পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হলো ইরাকের মেসোপটমীয় সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। খ্রিষ্টপূর্ব ১০ হাজার বছর আগে সৃষ্ট এই সভ্যতা নবী-রাসূল কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এই সভ্যতা গ্রিক সভ্যতাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে আমার এই রচনা।
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রিসে সক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯-৩৯৯) প্লেটো (খ্রিষ্টপূর্বক বা না। ৪২৭-৩৪৭), এরিস্টটল বর্তমান ছিলেন। মিসরীয় সভ্যতার নবী ছিলেন ইউসুফ আ: ও মুসা আ: সুমেরীয় সভ্যতার নবী ছিলেন হজরত ইব্রাহিম আ:। ওই সময়ে মিসরীয়, সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয়দের প্রজ্ঞা গ্রিক সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। Encyclopedia of world history বলছে :
The Egyptians, the sumerians & the Babylonians were most famous for their wisdom of teaching. Their traditions emerged long before the greeks & the Hebrews of the fifth fourth centuries BcE. (P521).
হজরত ইব্রাহিম আ:-কে ইহুদি সম্প্রদায়ই হিব্রুজাতির জনক বলে। তার পরে মুসা আ: হিব্রু ঐতিহ্যকে সম্প্রসারিত করেন। হিব্রু দার্শনিকরা আল্লাহর একত্ববাদ ও আত্মার অমরত্বের কথা বলেছেন। কিন্তু চিরন্তন নয়; ভাবই চিরন্তনÑ এ কথা তারা বলেছেন। সক্রেটিস ও প্লেটোর মধ্যে আমরা সেই ভাববাদী দর্শনের প্রভাব লক্ষ করি। Hegets lectures on the history of philosophy থেকে উদ্ধৃত করছি :
We find in these jewish philosphers proofs brought forward that God is one that the world was created & that matter is not eternal. (P-36).
গ্রিক মহাকাব্যকার হোমারের (৮৫০ খ্রিষ্টপূর্ব) ইলিয়াড ও ওডিসিকে ইউরোপীয় সাহিত্য ঐতিহ্যের সূচনা ধরা হয়। সক্রেটিসের প্রায় ৩৫০ বছর খ্রিষ্টপূর্বের এ সময়ে তুর্কিসুমেরীয়-ব্যাবিলনীয় সভ্যতা দ্বারা গ্রিক গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। সে জন্য আমি মনে করি হোমারের সাহিত্য দর্শন সৃষ্টি করেছে সুমেরীয় সভ্যতা, কারণ সুমেরীয় মহাকাব্য গিলগামেশ রচিত হয়েছে হোমারের প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে। তা ছাড়া Encyclopedia of world history এর নিচের বক্তব্যেও সুমেরীয় ও এশিয়া মাইনর বা তুর্কির সাথে গ্রিসের জ্ঞানগত যোগাযোগের ঘোষণা দেয়; This was the period when many greeks were moving to Asia Minor & there was an increasing Interest cultvest in the traditions of contact with the region. (P-240).
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯-৩৯৯) দরিদ্র ছিলেন। কিন্তু তার ভাববাদী দর্শন প্রকাশের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। পবিত্র কুরআন থেকে জানতে পারি : নবী-রাসূলগণও তাদের একত্ববাদ প্রচারে কোনো অর্থ নিতেন না। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা বলছে : Bc 400: Socrates: The founder of moral philosophy among the greeks, believes the immortality of soul (Ibid, P-113)। সক্রেটিস প্রচলিত দেবদেবীতে বিশ্বাস করতেন না। এক ও অদ্বিতীয় একজন স্রষ্টাকে মানতেন। তার হেমলক পান; তার ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় শাস্তির কারণে। এটি তার আত্মহত্যা নয়। এই বিচারের ভারও তিনি ঈশ্বর অর্থাৎ এক স্রষ্টার ওপর সমর্পণ করেছেন। সক্রেটিসের শিক্ষক এনাক্সাগোরাস মেসোপটমীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত। সক্রেটিসও আল্লাহর একত্ববাদী তত্ত্ব চিন্তা দর্শনস্নাত তুরস্কের আনাটোলিয়া সূত্রে পেয়েছেন বলে মনে করি। সে হিসেবে বলা যায় : সক্রেটিস নবীও হয়ে থাকতে পারেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ইতিহাসের বস্তুবাদী গবেষক ও রেজিয়াস প্রফেসর জন ব্যাগনেল বিউরি (১৮৬১-১৯২৭) তার A history of freedom of thought এ সক্রেটিস সম্পর্কে যা বলেছেন তা স্মর্তব্য।
সক্রেটিস তার সারা জীবনের কাজকে একধরনের ধর্মীয় অনুসন্ধান বলে বর্ণনা করেন। আমি মান্য করব আপনাদেরকে নয়; বরং ঈশ্বরকে যিনি আমাকে এ কাজে নিযুক্ত করেছেন বলে আমি বিশ্বাস করি এবং যতক্ষণ আমার শ্বাস ও শক্তি আছে আমি কখনো দর্শনের সাথে আমার পেশাগত সম্পর্ক (ধর্মপ্রচার) থেকে নিবৃত্ত হবো না।৩৯ (পৃ. ১৩)।
মাইকেল এইচ হার্ট তার The hundred বইয়ের ৮৬ নম্বর প্রবন্ধে ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯০-৫২৯) প্রবন্ধে মেসোপেটমীয় সভ্যতাকে তদানীন্তন বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অগ্রসর সভ্যতা বলেছেন (ঐ, পৃ. ৩১৫)। গ্রন্থটির ৩৩ নং ‘আলেক জেন্ডার দ্য গ্রেট’ প্রবন্ধে গ্রিসের হেলেস্টিক সভ্যতাকে ‘বেশ জোরালো প্রাচ্যপ্রভাবযুক্ত’ বা ধর্মীয়ভাবে ব্যাপক প্রভাবশীল বলেছেন (ঐ, পৃ. ১২১)। প্রাচ্যপ্রভাব মানে মেসোপটমীয় সভ্যতার আল্লাহর একত্ববাদী দর্শনের প্রভাব।
হিপোক্রেটাসকে গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার জনক বলা হয়। তিনি লিবিয়া ও মিসর সক্রেটিসের যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬৯-৩৯৯) ভ্রমণ করে মিসরীয় সভ্যতা; যা মেসোপটমীয় সভ্যতার সম্প্রসারিত ও অন্তর্ভুক্ত রূপ থেকে অবশ্যই চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য নিয়েছেন। সে জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিপোক্রেটাসের অবদান আসলে মিসরীয় সভ্যতারই অবদান। Encyclopedia of world history বলেছেন :
Hippocrates (460-377 BcE) has been called the father of greek medicine. He traveled Greece & possibly as far as Libya & Egypt.(P238).
গ্রিক দর্শনের সৃষ্টিকারী সভ্যতার নাম মেসোপটমীয়-ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। এশিয়া মাইনর বা তুরস্কের মাইলেটাস এ সভ্যতার অন্তর্গত ছিল। সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিক থেলিস, এনাক্সিমিন্ডার ও এনাক্সিমিনাস এখানকার অধিবাসী ছিলেন। গ্রিক দর্শনের উৎপত্তি গ্রিসে নয়; তুরস্কের মাইলেটাসে। সুমেরীয়-ব্যাবিলনীয় সভ্যতাই রোমান সভ্যতাকে সৃষ্টি করেছে। রোমান নবী ছিলেন আইয়ুব আ: খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০-১৫০০ সালে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অর্থাৎ ৫০০ সালে অর্থাৎ সক্রেটিসের পূর্বে দক্ষিণ ইতালির ইলিয়া নামক দ্বীপটি ছিল প্রাচীন গ্রিক দর্শন চর্চার কেন্দ্র। এখানে বাস করতেন দার্শনিক জেনোফেন্স, পারমিনাইডিস, জেনো ও মিলিসাস। তাদের দর্শন ছিল : সৃষ্টির মূল সত্তা অপরিবর্তনীয়। মেসোপটমীয়-ব্যাবিলনীয় সভ্যতার সাথে ইতালির বাণিজ্য যোগাযোগ থাকায় বলা যায়, আল্লাহর একত্ববাদী দর্শন তারা সুমেরীয় সভ্যতা থেকেই লাভ করেছে। পরবর্তীকালে সক্রেটিসের একত্ববাদিতা তার শিষ্য দার্শনিক প্লেটোকেও ভাববাদী একত্ববাদী দার্শনিক করেছে।
গ্রিক সভ্যতা ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে দিন যে ২৪ ঘণ্টায় হয়, সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান আহরণ করেছে। এ কথা ইতিহাসের জনক গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস বলেছেন। ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় ইদ্রিস আ: খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ সালে জ্যোতির্বিদ্যা। ও অঙ্কশাস্ত্রের ব্যাপারে তাদের দীক্ষিত করেছেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘সিরাত বিশ্বকোষ’ থেকে আমরা জেনেছি যে, জ্যোতির্বিদ্যা ও অঙ্কশাস্ত্রের জ্ঞান খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০-৩৫০০ সময়পূর্বে তাকে আল্লাহ মোজেজা হিসেবে দিয়েছেন। সভ্যতাকে অগ্রগামী করার জন্য জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে দিন-মাস-বছর গণনার জন্যই সভ্যতার সূত্রপাতের সময় মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাকে এই জ্ঞান দিয়েছেন। মিসরেও ইদ্রিস আ: (Enoch) গমন করেছেন। সেখানেও তিনি গণিত ও জ্যোতিশাস্ত্র শিক্ষা দিয়েছেন। সে জন্য হেরোডোটাস যে বলেছে, ১২ ঘণ্টা সম্পর্কিত জ্ঞান গ্রিকরা জেনেছে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে তা ঠিকই বলেছেন। Encyclopedia Britannica বলছে :
According to Herodotus, the greeks received the knowledge of the twelve hours of the day from the Babylonians. (P-101).
গ্রিক ইতিহাসবিদ হিরোডোটাস কিন্তু গ্রিসে জন্মেননি। তিনি মেসোপটমীয় সভ্যতার অন্তর্গত তুর্কির হালিকারনাসস, যা বর্তমানে তুরস্কের বদরুমে অবস্থিত সেখানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবিলন, ফোনেশিয়া বা লেবানন, মিশর, দক্ষিণ রাশিয়া খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৩ সালে ভ্রমণ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়, বিশ্ব ইতিহাসের জনক হিরোডোটাস আদম-শীশ-ইদ্রিস-নূহ-ইব্রাহিম-মুসা-দাউদ ও সুলাইমান আ: প্রতিষ্ঠিত মেসোপটমীয়-সুমেরীয়-মিসরীয় সভ্যতা থেকে জ্ঞান নিয়ে তিনি তার ইতিহাসের দর্শনকে বিবৃত করেছেন। এ প্রসঙ্গে Encyclopedia of world history ঘোষণা করেছে :
Herodotus visited Babylon, Phoenicia, Egypt, southern Russia & Athens Setteling in the Athenian colony of Thurii in southern Italy in 443 ( P-23 2)