শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে মিখাইল সলোখভ বলেছিলেন ‘কারখানার শ্রমিক কিংবা খেতখামারের চাষি নি¤œমানের জিনিসপত্র কিংবা ফসল তৈরি/উৎপাদন করলে তার চাহিদা যেমন থাকে না, লেখক শিল্পী নি¤œমানের দায়সারা কাজ করলে তারও চাহিদা থাকে না।... তিনি আরো বলেছিলেন ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের আর কোথাও সাহিত্যের মতো দ্বন্দ্বমূলক গতিবাদ এত প্রচণ্ডভাবে কাজ করে না। জনগণের জন্য লিখতে পারাটাই হচ্ছে বড় সম্মান বড় পুরস্কার’।
কবিতা প্রসঙ্গে কবি শিল্পী প্রাবন্ধিক মঈন চৌধুরী উল্লেখ করেছেন; ‘কবি শিল্পী সাহিত্যিক স্ব স্ব ক্ষেত্রে তার সৃষ্টিকে প্রকাশ করেন। ‘মনস্তত্ত্ব নির্ভর এবং এক ধরনের ‘বাইনারি অপজিশন’ বা যুগ্ম-বৈপরীত্যসৃষ্ট রোমান্টিকতা এখানে কাজ করে’। কবিতা তার কাছে কোনো ঐশীপ্রাপ্ত বিষয় নয়। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ^াস করি, কবিতার জন্মের সাথে সবসময় জড়িয়ে থাকে একজন মৌলিক সত্তার স্রষ্টা মানুষ এবং তার মনস্তাত্ত্বিক সঙ্ঘাত’। কবিতায় অনেক ঊপাদান সংযুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন ‘মন বলে, বাকি সবই হলো ঘটনা, যাকে বলি কাব্যগুণ নন্দনতত্ত্ব আধুনিকতা পরাবাস্তবতা ভাষার নাচন জীবনবোধ দ্রোহ ইত্যাদি, সবই আসে কাব্যমূলের অণু-পরমাণুর মাইক্রোসোম বা অণুবিশ্বের অনিশ্চয়তা আর সঙ্ঘাত থেকে’ যদি এমন না হয়? নিজ প্রশ্নের উত্তরে তিনি লিখেছেন ‘তখন আর কবিতা হয় না’।
সাংখ্যকারের নিরিখে প্রকৃতি অচেতন। মানব শিশু যখন অন্য মানুষ দেখে সেই মানুষটার সচেতনতা প্রসঙ্গে কোনো জ্ঞান তার থাকে না। বড়রা যেমন জীব, প্রাণী মানুষ ইত্যাদিকে চেনে সেটা অনুমানের যাকে বলে পারসেপশন যা ইমেজ আকারে মনে স্থিত হয়। শিশু দূর নিকট লোকদেরকেও চেনে বাইরের কোনো ইমেজের সঙ্গে নিজে প্রতিফলিত ইমেজ যুক্ত করে। লাঁকার মতে নিজের বাইরের কোনো ইমেজের সাথে একাত্মবোধ করা শিশুর কোনো মুহূর্তের ব্যাপার নয়, বরং লাগাতার।.. কেউ যখন কোনো ইমেজের সাথে একাত্মবোধ করে তখন সে এমন সব কাজ করে যা আগে করেনি। মিরর ফেজ শেষ হলে শিশুর সত্তা যৌগিক সত্তায় রূপান্তর ঘটে। কেউ শামসুর রহমান কেউ আলমাহমুদ কেউ ড. শহীদুল্লাহ হতে চায় আবার কেউ টাউট বাটপার রাজনীতিবিদ পতিত স্খলিত ধনিক ইত্যাদির ইমেজকে নিজের মধ্যে সংস্থিত করে কয়েদ হয়ে যায়। আর এর মধ্যেই শিশু বড় হয় কৈশর যৌবন পার করে সমাজজীবনে স্থিত হয় এবং পতিত সত্তা বা মানবিক সত্তার রূপান্তরের মধ্যে অধীন হয়ে কয়েদির জীবনপ্রবাহ চলমান রাখে। আমরা পাই কখনো সদগুণসম্পন্ন মানুষ, হিতৈষী মানুষ, সাহসী যোদ্ধা, ত্যাগীবীর অথবা পতিত সত্তাধারী, ইমেজের কয়েদি। ইমেজ সঙ্কট প্রবল হয়ে ওঠে রাজনীতির সমাজনিয়ন্ত্রণের কারণে। মানুষ যত দিন আছে তত দিন থাকবে রাজনীতি। রাজনীতি দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের সামাজিক জীবন। সমাজ পরিশীলিত হয় রাজনীতির সুস্থ বিকাশে। কেবল কঠিন কঠোর আইনপ্রণয়ন দ্বারা একটি সুস্থ সবল কলুষমুক্ত সমাজ নির্মাণ করা যায় না। যায় নিরন্তুর সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ও যুগোপযোগী উন্নয়নের মধ্য দিয়ে। সংস্কৃতিবান মানুষ নিজেকে চিনতে পারে তার পরিপাশর্^ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারায়। সংস্কৃতি ভূমিলগ্ন থেকে আধুনিকতাকে স্পর্শ করে, জনজীবনে স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসে সংস্কৃতির অসুখের সুস্থ চিকিৎসার মধ্যে। [মানুষের গোটা জীবনই সংস্কৃতির মধ্যে আবর্তিত। কেবল কাব্য/শিল্প/সঙ্গীত সংস্কৃতি নয়।] জ্যাক লাঁকার মতে এই ইমেজ থেকে ব্যক্তির মুক্তি ঘটে না, ব্যক্তি মাত্রই ইমেজ প্রভাবিত।
দুই.
মানুষের মনের ভেতরেও মন আছে এই আবিষ্কার ফ্রয়েডের। সে অচেতন মন। এই অচেতন মন কামনা বাসনা ইত্যাদির নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে। সচেতনতার মধ্যে আমাদের ভাবনা, চিন্তা, অনুভব ইত্যাদি, তাই ইগো। ইগো বা অহঙ্কার জগৎ এবং ব্যক্তির মধ্যে মধ্যস্থ হয়ে বোঝাপড়া করে। সত্যকামের জন্ম দিয়ে জাবালা তার সাথে তার সম্পর্ক অস্বীকার করেনি, ফলে সত্যকামও কলঙ্কিত হয়নি, কিন্তু কুন্তি অস্বীকার করেছিল কর্ণকে আর পরবর্তীতে কর্ণের কাছে সম্পর্কের দোহাই দিতে হয়েছিল। তাই আমাদের আইন প্রণয়নকারীরা গোপন ব্যালট সম্ভবত গোপন না রেখে বলাৎকার করে দিচ্ছেন গোপন ভোটের। তারা জাবালার পথ ধরেছেন। হয়তো এতে আর কলঙ্ক থাকছে না।
ফ্রয়েড তার টোটেম ও টাবু গ্রন্থে লিখেছেন : টোটেম ও টাবু যে এখনো আমাদের স্বভাবে রক্তে মগজে চিন্তায় সাথে যুক্ত হয়ে আছে। মাত্র অর্ধশতকের খানিকটা বেশি সময় আগে গ্রামে রাস্তাদিয়ে শাশুড়ি হেঁটে গেলে এবং মেয়ে জামাইয়ের সাথে পথে দেখা হলে শাশুড়ি ছাতা থাকলে তা খুলে বা আঁচলে মুখ-মাথা ঢেকে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি জামাই হেঁটে না যাওয়া পর্যন্ত। হয়তো এখনো কোনো দূরগ্রামে তার চলন আছে। আজও আমাদের সমাজে এমন মানুষ খুব দূরের নয় যাদের সাথে আদিম মানুষের ঘনিষ্ঠতা কোনো না কোনোভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে। এই রীতি আদিম সমাজগুলোতে দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা। টোটেম যেকোনো কিছু হতে পারে দৈবশক্তি, অপশক্তি, কল্যাণ শক্তি যার ওপর আরোপিত হয়। আদিমরা, টোটেম পশুর মাংস খেত না হত্যাও করত না। টাবু যে আসলে কী ফ্রয়েড তার প্রকৃত অর্থ বলেননি, তবে টাবু যে বহু কিছু যেমন রীতিনীতি নিষেধ শাস্তি বিশ^াস-অবিশ^াস জাদু ইত্যাদি সবই হতে পারে এমন ইঙ্গিত নানাজনের লেখায় রয়েছে। সেই টাবু যে এখনো আমাদের মনজগতে আমাদের জেনমে যুক্ত, আমরা আধুনিক হয়েও তা কোনো ক্যাথারসিস ক্রিয়ায় বের করে ফেলতে পারিনি। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সব ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা টোটেম ব্যবস্থার অনুশাসনেই চালিত হয়ে থাকে। ১৮৯১ সালে জে. লঙ সর্বপ্রথম উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে টেটেম বা টোটাম কথাটি জেনেছিলেন।
একসময় রাজাকে ঈশ^রের প্রতিনিধি মনে করা হতো/এখনো বিদ্যমান। সে তো খুব বেশি দিনের কথা নয় এবং একসময় এরকম বিশ^াসও ছিল রাজার স্পর্শে রোগের উপশম হয়, এখনো পুরোহিতের ফুঁ চালু রয়েছে, পানিপড়া, গিরাদেয়া সুতা অষ্টধাতুর মাদুলি, তাও আছে। আমাদের রাজনীতিবিদ ধর্মীয় গুরু মওলানা ভাসানী নদীতে ফুঁ দিতেন আর সেখান থেকে পানি বোতল ভরে গ্রামের মানুষ নিতো রোগমুক্তির আশায়। সেই টোটামগুরু আর একালের ধর্মগুরুর পার্থক্যটা আর কী? যদিও মওলানা ভাসানী এসব জানতেন এবং কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন কী আর করা যাবে ওরা এতে বিশ^াস করে। অবশ্য এই বিশ^াস একদিন বদলাবে এমন বিশ^াসও ছিল তার।
তিন.
অমল বন্দ্যোপাধ্যার উত্তর-আধুনিক ও পাঁচজন ফরাসি ভাবুক বইখানার কথা মনে পড়ল। নরহরি কবিরাজের উত্তর আধুনিকতা এবং মঈন চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহে এ প্রসঙ্গের প্রবন্ধ। বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাগুলোয় একটু ভিন্নতা আছে। তিনি লিখেছেন, ‘উত্তর আধুনিক শব্দটি হঠাৎ কোনো উপগ্রহ থেকে ছিটকে আসা বিচিত্র বস্তুও বা প্রাণীর নাম নয়। উত্তর-আধুনিক একটি আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বিশেষণ এ সম্পর্কের উত্তর-আধুনিক চিন্তার বিশ্লেষণে তিনি উল্লেখ করেছেন আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের এই জটাজালে জড়িয়ে পড়েছি।... আরো উল্লেখ করেছেন গত আড়াই হাজার বছরব্যাপী ইউরোপীয় দর্শন, রাষ্ট্রজ্ঞিান ও সমাজতাত্ত্বিক রচনার মাধ্যমে শেখানো হয়েছে তার মধ্যে কী পরিমাণ অসত্য ভ্রান্তি ও ত্রুটিপূর্ণ অনুসিদ্ধান্ত বা প্যারালোগিজম রয়েছে যা একসময় রাষ্ট্রের, জাতির ও ধর্মের স্বার্থে কাজে লাগানো হয়েছে। এই অসত্য বিভ্রান্তি আর বাদনের তীক্ষè নির্মম ও আপসহীন বিশ্লেষণ করেছেন কয়েকজন ফরাসি, তথাকথিত উত্তর-আধুনিকভাবুক। যেন এক বিদ্রোহ; এই বিদ্রোহকে নিষ্পন্ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি যথা দেরিদার অবিনির্মাণ তত্ত্ব ফুকো এবং দলয়জের বংশানুচরিত ইত্যাদি। এগুলো সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৩০ এর দশকে। স্পেনের মেগুয়েল উনামুনো,ওর্তগা ই প্যাসেট এদের বন্ধু ফ্রেদেরিকা দে অনিস। এরপর চলে যায় আমেরিকায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে সেখানে নানা ব্যক্তির হাতে নানাবিধ সৃষ্টি কবিতা চিত্রকলা নাটক এমন কি স্থাপত্যেও সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে’। এর মধ্যে ঢুকে পড়ে হাইডেগার, কখনো সার্ত্র কখনো ফুকো সাহেবরা। জন্মসূত্রে মিসরীয় নাগরিক সূত্রে মার্কিন বুদ্ধিজীবী ইহাব হাসান। এসব ফরাসি দার্শনিক মণ্ডপে নিয়ে আসেন লিয়োতার। ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের গোড়ার দিকে কানাডা ফরাসি-ভাষী প্রদেশ কুইবেক শিক্ষা দফতর থেকে লিয়োতারকে অনুরোধ করা হয়েছিল জ্ঞান, জ্ঞান সঞ্চয় বা জ্ঞানের প্রয়োগ প্রভৃতি বিষয়গুলো সেই সময়কার পরিস্থিতিতে ঠিক কি অবস্থায় ছিল তার ওপর একটা রিপোর্ট তৈরি করার জন্য। লিয়োতার ১৯৭৯ সালে সেই রিপোর্ট গ্রন্থাকারে [লা কনডিশন পোস্টমর্টেম শিরোনামে প্রকাশিত হয়।]] লিয়োতার ছিলেন ইউরোপীয় দর্শনে সুপণ্ডিত। তিনি মার্কসপন্থী ছিলেন প্রথমে, তার পর মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি দেখাতে চেয়েছে যে মার্কস প্রলেতারিয়েত প্রসঙ্গে যে ধারণা উপস্থাপন করেছে আদতে ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থাটা এখন আর তেমন নেই। তাদেরও উন্নতি ঘটেছে। লিয়োতার বলেছেন আড়াই হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় চিন্তায় বা ধর্মে যা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়ে গেছে ফাঁকফোকর। আশা আকাক্সক্ষা, প্রতিশ্রুতি ও শিক্ষার মাধ্যমে যা সৃষ্টি করা হয়েছিল তা বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। এই শিক্ষা ও প্রতিশ্রুতিকে তিনি আখ্যা দিয়েছেন গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ এবং এটা যতটা গ্র্যান্ড ঠিক ততটা ন্যারেটিভ। ন্যারেটিভ মানে লিখিত বা পঠিত ভাষণ নয়। লিয়োতার নিজে বলেছেন যা জনপ্রিয় এবং লোকে শুনতে চায়। সে দিন অবশ্য আজ আর নেই। মহাভারত বা রামায়ণ বা ইলিয়ড অডিসি এগুলো জনপ্রিয় একসময়ের, আজ মানুষ অল্পেই আনন্দটুকু নিতে চায়, কারণ বিশাল অবসর আজ আর নেই, যদিও করোনা তেমন একটা অবসর হাতে এনে দিয়েছে, তবুও ওগুলো কিছু প্রয়োজন ছাড়া আর বসে বসে পড়তে ইচ্ছে করে না কারণ মনে হয় রুচির বদল।
চার.
ভাষার এক নিজস্ব অটোনমি আছে। তার ক্রিয়াবিধির এক নিজস্ব সত্তা আছে যাকে যুক্তিবিদ্যা,ভাষতত্ত্ব বা ভাষা দর্শনে পর্যবসিত করা যায় না, বিশেষ করে কবিতার ভাষা। কবিতার ভাষ্যগুলো বাক্যবন্ধ হলে শব্দের আন্তনিয়মে অর্থদ্যোতনায় নতুনত্ব আনবে তার যতœ নিতে হয় সময় ধরে। অনেকেই কবিতা লিখেই মনে করেন হয়ে গেছে, আর পড়েন না, ভাষা নিয়ে ভাবেনও না। ফলে শব্দের নতুন দিগন্ত তাদের কবিতায় তারা নির্মাণ করতেও পারেন না। গতানুগতিকতাই তাদের কবিতার নিয়তি। কবিতা মূলত চিন্তার সূক্ষ্ম বিস্তার, শব্দ কেবলই শব্দই নয়, প্রচলিত অর্থের বাইরেও অর্থনিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নতুনের দ্যোতনায় হয়ে ওঠে আধুনিক। বোদলেয়ার আধুনিকতা প্রসঙ্গে বলেছেন ক্ষণস্থায়ী, বিলীয়মান অনিয়ত; এটা শিল্পের এক অর্ধেক; বাকি অর্ধেক চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়’] কে আধুনিক? আধুনিকতাই বা কী? [সে প্রসঙ্গ অন্যত্র] প্রবন্ধ মিশেল ফুকো শেষ পর্যায়ের তত্ত্বভাবনা], আমাদের সৃষ্টি কিসের জন্য সেই বোধ যদি না থাকে তা হলে তো বলা যায় পাগলের আনন্দ কাপড় খুলে দৌড়ান আর সেটা সহনীয় নয় সুস্থের কাছে। কাব্য-সাহিত্য-শিল্প এসবই সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টি সবই মিলে শিল্প এবং বিভক্তিতে কলাÑ শিল্পকলা। সুন্দর হলো মানুষের মনগত ভোগ ক্রিয়া। তুমি বলো সুন্দর, তাই আমি সুন্দর। এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নটি। শিল্প কলা দেখার বোঝার উপলব্ধি করার মধ্যদিয়েই একেকজন ভোক্তা তার সুন্দরকে অনুভব করতে পারেন। এরও সীমাবদ্ধতা আছে, যারা পুরাতনপন্থী সামন্তীয় সময়ের মনোবৃত্তি দ্বারা আচ্ছন্ন ও আক্রান্ত [পৃথিবীর পুঁজিবাদী সমাজ বদল [যা সামন্তীয় সমাজে থেকে আধুনিক] বিষয়গুলোর মধ্যে বসবাস করেন, রুচিতে অভ্যেসে পরিবর্তনগুলো দেখেও রয়ে গেছেন অতীতের নস্টালজিয়ায়, আহা আহা হা হুতাশে, সেই সময় আহা সেই সব কি না মধুর ছিল তারা শিল্পের বদল রূপটিও অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন আজ। আবার মতলববাজিও থাকে কারণ ভেতরের বিদ্রোহ কয়েদমুক্ত হতে চাইলে স্থানচ্যুতির সম্ভাবনা আছে। আঁতেল বলে যে সুবিধা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে তারও যোগ থেকে বিয়োগ চুঁইয়ে পড়তে পারে। সে যা হোক তার পরও শিল্পকে বুঝতে হয়, যে দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পী কবি লেখক তার সৃষ্টিতে প্রকাশ মাত্রায় রেখেছেন তাকে। শিল্পী-কবি-আঁকিয়ে-গাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গিটা অবশ্যই বুঝতে হবে। বোদলেয়ার তার দ্য পেইন্টার ইন মডার্ন লাইফ রচনায় বলেছেন ‘আমি জোর দিয়ে বলতে প্রস্তুত আছি যে প্রেরণার সঙ্গে মানসিক আলোড়নের একটা মিল আছে এবং প্রতিটি সুমহান চিন্তার সহযোগী হলো এক ধরনের উগ্র নার্ভাস শক..]
মানুষ রহস্যবাদ পছন্দ করে কেন, তার কারণ তার সামনের চলমান জীবনটাই অনিশ্চয়তার, অক্ষমতার, অসহায়ত্বের এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের। তার সামনে চলমান পরিবর্তনগুলো কোনো বিশেষ অর্থই তৈরি করে না দেয় না নতুন কোনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। প্রাকৃতিক নিয়মের পরিবর্তন মানুষের চাহিদার সঙ্কটকে পূরণও করতে পারে না আর যেটুকু তার পরও সে পায় তা প্রাকৃতিকভাবে, তাই সে হয়ে ওঠে নিয়তিবাদী। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে কেউ যদি পরিবর্তনগুলোকে এবং এর ব্যবহারিক প্রয়োজনগুলোকে উপলব্ধি না করে ফেলে আসা সময়ের মনোবৃত্তি নিয়ে আজকের পরিবর্তিত সময়ের শিল্পকে বুঝতে বা অনুভব করতে চায় : তিনি ব্যর্থই হবেন। শিল্পী বা কবিকে উপলব্ধি করতে হবে সময়কে, সমাজকে, পরিবর্তিত সমকালীনতাকে Ñ পরিবর্তন ও রূপান্তরকে। মহান সে, যাঁর সৃষ্টি/আবিষ্কার মানব জীবনকে সুরক্ষা দেয় সংযত করে, সংহত করে, বিপদ থেকে মুক্তির উপায় বাতলায়। শিল্পী কবি সাহিত্যিকও সমাজ জীবন নিয়ে এমন কিছু এমনভাবে বলবেন যা থেকে একজন পাঠপ্রিয় পাঠক বুঝতে পারবে বা চিনতে পারবেন তার কালের মানুষকে, সময় ও সুন্দরকে। অসুন্দরকে ও জানতে পারবেন সৃষ্ট-সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে। আর এটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর কাজ তার দায়িত্ব। যখন তা না হয়ে কেবল আনন্দ আনন্দ বলে চিল্লাচিল্লি চলে, তখন বুঝতেই হয় সে কয়েদ হয়ে আছে তার নিজ সুখপ্রাপ্তির মডেল অর্থ-পদ-মেডেল-বিদেশ ভ্রমণ সুবিধার দেবীর সামনে।
পাঁচ.
‘প্লেটো বলেছেন আর্ট হচ্ছে ইমিটেশন সে কারণেই সত্য থেকে অনেক দূরে। অ্যারিস্টোটল বলেছেন যেহেতু ইমিটেশনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে এ পৃথিবীতে মানুষের সচলতা ও সজীবতা তাই শিল্প ইমিটেশন হওয়ার কারণেই সত্য বস্তুর চেয়ে অধিকতর জীবন্ত। বস্তু উপকরণগত বাস্তবতা নিয়ে নিঃশেষ হয় কিন্তু শিল্পানুভূতি অন্তঃসার নিয়ে জীবন্ত থাকে।... কবি ও শিল্পীর দৃষ্টিতে বস্তুর বস্তুত্বটি কিছুই নয় কিন্তু তার সজীবতা এবং সচলতাই একমাত্র প্রতিপাদ্য।’ আসলে বস্তু কেমন করে কবির অনুভূতিতে টোকা দেয় এবং কবি সংবেদিত হয়ে আবেগ ও কল্পনায় তার অনুভূতিকে নির্মাণ করেন সেটি হলো প্রতিপাদ্য।
কেবল একটা হইচই নয়, বরং শিল্পভাবনার চূড়ান্তকরণ বা আত্মোপলব্ধির যথাযথ রূপায়ণ শিল্পসার্থকতার সাথে। কিন্তু সে কাজটি করতে গেলে একজন কবিকে প্রতিটি মুহূর্তে সময়ের রথে চড়ার ক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে হয়। সমাজ রূপান্তর ঘটে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মধ্য দিয়ে, রাজনীতি যদি হয় শোষণ-শাসন-ত্রাসন এবং কুমিরকান্নার, বিরাজমান চেতনা তখন স্থবিরতায় আটকে পড়ে এবং পশ্চাদপদতাকে সম্বল করে সেই সব অন্ধকাহিনী পবিত্র কাহিনী হয়ে লোকমুখে বিস্তৃতি পায়। বিলাতফেরত অধ্যাপক বলেছেন, মিথ্যে হবে কেন, এই অনুপান ছড়ানোর কাজটি কবি সাহিত্যিকরা যে খুব কম করেন তা কিন্তু নয় বরং মনোজগতে কবি সাহিত্যিকরা যে হরমোন পুশ করে তা ঠাকুরের পাণ্ডার চেয়ে কম নয়। যদিও শিল্পীরা সব সময় তার দৃষ্টি ও বোধ সম্পর্কে সজাগ তাও নয়, কিন্তু মানুষের অবচেতন চিত্তের মধ্যে এই বোধটা প্রবলভাবে ধাক্কা দেয়। তাই শিল্পীকেই আগে কয়েদ থেকে মুক্ত হতে হয় এবং কী লিখবেন কেন লিখবেন যা লিখছেন সে সম্পর্কে তার আলোকায়ন আছে কি না, ভাষ্যগুলোয় কোনো কিছুর ইঙ্গিতকে পরিপুষ্ট করতে পারছে কি না সে সম্পর্কে অনেক না হলেও খানিকটা স্পষ্ট থাকা দরকার।
ছয়.
১৯০৫-১৯১০ এর মধ্যে পশ্চিমে প্রচলিত ব্যতিক্রমী দু’টি শিল্পধারার উদ্ভব ঘটে। প্রচলিত শিল্পধারা এবং চিরাচরিত শিল্পবিশ^াসকে তা প্রবলভাবে নাড়া দেয়। যদিও তা স্থায়ী রূপ লাভ করতে পারেনি পুঁজিবাদী কৌশলের কাছে এবং মননবিশে^ মানুষের অগ্রগামিতার অভাবে। একটি ‘ফভবাদ’ ও অন্যটি‘ কিউবিজম’। যে ব্যবস্থার মধ্যে এই ক্রিয়া সংঘটিত হয়েছিল সে ব্যবস্থাপনার মধ্যে ছিল অস্থিরতা, অক্ষমতা ও বিকার এবং অন্যায়ের প্রশ্রয়। এক কথায় বলা যায় মানবতা তখন এক সঙ্কটকালের মধ্যে নিমজ্জিত যা আজ আরো ভয়ানক হয়ে উঠেছে। শিল্পীরা কবিরা সাহিত্যিকরা চাইলেন মুক্ত জীবন, যা কয়েদায়িত নয়Ñ। কিন্তু রাষ্ট্রশক্তি এসব টের পায়। ‘বাস্তবে যথার্থ শিল্পের মহত্ত্ব হচ্ছে সেই সত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করা এবং বোধের আয়ত্তে আনা’ যা রাষ্ট্রশক্তির পরিবর্তন না ঘটলে বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে থাকে। কিন্তু একটি স্বপ্নের রাষ্ট্র অনেক স্বপ্নবিনাশী রাষ্ট্রের মধ্যে টিকে থাকার কৌশল আয়াত্তাধীন করার কাজ বিচক্ষণতায় সক্ষম হয় না। কৃষক শক্তি সংগঠিত, বিদ্রোহ বিপ্লব জীবন দেয়া এসব করতে পিছু পা হয় না কিন্তু তারা ধারণায় নিতে পারে না সামগ্রিক জাগরণ ছাড়া রাষ্ট্রশক্তির কাছে তাদের শক্তি খুবই নগণ্য। কানদিনস্কি বিশ^াস করতেন ‘নিজস্ব স্বকীয়তায় শিল্পের যে অবঅয়ব তার একটি অস্থিগত চৈতন্য আছে।’ তিনি কল্পনার রহস্যাবৃত জগত ভালো বাসতেন। একটি ব্যতিক্রমী শিল্পধারা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই সেটা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং সঙ্ঘবদ্ধতার মধ্যেই তার অস্তিত্ব। কানদিনস্কি মনে করতেন ‘একজন শিল্পী বা কবি অদৃশ্য ঐশ^র্যের অনুসন্ধানে আত্মার একটি পিরামিড গড়ে তুলবেন যার শিখরদেশ আকাশ স্পর্শ করবে’।
১৯০৯ সালে শুরু হয় ‘ফিউচারিজম’ ইটালির কবি মারিনেত্তির হাতে। তারা বললেন এত দিন যা কিছু তৈরি হয়েছে রঙে শব্দে তা ভুলে যেতে হবে, মনে রাখতে হবে সব কিছু গতিমান যেমন আকৃতি তেমনি রঙ তেমনি শব্দের ব্যবহার। বিশ^ গতিময় তার মধ্যেই একজন শিল্পী কবির বসবাস। যাকে আমরা স্পেস বলে এত দিন জেনে এসেছি বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই, অস্তিত্ব আছে গতির। তারা বস্তুর অনুকরণে এতদিন যত কাজ হয়েছে তাকে অবহেলা এবং অস্বীকার করলেন, প্রতিবাদই হবে শিল্পের মূল প্রতিপাদ্য যা শিল্পীর ভিতরের বিদ্রোহীর প্রকাশ, যেসব বিষয়বস্তু এত দিন কাব্যে ও শিল্পের বিষয়বস্তু ছিল তাকে বাদ দিযে যেগুলো সময়কে মূল্য দিচ্ছে তাকে গ্রহণ করতে হবে, কবিতায় ‘ছন্দ দাসত্বের’ মুক্তি দরকার এখন। ছন্দতামাশা একজন কবিকে কয়েদ করে। বরং পলিফোনি বা ধ্বনির সমস্বর প্রয়োজন, প্রকৃতিকে প্রথাগত ব্যবহার পরিহার করে নতুন বিশ^াস সৃষ্টিতে মনোযোগী হতে হবে। এই মতবাদকে বলা হয় ‘এককালীনতা’। সব কিছুই গতিমান সব কিছু সঞ্চরমান, সব কিছু সময় এবং পরিসরের প্রেক্ষাপটে উদ্ভাসিত। বিভিন্ন সময়ের শিল্পান্দোলন শিল্পাঙ্গনকে আলোড়িত করেছে, মানুষের মনোজগত নতুন করে নির্মাণে অনেকটা ইন্ধন জুগিয়েছে। চলমান সভ্যতা আসলেই কী সভ্যতা কিংবা মানুষের যাত্রা থেকে এখনো কত দূর এরও সারসঙ্কলন ঘটবে কোনো এক দিন। হ
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক
