পৃথিবীতে চার ভাগের তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। আর এই স্থল ভাগের মধ্যে বৃহৎ অংশজুড়ে আছে পাহাড়, পর্বত, বন-বনানী ও মরুভূমি। মানুষের বসবাস খুবই সামান্য অংশ নিয়ে। আর এই মানব সমাজ বিচিত্র অবয়ব এবং সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যে পূর্ণ। মানুষের আসা-যাওয়া এবং পৃথিবীর বুকে পদচারণায় ছাপ তার বিচিত্র সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। জগতে আসার পর সে বিস্ময় বোধ করেছে। এই বিস্ময় থেকে তার মনে প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে। এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটেছে। বিজ্ঞান মানুষকে দেছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে বিবেক। বিবেকের শাসন না থাকার কারনে মানুষ আজ অন্ধকার গলি পথে আটকা পড়ে আছে। পরিবেশ পরিস্থিতি পরিবর্তন না ঘটলে মানুষের আচরণের ও পরিবর্তন ঘটবে না। কারণ পরিবেশের পরিবর্তন মানব চরিত্রের পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তনের স্রোত ধারা এত বেশি যে গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাস বলেছিলেন যে একই নদীতে দুইবার অবগাহন করা যায় না। বস্তু সদা পরিবর্তনের আধার। তার যেমন আছে পরিবর্তন তেমন আছে রূপান্তর ও ধ্বংস। আর এই ধ্বংস চিরস্থায়ী ধ্বংস নয়। কারণ বিজ্ঞান বলে বস্তুর ধ্বংস নেই। এক শক্তি আর এক শক্তিতে রূপান্তর হয় মাত্র। মানুষের দেহ ধ্বংস হলেও আত্মা অবিনশ্বর। আত্মার কোনো ধ্বংস নেই। ঐশী প্রত্যাদেশ দ্বারা মানুষকে এই জ্ঞান দেয়া হয়েছে। তবে মানুষ সবাই এই জ্ঞানে জ্ঞানী হতে পারেনি। চার্বাকরা আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে। তারা মানব দেহের ভেতর আত্মাকে শক্তি এবং প্রাণকে তারা অস্বীকার করেছে। তারা বলেন যে চুন, সুপারি, পানের ভেতর যেমন লাল রঙ নেই। কিন্তু এই তিনটি একত্রে চাবানোর পর লাল রঙের উৎপত্তি হয়। ঠিক মানব দেহের ভেতর প্রাণের আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা বিভিন্ন গ্যাস ও বস্তুর সংমিশ্রণের ফলে উদ্ভব হয়েছে। জীবনটা এমনিই উদ্ভব ঘটেছে? না উত্তম অবয়ব দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। না চোখের দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভব ঘটেছে তা দেখা শুরু করেছে। কানের দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভব ঘটেছে তা শোনা শুরু করেছে। নাকের দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভব ঘটেছে তারপর সে ঘ্রাণ নেয়া শুরু করেছে। এই ধরনের চিন্তার দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভব ঘটেছে। কারণ দুর্ঘটনার ফলে সজীব বস্তুর উদ্ভব ঘটেনি। এবং তারা কার্যকলাপ নিক্তিতে নিক্তিতে কাজ করা শুরু করেছে এটা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও মানবীয় জ্ঞান হতে পারে। কারণ মানুষের জ্ঞানের সীমানা এত কম তে সে খুবই সামান্য জানতে পারে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সে জ্ঞানটা জানা যায় তা দ্বারা মানুষের বিশাল জ্ঞানের এরিয়া তাতে চলতে পারে না। তাই তার ইন্দ্রিয়াতীত জ্ঞান দরকার হয়। যেখানে যাওয়া তার অধিকার নেই। দার্শনিকরা এই জ্ঞানকে বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার দ্বন্দ্ব বলে স্বীকার করেন।
বস্তু কোনো দিন আইডিয়া দিতে পারে না। বরং সমস্ত বস্তুই আইডিয়ার মধ্যে। বস্তু ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ফলে চেতন সত্তার আচরণের পরিবর্তন হয়। কিন্তু এই চেতন সত্তা বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কারণ মন রঙে রঙিন হয়। এমনিক দেহটাকে রঙিন করা যায়। কিন্তু আত্মাকে চিরস্থায়ীভাবে রঙিন করা যায় না। কারণ আত্মাকে রঙিন ও উজ্জ্বল করার জন্য যে উপাদান দরকার তা দেহকে রঙিন করার জন্য যে রঙ দরকার এক নয়। আত্মা অবস্তু আর দেহ বস্তু। এদের মাপকাঠি ভিন্ন। এদের একই মাপকাঠিতে মাপা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। আত্মাকে পরিশুদ্ধ বা উজ্জ্বল না করে যদি দেহকে উজ্জ্বল করার জন্য চিন্তার ব্যস্ত থাকা হয়। এবং সময়, শ্রম ও ঘাম ব্যয় করা হয় তাহলে এটা হাইড্রোজেন বোমা ফাটাবার মতো পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। মনো জগতের মতো বিশ্ব জগৎ রহস্যে ভরা। এই রহস্য ছেদ করা দুরূই ব্যাপার। বিশ্ব চরাচর নিয়ে ভাবতে গিয়ে মানুষ আজ অবাক হয়ে গেছে। এই বিশাল সৃষ্টি জগতের রহস্য তার কাছে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞানের আকার প্রকার ও অবয়ব দান করেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে, এক ছায়া পথ থেকে আর এক ছায়া পথ ২০ লাখ আলোক বর্ষ দূরে। আমাদের কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে যে ছায়াপথটা আছে সেটা ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। আজকে আমাদের দৃষ্টিতে যে ছায়াপথটি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সেটা ৫০ কোটি বছর আগেকার। অর্থাৎ আজকের ছায়াপথটি দেখতে আমাদেরকে ৫০ কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে।
তামাম সৃষ্টি জগৎ সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে। এই বিশাল বিশ্বচরাচর দেখে মানুষের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দেছে। এত বড় জ্ঞান মানুষ নিজের থেকে পাবে অথবা অন্য কারোর থেকে পাবেÑ এটা গ্রহণযোগ্য কি না ভেবে দেখার দরকার। মানুষ সম্পূর্ণ অপূর্ণ সত্তা। আর এই অপূর্ণ সত্তার জ্ঞান ও অপূর্ণ থাকবেÑ এটা স্বাভাবিক। সে চরম ও চূড়ান্ত জ্ঞানার্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দেবেÑ এটা স্বাভাবিক। কারণ মানুষের জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে, যা সে জানত না। এই মানব সমাজ চলিত হচ্ছে রাজনীতি দ্বারা। আজ মানুষ শান্তির পিপাসায় অস্থিরভাবে প্রবাহিত। কী তার পরিণতি? কোথায় তার যাত্রা শেষ? এ নিয়ে মানুষের চিন্তার ভেতর দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। আজ রাজনীতিতে রাজার নীতি আছে; কিন্তু নীতির রাজা নেই। আজ রাজনীতিতে রাজার নীতি আছে; কিন্তু নীতির রাজা নেই। আজ রাজনীতি দ্রুত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে চলেছে। ব্যবসায় যেভাবে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যায়। তদ্রƒপ রাজনীতিতে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যায়। যা মানব সমাজ ও সভ্যতার জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারণ মানব সেবায় শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো রাজনীতি। আজ রাজনীতি অন্ধকার গলি পথে আটকা পড়ে আছে। এ থেকে পরিত্রাণ কিভাবে হবে তা ভাবতে হবে। আজ গণতান্ত্রিক মানসিকতার বড় অভাব। পর মতের প্রতি সহিষ্ণুতা, পর ধর্মের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্য দলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ; এই গণতান্ত্রিক মানসিকতা আমাদের নির্মাণ করতে হবে। যে শিক্ষা পেয়ে এটা তৈরি হবে সেই শিক্ষায় পথ প্রশস্ত করতে হবে। তবেই জাতি উন্নত হবে।
সাহিত্য জাতির জন্য কল্যাণস্বরূপ। কিন্তু জনপ্রিয় সস্তা সাহিত্য এবং জনবিচ্ছিন্ন দায়িত্বহীন সাহিত্য মানুষের উপকারের স্থলে অপকারের সৃষ্টি করে। আমাদের চিন্তা চেতনার প্রগতিশীল হতে হবে। কারণ মুক্ত স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্রে স্পেন্সরশিপ কাম্য নয়। তবে স্বাধীনতা দাবি করার আগে আমাদের ভাবতে হবে আত্মনিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা আছে কিনা? যার আত্ম নিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা নেই তার স্বাধীনতা দাবি করার অধিকার নেই। স্বাধীনতা মানে সুনির্বাচিত অধীনতা। সাম্প্রদায়িক সমাজ দ্বারা কলহ বৃদ্ধি পায় শেষ পর্যন্ত মারামারি, কাটাকাটি হতে পারে। তাই আমাদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা বর্জন করে অম্প্রদায়িক হবে হবে। আমরা পোশাকে আশাকে আধুনিক হয়েছি; কিন্তু চিন্তা-চেতনায় আধুনিক হতে পারেনি। তার জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। পৃথিবীতে যারা মহামানব তাদের দায়িত্ব ছিল জাতি তৈরি করা। প্রথম দায়িত্ব ছিল ব্যক্তিতে তৈরি করা। কারণ ব্যক্তি নিয়েই রাষ্ট্র গঠিত। যদি লোক তৈরি হয় তাহলে শান্তির জন্য সংগ্রাম করা লাগবে না। বরং শান্তিতে থাকাই হবে সমাজবাসীর স্বভাব।
শান্তিতে থাকার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন চিন্তা দ্বারা সমাজকে প্রভাবিত করেছে। যেমন বার্ট্রান্ড রাসেল তার “ঞযব রসঢ়ধপঃ ড়ভ ংপরবহপব ড়হ ংড়পরবঃু” গ্রন্থে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চারটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন। বিশ্বনাথ গঙ্গোপাধ্যার কর্তৃক অনূদিত ওই গ্রন্থে বার্ট্রান্ড রাসেলের শর্তগুলো হলো :
প্রথম শর্ত : গোটা দুনিয়ার শুধু একটি (বিশ্বসরকার) থাকবে। শুধু সেই বিশ্বসরকারের অধীনে থাকবে সৈন্যবাহিনী (অর্থাৎ জাতীয়তাবাদকে বিলুপ্ত করতে হবে)। সারা পৃথিবীতে একটি মাত্র সরকার ও সৈন্যবাহিনী থাকার বিশ্বশান্তি বলবৎ করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় শর্ত : জাগতিক সুখ সমৃদ্ধিকে কোনো অঞ্চলে আবদ্ধ না রেখে সব দিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। ফলে কোনো অঞ্চল অপার অঞ্চলের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করবে না।
তৃতীয় শর্ত : ধরা থাক দ্বিতীয় শর্তটি সাফল্যের মুখ দেখেছে : জনসংখ্যা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে যে সবখানেই জন্মের হার কম হয়ে গিয়ে যেন বিশ্বজনসংখ্যা স্থির বা প্রায় স্থির স্বরে থাকে।
চতুর্থ বা শেষ শর্ত : কাজের অবসরে আনন্দ এবং খেলাধুলা ব্যক্তি উদ্যোমকে উৎসাহিত করতে হবে এবং রাজনীতিক ও অর্থনীতিক কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষমতার সার্বিক পরিব্যপ্তি সাধনকে মর্যাদা দিতে হবে।
বার্ট্রান্ড রাসেলের চিন্তা বাস্তবায়িত করা গেলে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এটা ঠিক। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সুদূর পরাহত। কারণ মানুষ স্বভাব স্বার্থপর। ব্যক্তি স্বার্থ না থাকলে সমষ্টি স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ পরিত্যাজ্য। কিন্তু জাতীয়তাবাদকে অঙ্গীকার, ভৌগোলিক বিভক্ততা, আঞ্চলিক অবস্থা এবং জাতিগত, বর্ণগত, ভাষাগত, ধর্মগত পার্থক্য অঙ্গীকার করা যায় না। এদের একই ছাদে ফেলে মাপা দূরহ ব্যাপার। ধর্ম থাকবে কিন্তু ধর্মান্ধতা থাকবে না। সম্প্রদায় থাকবে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। মত থাকবে কিন্তু মাতামাতি থাকবে না। বর্ণ থাকবে কিন্তু বর্ণবাদ মাথা চাড়া দেবে না। এমনকি কাদা থাকবে কিন্তু কাদা ছোড়াছুড়ি থাকবে না। মানুষকে এই শিক্ষাটা দিতে হবে।
এই সত্য শিক্ষা যদি মানুষের ভেতর প্রবেশ করা যায় তাহলে জগতের মানুষ এক মোহনায় শান্তির বাঁশি বাজাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই বাঁশিটি বাজানোর দায়িত্ব নিতে হবে যোগ্য ব্যক্তিদের। তারাই হবে শান্তির আলোকবর্তিকা। তাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতা দিয়ে আজকে লেখাটি শেষ করিছিÑ
‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পড়া অতীত
গিরি গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত।
সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর, বীর্যবান,
তাহা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান।।
চলমান-বেগে প্রাণ-উচ্ছল
রে নবযুগের স্রষ্টা দল,
জোর কদম চলবে চল’।। হ

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলেজশিক্ষক
ঊ-সধরষ:- ংযধযরফঁষরংষধসরঁপ@মসধরষ.পড়স