‘নদীর পাড় ঘেঁষে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ।’
‘চমৎকার না?’
‘খুব চমৎকার!’
‘রাতের বেলা মেঘ নদী পাহাড় জমিয়ে গল্প করে।’
‘কী বলছো এসব?’
‘যা বলছি পুরোটাই সত্যি।’
শিয়ালের কথা শুনে হাসে মুরগি। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গর্ত ছেড়ে বের হয় শিয়াল। নদীর ওপর কলা গাছের ভেলা। তার ওপর চোখ বুঁজে ঘুমাচ্ছিল মুরগি। তরতাজা মুরগি দেখে শিয়ালের জিভে পানি এসে যায়। তাই মুরগিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে গল্প শুরু করে। মুরগি ডান পা দিয়ে গলা চুলকিয়ে বলল, ‘তা কী ভাষায় কথা বলে মেঘ নদী পাহাড়?
‘সে এক জটিল ভাষা। প্রথম প্রথম বুঝবে না। চার পাঁচ দিন মনোযোগ দিয়ে শুনলে তারপর ঠিক বুঝতে পারবে।
‘তাই নাকি?’
‘হুঁ। তুমি শুনবে মেঘ নদী পাহাড়ের ভাষা?’
‘কিভাবে?’
‘আজ রাতে গৃহস্থের বাড়িতে না গিয়ে আমার সাথে থাকো।’
‘কী বলছ এসব?’ মুরগি ঢোক গিলে বলল।
শিয়াল হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘ভাবছ একসাথে থাকলে আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব। আরে গৃহস্থ কী তোমাকে না খেয়ে ছাড়বে?’
‘তোমার কথাও সত্যি।’ মুরগি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
‘তাহলে আর দেরি করছ কেন? ভেলা নিয়ে পাড়ে এসো।’
‘আমাকে একটু ভাবতে দাও।’
‘ঠিক আছে ভাবো।’
‘আচ্ছা তোমাকে কেউ কোনো দিন খেতে আসেনি?’
‘আসেনি বলছ কেন? প্রায় রোজই কেউ না কেউ আমাকে খেতে আসে।’
‘ও। মেঘ নদী পাহাড়ের গল্প বলো।’ মুরগি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল।
‘একদিনে এত বলা কী ঠিক হবে?’
‘হবে। আবার তোমার সাথে কবে না কবে দেখা হয়। আবার হয়তো তুমি আমাকে কাছে পেয়ে খেয়ে ফেলবে।’
খাওয়ার কথা শুনে শিয়ালের ক্ষুধা বেড়ে যায়। সে জিহ্বা বের করে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুমি যা ভাবছ আসলে তা না।’
‘তাহলে?’
‘আমি মুরগি তেমন একটা খাই না। তবে সামনে পেলে ...। আচ্ছা বাদ দাও। তার চেয়ে চল মেঘ নদী পাহাড়ের গল্প বলি।’
‘হ্যাঁ বলো।’
‘কয়েক মাস আগের কথা। একদিন সকাল বেলা পাহাড়ের চূড়ায় হাঁফাচ্ছি। হঠাৎ পাহাড় বলল মেঘকে কাছে এসো। সত্যি সত্যি মেঘ পাহাড়ের কাছে এলো। নদী বলল, ‘মেঘকে একটু ভিজিয়ে দাও। সত্যি সত্যি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সে এক অন্য রকম অনুভূতি।
‘তাই?’
‘হুঁ। এবার তাহলে পাড়ে এসো।’
‘আর একটু ভাবতে দাও।’
এমন সময় আশপাশের কোথাও থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে এলো। শিয়াল নড়েচড়ে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকায়। তার শরীর কাঁপে। মুরগি এক ঢোক পানি খেয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি খুব ভয় পাচ্ছ?’
‘আরে না। আমি ঠিক আছি।’
‘হি হি হি।’
‘হাসছ কেন?’
আবার ও কুকুর ডাকে। শিয়ালের শরীরের কাঁপুনি আরো বেড়ে যায়। সূর্য মাথার উপর। মুরগি নিচু গলায় বলল, ‘শুনেছি শিয়ালরা খুব চালাক।’
‘ভুল শুনেছ। চালাক হলে কি আর এত বেলা পর্যন্ত না খেয়ে থাকি।’
‘হুঁ, তাহলে তুমি বোকা?’
‘খুব বোকা। আচ্ছা কুকুরটা কি এদিকে আসতে পারে?’
‘মনে হয়। হি হি হি।’
‘ভেলাটা পাড়ে ভিড়াও। বললাম না তোমাকে খাবো না। আর খেলে বা কী?’
‘আসলে যে গৃহস্থ আমাকে যতœ করে এত বড় করেছে। আমি চাই সেই আমাকে খাক।’
হঠাৎ একটা কুকুর দৌড়ে এসে শিয়ালকে দেখে বলল, ‘আরে বেটা শিয়াল এতক্ষণ তোকেই খুঁজছিলাম।’
‘কেন আমাকে খুঁজচ্ছিলেন, কেন?’ শিয়াল হকচকিয়ে যায়।
‘দুষ্ট ছেলের দল বট গাছের গুঁড়ির নিচে গর্তের ভেতর শুকনো মরিচ পোড়া দিয়েছে। কিন্তু শিয়াল বেরিয়ে আসছে না।’
‘বট গাছের গুঁড়ির নিচে গর্তের ভেতর আমি থাকি।’ শিয়াল মুখ ফসকে কথাটা বলে জিভ কাটে।
‘ও তাই বলো। তাহলে তো তোকে মারতেই হয়। ’
‘ওই দেখেন মেঘ নদী পাহাড় কী সুন্দর জমিয়ে আড্ডা মারছে।’
কুকুর পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকায়। চূড়ার কাছাকাছি মেঘ। দেখে মনে হচ্ছে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সত্যি চমৎকার মনে হয় তার। হঠাৎ মুরগির হাসি শুনে পিছনে ঘুরে দেখে শিয়াল নেই। কুকুরের মেজাজ চড়ে যায়। সে চিৎকার করে বলল,
‘শিয়াল ও শিয়াল। শিয়াল কোথায় গেল?’
‘তুমি যখন পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকালে তখন এক মুহূর্তে সে হাওয়া হয়ে গেল।’
‘ধ্যাৎ। দুষ্ট ছেলেদের কাছে আমার আর সম্মান থাকল না।’
‘কেন?’
‘শিয়ালটাকে মেরে ওদের হাতে তুলে দিতে পারলে মজার মজার খাওয়া পেতাম।’ এক বুক হতাশা নিয়ে কুকুর চলে যায়। আর স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে ভেসে চলে কলা গাছের ভেলা। মুরগি চোখ বুঁজে বসে থাকে। কল্পনায় দেখে মেঘ নদী পাহাড় জমিয়ে গল্প করছে। হ