আমাদের সমাজে নিকট অতীতে বেশ কিছু সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী দেশের আর্থসামাজিক বহু ইস্যুতে প্রবল সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোটামুটি চুপচাপ। আশপাশে এত কিছু ঘটে চলেছে কিন্তু তারা বেশি কিছু বলছেন না। এদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যে যা বলেন তাও সরকারের অনেক পরস্পরবিরোধী নীতির সমর্থনে জোর গলায় চিৎকার করে বলেন। সেসব বাক্য মানুষের দুর্বিষহ জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে তোলে। এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা সেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই বর্তমানে বেশ বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হলো জনসাধারণের জন-উপযোগ ও দৈনন্দিন জীবনের প্রাপ্যতাকে নিশ্চিত করা, মানুষের কল্যাণে কাজ করা, দেশকে ২০২১ সাল নাগাদ মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত করার কাজে নেতৃত্ব দেয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পদ পেয়ে বেশ আরাম ও স্বস্তিতে আছেন এবং অনেকেই আত্মমুগ্ধতায় বা আত্মতৃপ্তিতেও ভুগছেন। অনেকে পদ পাওয়ার আশায় একেবারেই চুপচাপ। অনেকেই আবার ইতোমধ্যে মোটামুটি উপলব্ধি করছেন যে, তাদের প্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের অনেক মধুর বচনই সত্য নয়। তবে তারা মুখ খুলে খুব বেশি কিছু বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। বর্তমান বিভাজিত সমাজে তারা সত্য বলতে অপারগ।
এসব সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীর মধ্যে যারা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বিশিষ্ট বলে গণ্য তারা হলেন অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ খ্যাতিমান ব্যক্তি হলেন অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞানেরই একটি অংশ। দেশে বিজ্ঞানের অন্য কোনো শাখার তেমন কোনো গবেষণা কার্যক্রম না থাকায় সমাজবিজ্ঞানীরাই আমাদের সমাজে আপাতত আধিপত্য বিস্তার করে আছেন। সাধারণত সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যে ধারা-প্রবাহের সৃষ্টি হয় সেগুলোর বাস্তবধর্মী বিশেষণ করেন ও নতুন বাস্তবতার সৃষ্টিধর্মী শক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন। সমাজের মানুষের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে এসব বিশেষণ অতীব জরুরি। তবে বিশেষণ যদি মানুষের কাছে অবাস্তব মনে হয় তখন তাদের মনে সংশয় বেড়ে যায়।
অবশ্য ভিন্নমতাবলম্বী গুটিকয়েক বিশ্লেষক যতটুকু সম্ভব লেখালেখি করে দেশের সমাজ ও অর্থনীতির বর্তমান দুরূহ অবস্থার সংবাদ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দুঃখের বিষয় হলোÑ তাদের সংখ্যা খুবই কম এবং তাদের দুঃসংবাদের ভাষা হলো বিমূর্ত। এই দুর্বোধ্য ভাষা আমজনতার পক্ষে বোঝা খুবই মুশকিল। বহু চেষ্টা করেও আমরা এসব বিশ্লেষণের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র বুঝতে পারি।
আমরা যারা সাধারণ লোক তাদের জীবন বাঁচাতে বা জীবন-মান ধরে রাখতে অর্থনীতির দৈনন্দিন চর্চা করতে হয়। বলতে গেলে সবাই আমরা অর্থনীতির দৈনন্দিন চর্চাকারী। তবে ব্যবসায়ীদের অন্যদের চেয়ে অর্থনীতি একটু বেশি বুঝতে হয়। এর দুটো কারণ। প্রথম তাদেরকে লাভ-লোকসান কী তা অবশ্যই বুঝতে হয়। দ্বিতীয়ত, এটা বুঝতে হলে অর্থনীতির কিয়দাংশ বোঝা তাদের জন্য অনেকটা আবশ্যিক। আর যদি ব্যবসায়ীরা তা না বোঝেন তাহলে তার ফলাফল হবে : ক. নিশ্চিত ঋণখেলাপি অথবা দেশের বুদ্ধিজীবীদের বিচারে ‘বিখ্যাত চোর, মুনাফাখোর, অতিলোভী অথবা দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারীর পদবি নিয়ে বেঁচে থাকা; খ. বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকদের টক শোতে বিচারের কাঠগড়ায় সদা-সর্বদা আসামি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা। তবে যারা টুকটাক বায়োবীয় ব্যবসায় নিয়োজিত তাদের অর্থনীতি না বুঝলেও কোনো অসুবিধে নেই। তারা যেটা ভালো বোঝেন সেটা হলো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে ব্যবসার নাম করে জনগণের সম্পদ চুরির মাধ্যমে অনৈতিক আয় বা লাভ। তাদের কোনো লোকসান নেই। তাদের ব্যবসা মানেই হলো লাভÑ মানে দেশের সম্পদ লুটপাট করে ক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিদের সাথে ভাগাভাগি করা। তাদের জন্য দেশে কোনো আইন প্রযোজ্য নয়। ব্যাংক থেকে জনগণের টাকা লুটেরাদের প্রতি একই বাক্য প্রযোজ্য।
অনেকটা চিৎকার করেই বলতে ইচ্ছে করে, বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ ও টুকটাক ব্যবসায়ীদের যে অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে ও তাদের অপরিণামদর্শী কার্যধারার পরিণতিতে বর্তমানে দেশের যে অর্থনৈতিক দুরবস্থা তার প্রধান কারণ হলো সরকারসমর্থক বুদ্ধিজীবীদের ক্রমাগত অনৈতিক সমর্থন। এ রকম চলতে থাকলে হয়তো অচিরেই বেশির ভাগ প্রকৃত ব্যবসায়ী খেলাপি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে, অথবা ব্যবসা ছেড়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হবে।
সমস্যা হলো এই, আমার মতো ব্যবসায়ীদের অনেকেই অর্থনীতির তত্ত্বকথা তেমন বোঝে না। কেননা অর্থনীতিবিদদের ভাষা সবসময় বিমূর্ত, অধরা ও তাত্ত্বিক। তাই আমাদের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। তবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা এক দিকে অর্থনীতিবিদরা স্বাভাবিক নিয়মে ভদ্র-নম্র, আর অন্য দিকে অর্থনীতির দৈনন্দিন চর্চাকারীরা অর্থাৎ ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া মানুষ যৌক্তিকভাবেই অর্থনীতিতে অনভিজ্ঞ।
ব্যক্তিগতভাবে অর্থনীতিবিদ ছাড়াও বাংলাদেশে বেশ কিছু মর্যাদাবান, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমরা তাদেরকে ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ বা ‘জ্ঞানকেন্দ্র’ হিসেবে বিবেচনা করি। এসব কেন্দ্র বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা সভা, সেমিনার করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে কিছু কিছু সংবাদপত্র যেগুলোর কান্ডারিরা আবার বুদ্ধিজীবী খেতাবপ্রাপ্ত সম্পাদক। এসব সেমিনারে দেশের সব খ্যাতিমান ব্যক্তিরা সবসময় দাওয়াত পান না। মুষ্টিমেয় কিছু খ্যাতিমান ব্যক্তিরা নিত্যনিয়ত এসব সেমিনারে যোগ দেন। তারা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন তবে তাদেরকে সমালোচনা করতে তেমন দেখা যায় না। তারা দেশের অর্থনীতির হালচাল, গতি-প্রকৃতি জানেন ও বোঝেন। কিন্তু খুব একটা উচ্চবাচ্য করেন না। তবে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আমাদের অর্থনীতির ওপর তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনে উষ্মা প্রকাশ করে তখনই এসব প্রতিষ্ঠান সোচ্চার হয়ে ওঠে। এতে বোঝা যায়, আমাদের দেশীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক ও বিদেশী সংস্থাগুলোকে অনুসরণ করতেই বেশি ভালোবাসে। নিজ থেকে এগিয়ে এসে অভিমত ব্যক্ত করতে কেন যেন ইতস্ততাবোধ করেন তারা। অগ্রণী ভূমিকা নিতে ইতস্তত করলেও বিদেশীদের অনুসরণ করতে তারা সিদ্ধহস্ত।
সমাজের সদস্য হিসেবে বিশ্বজুড়েই অর্থনীতিবিদরা খুবই নম্র-ভদ্র। তবে তাদের পরামর্শানুযায়ী কোনো কার্য সম্পাদনের পরও যদি অর্থনীতিতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তারপরও তারা প্রায়ই দাবি করেন, অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল দশা সে জন্য তারা দায়ী নন; তারা কেবল দুঃসংবাদের বার্তাবাহক মাত্র। অর্থনীতির দুরবস্থার জন্য কোনোরকম দায়িত্ব নিতে ইতস্তত করলেও বাজারব্যবস্থা, উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠান ও বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের ভুলগুলো চিহ্নিত করে জনগণকে জানানোর ব্যাপারে তারা খুবই পারদর্শী। অতি দ্রুত তারা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন যে, ব্যবসায়ীরা স্বার্থপর। তারা দৈনন্দিন লেনদেনে অর্থনীতির মাপকাঠি অনুযায়ী বাজার আদর্শের নীতিগুলো ঠিকমতো বাস্তবে প্রয়োগ করেন না। মেধা ও বুদ্ধির মারপ্যাঁচে কথা বলাই তাদের পেশা।
প্রায়ই অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, ব্যবসায়ীরা নীতিহীন, অতিলোভী ও মুনাফাখোর। তারা সদা-সর্বদা ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেন; তারা ব্যাংকের টাকা নিয়ে তা অবৈধভাবে অন্য খাতে ব্যবহার করেন। সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও অসমতার জন্য ব্যবসায়ীরাই দায়ী। তবে সরকারের নীতির গলদ কোথায়, সমাজের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কী, এসব বিষয়ে তারা তেমন কিছু বলেন না। ব্যবসায়ী নামধারী লুটেরাদের সাথে অসাধু লুটেরা রাজনীতিকদের অবৈধ আঁতাত ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে তারা তেমন উৎসাহী হন না। যেমন সরকারের কোনো কোনো নীতি আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি করছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ওই সব দিকে দৃষ্টি দিলেও পরে মুখ ফিরিয়ে নেন। যদি কদাচিৎ কিছু বললেও সঠিক সময়ে সঠিক কথাগুলো বলেন না। যখন বলেন, ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী ও প্রবীণ অর্থনীতিবিদ দাবি করে থাকেন, উৎপাদনে দক্ষতা ও মুনাফা বাড়ানোর জন্য উৎপাদক শ্রেণী (পুঁজি বিনিয়োগকারী) যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে তার মধ্যেই সমাজের অশুভ পরিণাম নিহিত রয়েছে। এ কারণেই সমাজে অন্যায়, অসমতা ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়ে যায়। এক কথায় ব্যবসায়ীরা অনৈতিক কাজে লিপ্ত।
অর্থনীতি : নৈতিকতা ও জনপ্রিয়তা
’২০ শতকের প্রখ্যাত দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ এফ এ হায়েক (১৮৯৯-১৯৯২) তার শ্রোতা-পাঠক তরুণ অর্থনীতিবিদদের এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অর্থনীতিতে ‘কোনো যুক্তিতর্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে হয়তো বা তোমরা অনিবার্যভাবেই সমাজে অপ্রিয় হয়ে পড়বে ও জনপ্রিয়তা হারাবে। তার পরও যুক্তিতর্কের ব্যাপারে জনগণ কী বলে, আর জনপ্রিয়তা বাড়বে না কমে যাবেÑ এটা অর্থনীতিবিদদের জন্য কোনো বিশেষ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে কোনো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পূর্ণ প্রয়াসে কারো অনুমোদন বা সহানুভূতির দিকে চেয়ে থাকলে চলবে না। এটাই হলো বিশেষজ্ঞতার নৈতিক মাত্রা, যার ভিত্তিভূমিতে অর্থনীতবিদকে অটল থাকতে হবে এবং থাকা উচিত।’
আমি আশা করি বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সমাজবিদ বা অর্থনীতিবিদ, যাদের ওপর আমাদের এত আস্থা, যাদেরকে আমরা এত সম্মান করিÑ তারা নিশ্চয়ই নির্ভীকচিত্তে ও কোনো তিরস্কারকে ভয় না করে, অথবা কোনো সরকারি পদ পদবি, অনুদান বা পুরস্কারের প্রত্যাশা ছাড়াই দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনীতির বর্তমান হাল-অবস্থার সঠিক তথ্য ও বাস্তবতাকে জনগণের সামনে তুলে ধরবেন ও অবহিত করবেন। তবে বার্তাটি বিরাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে নিরেট সত্যটিকেই তুলে ধরবে এবং তা হতে হবে সহজ-সরল ভাষায়, যাতে করে সাধারণ মানুষ তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। কারণ এ মুহূর্তে জনগণ জানতে, বুঝতে এবং আশ্বস্ত হতে চায় যে, সরকার বর্তমানে যেসব নীতি অনুসরণ করছে তা আমাদের দেশকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে।
আমি অর্থনীতিবিদদের ‘সোজাসাপটা বার্তাবাহক’ নামে অভিহিত করে আদৌ খাটো করার কোনো চেষ্টা করিনি। এটা অবশ্যই আমার অভিপ্রায় নয়। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই আজ দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক এবং বিভিন্ন সরকারি কমিটির প্রধান বা সদস্য পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তারা নানা মূল্যবান সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ও সরকারকে সুপারিশ করেন। আর এসব সুপারিশ সরকার বাস্তবায়ন করে থাকেন। তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে অর্থনীতিবিদরা কেবল একজন ‘বার্তাবাহক’ এটি কল্পনা করাও কঠিন। আমাদের অর্থনীতিকে এ পর্যন্ত এগিয়ে আনতে এবং সমাজের বর্তমান আকার-আঙ্গিক গড়ার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের অবদান অনস্বীকার্য। অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে আসীন রয়েছেন। তাই তাদের ভূমিকা, বিশেষত দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক আবর্তন-বিবর্তনের এ মুহূর্তে একান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতির দৈনন্দিন চর্চাকারী
মুদ্রণ ও ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ও তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সাধারণ নাগরিকরা বর্তমানে অনবরত ও যথেষ্ট পরিমাণে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান পেয়ে থাকেন। তা ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অর্থনৈতিক বিবরণী দিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ধরনের তথ্যাদির বিচার-বিশ্লেষণ যেমন সম্ভব নয়, তেমন এগুলোর সত্যতা যাচাই করাও সম্ভব নয়। কেননা তথ্যগুলো থাকে অবোধ্য ভাষায়। যেমনÑ ‘সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে’, ‘সামষ্টিক অর্থনীতিতে নিবিড় তদারকির অভাব’, ‘অর্থনীতিতে কোনো আশার আলো নেই’, ‘অর্থনীতি চাপের মুখে’। চাপ কোথা থেকে আসছে? কেন এই চাপ? সামষ্টিক অর্থনীতিই বা কী? আমার মতো লোকের পক্ষে তাদের দুর্বোধ্য জটিল ভাষার অন্তর্নিহিত বক্তব্য বোঝা মুশকিল। কেননা, এগুলো সাধারণত অস্পষ্ট, অনেক সময় আবার বিভ্রান্তিকর। অর্থনীতির তাত্ত্বিক বিচারে সাধারণ নিয়মেই সাধারণ জনগণ যুক্তিসঙ্গতভাবেই অজ্ঞ ও অপারগ। তারপরও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, ব্যবস্থাপনায় কোনো দোষত্রুটি আছে কি না, কে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে, তাদের চিন্তাধারা, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের মধ্যে কোনো পারস্পরিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে কি না বা তাদের পরস্পরবিরোধী কার্যক্রমে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি নাÑ এগুলো এক দিকে যেমন আমরা বুঝতে চাই, আবার অন্য দিকে এগুলো বুঝতে পারা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ওঠানামার টানাপড়েন কেবল বিনিয়োগ ও লাভ-লোকসানকে অস্থিতিশীল করতে পারে এমন নয়, বরং সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক জীবনকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
দেশে অর্থনৈতিক মন্দা ব্যক্তিপর্যায়ে একজন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে ও করে। যেমনÑ রফতানি কমে গেলে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে শ্রমিক চাকরি হারাবে। বাণিজ্যিক ভারসাম্যে ঘাটতি বাড়বে। টাকার মূল্য কমে যাবে। আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। অবমূল্যায়ন ও শুল্কের প্রভাবে বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দেশীয় পণ্যের উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্য বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে। বাজারে বিক্রি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাবে। তাতে এক দিকে অর্থনৈতিক মন্দাভাব দেখা দেবে অন্য দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবাই। তাই কেবলমাত্র বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার বেলায় কিংবা ভবিষ্যতের মুনাফা বা লোকসান প্রক্ষেপণ করার বেলায় নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও এসব তথ্য জানা ও বোঝা একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যারা সাধারণ জনগণ তারা অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো ঠিকমতো না বুঝলেও অর্থনীতিবিদরা কিন্তু সহজে বোঝেন। এ বিষয়ে তাদের দক্ষতা ও পারদর্শিতা রয়েছে। তারা অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্বগুলোকে বিশ্লেষণ করে ওই তত্ত্বের পেছনে নীতিমালার কার্যকারিতা সম্পর্কে মতামত দিতে পারেন। তাই এ ব্যাপারে জনগণকে সহজ-সরল ভাষায় অবহিত করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা সবসময় আশা করিÑ সমাজবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী বা অর্থনীতিবিদ, যেই হোক না কেন, তারা কখনো ক্ষতিকর সরকারি নীতিকে সমর্থন দেবেন না। সরকারের ভ্রান্ত ও রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাবিত সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থন দিয়ে দেশের আর্থসামাজিক নিরাপত্তাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে না দেন। এটা যদি করেন তাহলে এ দেশের কৃষক, গরিব ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে। তারা বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা আরো বেড়ে যাবে। একই সাথে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান কমে যাবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুরো দেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
অর্থনীতির চর্চাকারী ও সিদ্ধান্ত প্রণেতা
অর্থনীতি একটি সমাজিক বিজ্ঞান। এটি বিরল সম্পদের (ংপধৎপব ৎবংড়ঁৎপব) বিলিবণ্টন ও বরাদ্দ নিয়ে চর্চা করে। অর্থনীতি এক দিকে উৎপাদন, পণ্যসামগ্রী, সেবা, ভোগ ও সম্পদের বণ্টন ও অন্য দিকে এসবের ব্যবস্থাপনা ও প্রভাব-প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে। অতএব, সাধারণ মানুষ বা ভোক্তা হিসেবে আমাদের সবার জানা উচিত যে, যারা এসব কার্য সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন ও সিদ্ধান্ত নেন তারা কারা? তাদের সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার পদ্ধতি ও কারণগুলো কী? ওই সব সিদ্ধান্তের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই সচেতন ও অবহিত হতে হবে। কেননা তাদের সিদ্ধান্তগুলো অর্থনীতির স্রোতধারা, গতিপথ, দিকনির্দেশনা ও গতিবিধিকে প্রভাবিত করে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আর্থসামাজিক মঙ্গলামঙ্গল নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণেই একদিকে সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও নীতির খবরাখবর রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব-প্রক্রিয়া ও গতিবিধি নিরীক্ষণ করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব প্রক্রিয়া, নীতি ও প্রভাব আমাদের পক্ষে বুঝে ওঠা মুশকিল। অর্থনীতিবিদরাই সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতির শক্তিশালী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সৎভাবে বিচার-বিবেচনা করার জ্ঞানের যোগ্য দাবিদার। তাই এসব বিষয়ে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারেন। কেননা সরকার যদি ভুল নীতি অবলম্বন করে এবং তার ফলে যদি অর্থনীতি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়, তাহলে ওই সব পরামর্শ একপর্যায়ে মানুষের দাবিতে পরিণত হয়ে শক্তি ও গতি সঞ্চার করে তীব্র হয়ে উঠতে পারে এবং তার প্রবল চাপে রাজনীতিক ও যারা অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন তারা ভ্রান্তনীতির পরিচালনা থেকে দূরে সরে এসে যথাযথ নীতি অনুসরণে বাধ্য হবেন। এতদ সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা পেছনে পড়ে থাকেন। এসব ব্যাপারে তারা দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে আসেন না। এর কারণ হতে পারে, তারা খুব বেশি রকমের নম্র-ভদ্র অথবা তারা সরকারের অনুগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা হারাতে চান না।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ প্রায় সমুপস্থিত, যখন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে বলা উচিতÑ কেন দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কেন সরকারকে প্রায়ই গ্যাস ও তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে? কেন দিন দিন ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। সরকারকে কেন প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে? ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট কেন? বিদেশী ঋণ ও মঞ্জুরির অর্থের ছাড় দিন দিন কমে যাচ্ছে কেন? আমাদের দেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা যদি সহজ-সরল ভাষায় দেশবাসীকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলতেন তাহলে আমরা সাধারণ মানুষরা যেমন উপকৃত হতাম তেমনি উপকৃত হতো দেশও। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি সিদ্ধান্তই যথানিয়মে নেয়া হয় সমসাময়িককালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার-বিবেচনা করে। তবে সিদ্ধান্ত নেন যথারীতি রাজনীতিবিদরা। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার বা অপব্যবহার ও রাজনীতিবিদদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে অনুগ্রহকারীরা যখন সন্ত্রাসী কার্যক্রমকেও ব্যবসাতে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টা চালায় তখন সমাজের আর্থসামাজিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সামাজিক মূলধনের সঞ্চয় কমে যায়। কমতে কমতে বিলুপ্তি ঘটে। মনে রাখা ভালো, সামাজিক মূলধনের ঘাটতি দেখা দিলে আর্থিক মূলধনের বিনিয়োগ বাধাপ্রাপ্ত হয়Ñ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ উভয়ই কমে যায় এবং আর্থসামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তেমনটাই এখন আমাদের সামনে দৃশ্যমান। হ
লেখক : সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই
