সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সাধারণত দেখা যায়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উপাদান যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ধর্মীয় সামাজিক চেতনা ও জাতিগত স্বতন্ত্র সত্তা থেকে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রমূর্ত হয়ে ওঠে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই বাঙালি মুসলিমের মধ্যে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রমূর্ত হয়ে ওঠে। মীর কাসেমের যুদ্ধ, ফকির মজনু শাহর বিদ্রোহ, হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, হাজী তিতুমীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত সিপাহি বিদ্রোহ, অতঃপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে বাঙালি তথা উপমহাদেশের মুসলিমগণ নিজেদের জন্য এক স্বতন্ত্র আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
এ দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মূলে প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র চেতনা ও স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের দুর্মর আকাক্সক্ষা। এ চেতনার বিকাশ ও আকাক্সক্ষার উন্মেষ এক দিনে হয়নি, দীর্ঘকাল ধরে নানা অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও হতাশা থেকে ক্রমেই এর উদগম ও বিকাশ ঘটে। উপমহাদেশের অখণ্ড ভৌগোলিক সীমানায় বসবাস করা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার পাশাপাশি মুসলমানগণ তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সত্তা নিয়ে এক স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে সবসময় নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। মূলত একটি জাতি গঠনের মূল উপাদান ও নিরিখে তারা যে এক স্বতন্ত্র জাতি, তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও স্বকীয় আদর্শ ও জীবন গঠনের প্রত্যয়ই তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সুদৃঢ় প্রেরণা জোগায়। সে আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং তার সর্বশেষ অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবময় অভ্যুদয়।
বাংলাদেশকে বলা হয় অনার্য দেশ। ‘অনার্য’ অর্থ যারা আর্য নয়। আর্যদের আদিভূমি মধ্যপ্রাচ্য। সেখান থেকে ক্রমেই তারা ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে। প্রথমত, রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে আগমন করলেও ক্রমেই তারা তাদের ধর্ম, ভাষা, সভ্যতা, সংস্কৃতিসহ সব কিছুর প্রচার-প্রসারে তৎপর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে আর্যদের আগমন ঘটে অনেক পরে। প্রথমত, তারা উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে আগমন করে। সেখানে রাজ্যবিস্তার ও ধর্মপ্রচারে তারা ব্যাপৃত হয়। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে তাদের ধর্মীয় ভাষারও প্রবর্তন ঘটায়। এভাবে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে আর্যদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। উর্বরা-শস্যশ্যামলা বাংলার প্রতি তাদের লোভাতুর দৃষ্টি অনেক আগে থেকেই নিপতিত হয়েছে। কিন্তু বাংলার নদীনালা এবং প্রাকৃতিক বিভিন্ন বৈরী পরিবেশের কারণে বাংলায় তাদের আগমন অনেক বিলম্বিত হয়।
আর্যদের আগমনের আগে এ দেশীয়দের অনার্য বলে অভিহিত করা হয়। তখন এ দেশের জনগণের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি কিরূপ ছিল তা নিশ্চিতরূপে ধারণা করা কঠিন। তবে এ দেশে তখন যে ভাষা প্রচলিত ছিল, সেটাকে এককথায় বলা হয় দেশীয় ভাষা। বাংলা নামটির উদ্ভব ঘটেছে অনেক পরে। যখন বাংলা নামের উদ্ভব ঘটেছে, তখন থেকে এ দেশের ভাষা বাংলা ভাষা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সুলতান ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম নিজেকে সুবে-বাঙ্গালাহর অধিপতি হিসেবে দাবি করেন। তখন থেকে রাজনৈতিকভাবে এ ভূখণ্ড বাঙ্গালাহ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু এ ভূখণ্ড অনেক প্রাচীন সভ্যতার দেশ। পলিমাটি অধ্যুষিত সৌন্দর্যময় এ উর্বরা ভূখণ্ডে সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ বসবাস করে আসছে। শস্যশ্যামলা এ প্রাকৃতিক মনোরম ভূমির আকর্ষণে বহিরাগত অনেকেই এ দেশে এসেছে নানা প্রলোভনে। কেউ রাজ্য জয় করতে, কেউ ধর্ম প্রচার করতে, কেউ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে, কেউ লুটপাট-ডাকাতিসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। বহিরাগতরা এ দেশে যখন এসেছে, তখন তারা তাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির কমবেশি কিছুটা ছাপ রেখে গেছে। যারা স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুলেছে, তাদের ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব যেমন এখানে কমবেশি বিস্তৃত হয়েছে, অনুরূপভাবে তারাও কালক্রমে এ দেশের ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব ধারণ করে এ দেশের মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছে। কালক্রমে তাই এ ভূখণ্ড হয়ে উঠেছে একটি মিশ্র জাতি ও সংস্কৃতির দেশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দেশে যখন যারা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছে তখন তাদের ধর্ম-সংস্কৃতিই এ দেশের প্রধান ধর্ম-সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এভাবে এ দেশে আদিকাল থেকে আর্য-অনার্য, শক-হুন-দ্রাবিড়, হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-মুসলিম-খ্রিষ্টান প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতির বসবাস। প্রাচীনকালে হিন্দুধর্মের পর এখানে জৈনধর্ম তার পর বৌদ্ধধর্ম এরপর দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আগত বৈদিক ধর্ম এবং সর্বশেষে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। খ্রিষ্টান ধর্মের আগমন ঘটে এ দেশে ইংরেজ শাসনামলে। প্রতিটি ধর্মের আগমন ও প্রচারের সাথে সাথে এ দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্যের মধ্যে একধরনের পরিবর্তন-বিবর্তন ঘটে। বহিরাগতদের আগমনের ফলে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য অর্থাৎ তাদের জীবনায়নের একটা প্রভাব পড়ে স্থানীয় সমাজ ও মানুষের জীবনে। এভাবে বাংলাদেশে কখনো হিন্দু সংস্কৃতি, কখনো জৈন, কখনো বৌদ্ধ, কখনো বৈদিক ব্রাহ্মণ্য আবার কখনো মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণে একধরনের মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও ময়মনসিংহের মধুপুর পাহাড়ি এলাকার মতো বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্র উপজাতীয় নৃগোষ্ঠীর মধ্যে একধরনের উপজাতীয় সংস্কৃতিরও উদ্ভব ঘটেছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশ যেমন এক বৈচিত্র্যপূর্ণ সৌন্দর্যের দেশ, তেমনি বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির উদ্ভবও ঘটেছে এ প্রাচীন ভূখণ্ডে।
প্রাচীন ভারতে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম-সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। আর্য-ব্রাহ্মণ্যদের ধর্মকে বলা হয় বৈদিক ধর্ম। তাদের ধর্মীয় ভাষা ছিল সংস্কৃতি। সংস্কৃতি ভাষায় বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলো যথা বেদ (বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে রচিত চার প্রকার বেদ) ও মহাভারত রচিত হয়। তাদের সংস্কৃতিকে বলা হয় আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বা বৈদিক সংস্কৃতি। তবে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতি ভাষা উপমহাদেশের সর্বত্র প্রচলিত ছিল, তা বলা যাবে না। প্রাচীন ভারতের বিস্তৃত ভূ-ভাগে বহু ধর্ম, ভাষা, গোত্র ও সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল। তবে সেগুলোর সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া দুষ্কর। এককথায় সেগুলোকে লোকজ সংস্কৃতি ও বিভিন্ন আঞ্চলিক বা দেশীয় ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। বাংলাদেশে তখন যে ভাষা প্রচলিত ছিল, সেটিকে ভাষাবিজ্ঞানীগণ ‘প্রাচীন প্রাকৃত ভাষা’ নামে অভিহিত করেছেন। বৈদিক যুগে ‘বেদ’, ‘মহাভারত’ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ লেখার সময় প্রচলিত ভাষা সংস্কার ও পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজন দেয়া দেয়। এ সংস্কারসাধিত পরিশুদ্ধ ভাষা সংস্কৃত ভাষা হিসেবে পরিচিত। এরপর কালক্রমে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ ভাষা পরবর্তীকালে যথাক্রমে ‘পালি’, ‘আধুনিক প্রাকৃত’, ‘অপভ্রংশ’ ও ‘বাংলা’ প্রভৃতি ভাষার জন্ম হয়। বৌদ্ধপাল শাসনামলে বাংলা ভাষার উদ্ভব।
বৌদ্ধপাল শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাংলার সর্বত্র বৌদ্ধ ভাস্কর্য-স্থাপত্য, মঠ প্রভৃতি নির্মিত হয়। এ আমলে বাংলা ভাষার উদ্ভব ঘটে। দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আগত সেন ব্রাহ্মণগণ বাংলা জয় করে এ দেশের বৌদ্ধদের নির্মমভাবে হত্যা করার সাথে সাথে তাদের স্থাপত্য-ভাস্কর্য মঠ বা ধর্মীয় উপাসনালয় প্রভৃতি ধ্বংস করে ফেলে। এমনকি দেশীয় ভাষা বাংলা চর্চার ওপর তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে সেন রাজাগণ বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন করতে চাইলেও সমাজ থেকে তা একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে তারা যেমন আত্মরক্ষা করেছে, তেমনি গোপনে আপন ধর্ম-সংস্কৃতির সুরক্ষায়ও যতœবান হয়েছে। যারা পালাতে পারেনি, তারা সমতলের হিন্দু অধিবাসীদের সাথে মিলেমিশে তাদের ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এক ধরনের মিশ্র বা লোকজ ধর্ম-সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। এ ধরনের সমন্বয় প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন বহিরাগতের আক্রমণ ও বিজয়ের পর প্রায়ই লক্ষ করা গেছে।
সপ্তম শতাব্দীতে খলিফা ওমর আল-ফারুকের রা: সময় থেকেই বাংলায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মুবালিগ ও আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার শুরু হয়। ১২০৪ সালে (১১৯৯-১২০৪ এর মধ্যে) বাংলায় তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির আগমনের পর এ দেশে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বখতিয়ার খিলজি অথবা কোনো মুসলিম শাসকই প্রত্যক্ষভাবে এ দেশে ইসলাম প্রচার করেননি। রাজ্য জয় ও রাজ্য শাসনই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। তবে শাসক মুসলিম হওয়ায় ইসলাম প্রচারকদের জন্য এ দেশে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে গৌড়ে মুসলিম শাসক অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ দেশে ইসলাম ধর্মের দ্রুত প্রসার ঘটে। ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে স্বভাবতই ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ইতঃপূর্বে যেখানে হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতির একাধিপত্য বিরাজমান ছিল, মুসলিম শাসনামলে ক্রমেই সেখানে ইসলামী বা মুসলিম ধর্ম-সংস্কৃতির আধিপত্য সৃষ্টি হয়। ইসলামের সাম্য-ভ্রাতৃত্বপূর্ণ উদার মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে এ দেশের মানুষ মুসলিম হতে শুরু করে। ফলে সেন আমলের হিন্দু প্রধান একটি দেশ অচিরাৎ একটি মুসলিম প্রধান দেশে পরিণত হয়। ইসলামের উন্নত মানবিক আদর্শ, নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং মুসলমানদের জীবনাচারের ভিত্তিতে বাংলাদেশে এক নতুন প্রাণবন্ত সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। ইসলামী সংস্কৃতি প্রাণশক্তিতে অতিশয় প্রবল ও জীবনমুখী। ফলে সহস্র বছরের বিবর্তনে তা এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জাতিসত্তার রূপ পরিগ্রহ করে।
ইংরেজ আমলে এ দেশে ইসলামের প্রচার-প্রসার অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। অন্য দিকে বহিরাগত ইংরেজ ও পর্তুগিজ পাদ্রিদের দিয়ে এ দেশে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার শুরু হয়। ইংরেজি ভাষা-সাহিত্য, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচারের চেষ্টা হলেও এ দেশে তা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেনি। একশ্রেণীর উপজাতীয়, নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও ইংরেজি শিক্ষা-সভ্যতায় প্রভাবিত অল্প কিছুসংখ্যক হিন্দুদের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার-প্রসার সীমাবদ্ধ থাকে। খুব অল্পসংখ্যক অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলিম ছাড়া মুসলিম সমাজে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ব্যাপকতা লাভ করেনি। মানবিক ধর্ম ইসলামের শক্ত অবস্থান ও এ সময় কিছু ইসলাম প্রচারকের আবির্ভাবের ফলে তা সম্ভব হয়নি। ইংরেজ আগমনের আগেই এ দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম হিসেবে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের সাম্যবাদী জীবনাদর্শ, মানবিক ভাব-বিষয় ও প্রাণবন্ত সংস্কৃতির প্রভাবে এ দেশে মুসলিমগণ এক স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এ প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশে ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিমগণ তাদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এ দাবির সুস্পষ্ট ঘোষণা আসে ১৯৪০ সালে। ওই সময় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে একটি এবং পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। প্রতিপক্ষ ইংরেজ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের চরম বিরোধিতায় এ দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য ‘পাকিস্তান’ নামক এক স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমান বাংলাদেশ পূর্বতন পাকিস্তান রাষ্ট্রেরই এক বিবর্তিত রূপ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অবিচার-বৈষম্যের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ফলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। অতএব, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূলে ইসলাম এক প্রাণবন্ত শক্তি হিসেবে আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। সহস্র বছর ধরে লালিত ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণময় প্রবাহই আমাদের অবিসংবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাপনের অনিবার্য ভিত্তি ও অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হওয়ায় উপমহাদেশে মুসলিমদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। এর পরিণত রূপ হলো ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। জাতিসত্তার এ মূলভিত্তি ও আমাদের সংস্কৃতির মূলধারার পরিচিতিকে সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও একক সিদ্ধান্তবলে বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে যোগদান করে দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম রাষ্ট্রের জাতিসত্তার মূল পরিচিতি সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। এরপর তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন করে বাংলাদেশের মূল সংস্কৃতির রূপরেখা আরো সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধা-সংশয়ের অবকাশ নেই। আমাদের জাতিসত্তা ও জাতীয় সংস্কৃতির এ পরিচয়কে চর্চা ও বিকাশের মধ্য দিয়ে সুসংহত ও সমুন্নত করে তুলতে হবে। তা হলে আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তি দৃঢ় ও মজবুত হয়ে উঠবে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যেমন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা থাকে, তেমনি প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি আদর্শিক-সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক সুস্পষ্ট পরিচিতি থাকে। এ আদর্শিক সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক পরিচিতি প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একান্ত গৌরব ও অনুপ্রেরণার মূল উৎস। এর চর্চা ও বিকাশের মাধ্যমেই জাতীয়তার ভিত্তিকে দৃঢ়তর করে তোলা এবং এর মাধ্যমেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ ও সমুন্নত রাখা সম্ভব।
সংস্কৃতি একটি জাতির প্রাণসত্তা। জাতীয় আদর্শ, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের ভিত্তিমূলে সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। সংস্কৃতি একটি জাতির দর্পণ, এতে জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, মননশীলতা, বোধ-বিশ্বাস, মানবিক মূল্যবোধ ও মার্জিত আচার-আচরণের প্রকাশ ঘটে। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জাতীয় গৌরব, মর্যাদা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। অতএব, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রাখা ও উত্তরোত্তর তার উৎকর্ষ সাধনে সর্বোতভাবে সচেষ্ট থাকা কর্তব্য; অন্যথায় জাতীয় পরিচিতি একসময় হারিয়ে যায়। কোনো জাতির স্বতন্ত্র পরিচিতি যখন বিলুপ্ত হয়, তখন সে জাতির স্বাধীনতা ও মর্যাদাও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
অতএব, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির লালন, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও আমাদের ত্যাগ ও সাধনায় নিরন্তর তার উৎকর্ষ সাধন জাতীয় অপরিহার্য দায়িত্ব-কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এভাবে সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যিক প্রেরণা প্রাণবন্ত ভূমিকা পালন করে থাকে। ইতিহাসের সাথে ঐতিহ্যের যেমন নিবিড় সম্পর্ক, সংস্কৃতির সাথেও তেমনি ইতিহাসের গভীর যোগসূত্র বিদ্যমান। যেকোনো জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মধ্যে এক পারস্পরিক সম্পর্ক-সূত্র রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে এর কোনোটির অস্তিত্ব সম্ভব নয়। তবে কাল-বিবর্তনে ইতিহাস-ঐতিহ্যের মধ্যে যেমন পরিবর্তন-পরিবর্ধন-উৎকর্ষ সাধন বা নতুন অনুষঙ্গের সংযোজন ঘটে, তেমনি সংস্কৃতির মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে। তবে মৌল স্বভাব বিনষ্ট হয়, এমন কোনো পরিবর্তন কখনো কাম্য নয়।
সংস্কৃতির মূল কথা হলো জীবনবোধ, পরিশ্র“ত জীবনায়ন, মার্জিত জীবনাচার ও রুচিশীল উন্নত জীবনের প্রত্যাশা। ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাপন পদ্ধতি সম্মিলিতভাবে সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে কাজ করে। ইতিহাসের ভাঙাগড়া, জাতির উত্থান-পতন, নতুন মতবাদের প্রবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। এটি প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই একটি সাধারণ ঘটনা। তবে এ পরিবর্তনকে সর্বদা কল্যাণময় ও জাতীয় স্বার্থ ও আদর্শে অতিরঞ্জিত করে তোলা কর্তব্য। অপসংস্কৃতি ও বিজাতীয় আদর্শের অপছায়া যাতে কখনো জাতীয় সংস্কৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে দিকে সর্বদা সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। স্বকীয় আদর্শ-ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ওপর দৃঢ় আস্থাই কেবল এ অপছায়ার বিস্তারকে রোধ করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সব কিছুর মধ্যেই বহির্মুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্বায়নের মূল কথা হলো, সমতার ভিত্তিতে দেয়া-নেয়া। আমি যেমন অন্যকে দেবো, অন্যদের থেকেও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকব। এটি মূলত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এটিই মূলভিত্তি। সে অর্থে মানব সভ্যতাও বর্তমানে অনেকটা বহির্মুখী। অন্য জাতির যা কিছু ভালো সেটাকে গ্রহণ করে আমি যেমন ঋদ্ধ হবো, তেমনি বিশ্বসভ্যতায় নিজের অবদান রাখতেও সচেষ্ট হবো। দেবো আর নেবো এ নীতিতে মানবজাতির পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ও সহাবস্থান সহজতর হয়ে ওঠে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। তবে সংস্কৃতি প্রতিটি দেশ ও জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য-আদর্শ ও জাতিসত্তার ভিত্তিতে নির্মিত হয়। বিজাতীয় সংস্কৃতি যখন কোনো বিশেষ জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য-আদর্শ ও জাতিসত্তার ভিত্তি মূলকে উপড়ে ফেলতে উদ্যত হয়, তখন সে সংস্কৃতি গ্রহণে কোনো আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন জাতি সম্মত হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেকটা অন্ধের মতো ভালো-মন্দ বিচার না করেই বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা, গ্রহণ, ধারণ এমনকি লালন করতে এতটুকু ইতস্তত বোধ করছি না। এটি এক আত্মবিধ্বংসী ও আত্মপ্রতারণামূলক প্রবণতা। এ প্রবণতা পরিহার করা আবশ্যক। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, জাতীয় সংস্কৃতির মূলভিত্তি গড়ে ওঠে জাতীয় আদর্শ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে। জাতীয় আদর্শ-মূল্যবোধ জাতিসত্তাকে যেমন দৃঢ়ভিত্তির ওপর সংস্থাপিত করে, স্বকীয় বিশ্বাস-ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নির্মিত জাতীয় সংস্কৃতিও তেমনি জাতির আত্মমর্যাদাবোধকে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করে তোলে। এ সচেতনতাবোধ থেকে আমাদের স্বকীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের লালন ও তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গৌরবময় সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে যতœবান হওয়া সবার অপরিহার্য জাতীয় কর্তব্য। হ
লেখক : প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা