চখাচখী

বাংলাদেশের মানুষ চখাচখীকে পরিযায়ী পাখি হিসেবে জানে। উপমহাদেশের একান্ত নিজস্ব এই পাখি শীতকালে লোকালয়ের আশপাশে চলে আসে। পুরুষটির নাম চখা, মেয়েটির নাম চখী। দুয়ে মিলে চখাচখী। লম্বায় ২৬ ইঞ্চি, দেখতে আমাদের পোষা হাঁসের মতো, পার্থক্য রঙ ও কণ্ঠস্বরে। পুরুষের মাথা ও গলা বাদামি, শরীরের অন্য অংশের রঙ কমলা রঙের। গলায় আছে একটি কালো দাগ। পাখার পালকগুলো ফ্যাকাশে সাদা, আগার দিকে কালচে ও উজ্জ্বল চকচকে সবুজ। লেজের আগার পালক কালো। তলপেট বাদামি, পাখার গোড়ার দিকের পালক সাদা। স্ত্রী পাখিটির রঙ সবটাই ফ্যাকাশে বাদামি; গলায় পুরুষটির মতো কালো দাগটি নেই। চোখের মনি বাদামি। পা ও ঠোঁট কালো, গড়ন অনেকটা রাজহাঁসের মতো কিন্তু ঠোঁট পাতিহাঁসের মতো চ্যাপ্টা।
চখার স্বাভাবিক বাসস্থান এশিয়ার মধ্য ও উত্তর অঞ্চল। বালিহাঁস, সরাল প্রভৃতি বুনো হাঁসের দল বিলঝিল ও পুকুর পছন্দ করে। চখাচখীর পছন্দ নির্মল জলের বিস্তীর্ণ নদী অঞ্চল, যেখানে আছে বালির চর। এখানে জোড়ায়-জোড়ায় ডাঙায় বসে থাকে, সহসা জলে নামতে চায় না। যখন নামে তখন সাঁতার কাটে বেশ দ্রুততায়। সামনের দিকটা জলের মধ্যে অনেকখানি ডুবে থাকে। পেছনটা থাকে উঁচু হয়ে। দিনের বেলায় বেশির ভাগ সময় এরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিশ্রাম করে, খাবার সন্ধান করে। কখনো কখনো ঝিনুক, শামুক, জলজকীট, ছোটো মাছ ও উদ্ভিদ এদের প্রধান খাবার। এরা জলের আশপাশে হেঁটে হেঁটে ঘাস ও অন্যান্য উদ্ভিদ খুঁটে খায়।
দিনের বেলা ফাঁকা চরে বসে থাকলেও এরা অত্যন্ত সজাগ ও হুঁশিয়ার। সামান্য বিপদের সম্ভাবনা বুঝতে পারলেই উড়ে পালায়।
চখাচখী সমভূমি অঞ্চলে বাসা বাঁধে না। এখানে আসে শীত কাটাতে। উত্তর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা যখন বেশি, পানি বরফ হয়ে যায়, তখন এরা স্বচ্ছ ও নির্মল জলাভূমির সন্ধানে দক্ষিণ দিকে চলে আসে। আবার গরম কালে ফিরে যায়। মে-জুন মাসে ওদের গৃহস্থালির সময়। নদী ও হ্রদের কোলঘেঁষে পাহাড়ের ফাটলে ও গর্তে এরা বাসা বানায় সংসার পাতে। নিজের শরীরের ছোটো ছোটো কোমল পালক দিয়ে ডিম রাখার ঘরবানায় তারা। ডিম হয় ৬ থেকে ১০টি। এক দিকে সামান্য সরু, মাখনের মতো সাদা, মসৃণ ও চকচকে সেই ডিম।