মহামারী করোনাকালেও স্পষ্ট হচ্ছে বিশ্বের সামগ্রিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সঙ্কটের মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে বিশ্বের ৮২ ভাগ সম্পদের মালিক মাত্র ধনিক শ্রেণীভুক্ত মাত্র একভাগ মানুষ। ধনকুবেরদের সুরতহাল প্রতিবেদনে পাওয়া যাবে, বিশ্বের বেশির ভাগ সম্পদ গুটিকয়েক পরিবারের হাতে। পুঁজিবাদের অনিয়ন্ত্রিত ও বল্গাহীন বিকাশের কারণে একই প্রকার সামাজিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার আওতায় থেকেও মানুষে মানুষে ব্যাপক পার্থক্য এবং শোষণ ও বঞ্চনাবোধের মনোজাগতিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যে নতুন মানবিক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে সে সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা না থাকলে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ অসম্ভব হবে। ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণবাদের বিস্তৃতি ঘটেছিল তা শেষ পর্যন্ত বিশ্বে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করেছিল। অতঃপর উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ কলোনির বিরুদ্ধে গণজাগরণ, গৃহযুদ্ধ ও মার্কিন গণতন্ত্রের যে মাইলফলক সূচিত হয়েছিল তা বিশ্বের রাজনৈতিক ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয়। আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানুষ আর মেশিন, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আর মেশিনের কার্যক্ষমতার মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সূত্রপাতই শুধু ঘটাবে না, সেই যুদ্ধে মানুষ যে দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখানোর হিম্মত রাখে তাকে কাবু করার কাজ করোনা করেই চলেছে।
অর্থব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা এবং পুঁজির পুঞ্জীভবন দ্বারা করপোরেট অর্থনীতির জয়যাত্রা সূচনার ধারক ও বাহক হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতির আধুনিকতম এজেন্ডা। মূলত এবং মুখ্যত রাজনীতি ও অর্থনীতি এ দুয়ের মধ্যে এখন কে বড় কে ছোট, কে কার দ্বারা কতখানি প্রভাবিত, উদ্বুদ্ধ কিংবা পরিচালিত হয় বা হচ্ছে তা আজো বিশ্বব্যাপী কোথাও খোলাসা করা সম্ভব হয়নি। কেননা, যুগে যুগে স্থান, পাত্র ও প্রক্রিয়াভেদে অর্থনীতি ও রাজনীতি অধিকাংশ সময় অনিবার্যভাবেই সমতালে ও সমভাবনায় এগিয়ে চলছে। সে কারণে প্রায়ই মনে হয়েছে বড্ড পরস্পর প্রযুক্ত এরা। যেন দু’জনে দু’জনার। যদিও অনেক সময় এটাও দেখা গেছে রাজনীতি অর্থনীতিকে শাসিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করেছেÑ আবার অর্থনীতি রাজনীতিকে অবজ্ঞার অবয়বে নিয়ে যেতে চেয়েছে বা পেরেছে। গত শতকে রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা বেশ ব্যাপ্তিলাভ করে। এ কথা ঠিক, বহমান বর্তমান বিশ্বে, ক্রমশ, অর্থনীতিই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে, সবপর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সব কিছুতেই নীতিনির্ধারণে অর্থ নিয়ামক ভূমিকায়। সিদ্ধান্ত হয় আর্থিক প্রভাবের ও সক্ষম সম্ভাবনার নিরিখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতিনির্ধারণ করে অর্থনৈতিক জীবনযাপনকে জবাবদিহির আওতায় এনে সুশৃঙ্খল, সুশোভন, সুবিন্যস্ত করবে এটাই ঠিক। কিন্তু নীতিনির্ধারক যদি ভক্ষক হয়ে নিজেই অর্থনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টির কারণ হয়, তখন আমজনতার অর্থনৈতিক জীবন যাপন পোষিত (ভধপরষরঃধঃবফ, ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃবফ) হওয়ার পরিবর্তে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নীতিনির্ধারক নেতৃত্ব যদি নিজস্ব তাগিদে ও প্রয়োজনে নিজস্ব উপায়ে সম্পদ ও স্বার্থ সংগ্রহে আত্মসাতে ব্যাপৃত তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খর্ব হয়। আইনসভায় নীতিনির্ধারক বিধিবিধান তৈরি করবেন সবার জন্য প্রযোজ্য করে, নিরপেক্ষভাবে, দূরদর্শী অবয়বে। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগে নীতিনির্ধারক নিজেই নিজেদের স্বার্থ অধিকমাত্রায় দেখতে থাকেন তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, প্রতিপক্ষরূপী বিরুদ্ধবাদীদের বঞ্চিত করতে, অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে বিচ্ছিন্নতায় (ঃযবড়ৎু ড়ভ ফবহরধষ) স্বেচ্ছাচারী অবস্থান গ্রহণ করেন তখন ওই আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় সন্দেহ তৈরি হয়। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমজনতার আগ্রহ নেতিবাচক মনোভাবে চলে যায় ও সর্বোপরি সবাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।
জাতীয় অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মসূচি পরিপালিত হবে দলমত নিরপেক্ষভাবে, কারো প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুযোগ-সুবিধা অধিকার আদান-প্রদান, নীতি নিয়মকানুন ও আইনশৃঙ্খলার বিধানাবলি বলবৎ, প্রয়োগ ও বাস্তবায়নযোগ্য হবে না যদি সব নাগরিকের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও প্রথার প্রতি আনুগত্য অনুসরণ না মেলে। যদি দেখা যায় ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারক তা শুধু নিজের, নিজের এলাকায়, গোত্রে, দলে ও কোটারির মধ্যে নাগরিকসেবার সব বরাদ্দ বিভাজন সীমিত করে ফেলে এবং বিরুদ্ধবাদীদের বঞ্চিত করায় স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে ওঠে তাহলে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য পূরণ ব্যর্থ হতে পারে। এখানে এ রূপ পরিবেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে, নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উৎপাদনে সম্পদে সংসার-সমাজসহ নীতিনির্ধারককে যেমন একটি রূপময়, বেগবান, ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও আনন্দঘন সক্ষমতাদান করে, রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকের ভুল পদক্ষেপের দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে, সমৃদ্ধির সক্ষমতা ও সুযোগকে তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ-পক্ষপাতযুক্ত করে ফেলে, দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ হয় বিপন্ন এবং এর ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা শুধু দ্বিধাগ্রস্ত নয়, হয় বাধাপ্রাপ্তও। দেখা গেছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, যা সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে সরকারের শেষ সময়ে প্রকল্প পাসের গতি বাড়ে। গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। নির্বাচনের ইশতেহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির নানান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে রাজনৈতিক দল। ভোটারকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ক্ষমতায় গেলে এ জাতীয় উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাবে দেশ। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর নেতৃত্ব তা যদি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে না পারে তাহলে ব্যর্থতার ও অভিযোগের তীর নিক্ষিপ্ত হয় খোদ রাজনীতির প্রতি, এর নেতিবাচকতার দিকেই।
অতীতে রাজা-বাদশাহদের রাজনীতি আবর্তিত হতো মসনদে আরোহণকে কেন্দ্র করে; সে সময় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হতো সেভাবেই। মসনদে আরোহণের ধ্রুপদ মুখ্য প্রেরণা ও শক্তির উৎস ও লক্ষ্য থাকত অর্থ, প্রতিপত্তি উদ্ধার ও অধিকার। এই ভারতবর্ষে কোম্পানি আমলে এ দেশ প্রশাসিত হয়েছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে। ছিল নানান খাজনা রাজস্ব আদায়কামী অর্থনীতি। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেছিলেন তা ছিল মধ্যস্বত্বভোগী জমিদারের মাধ্যমে রায়তের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্যই। কিন্তু প্রজার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন সবই কোম্পানির মুনাফামুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে উপেক্ষিত থাকে। ফলে রায়ত বা প্রজাকুল অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার পদে পদে নানান বঞ্চনার শিকার হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের মূল কারণ যতটা না সামাজিক কিংবা ধর্মীয় তার চাইতে বেশি ছিল অর্থনৈতিক।
সব বাণিজ্যিক ব্যাংকে এখনো নয়-ছয় সুদ কার্যকর করা যায়নি। সরকারের নীতিগত সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর করা হচ্ছে না। সরকারের কাছ থেকে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা। উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির চাহিদা অনুযায়ী যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে সেগুলো হলোÑ সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, সিআরআর এক শতাংশ কমানো, ঋণ আমানতের হার সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা। এসব সুবিধা নেয়ার পরও এখন পর্যন্ত সুদের হার আগের জায়গাতেই আছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য ও সুদের হারের যখন এই অবস্থা সে সময় বিএবির নেতারা আরো একটি সুবিধা চাচ্ছেন। আগের মতোই তারা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ‘অলস’ পড়ে থাকা অর্থ বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করতে দিলে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এসব ক্ষেত্রে এ ধরনের আরো বেশি দাবি আদায় অসম্ভব ছিল না।
জাতীয় নির্বাচনের প্রায় বছরখানেক আগেই উন্নয়নশীল দেশের অর্থমন্ত্রীরা আর্থিক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার কার্যক্রমের ইতি টেনে থাকেন। সংস্কারে ভোট নষ্ট হতে পারেÑ এই চিন্তায় থাকেন মগ্ন। ব্যাংক লুটেরাদের মোকাবেলায় কোনো কোনো অর্থমন্ত্রীর সীমাবদ্ধতা সর্বজনবিদিত। আর তিনি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে বাধ্য হয়েছিলেন রাজনৈতিক বিবেচনায়Ñ এটা তার স্বীকারোক্তি। রাজনৈতিক অনিবার্যতা নিয়ে তার তেমন ভাবনা ছিল না। এ সবই রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেসক্রিপশন বা সবক।
১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করার পর নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গটি সামনে আসে। সে দায়িত্বপালনের জন্য নাগরিকদের ওপর কর আরোপ প্রথা প্রবর্তন করা হয়, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে একটা কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। এ সবই কিন্তু মূলত এবং মুখ্যত রাজনীতিকে অর্থনীতির সাথে সাযুজ্য সামঞ্জস্য আনার জন্য, দায়বদ্ধ পরিবেশ সৃজনের জন্য। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত দু’টি অঞ্চলকে নিয়ে একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে দেখা গেল পূর্বাঞ্চল নানান বৈষম্যের, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও পক্ষপাতিত্বকরণের শিকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ও মূল কেন্দ্রবিন্দু এই অর্থনৈতিক বণ্টন বৈষম্য দূরীভূত করার আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে। সে সময় প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অর্থনীতির চিন্তা-চেতনা সামনে চলে আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ উচ্চারণ করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিশেষ করে পাকিস্তানের সমাজ-সংসার থেকে পৃথক স্বাধীন সার্বভৌমত্ব অর্জনের মূল কারণ ও প্রেরণা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি তথা শোষণমুক্তি ও বণ্টনে বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে মুক্তি। তদানীন্তন পাকিস্তানি রাজনীতির ব্যর্থতা ছিল আঞ্চলিক উন্নয়ন তথা স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে সব অঞ্চলে সুষম, সুশোভনীয় সুশীল আচরণে অপারগতা, ব্যর্থতা। প্রকারান্তরে বলি পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিজেদের আর্থিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবির বেশির ভাগ ছিল অর্থনৈতিক হিস্যা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ও সুযোগের সুষম বণ্টন।
বাংলাদেশের ৫০ বছর বয়োক্রমকালে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নীতিনির্ধারক সরকার নেতৃত্বে এসেছে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু অবদানে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমছে, দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে বা হচ্ছে। শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, মানুষের মাথাপিছু আয়ের পরিস্থিতিতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। বাজেটের বপু বেড়েছে এডিপির আকার বেড়েছে। এখানে স্বভাবত প্রশ্ন এসেছে অর্থনীতির এই উন্নয়নে সরকারগুলোর একক কৃতিত্ব কতখানি। এসব সাফল্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৃজনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, সততা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার ভূমিকা বেশি না আমজনতার অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছ সলিলাশক্তির বলে এটি বেড়েছে। এটাও দেখার বিষয়, পরিস্থিতি এমন হয়েছে কি না, আমজনতার নিজস্ব উদ্ভাবন প্রয়াসে অর্জিত সাফল্য বরং নীতিনির্ধারকের নিজেদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দ্বারা বরং বাঞ্ছিত উন্নয়ন অভিযাত্রা বাধাগ্রস্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন প্রয়াসে তাদের কর্ম উন্মাদনা ও প্রেরণায় ক্ষমতালোভী দুর্নীতিদগ্ধ রাজনৈতিক অভিলাষ বাধা সৃষ্টি করেছে কি না কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সেবাপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত কিংবা বিড়ম্বনাদায়ক হয়েছে কি না।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থনীতিতে কর জিডিপির রেশিও কাক্সিক্ষত সাধারণ মাত্রার (জিডিপির ১৫-১৬ শতাংশ) চেয়ে যথেষ্ট কম। বর্তমানে কর জিডিপি রেশিও ১০-১১-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, অর্থাৎ জিডিপির ৫-৬ শতাংশ কর আওতার বাইরে বা রাজস্ব অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে জিডিপির ৪-৫ ভাগ পরিমাণ অর্থই ঘাটতি হিসাবে প্রাক্কলিত হতে হচ্ছে এবং এ ঘাটতি পরিমাণ অর্থ দেশী-বিদেশী ঋণ নিয়েই মূলত উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ দেশে জিডিপির আকার অনুপাতে যথাপরিমাণ ন্যায্য কর রাজস্ব অর্জিত হলে ঘাটতি বাজেট হয় না এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ব্যাংকঋণ গ্রহণ কিংবা নানান শর্তসাপেক্ষে বিদেশের কাছে হাত পাততে হয় না। গভীর অভিনিবেশ সহকারে বিচার বিশ্লেষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়Ñ কেন ন্যায্য কর রাজস্ব আহরিত হয় না বা হচ্ছে না, কারা কর নেটের বাইরে এবং তাদের কর নেটে আনার পথে প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা কোথায়? বিভিন্ন কৌণিক দৃষ্টিতে পরীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছেÑ দেশ, সমাজ ও প্রশাসন কর রাজস্ব সুষমকরণের পথে স্বচ্ছতার ন্যায়ানুগতার, পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নিতে অপারগ হয়েছে বা হচ্ছে। কর প্রদানে, আহরণে, এমনকি কর রেয়াত বা অব্যাহতি প্রাপ্তিতে অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্ব বা অপারগতা বা দুর্বলতা রয়েছে। সাধারণ ও অসাধারণ করদাতায় অসম বিভক্ত সমাজে অসাধারণ করদাতারা শুধু একদাগে যে কর ফাঁকি দেয় সমগ্র সাধারণ করদাতার ওপর তার চাপ পড়ে। বড় করদাতারা নীতিনির্ধারকের প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগে থাকলে কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতি সুস্থ ও সাবলীল হতে পারে না। আইনপ্রণেতাদের বেশির ভাগ অংশ বৃহৎ করদাতা হলে ক্ষমতার বলয়ে বসবাসকারী হিসেবে রেয়াত ও ছাড় গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক কর রাজস্ব রাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। যথাযথ কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অথবা কথাটি এভাবে ঘুরিয়ে বলা যায়, নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের যে বলিষ্ঠ কমিটমেন্ট দরকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে, যে এনফোর্সমেন্ট, যে সুষম পরিবেশ, যে পক্ষপাতহীন আচরণ, যে দৃঢ়চিত্ত মনোভাবের প্রয়োজন তা যেন থেকেও থাকে না। আইনসভায় যে অর্থবিল উত্থাপিত ও গৃহীত হয় সেখানে পরীক্ষা পর্যালোচনা-উত্তর ছাঁটাই প্রস্তাব পেশের কিংবা বিভিন্ন গঠনমূলক মতপ্রকাশ বা প্রস্তাবনা পেশের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে ফিসকেল মেজারসগুলো যা যা যেভাবে উত্থাপিত হয় তাই গৃহীত হয়। মূল বাজেটে আয়-ব্যয়ে প্রাক্কলিত বরাদ্দ যথাযথ অর্জিত হচ্ছে কি না তার জবাবদিহিকরণের সুযোগ সেখানে অনুপস্থিত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আয় ও ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। কর রাজস্ব প্রদানের বিপরীতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় নাগরিকসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি সুনিশ্চিতকরণ কর প্রদানে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য অপরিহার্য।
আরেক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের পথযাত্রী দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে উপনীত হওয়ার উপযুক্ত উৎপাদন, বিপণন, সেবা, নির্মাণ পরিবেশ সবই বিদ্যমান সত্ত্বেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব ৬-৭-এর মধ্যে আটকা থাকছে। নানান কারণে প্রায় দুই থেকে তিন শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জিডিপিতে অবদান রাখতে পারছে না বা যথাযথ হিসাবভুক্ত হতে পারছে না। অদূরদর্শী কর্মযোজনা ও সামষ্টিক আর্থিক অব্যস্থাপনা, অপচয়-অপব্যয় আত্মসাৎকৃত কর্মসূচির দ্বারা মোটা অঙ্কের অর্থ উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহসহ অবকাঠামো নির্মাণসহ সব সহযোগী খাতে অপব্যয়িত হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্যে চোরাকারবারে, ইনফর্মাল ট্রেডে আমদানি-রফতানি ওভার/আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের দ্বারা, ইনফর্মাল রেভিনিউ রেন্টসিকিংয়ের মাধ্যমে নানাভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির সৌভাগ্যের ওপর ভাগ বসানো হচ্ছে। বিনা প্রতিকারে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট হচ্ছে, আত্মসাৎসহ নানান প্রকার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে মানি মার্কেটের প্রতি আস্থা বিনষ্ট হচ্ছে, পুঁজিবাজারে পুঁজিপ্রবাহ কমছে। পণ্য সরবরাহে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেশন ব্যবসা বাণিজ্যে টেন্ডারবাজি সবই ব্যয় বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি সবকিছু বাবদ যে অতিরিক্ত অর্থের অপচয় হচ্ছে তা যদি জিডিপিতে যথাযথভাবে অবদান রাখতে পারত (অর্থাৎ ব্যয়িত অর্থ দ্বারা গুডস অ্যান্ড সার্ভিস প্রডিউস হতো) তা জিডিপিকে দুই ডিজিটে নিয়ে যাওয়ার জন্য হতো যথেষ্ট।
অতি সম্ভাবনাময় এই অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির নানান সমস্যা সীমাবদ্ধতাকে নিয়ন্ত্রণ দূরীভূতকরণের দায়িত্ব যে নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক দোষারোপের অবয়বে অর্থনীতির যে ক্ষয়ক্ষতি সাধন তা কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। কোনো ঘটনার কারণ (পধঁংব) ঘটিয়ে সেই ঘটনার ফলাফলের (বভভবপঃ) ওপর দোষ চাপালেই ক্ষয়ক্ষতির দায় দায়িত্ব নির্ধারণ শেষ হয় না। ঘটনার কারণ ও কার্যকরণও পর্যালোচনাযোগ্য। দলীয় বা কোটারিগত, শ্রেণীগত পক্ষপাতিত্বে অর্থনীতিতে যে ভারসাম্যহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা অবশ্যই অনুধাবনীয়। সাম্প্রতিককালে, এমনকি এই করোনাকালে দেখা গেছে, জনগণ নিজেদের দিন এনে দিন খাওয়ার টানাপড়েনের অর্থনীতিতে অতিশয় সতর্ক ও মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার বিপরীতে। রাজনীতিকে অর্থনীতির প্রতিপক্ষ প্রতিপন্নকরণের পথ এড়ানোর স্বার্থে নীতিনির্ধারকের নিজেরই দায়িত্বশীল হওয়ার যৌক্তিকতা হারিয়ে যায়নি, যেতে পারে না। হ
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান-এনবিআর