গয়ার বা সাপপাখি
সাপের মতো লম্বা গলা আর ধারালো ঠোঁটের জন্য বিখ্যাত একটি পাখির নাম সাপপাখি। এই পাখিটি বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে এখনো অল্পবিস্তর টিকে আছে। পানকৌড়ি প্রজাতির বড় আকারের। দৈর্ঘ্যে তিন ফুট। মাথা এবং গলা বাদামি রঙের, পালকের আগা ফ্যাকাশে কালো। পিঠ কালো। চোখের ওপর দিয়ে থুতনি গলা পর্যন্ত সরু সাদা রেখা। পাখার পালকে রুপালি সাদা দাগ। সাদা-কালোর মিশ্রণে দূর থেকে মনে হয় যেন কালো মখমলের পোশাকের ওপর সাদা জরির-কাজ করা ওড়না পরে আছে এরা। চোখ হলদে, ঠোঁট বাদামি-কালো। নিচের ঠোঁট হলুদ আভাযুক্ত। পা কালো। পায়ের পাতা জোড়া লাগানো। লেজ দেখতে লম্বা বৈঠার মতো।
গভীর ঝিল, বিল, নদীনালাই এদের পছন্দ। সমুদ্রে কখনো যায় না। নদীর মোহনায় ও খাঁড়িতে এদের দেখা যায়। স্বভাবে ও আচরণে পানকৌড়ির সাথে খানিকটা মিল আছে। একই জায়গায় খাদ্য সন্ধান করলেও এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই। পানকৌড়ি ও বকের সাথে মিলেমিশে একত্র বসবাস করতে এরা খুশিই হয়। তবে পানকৌড়িদের মতো দল বেঁধে বাস করে না।
সাপপাখি জলের মধ্যে অতি দ্রুত চলতে পারে। এদের শরীরের গড়ন দ্রুত চলারই উপযোগী। চলার সময় লম্বা গলা সাপের মতো বাঁকিয়ে এদিক-ওদিক চালিয়ে খাদ্য সন্ধান করে। গলা সঞ্চালনের ভঙ্গির জন্যই নাম হয়েছে সাপপাখি। মাছই এদের প্রধান খাদ্য তবে ছোটো জলচর সাপ ও পোকাও ধরে। মাছকে তাড়া করে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে সে জলের ওপর ভেসে ওঠে। তখন মাছটিকে উপরের দিকে ছুড়ে দিয়ে সোজা করে নিয়ে মাথা আগে ধরে গিয়ে ফেলে।
সাপপাখির লম্বা গলা সাধারণ অবস্থায় দেখতে ইংরেজি ঝ অক্ষরের মতো। গলায় অষ্টম ও নবম কশেরুকা হাড়দু’টি এমনভাবে সাজানো যে, ওর বাঁকা গলাটি সোজা করে এগিয়ে দিলেই স্প্রিং-এর কাজ করে আঘাতে শক্তি এনে দেয়।
ভোজন শেষ হলে সাপপাখি গাছে কিংবা কোনো শুকনা জায়গায় পানকৌড়িদের সাথে বসে তাদের মতোই রোদে পাখা মেলে দিয়ে শুকিয়ে নেয়। সাপপাখি ডুবুরি-পাখি; জলের মধ্যে চলার জন্য আছে হাঁসের মতো পাতা জোড়া লাগানো পা; শরীরটি লম্বা ক্ষিপ্রগতিতে ছলার পক্ষে অনুকূল; শিকারের জন্য আছে তীক্ষè বর্শার মতো ঠোঁট; পানি ছেড়ে বাসস্থানে যাওয়ার জন্য আছে পাখা। পানি থেকে ওঠার সময় কয়েকবার পাখার ঝাপটা দিয়ে শূন্যে উঠতে হয়।
সপপাখিরা ডিম পাড়ে বর্ষাকালে। পানকৌড়িদের মতোই এদের বাসা তৈরিতে পরিপাট্য নেই। শুকনা ডালের টুকরা ও কাঠিকুটি দিয়ে গাছের ডালে কোনোরকমে ডিম পাড়ার স্থান করে নেয়। পানকৌড়ির মতো এরা অন্য পাখিদের সাথে একই গাছে বাসা বাঁধে। লম্বাটে সবুজ আভাযুক্ত নীল ডিমগুলোতে চকের মতো গুড়া মাখানো থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার আগ দিয়ে এগুলো বাদামি রঙের হয়ে যায়।
