[গত সংখ্যার পর]

তবে মায়ের অবদানই বেশি
.....................................................

প্রত্যেক লেখকই লেখালেখির শুরুটা সাধারণত কবিতা দিয়ে করেন। কারণ কবিতাই মূলত শিশুমনে আবেগ জাগিয়ে দেয়। নবজাত শিশুটিকে মা যখন ঘুম পাড়ান বা নিছক আনন্দ দেন তখন স্বভাবত সুর করে গানের মতো করে ছড়া শোনান। শিশু এতে একধরনের আনন্দ পায়। অনেক সময় মায়ের মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ার ধরনে সেও মাথা ও হাত-পা দোলাতে থাকে। শিশুমনস্তত্ত্বে বলা হয়, মায়ের গর্ভ থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই শিশুরা যা শোনে তা মনে রাখতে পারে। এমন কি যেরকম আচরণ তার সাথে করা হয় সেটা সে জন্মের পর, এমনকি বড় হয়েও করে থাকে। মোটকথা সারা জীবনের জন্য সেই আচরণটা তার সঙ্গী হয়ে থাকে।
আর অতিশিশু বয়সে, তার অক্ষরজ্ঞান শেখার আগে ছবিওলা ছড়ার বই থেকে মা তাকে ছড়া পড়ে শোনান। ফলে সে শৈশবের শুরুতেই ছড়া-কবিতার সাথে পরিচিত হয়। তাই কবিতা বা পদ্যই শিশুর প্রথম পাঠ্য।
আর মা-ই শিশুর প্রথম শিক্ষক বা অনুপ্রেরণাদাত্রী। এই শিশুর কবি হয়ে ওঠা। বা লেখক হয়ে ওঠার পেছনেও তাই মায়ের অবদানই বেশি। সে জন্য, কবি সাহিত্যিকদের কাছে লেখক হয়ে ওঠার পেছনে কার অবদান বেশি এই প্রশ্নটি করলে, সচরাচর উত্তর পাওয়া যায়Ñ মায়ের অবদান।

অধ্যায়-২

কবি ও কবিতা
.....................................................

সবার আগে কবিতা ॥
আদিম মানুষের কোনো ভাষা ছিল না। তারা ইশারায় একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করত।
বহু বহু কাল এভাবে যাওয়ার পর সে ছবি আঁকার পদ্ধতি রপ্ত করল।
দৈনন্দিন কাজ বা ইচ্ছাটা তারা আঁকাআঁকির মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকল। গুহাবাসী আদিম মানুষের গুহা থেকে এমন অনেক চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। শিকারের চিত্র, কাঠ কাটার দৃশ্য, কিংবা স্নান করার দৃশ্য ... ইত্যাদি।
এই হিসেবে বলা যায়, মানুষের প্রথম ভাষা... ইশারা এবং দ্বিতীয় ভাষা চিত্র।
এভাবে মানুষের হয়তো কোটি কোটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়কালকে আমরা মানুষের বোবাযুগ বলে অভিহিত করতে পারি।
হয়তো এই বাকহীন মহাকালেও অসংখ্য রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শেক্সপিয়র, হোমার, মিল্টনের মতো কবিপ্রতিভার জন্ম হয়েছিল, কিন্তু শুধু ভাষার অভাবে তাদের হৃদয়ের সৃজন-ভাবটি গুঞ্জরিত হতে পারেনি।
ভাষার উদ্ভাবনই মানুষকে পূর্ণসত্তার অধিকারী করে তোলে। ভাষাই মানুষকে ভাববিনিময়ের পাশাপাশি, সৃজনশীল করে তোলে।
মানুষের ভেতরে অন্যতম উপাদান আবেগ। আবেগ আত্মার মতো, তাকে দেখা যায় না। বাতাসের মতো, তাকে শুধু অনুভব করা যায়। আবেগই মানুষের ভেতরে স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, আনন্দ, কান্না-হাসির উদ্রেক করে এবং এই আবেগই সৃজন-সৃষ্টির প্রতি তাড়িত করে। কবির কবিতার জন্ম এই আবেগ থেকেই।
এবং মানুষের প্রথম সৃজনের মাধ্যম কবিতা। কবির আবেগ উৎস প্রকৃতি।
মানুষ পৃথিবীতে আসবে বলে স্রষ্টা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে সাজিয়ে তোলেন। বেঁচে থাকার যাবতীয় উপাদানÑ পানি, বাতাস, আগুন ইত্যাদি সৃষ্টি করেন। পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী, নানা পশুপাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানে পৃথিবীকে সজ্জিত করেই মানুষের আগমনের বার্তা শোনান পৃথিবীকে।
মানুষের পদধ্বনি পেয়ে বাতাস হিল্লোল তুলল সবুজ পত্রশোভিত তরুবীথিকায়। পাখিরা কলকাকলিতে মুখরিত হলো। নদী দুলে উঠল ঢেউ-উচ্ছলতায়। এভাবে প্রকৃতি স্বাগত জানাল পৃথিবীর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব মানবজাতিকে।
মানুষ প্রকৃতির এই নৈসর্গিক আবাহনে প্রথম আবেগাকুল হলো। প্রকৃতির এই আবেগস্পন্দনই মানুষের ভেতর কবিত্বভাব জাগিয়ে দেয়।
এবং এভাবেই মানুষের প্রথম সৃজনসৃষ্টির বিষয় হয়ে কবিতা। আগেই বলেছি, ভাষা উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত মানুষ মনের পুঞ্জীভূত আবেগ প্রকাশে অক্ষম ছিল, ফলে কবিত্বের প্রকাশ ইচ্ছাটি ডানা মেলেনি তার।
কবিতা কী? এ-প্রশ্নে অধুনা যুগের পণ্ডিতজনেরা নানা সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন।
যেমন... ভাব, ছন্দ, অলঙ্কার, উপমা, রস ইত্যাদি উপকরণে সজ্জিত ভাষারূপকেই তারা কবিতা বলে চিহ্নিত করেন। কবিতার এসব উপাদান নিয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো, তবে কবিতা লেখার জন্য ওসব ছন্দ-টন্দ, রস-টসের বিদ্যে রপ্ত করে কবিতা লেখা শুরু করে না। যেমন মুখ-সঞ্চারি-অন্তরার কী তা না জেনেই লালন, পাগলা কানাই প্রমুখ নিরক্ষর বাউল-পথকবিরা গান বাঁধেনি। আবেগই তাদের সৃজনক্ষমতার স্পন্দন জাগিয়ে দিয়েছে।
নবীন কবি বাঁধাধরা নিয়ম না মেনেই যা লিখে যায়, তাই নিয়মে বাঁধা কবিতা হয়ে যায়। শুধু বোধটুকু থাকতে হয়। তার কান আর ঠোঁটই বলে দেবে সে যা লিখল তা কবিতা হয়েছে কী না!
এটা পরখ করার জন্য আমরা সদ্যপ্রস্ফুটিত এক নবীন কবির প্রথম রচিত কবিতাটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে পারি। [চলবে]