বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যকর্ম চর্যাপদ। সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় লিখিত নয়। দ্বিতীয় সাহিত্যকর্ম বডু চণ্ডিদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এটি খাঁটি বাংলায় লিখিত প্রথম গ্রন্থ। তৃতীয় গ্রন্থ রামায়ণ। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্তিবাস রচনা করেন রামায়ণ।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ। এগুলো রচিত হয় বৌদ্ধ সাধকদের সাধনসঙ্গীতরূপে। চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়াটিক সোসাইটির আত্মপ্রকাশ বাঙালি জাতিকে অনুসন্ধানী হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
এশিয়াটিক সোসাইটির সাথে রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পরিষদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চারবার নেপালে যান। ১৮৯৭, ১৮৯৮, ১৯০৭ ও ১৯১২ সালে। প্রথম সফরে তিনি নেপালে গিয়ে বেশ কিছু প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার করেন। নেপাল রাজদরবারের লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান সুববা বিষ্ণুপ্রসাদ রাজ ভাণ্ডারির সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। তিনি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে সরোজবজ্রের ‘দোহাকোষ’ ও অদ্বয় বজ্রের ‘টীকা’ নামে দু’খানা পুঁথি উপহার দেন। এর ওপরা ভিত্তি করে তিনি লেখেন উরংপড়াবৎু ড়ভ খরারহম ইঁফযরংস রহ ইবহমষব (১৮৮৭) নামের পুস্তিকা। এই পুস্তিকায় তাঁর ভাষ্য ছিল বৌদ্ধধর্মের অবশেষ হচ্ছে ধর্মঠাকুরÑ তাঁর নেপাল যাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়’ বা চর্যাগীতি বিশ্লেষণ করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমাণ করেছেন যে, বাংলা ভাষা হাজার বছরের পুরনো। এ ছাড়া যে যুগের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিত্র এই পুঁথি থেকে পাওয়া যায়। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে ব্রিটিশ সরকার মহামহোপাধ্যায় উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে উপাধি পান ‘কম্পালিয়ন অব দ্য এম্পায়ার’।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের নৈহাটিতে। লেখাপড়া ও শিক্ষকতাসহ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কলকাতায় ব্যয় করেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্যানুসন্ধানী তাঁর পূর্বপুরুষদের নিবাস সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামে বলে মনে করেন।
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫০-১৯৩১) নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালা থেকে চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার করেন। ২০০৭ সালে চর্যাপদ আবিষ্কারের শত বছর পূর্ণ হয়েছে। উনিশশতকের শুরুতেই ইউরোপীয় প্রাচ্যগণ নেপাল ও তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধধর্মবিষয়ক পুঁথির সন্ধান করেন। এদের গবেষণার পরবর্তী সময়ে বাঙালি পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। ডাকার্নব, দোঁহাকোষ পঞ্জিকা ইত্যাদি পুঁথি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কল্যাণে আলোর মুখ দেখে। এ ছাড়া নেপালে গিয়েই তিনি পেয়ে যান ‘চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়’। ডাকার্নব, কৃষ্ণাচার্য ও সরোরুহ বজ্রের দুটি দোহাকোষ এবং চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয় এই চারখানা পুঁথি সম্পাদনা করে ১৯১৬ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে একত্রে প্রকাশ করেন ‘হাজার বছরের পুরান বাঙলা ভাষার বৌদ্ধ গান ও দোহা’।
এই গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পায় নতুন মাত্রা, প্রাচীন বাংলার জনপদ ও বাংলা-জীবন সম্পর্কে পাওয়া যায় নতুন তথ্য।
বাংলাভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে মতভেদ আছে। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, এ চর্যাপদের রচনাকাল দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ভিন্নমত পোষণ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন। রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন বলেছেন, লুইপাদ এবং সরহপাদ এই দুইজন প্রাচীন সিদ্ধাচার্য রাজা ধর্মপালের সময়ে (৭৬৯-৮০৯ খ্রি.) বর্তমান ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, চর্যাপদের আনুমানিক ৬৫০ থেকে ১০০ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্রাচীন বাংলাভাষার চর্যাপদের মোট ৫১টি পদের ২৩ জন কবির নাম পাওয়া যায়। চর্যাপদে আরো একজন পদকর্তার নাম আছে কিন্তু পদটি নেই। সেই হিসেবে চর্যাপদের সংখ্যা ৫১টি এবং কবির সংখ্যা ২৪ জন।
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নমুনা তালপাতায় হাতেলেখা চর্র্যাপদ আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের রহস্যময় ভাষার অর্থ অনুধাবন করা কিছুটা কষ্টকর। তাই চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যাভাষা’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিজেই লিখেছেন, সন্ধ্যাভাষা মানে আলোআঁধারি ভাষা। কতক আলো কতক অন্ধকার। খানিক বুঝা যায় খানিক বুঝা যায় না অর্থাৎ এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতর একটা অন্যভাবের কথা আছে। পণ্ডিতদের ধারণা, সহজিয়া বৌদ্ধদের বিরুদ্ধবাদী শক্তির শ্যেনদৃষ্টি থেকে নিজেদের গাঢ় ধর্মাদর্শকে আড়াল করে রাখার জন্যই বৌদ্ধতান্ত্রিক সিদ্ধাচার্যরা রহস্যময় ‘সন্ধ্যাভাষা’য় চর্যাপদগুলো রচনা করেন।
সামাজিক স্তরবিন্যাসে যারা উপরে তাদের ছবি চর্যাপদে তেমন পাওয়া যায় না। বরং তাঁতি, ডোম, শবর, মাঝি, ব্যাধ, ধনুরি প্রভৃতি শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষকে চর্যাপদে লক্ষ করা যায়।
কবি টেন্টনপাদ লিখেছেনÑ
টালত ঘর মোর নাহি প্রতিবেশী।
হাঁড়িতে ভাত নাহি নিতি আবেশী॥
বেঙ্গ সংসার বড়হিল যায়।
দুহিল দুধ কি বেন্টে যামায়॥
অর্থাৎ পাহাড়ের টিলায় আমার ঘর। কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই। কিন্তু নিত্যই অতিথি আসে। দিন দিন ব্যাংকের সংসার বেড়েই চলেছে। কী দুঃখ দোয়ানো দুধও আবার বাটের মধ্যে চলে যায়।
চর্যাপদে ব্রাহ্মণদের সমাজে ঊর্ধ্ব পদে দেখানো হয়েছে। ব্রাহ্মণ শ্রেণীর অত্যাচারের ছবিও চর্যাপদে চিত্রিত হয়েছে। একটি চর্যায় দেখা যায়, শবরী নারীর ঘরের চারধারে রাতের আঁধারে কামুক ব্রাহ্মণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ দিনের আলোতে তার ভিন্নরূপ। কবির ভাষায়Ñ ‘নগর বাহিবিয়ে ডোম্বি তোহ্যোরি কুড়িয়া।
ছোই ছোই আইস ব্রাহ্মণ নাড়িয়া ॥
বিবাহিত স্ত্রী থাকতে তারা নি¤œবর্ণের নারীদের কুঁড়েঘরে গমন করত জৈববাসনা চরিতার্থের জন্য। তাদের অসহায় শিকার ছিল ডোম্বি, শবরী, যোগিনী, নিষাদ, চণ্ডালি প্রভৃতি নি¤œবর্ণের নারী। লক্ষণীয় নারীরা কর্মঠ ও অর্থনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত। হাজার বছর পূর্বে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা এবং ধর্মীয় জীবনের পরিচয় চর্যাপদগুলোতে সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। তাই চর্যাপদগুলো সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছে।
পাঠক যদি সহমর্মী-সমমর্মী হন তবে লক্ষ করবেন, চর্যাপদ হচ্ছে নিরন্ন, গৃহহীন, নির্যাতিত, অত্যাচারিত মানুষের নীরব শ্রেণিসংগ্রামের আত্মকথা। চর্যাপদের শ্রমজীবী মানুষেরা অস্পৃশ্য, অনার্য। আমাদের মন ও মগজে হাতুড়ি পেটায় দু’টি লাইনÑ
টালত ঘর মোর নাহি প্রতিবেশী।
হাঁড়িতে ভাত নাহি নিতি আবেশী॥
অর্থাৎ বস্তিতে আমার ঘর। কোনো প্রতিবেশী নেই। (আর) হাঁড়িতে ভাত নেই অথচ প্রতিদিনই প্রেমিকদের ভিড়।
সর্বহারা নারীদের অসহায়ত্ব, দারিদ্র্যের সুযোগে নিত্যদিন ঘরে আসে প্রেমিক। নিরন্ন মানুষের ওপর এ কেমন বলাৎকার? হৃদয়নিংড়ানো এ কেমন বেদনার আর্তি। শ্রেণী-বৈষম্য জীবনের শুরুতেই ছিল। নারী হয়েছে লাঞ্ছিত দলিত। তাদের অসহায়ত্বের চিত্রই যেন চর্যাপদ। কী কঠিন বাস্তবতা শ্রেণী দ্বান্দ্বিক জীবন সংগ্রামে। চর্যা পদকর্তাদের বিদ্রোহের ধরন নানারূপ। যেখানে বাঁচা ও মরার পার্থক্য নেই, মুক্তির একমাত্র পথ দেশ ছাড়া হওয়া। চর্যাপদ নং-৬ এ কবি ভূযুকপাদ তার কবিতায় বর্ণনা করেনÑ যা আধুনিক বাংলা করলে দাঁড়ায়Ñ কাকে নিয়ে কাকে ছেড়ে কেমন করে যে আছি, আমার চারপাশ ঘিরে হাঁক পড়ে। আপন মাংসের জন্যই তো হরিণ সবার শত্রু। কখনোই ভূযুক তাকে ছেড়ে যায় না, হরিণ ঘাসও খায় না, পানিও ছোঁয় না। হরিণী বলে, হরিণ তুমি শোন, এ বন ছেড়ে চলে যাও। চর্যাপদে ব্রাহ্মণরা শুরু উচ্চশ্রেণীর নয়, সব লাঞ্ছনা-বঞ্চনারও প্রতীক।
চর্যাপদের কবিতা মূল্যকে অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। যেহেতু চর্যাপদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত। এবার আলোকপাত করা যাক মধ্যযুগের মুসলিম শাসনামল।
কাজী দৌলত, আলাওল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য উচ্চমার্গে নিয়ে যান। মধ্যযুগের শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র ভাষারূপে সমৃদ্ধ হয়। তাই বলা যায়Ñ মধ্যযুগের মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রকৃত স্থপতি।
প্রাচীন আমলে বাংলায় বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। উত্তর বঙ্গ-বরেন্দ্র, ভাগীরথীর পশ্চিমতীর- রূঢ়। পূর্ববাংলা-বঙ্গ এবং মেঘনা-পূর্ব এলাকা-সমতট নামে পরিচিত ছিল। মুসলমান শাসন আমলেই (চতুর্দশ শতকে) সারা বাংলা একত্রীভূত এবং একক শাসনাধীনে আসে এবং বাংলা ‘বাঙালা’ নামে পরিচিতি পায়।
মোগল আমলে বাংলাকে ‘সুবাহ বাংলা’, ইংরেজ শাসনামলে বেঙ্গল, বর্তমানে যার নাম বাংলাদেশ। উল্লেখ্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা ভারতের প্রদেশের নাম পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে বাংলা করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।
বাংলার আদিরূপ চর্যাপদ থেকে চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং কৃত্তিবাসের রামায়ণ পর্যন্ত আসতে কয়েক শ’ বছর লেগে যায়। বাংলা ভাষা মুসলমানদের ভাষা নয়, বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের সাহিত্য নয়Ñ এটি এক সময় তার্কিক বিষয় ছিল। বিতর্কের ঊর্ধ্বে পণ্ডিতরা একমত হন যে, ইলিয়াস শাহি আমলেই চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচিত হয়।
আরাকান রাজসভার কথা উল্লেখ করতে হয়। সে সময় আরাকান রাজ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বাংলা ভাষায় কাব্যরচনায় উৎসাহিত করতেন এবং কবিদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
একসময় আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে আরাকানবাসীরা বসবাস করে আসছিল বহু বছর ধরে। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে আরাকানবাসীদের ‘রোয়াঙ্গ’ নামে উল্লেখ করা হয়। আরাকানের ইতিহাস জানতে আমাদের সাহায্য করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য। মহাকবি আলাওল, কোরেশি, মদন, মাগন ঠাকুর, নসরুল্লাহ খান প্রমুখ রোয়াঙ্গ রাজসভার কবি ছিলেন। আরাকান রাজসভায় উল্লিখিত কবিরা বাংলা সাহিত্যের প্রসার ঘটান। আরাকানিদের অনেকেরই ভাষা ছিল বাংলা এবং তাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলমান।
সুনির্দিষ্টভাবে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনার পূর্বে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। আগেই বলেছি, মধ্যযুগের মুসলিম শাসকরাই বাংলা সাহিত্যের স্থপতি।
একসময় ইলিয়াস শাহি বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ পাণ্ডুয়ায় রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন গৌড়েশ্বর। সেকালে বাংলা সাহিত্যে বাংলায় সুলতানদের গৌড়েশ্বর বলা হতো। রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। তাকেও গৌড়েশ্বর বলা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নিজে বিদ্বান ছিলেন এবং বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন এবং পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজকে বঙ্গে নিমন্ত্রণ করে পাঠান। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বিদ্বান ও কাব্যামোদী হওয়ার ফলেই কৃত্তিবাসের সমাদর করা সম্ভব ছিল। তাই ঐতিহাসিকগণ সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহই কৃত্তিবাসকে রামায়ণ রচনায় উৎসাহিত করেন। উল্লেখ্য, কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণ কাব্যে একবারও গৌড়েশ্বরের নাম উল্লেখ করেননি। কারণ হিসেবে ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম দুটি বিষয় উল্লেখ করেন। এক : রামায়ণের পাঠে গায়েন ও শ্রোতা উভয়েই পুণ্য লাভ করেন (ব্রাহ্মণদের বিশ্বাস), সে ক্ষেত্রে যবন মুসলমানদের নাম উল্লেখ করা ন্যায়সঙ্গত নয়। দুই : আজম শাহের রাজত্বকালেই হিন্দুরা ক্ষমতাবান হন এবং শাহকে হত্যা করে। উল্লেখ্য, আজম শাহের রাজত্বকালেই অনেক হিন্দু উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কৃত্তিবাস ছিলেন হিসেবি। রাজনীতি সে সময় ওলট-পালট হয়ে পড়ে।
কৃত্তিবাস তাই বুদ্ধি করে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের নাম উল্লেখ করেননি। সুখময় বাবু, সুষেন পণ্ডিতের সূত্র এবং বঙ্গদেশে প্রমোদের সূত্রের সাহায্যে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহই কৃত্তিবাস বর্ণিত গৌড়েশ্বর।
ড. আবদুল করিমের মতে, কৃত্তিবাসের রামায়ণ রচিত হয় গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের শাসনামলেই। ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, কৃত্তিবাসের জন্ম ১৩৮৬ খ্রি.। এ সময়েই গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ রাজ্যশাসন করেন। নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামের কৃত্তিবাস বাংলায় আদি কবি না হলেও তাঁর ‘রামায়ণ’ বা ‘শ্রীরাম পাঁচালী’ ছিল এক সময় বাংলার প্রথম ও প্রধান গ্রন্থ। সুতরাং গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সময় রামায়ণ রচিত হয়, সেই হিসেবে বাংলা ভাষায় রচিত তৃতীয় এবং মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ও উৎসাহে রচিত প্রথম বাংলা গ্রন্থ।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিন-চারজন সুলতান, ষোড়শ শতাব্দীতেও তিন-চারজন সুলতান আর কয়েকজন মুসলমান শাসনকর্তা বাংলা ভাষায় বাঙালি কবিদের কাব্য ও কবিতা রচনায় উৎসাহ দিয়েছিলেন।
কায়স্থ মালাধর বসু রচিত বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরাণাশ্রিত আখ্যান কাব্য ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’। এটি বাংলা ভাষায় রচিত চতুর্থ গ্রন্থ এবং মুসলিম শাসকদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত দ্বিতীয় গ্রন্থ। ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ বাংলায় কৃষ্ণলীলা বিষয়ক প্রথম কাব্য। এটি ছিল অব্রাহ্মণদের রচনা। প্রতিদিন জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাদান, সাহিত্যচর্চা ছিল ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার। অব্রাহ্মণদের জ্ঞানচর্চা ছিল নিষিদ্ধ। আর সাহিত্যচর্চাÑ সে তো অকল্পনীয়। সুতরাং ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ বাংলা সাহিত্যের জন্য বিপ্লব।
রাজশক্তির সাথে বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয় মূলত শাহদের আমলে (১৪৯৮-১৫৩২ খ্রি.)। এই রাজশক্তি ছিল বাঙালি ভাবাপন্ন, তাদের সহানুভূতির ফলেই বাংলা সাহিত্যের যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।
শাহবংশের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বিপ্রদাস রচনা করেন ‘মনসা বিজয়’। ‘মনসা বিজয়’ বাংলা ভাষায় রচিত পঞ্চম ও মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত তৃতীয় গ্রন্থ। এ কাজে হিন্দু মুসলমানদের ঐক্য ও সম্প্রীতির কথা উল্লেখ আছে।
হোসেন শাহের এক কর্মচারী যশোরাজ খান, তিনি রচনা করেন ‘বাঙালায় কৃষ্ণলীলা’ কাব্য। এটি বাংলা ভাষায় রচিত ষষ্ঠ ও মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত চতুর্থ কাব্য। পূর্ববঙ্গের নি¤œতটের অধিবাসী বিজয়গুপ্ত। তিনিও ‘মনসামঙ্গল’ নামে একটি কাব্য রচনা করেন কিন্তু এটি যে ১৪১৬ সালে রচিত হয়েছিল তা কোনো পুঁথি দ্বারা সমর্থিত নয়। তাই ‘মনসামঙ্গল’কে বাংলা ভাষার সপ্তম গ্রন্থ বলে দাবি করা যায় না। তবে মুসলমান পৃষ্ঠপোষকতায় এটি পঞ্চম গ্রন্থ। উল্লেখ্য, হোসেন শাহ-এর আরো দু’জন কর্মচারী গীতি কবিতা লেখে যশ লাভ করেন। রূপ গোস্বামীর ‘উদ্ধব সন্দেশ’ কাব্য এবং ‘সংস্কৃত পদাবলী’ হোসেন শাহের শাসনামলেই রচিত হয়।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে স্বাধীন সুলতানি আমলের দু’ শ’ বছর। সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা ফকরুদ্দিন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণার (১৩৩৮ খ্রি.) মধ্য দিয়ে এই যুগের শুরু হয় আর শেরশাহ সুরের নিকট গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের পরাজয়ে (১৫৩৮ খ্রি.) এই যুগের শেষ হয়। ফলে বঙ্গে সুদীর্ঘ সময় ইলিয়াস শাহি বংশ (১৩৪২-১৪১৪ খ্রি.) শাসন করে। এরপর বিভিন্ন শাসক বঙ্গ শাসন করেন। তবে বঙ্গে স্বাধীন সুলতানি আমলের সুদৃঢ়করণ এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় ইলিয়াস শাহি বংশের শাসকদের গৌরব সর্বাধিক। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়া সমগ্র বঙ্গের ওপর পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন।
এই কারণে ঐতিহাসিক আফিফ ইলিয়াস শাহকে ‘শাহ-ই-বাঙাল’, ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ এবং ‘সুলতান-ই-বাঙালা’ রূপে অভিহিত করেন। প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকেই বঙ্গ বলতে শুধু পূর্ববঙ্গ নয় মুসলিম শাসিত সমগ্র বঙ্গভূমি বোঝাতে থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক হোসেন শাহি বংশের রাজত্বকালকে বাংলার ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ নামে চিহ্নিত করে থাকেন।
বস্তুত পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ হতে চট্টগ্রাম বাংলা সাংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম হতে এই সংস্কৃতির ঢেউ অবিলম্বে তথাকার রাজসভাসদদের মারফত আরাকানে পৌঁছেছিল। প্রতিবেশী দেশ আরাকানের সাথে যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে। তখন থেকেই চাটিগাঁ ও নি¤œবঙ্গের সংলগ্ন অঞ্চল হতে শিক্ষিত মুসলমানরা আরাকানে গিয়ে রাজসভায় জাঁকিয়ে বসে।
আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের সমাদর ও পৃষ্ঠপোষকতা পেতে থাকে। রোসাঙ্গ (আরাকান) রাজ আমাত্যেরা বেশির ভাগ ছিলেন সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুসলমান। এদের প্রভাবেই সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উচ্চাসন লাভ করে। সপ্তদশ শতকে আরাকান রাজসভায় মুসলমান প্রভাব এতই বৃদ্ধি পায় যে আরাকান বৌদ্ধ রাজাদের অভিষেক বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পৌরোহিত্য না করে সেখানকার রাজসভার মুসলমান মন্ত্রীরা পৌরোহিত্য করতেন। আরাকান রাজ সান্দু-থু-ধম্মার অভিষেক অনুষ্ঠানে তদীয় মুসলমান প্রধানমন্ত্রী নবরাজ মুসলিম শপথবাক্য পাঠ করান।
খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে চর্যাগীতি রচনার পর বাংলা সাহিত্য চর্চা স্তব্ধ হয়ে যায়। চতুর্দশ শতাব্দীতে বডু চণ্ডিদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচনার মধ্য দিয়ে এই স্তব্ধতা ভঙ্গ হয়। চণ্ডিদাসের এই গ্রন্থ খাঁটি বাংলা ভাষার রচিত প্রথম গ্রন্থ। পরমেশ্বর দাস মহাভারতের কাহিনী বাংলা ছন্দে বিবৃত করেন। এটিই বাংলা ভাষায় লেখা সর্বপ্রাচীন মহাভারত কাব্য। কাব্যটি ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রচিত হয়েছিল।
হোসেন শাহি আমলের উত্তর চট্টগ্রামের শাসক লস্কর পরাগল খানের নাম বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে, বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। ড. দীনেশচন্দ্রের মতে কবীন্দ্র পরমেশ্বর ১৭ হাজার শ্লোকে মহাভরত রচনা করেন। পণ্ডিত কৃত্তিবাস বাংলা রামায়ণের আদি কবি। তিনি প্রাক-চৈতন্য যুগের কবি। বাংলা মহাভারতের আদি রচয়িতা কবীন্দ্র পরমেশ্বর প্রাক-চৈতন্য না হোক শ্রীচৈতন্যের সমকালীন কবি, হয়তোবা বয়সেও অগ্রজ। বাংলায় এই প্রথম মহাভারত রচিত হয়।
‘চর্যাপদ’ শুরু হয়েছিল বৌদ্ধযুগে। অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন, হিন্দুযুগে বাংলা সাহিত্যের প্রসার ঘটেনি বরং স্তব্ধ হয়ে যায়। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রবর্তনকালে লক্ষণীয় বিষয় ছিল, সেকালের ব্রাহ্মণদের কাছে সংস্কৃত ছিল ‘দেব ভাষা’। সেকালে ব্রাহ্মণগণ বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেনÑ যারা বাংলা ভাষায় অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ পড়বে তারা নরকে যাবে। বস্তুত নরকে যাবার ভয়ে হোক কিংবা সাধারণ পাঠক ভীত হয়ে হোক, হিন্দুযুগে বাংলা সাহিত্যচর্চা হয়নি। আজকের বাংলা সাহিত্যের যে প্রসার, তার ভিত রচিত হয় মুসলিম শাসনামলেই। বাংলার জনগণের মুখের ভাষা বাংলা, এই ভাষা সাহিত্যের রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ অবদান হলো দেশী ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। আস্তে আস্তে মুসলমানরা নিজেরা বাংলা কাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। বাংলায় মুসলিম শাসকরা রাষ্ট্রভাষা ফারসি প্রবর্তন করলেও দরবারে মহাভারত পুরাণ পাঠে উৎসাহিত করতেন। দেশী জনগণের মুখের ভাষা বাংলা, সে ভাষা চর্চা ও বাংলা সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করতেন কবিদের।
বাংলা ভাষা চর্চা ও সাহিত্যের রচনার পেছনে মুসলমান শাসকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একেবারে অগ্রাহ্য করার বিষয় নয়। কথিত আছে রাজা লক্ষ্মণ সেনকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি ১৭ জন অশ্বারোহী দিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে পরাজিত করেন, যদিও লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদ পূর্বেই বখতিয়ার খিলজি ঘেরাও করে রাখেন শত শত সৈন্য দ্বারা। লক্ষ্মণ সেনের পরাজয়কে অনেক সহমর্মী, বিদগ্ধ পাঠক ও চিন্তাবিদ বাংলার পরাজয় মনে করে মর্মাহত হন। কিন্তু রাজ্যশাসন ভিন্ন বিষয়। উল্লেখ্য, লক্ষ্মণ সেনের রাজদরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত অথচ সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। তৎকালীন আমলে রাজা প্রজার মধ্যে ভাষাগত পার্থক্যের কারণে যে ফারাক তৈরি হয়েছিল তার ফলেই লক্ষ্মণ সেনের পতনে জনগণের মধ্যে খুব একটা প্রতিক্রিয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ ভেবেছে রাজা আসবে, যাবে। এই সুযোগ গ্রহণ করে মুসলিম শাসকগণ। সাধারণ জনগণের মুখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন তারা। তারা বোঝতে পারেন সাধারণ জনগণের মুখের ভাষা, আশা-আকাক্সক্ষার কথা জেনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই রাজশক্তির সাথে সাধারণ মানুষের মেলামেশা অবাধ ও সহজ করার জন্য মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা উৎসাহিত করতে শুরু করেন।
কালক্রমে হিন্দু বিদ্বান সাহিত্যানুরাগীরা বাংলা সাহিত্যের প্রতি মনোনিবেশ করেন। বাংলা সাহিত্যের বয়স হাজার বছরের বেশি নয়। বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে দেশী-বিদেশী শব্দভাণ্ডারে। সংস্কৃত থেকে সৃষ্ট বলেই সংস্কৃতকে বাংলা ভাষার জননী বলা হয়। প্রাথমিকভাবে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্য ছিল স্বাভাবিকভাবে সংস্কৃতজ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরু হয় দশম শতাব্দীতে। সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ। বোধগম্য ভাষায় রচিত বডু চণ্ডিদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ যা ১৪৫০ থেকে ১৫২০ সালের মধ্যে অনুলিখিত। এ কাব্যের বুনিয়াদ যদিও সংস্কৃত। তা সত্ত্বেও এ কাব্যের ভাষা বোধগম্য বাংলা ভাষা। সে অর্থে কৃত্তিবাস ওঝার ‘রামায়ণ’ বাঙালির প্রকৃত কাব্য।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রামায়ণ, শ্রীকৃষ্ণ বিজয়, পরাগলী মহাভারত, ছুটিখার মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থে বডু চণ্ডিদাস, কৃত্তিবাস ওঝা, মালাধর বসু, কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাস, শ্রীকর নন্দী সংস্কৃত সাহিত্য অনুসরণে কাব্য রচনা করেন। কিন্তু তারা গধঃঃবৎ ড়ভ ইধহমধষ বা বাংলার বিষয় সংযুক্ত করেন।
সেই যুগে বহিরাগত শাসকরা বাংলা শাসন করেন। শাসকদের সাথে আগত কিছু ফারসি ভাষীরা এই উপমহাদেশে আসেন। এই শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই উপমহাদেশে অভিজাত শ্রেণীর লোকজন ফার্সি ভাষার সাথে পরিচিত হন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর খ্যাতনামা ইসলামিক তাত্ত্বিক কাজী রুকন উদ্দিন সমরকন্দী সংস্কৃত ভাষায় লিখিত হিন্দু যোগশাস্ত্র ‘অমৃতকুণ্ড’ প্রথমে ফারসি পরে আরবিতে অনুবাদ করেন। এর পরেই মুসলিম লেখকরা এগিয়ে আসেন বাংলা ভাষা সাহিত্য রচনায়।
‘ইউসুফ জুলেখা’-র প্রণয়োপাখ্যানই বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক কাব্য। পারস্যের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই শাহ মোহাম্মদ সগীর ১৫৩২ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য কবি ফেরদৌসী জামী ও আনসারীর কাছ থেকে শোনা নবী ইউসুফ-জুলেখার প্রেমকাহিনি অবলম্বনে রচনা করেন ইউসুফ-জুলেখা প্রণয়োপাখ্যান। এটি মিসরীয় কাহিনি অবলম্বনে রচিত। শাহ মোহম্মদ সগীরের সমসাময়িক আরেক কবি সাবরিদ খান, তিনি রচনা করেন ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য। এটি বাংলারই একটি প্রণয়োপাখ্যান।
সংস্কৃত কাব্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও মুসলিম লেখদের হাতে গধঃঃবৎ ড়ভ ইধহমধষ সাহিত্যের বিষয় হয়। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাহিনি আর সাবরিদ খানের বিদ্যাসুন্দর কাহিনি প্রায় একইরকম বলে গবেষকরা মনে করেন।
‘লাইলী-মজনু’ দৌলত উজির বাহরাম খানের একটি সাড়াজাগানিয়া, হৃদয়হরণ করা প্রণয়কাহিনি। আরব দেশে এটি কল্পিত হলেও আরব দেশে এই কিংবদন্তি চালু নেই। আবর দেশের হলেও বাংলা ভাষায় পরিবেশন ও আবহে রচিত হয় ‘লাইলী-মজনু’।
‘নবীবংশ’ রচনা করেন ষষ্ঠদশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি সৈয়দ সুলতান। তিনি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। রামায়ণ, মহাভারত ও বেদপুরাণ আত্মস্থ করেই তিনি ‘নবীবংশ’ রচনা করেন। অমুসলমানদের ইসলামি সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলাই ছিল ‘নবীবংশ’ রচনার প্রধান লক্ষ্য। মুসলিম শাসকরা তাদের শাসনামলেই বাংলা সাহিত্য রচনা শুরু করেন। উল্লেখ্য, খাঁটি বাংলা ভাষায় বডু চণ্ডিদাস কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচনাকালে বাংলায় (গৌড়ে) ছিল মুসলিম শাসক। তবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীর মধ্যেই অসংখ্য হিন্দু সাহিত্যিকের অভ্যুদয় ঘটে এবং তাদের হাতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম দু’জন কবি কাজী দৌলত ও আলাওল। তাদের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র বাংলাদেশ ছিল না, ছিল আরাকান। সে সময় সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহু মুসলমান আরাকানে রাজ অমাত্যের স্থান দখল করেন। চট্টগ্রাম সিলেটের যেসব ব্যক্তি রোসাঙ্গ রাজ অমাত্য হয়েছিলেন, তাদের উৎসাহে সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান হয়ে উঠেছিল বাংলা ভাষার সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র। সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি, আরবি, ফার্সি প্রভৃতি ভাষা তাঁরা তাদের সাহিত্য কর্মে সঙ্গতভাবে যুক্ত করেন। তাই সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য হয়ে উঠে পাঁচ ভাষার সমন্বিত সাহিত্য। মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত এই দুই কবির প্রভাবে পাঁচ ভাষার সমন্বয়েই সাহিত্য রচিত হয়েছিল।
‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যের বাইরে লৌকিক কাহিনির প্রথম রচয়িতা হলেন দৌলত কাজী। দৌলত কাজী রচনা করেন ‘সতীময়না’ বা ‘লোর চন্দ্রানী’। এই কাহিনি রচিত হয় হিন্দি কবি সাধনের কাব্য ‘মৈনামত’ হতে। তখনকার লোকসমাজ চিরদিনই প্রণয় কাহিনি শুনতে এবং রোমান্টিক প্রণয়লীলা জানতে আগ্রহী ছিল। দৌলত কাজী কিন্তু ‘সতীময়না’ শেষ করে যেতে পারেননি। ২০ বছর পর অসমাপ্ত অংশ শেষ করেন কবি আলাওল ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। সংস্কৃত কাব্যাদর্শে রচিত হলেও সতীময়না বিশুদ্ধ বাংলা কবিতা। তাই দৌলত কাজীকে গীতি কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বলা যায়। তিনি প্রথম শক্তিশালী বাঙালি মুসলমান কবি এবং ‘সতীময়না’ বা ‘লোর চন্দ্রানী’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম স্মরণীয় সেকুলার বা ধর্মসংস্কারমুক্ত মানবীয় প্রণয় কাব্য।
‘রোসাঙ্গ’ রাজসভার দ্বিতীয় কবি আলাওল। আলাওল পণ্ডিত ও গুণী ব্যক্তি ছিলেন। অনেক ভাষা, সঙ্গীত ও নাট্যকলায় তাঁর দখল ছিল। আলাওলের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ রচনা ‘পদ্মাবতী’। এটির রচনা শেষ হয় ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। মাগন ঠাকুরের অনুরোধে আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্য রচনা করেন। অযোধ্যা প্রদেশের জায়স গ্রাম নিবাসী মালিক মোহাম্মদ জায়গী রচিত ‘পদুমাবৎ’ এর স্বাধীন অনুবাদ ‘পদ্মাবতী’। এটিকে ভাবানুবাদও বলা হয়।
আলাওল ছিলেন মাগন ঠাকুরের সভাসদ। কোরেশী মাগন ঠাকুর নিজে কবি ছিলেন। রচনা করেন ‘চন্দ্রবতী’। আলাওল মাগন ঠাকুরের অনুরোধে আর একটি কাব্য রচনায় হাত দেন। সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান। ‘পদ্মাবতী’ শেষ করার আগেই তিনি এটি রচনায় হাত দেন। এই কাব্যের দুই-তৃতীয়াংশ রচনার পরেই মাগন ঠাকুরের মৃত্যু হয়। ফলে আলাওলের জীবনে দারুণ দুর্বিপাক নেমে আসে। আলাওল সর্বস্বান্ত হন। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। এই তিনটি গ্রন্থের পরে আরো দু’টি অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তাঁর ষষ্ঠ ও শেষ রচনা ‘সেকান্দার নামা’ আলেক সান্দরের বিজয় অভিযান সম্পর্কে ইরানে যে গল্প গড়ে উঠেছে, তারই কয়েকটি এই কাব্যের বিষয়। আলাওলের মতো বিদগ্ধ, উচ্চবর্গের কবি বাংলা সাহিত্যে বিরল। আলাওল আরো কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এই ধারণার সত্যতা কোনো পুঁথিতে নেই। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি শাহ সগির এবং তার কাব্য ‘ইউসুফ-জুলেখা’। এটি একটি প্রণয়কাহিনি। দ্বিতীয় প্রণয়কাহিনি বাহরাম খান রচিত ‘লাইলী-মজনু’।
সপ্তদশ শতক শেষ হওয়ার আগেই আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য, সাংস্কৃতির কদর কমে এসেছিল। কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়Ñ আরাকান রাজ্যের বিশৃঙ্খলা, বাঙালি মুসলমানদের ক্ষমতা লোপ। ড. সুনীতি কুমার কানুনগোর মতে, ১৩০০ থেকে ১৩২৩ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গ সম্পূর্ণভাবে মুসলমানদের অধীনে আসে। এ সময় বাংলা সাহিত্যেরও প্রসার ঘটে।
মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ও হিন্দু ধর্ম এবং সামাজিক সংস্কার তাই প্রত্যক্ষ ও উজ্জ্বল।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসুন্দর কাহিনির জয়জয়কার অষ্টাদশ শতকের শুরুতে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অন্তত সাত-আটজন কবি বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচনা করেন। বিদ্যাসুন্দর পাঞ্জালী কাব্যের সূত্রপাত ষোড়শ শতাব্দীতে। দ্বিজ শ্রীধর কবিরাজ বিদ্যাসুন্দর কাব্যের প্রথম কবি। সপ্তদশ শতাব্দীতে আরো দু’জন কবি কৃষ্ণরাম দাস কবি বল্লম ও প্রাণরাম চক্রবর্তী বিদ্যাসুন্দর কাব্য লেখেন। কবিশেখর বলরাম চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র রায়গুণকর, কবিরঞ্জন রায়প্রসাদ সেন, কবিরতœ নিধিরাম আচার্য, রাধাকান্ত মিশ্র ও কবীন্দ্র চক্রবর্তী বিদ্যাসুন্দর কাব্য রচনা করেন। বিদ্যাসুন্দর কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র (রায়গুণকার)। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর মুখ্য কবি। অন্নদামঙ্গল এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কাব্য। মুকুন্দরামের কাব্য পরবর্তী সব মঙ্গল কাব্যরচয়িতাকে প্রভাবিত করেছিল। ভারতচন্দ্রের কাব্য অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের কবিদেরও প্রভাবিত করেছিল।
বিদ্যাসুন্দর কাব্যের মূল বিষয় : বিদ্যাশিক্ষা উপলক্ষে বিদ্বান গুরুর সঙ্গে ছাত্রীর প্রণয়।
ভারতচন্দ্র শুধু বিদ্যাসুন্দরের কবি নন। বিদ্যাসুন্দর তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যের একটি অংশ মাত্র। ভারতচন্দ্র ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি প্রতিনিধি। ভারতচন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার বংশের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও জমিদারি হারান এবং নিজগুণে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাসদ হয়েছিলেন। তিনি তিনটি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। সংস্কৃত, বাংলা ও ফার্সি ভাষা তিনি তাঁর কাব্যে ব্যবহার করেন। নবদ্বীপের রাজার আদিষ্ট হয়ে তিনি অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যের তিনটি খণ্ড। প্রথম খণ্ডÑ অন্নদামঙ্গল, দ্বিতীয় খণ্ডÑ বিদ্যাসুন্দর-কালিকামঙ্গল, তৃতীয় খণ্ডÑমানসিংহ-অন্নপূর্ণামঙ্গল। তাই বলাচলে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র। অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বেই বাংলা সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের প্রভাব লক্ষণীয়। ভারতচন্দ্র বাঙালি কবি ছিলেন। তাঁর মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তিনি যেহেতু আরবি, ফার্সি, হিন্দি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন, তাই তাঁর কাব্যে সাহসিকতার সাথে অন্য ভাষার শব্দভাণ্ডার সাদরে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। ভারতচন্দ্রসহ আরো কয়েকজন কবি এসে বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটান। শুরু হয় আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্য চর্চা। হ
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক