ধর্ষণ প্রতারণার স্বার্থবাদীর নোংরা স্মৃতিপট নিয়ে।
যখন কাগজের পাতায় পাতায় কেবলি মানুষের অপকর্ম মানুষের দুষ্টক্ষতের চিহ্ন তখন লজ্জা ছাড়া আর কিছু বইবার অবশিষ্ট থাকে না। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সত্যি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। তবু এভাবেই প্রকাশ করি :
মানুষ মানুষের জন্যে
জীবন জীবনের জন্যে
একটু সহানুভূতি কী মানুষ পেতে পারে না.. হ
লেখক : কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক