মুক্তিযুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করা হলো মোল্লা জালাল ও আমাকে। জুলাইতে গিয়ে নভেম্বরে আমি ফিরে এলাম প্যারিসে যাবো বলে। মুজিব নগরে ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযোদ্ধা চট্টগ্রামের চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডা: আবু জাফরের সাথে সাক্ষাৎ। তিনি আমাকে বললেন, ‘মামা, আপনাকে কেন পাঠানো হয়েছিল জানেন? আমি বললাম আমার ফরাশি ভাষার জ্ঞান আর ফ্রান্সের অভিজ্ঞতার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম বলেই তো জানি। তিনি একগাল হেসে বললেন, ‘না, শুধু তা নয়। একে তো আছেন ‘মোল্লা’ তার সাথে একজন ‘কোরেশী’। মুসলমানিত্বের জন্য এর থেকে আর বড় প্রমাণ কী হতে পারে যে, পূর্ব পাকিস্তানে যে আমরা হিন্দু প্রভাবিত নই।...।’ এবার আমার অট্টহাসির পালা। এতকাল এ কথাটা তো ভেবে দেখিনি।
মুক্তিযুদ্ধের মিশনে আমাদের এই অভিযাত্রা খুব একটা প্রচার পায়নি। তবু দিল্লিতে আমাদের প্রথম পক্ষাবলম্বনকারী যে কূটনীতিক পরে আত্মকাহিনী লিখেছেন, তাতে কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলেও আমি সেখান থেকে একটু উদ্ধৃতি দেবো।
Special Envoys abroad
A third delegation consisting of Mollah Jalaluddin MNA and Dr. Mahamud Shah Qureshi, French educated scholar from Chittagong, was sent to Beirut, Cairo and Aden to lobby support in the Middle East in Beirut, Mullah Jalaluddin met with Journalists and middle ranking Lebanese leaders and succeeded in Obtaining government permission to open a small office there, He received valuable annistance from Quresh as will as Nabil Baradi a local palest Cobinian journalist. Nabil was a member of the Bangladesh embassy Statt in Beirut when I joinct Hat office in 1975 and would become a very close family friend (K M Shehabuddin, There and Back again A Diplomat's Tale, UPL, 2006 AP 151)
উদ্ধৃতির শেষপর্যায়ে শাহাবুদ্দিন সাহেব যে ফিলিস্তিনি আরব সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করেছেন তার সম্পর্কে আমি কিছু বলব। তিনি হলেন নাবিল বারাদি। ৩০-৮-১৯৭১ ইং তারিখে লেবানিজ পার্লামেন্টে মোল্লা জালাল ও আমি একটা মেমোরেন্ডাম দাখিল করে বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন শেষে বেরিয়ে আসার পথে আমরা এই নাবিল বারাদির হাতে বন্দী হলাম। তিনি সুকৌশলে অন্যান্য সাংবাদিকদের কবল থেকে আমাদের উদ্ধার করে তাঁর অফিসে নিয়ে এলেন। সেটা আল ইয়োলু পত্রিকার সম্পাদক আমাদের বন্ধু ওয়াফিক তিব্বির অফিসও বটে। পার্লামেন্টের ফরেন রিলেশন কমিশনের সব আমাদের বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে, মেমোরেন্ডামের একটা কপি রেখে, নতুন করে আমাদের ফটো তুলে বিদায় দিলেন। কিন্তু এরপর থেকে তার সাথে আমাদের সম্পর্ক চিরস্থায়ী হলো। এরপর ৪-৯-৭১ ইং তারিখে নাবিলের সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি ওর কথাবার্তায় কিছু হালকা চরিত্রের আভাস পেয়ে আমার ডায়েরিতে একটু বিরূপ মন্তব্য লিখেছিলাম। তবে মনে হয়েছিল কাজের লোক নাবিল। তিব্বিও তাই বলেছিলেন। ২৬-৯-৭০ ইং তারিখে আমার ‘সাফারিং হিউম্যানিটি ইন বাংলাদেশ’ রচনা লেখা হয়েছিল যা পুস্তিকাকারে আরব দেশগুলোতে বিলি করা হবে। নাবিল অনুবাদ করবেন। তিনি লেখাটির প্রশংসা করলেন। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এ কে দার ও জালাল ভাই কিছু সংশোধনী দিলেন।
অক্টোবরের শুরুতে মাসিক ৫০০ পাউন্ড সম্মানীতে নাবিলকে নিয়োগ দেয়া হলো। ওর কাছ থেকে জানলাম, নাবিল মানে হলো Noble, তার নতুন বাসায় খুব যতœ করে আমার বিদায়ে একটা ডিনার দিলেন, তার বান্ধবী হলো পাকা গিন্নির মতো সব কাজ করলেন।
এরপর ডিসেম্বরের ২ তারিখ আমার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করল। তখন ডাকনাম পূষণ ও আসল নাম নাবিল শাহ কোরেশী রাখা হলো।
বিগত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে আশ্চর্যজনকভাবে পুরনো কিছু কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে নাবিল বারাদির অনুবাদ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের একমাত্র প্রচারÑ প্রবন্ধ ও দু’টি চিঠি খুঁজে পেলাম। প্রথম চিঠি ২৩.৪.৭২ তারিখের। তাতে নাবিল আমার চিঠির জবাবে লিখছেন, ‘আপনার চলে যাবার পর আমি মি. জালালউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ভীষণভাবে কাজে ব্যস্ত ছিলাম যার ফলে আমার দুটো কাজ বাদ দিতে হয়েছিল।
Any how I am still loyal to the case I tought for, I’ll never forget my two brothers Jallaluddin and Mahmoud Shamsul Kadir (My fake nume) you did a lot to your country and you succeeded Alhamdulillah.
‘কিন্তু জানেন, আমির্ খুবই দুঃখভারাক্রান্ত। কারণ আমার সঙ্গে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা ছিল তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে আর আমাকে বের করে দেয়া হয়েছে। এটা কি আমি আরব বলে? বাংলাদেশ সরকার আরব দেশগুলোর প্রতি বিরক্ত থাকলেও আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করা তো ঠিক হয়নি। যা হোক, আমি সব সময় যে পক্ষে যুদ্ধ করেছি তার দিকেই থাকবো। আপনার যাবার পর মি. আহম্মেদ আর আমি কতো সভায় বক্তৃতা করেছি। এখনো আমার অফিসে শেখ মুজিবের ছবি শোভা পাচ্ছে। অতঃপর ব্যক্তিগতভাবে আমার স্ত্রী ও নবজাত নাবিল শাহর প্রতি প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে পত্র শেষ করেছেন নাবিল।
১৪-৬-১৯৭২ তারিখে নাবিল বারাদি আমাকে লিখছেন ‘পাকিস্তান দূতাবাস তখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা কিছু আমাদের কাগজে লিখছে। তারা বিশেষভাবে জোর দেয় যে, বাংলাদেশ এখন ভারতের কলোনি আর বাংলাদেশের মুসলমানরা সরকারের বিরুদ্ধে। শেখ মুজিব একজন পুরনো ফ্যাশনের নেতার মতো আচরণ করছেন। কেউ এসব পাকিস্তানি প্রচারের জবাব দেয় না। আমি ছাড়া (সাবেক আরব উপদেষ্টা)। এমনকি আমাদের বন্ধুরাও না। হয়তো আমার জবাবে তারা সন্তুষ্ট। যা হোক, আমি মনে করি, এটা আমার দায়িত্ব কারণ আমি গর্বিত যে আমি একজন বাঙালি। অর্থ সব কিছু নয়। আমি সবচে বেশি দুঃখিত যে, পররাষ্ট্র দফতর আমার চিঠির জবাব দেয় না। আমি সব কিছু লিখতে পারি না। কিন্তু তা বলতে চাই তাহলে এই যে, আমি সব সময় বাংলাদেশের প্রতি অনুগত আছি এবং থাকবো। আমি ‘ডাবল লয়ালটিতে’ বিশ্বাস করি না, যা আমাকে মোল্লা জালাল চলে যাওয়ার পর অনেকে সে রকম করতে বলেছিল। আপনি মি. আজাদকে লিখলে আমি খুশি হবো।’
আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদকে লিখেছিলাম। পরে ঢাকায় এসে দেখা করে বলেও ছিলাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আজাদ সাহেব একবার নিজ থেকে বৈরুতে এসে আমাদের দেখে গিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে চিঠিতে আমার প্রশংসাও করেছিলেন, চিঠিটি তিনি আমাকে দেখিয়েছিলেন।
এরপর যা হবার তাই হয়েছে। অর্থাৎ কিছুই হয়নি। ১৯৭০ এর জুলাইতে আমি প্যারিসে যাবার পথে বিমান বৈরুতে যাত্রাবিরতি করলে নাবিলের সঙ্গে ফোনে সামান্য আলাপ হয়। সময় ছিল না বলে তাঁকে আমি বিমানবন্দরে আসতে মানা করেছিলাম। উল্লেখ্য যে, পূর্বপত্রের সঙ্গে নাবিল বারাদি আমাকে আমার Suffering Humanity in Bangladesh লেখাটা আরবি Al Insanien I ---- zabah it Bangladesh একমাত্র কপিটিও প্রেরণ করেন।
যা হোক, সুখের খবর হলো, বাংলাদেশ সরকারের প্রথম কূটনীতিক প্রধান শাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৭৫ সালে বৈরুতে গেলে তিনি নাবিলকে ইতোমধ্যে দূতাবাসে কর্মরত দেখতে পান। নাবিল অন্তত দুবার সপরিবারে তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। পরে বহুদিন খোঁজখবর নেই। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বিদেশীদের সম্মাননা দিচ্ছেন। দেখে আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখে নাবিল বারাদিকে তার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে অনুরোধ জানিয়ে পত্র দেই। কোনো জবাব নেই। আরো পরে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে অংশগ্রহণরত বৈরুতের এক বিজ্ঞানীকে আমি তার সম্পর্কে অনুসন্ধানের অনুরোধ জানাই। শুনি, তিনি আর পৃথিবীতে নেই। আজ সশ্রদ্ধচিত্তে আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এই আরব সহযোদ্ধাকে স্মরণ করি। হ