[পঞ্চম কিস্তি ]
ছন্দ নিয়ে কথা
কেসহিস্ট্রি। এক.
আমি আন্ধাকানা। আমার মাত্রাজ্ঞান নেই। তাই তাল কাটে। কখনো ধরতে পারি, কখনো পারি না। বহু ছন্দ-মাত্রার বই পড়েছি। নূ.হু স্যারের কাছে কোর্স করেছি। রা..এর হেল্প নিয়েছি। কিন্তু মাথায় স্থায়ী হয়নি ছন্দ। আপনার মতো কবির কাছে ছন্দ নিয়ে চমৎকার বর্ণনা শুনলে আরো কুঁকড়ে যাই। তবে আমার খুব জিদ, একে আয়ত্ত করার।..
কেসহিস্ট্রি। দুই.
দাদা, ছন্দ নিয়ে যতই ভেবেছি, ততই আমি কবিতা ভুলে গেছি। এ বড় ফালতু ও জটিল বিষয়। আগে অনেক লিখেছি, ছাপা হয়েছেও এন্তার। কিন্তু ছন্দ সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে চর্চা করতে গিয়ে শেষ হয়ে গেছি। আমাকে শেষ করে দিয়েছে প্রবোধচন্দ্র সেন, অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়, রাখালরাজ রায়, তারাপদ ভট্টাচার্য, আনন্দমোহন বসু, নীলরতন সেন...। আর রবীন্দ্রনাথ যে কী সব ছবক দিয়েছেন আমার মাথা আরো নষ্ট হয়ে গেছে। আগে লিখতাম ছড়াটড়া, ছন্দ-মিলের কবিতা। খুব মজা পেতাম। ছাপা হতো। কেউ বলত না যে তোমার ছন্দ হয় না। তো চর্চা করতে গিয়ে ভুলে গেলাম। মনে হতে লাগল, ছন্দ না জেনে ওসব লেখা উচিত না। হাতুড়ে ডাক্তারের মতো হাল হবে। শেষমেশ আবলতাবল হয়ে যাবে। তবে, এখন আমি কবি, কবিতা লিখি। আধুনিক কবিতা। গদ্যকবিতা। মনে আসলেই হয়। ছন্দকে বাদ দিয়ে শব্দ নিয়ে খেলি। ছাপা হয়, টেলিভিশনে পড়ি। লোকে জানে আমি কবি। হ্যাঁ, ওই সব ছন্দ-বাগীশ কিন্তু আমার উপকারই করেছে। আমাকে আসল কবি বানিয়ে দিয়েছে। ছড়া-পদ্য যারা লেখে তাদে চেয়ে আধুনিক কবির কদর বেশি। তবে ভাই, আপনি আপনার পত্রিকার জন্য যে কবিতা চাচ্ছেন, তা লিখতে গেলে আবার ছন্দের দরকার। ওসব ছোটোদের কবিতা। ভেজাল বেশি। আমি ওই ভেজালে আর জড়াতে চাই না। আমারে মাফ করেন...।
হ্যাঁ, উপরের কথাগুলো দুজন লেখকের। প্রথমজন গল্প লেখেন। দ্বিতীয়জন অবশ্য কবি। আধুনিক কবিতা লেখেন। প্রথমজন নারী। তিনি আগে ছড়া-কবিতা লিখতেন। ছন্দ শিখতে গিয়ে ছড়া-পদ্য লেখা ঝক্কি ভেবে সরে এসেছেন ও-পথ থেকে। এখন গদ্য এন্তার লিখছেন। তবে ছন্দ নিয়ে তিনি ভাবছেনও বেশ। এটা তিনি রপ্ত করে ছাড়বেনই। সম্প্রতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এ-লেখাটি ছাপা হতে দেখে তিনি আমাকে তার ছন্দ-আতঙ্কের কথাটা জানালেন। আমি তাকে বলেছি, আপনি যেহেতু এখন ছড়া-পদ্য লেখেন না, সেহেতু এখন ছন্দ রপ্ত করতে সমস্যা নেই। ইচ্ছা করলে ছন্দেও ওপর একটা বইও লিখে ফেলতে পারেন। কারণ, আমাদের বিখ্যাত ছন্দোবাগীশরা ছন্দ নিয়ে বিস্তর ছবক দিয়ে গেলেও একটা কবিতাও লিখে যাননি। বোধহয় তারা কবিতা লিখতে পারতেন না। আপনি ছড়া-পদ্য ছেড়ে গদ্যে অনুপ্রবেশ করে ভালোই করেছেন।
দ্বিতীয়জন কবি। যারা আধুনিক কবিতা লেখেন, তাদের মধ্যে তিনি বেশ জনপ্রিয়। তিনিও একসময় ছন্দোবদ্ধ কবিতা লিখতেন। কিন্তু ছন্দের মারপ্যাঁচে পড়ে ওটা ছেড়ে গদ্যকবিতায় মনোনিবেশ করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। কোনো ছন্দের ধার ধারতে হয় নাএখন। আমি তার কাছে একটি ছড়া বা ছন্দোবদ্ধ কবিতা চেয়েছিলাম আমার কর্মস্থল থেকে প্রকাশিত ছোটদের পত্রিকার জন্য। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। আমি তাকে সাধুবাদ জানিয়েছি, আপনি এখন যা লিখছেন সেটাই ধুমছে লিখে যান। ইনশা আল্লাহ আপনি আরো বড় কবি হয়ে উঠবেন। ছন্দ না জেনে ভালোই করেছেন। আরো বলব, ছন্দাচার্য প্রবোধচন্দ্র সেন, অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়, রাখালরাজ রায়, তারাপদ ভট্টাচার্য, আনন্দমোহন বসু, নীলরতন সেনÑ এরা আপনার মঙ্গলই করেছেন। আপনি ছন্দের অন্ধকার হাতড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন, সেখান থেকে এরা আপনাকে গদ্যের বারান্দায় ঠেলে দিয়েছে। আর সেজন্যই আপনি এখন আমাদের আধুনিক কবিতার একজন বাতিঅলা হতে পেরেছেন।
ছন্দ-জ্ঞান বিনা কাব্য রচে যেই জন...
প্রথমেই বলে নিই সেই কথাটা, অবশ্য, আমি বারবার যে কথাটা বলে থাকি। তা হলো, কবিতা লেখা শুরু করার আগে আমি ছন্দের কথা ভাবব না। ছন্দ জেনে বা লেখার আগে ছন্দ নিয়ে চর্চা করতে গেলে আর কবিতা লেখা হবে না। কারণ, এটা খুব কঠিন মনে হবে। মনে হবে, এটা এক জটিল ব্যাকরণ। অঙ্কভীতু বালক যেমন বীজগণিতকে ভয় পায়, তেমনি তোমার অবস্থা হতে পারে। লিখে যেতে হবে আগে। আমার শিক্ষক আমি তখন। আমার ঠোঁট আর কান আমার শিক্ষক। সে ছড়া-কবিতা লেখার সময় সজাগ থাকলে কোনো ভুলই হবে না। এ কথাটি আমি এ লেখায় বারবার বলেছি, সবাইকেই আমি এ কথাটিই বলি। পরে গিয়ে, যখন আমি অনেক লিখে বেশ পোক্ত হয়ে উঠব, তখন ধীরে ধীরে ছন্দটা জেনে নেবো। কারণ লিখব কবিতা, ছড়া অথচ ছন্দ জানব না, এটা অতি লজ্জার ব্যাপার। আর যখন, প্রাচীন কবি বলেন-
‘ ছন্দ-জ্ঞান বিনা কাব্য রচে যেই জনÑ
পণ্ডিত সভায় সেই লজ্জার কারণ।’
তখন এই ছন্দ ব্যাপারটা জানব না, এটা হয় না। [চলবে]
