শুভ নববর্ষ। ছোট্ট এই বাক্য প্রয়োগে শুরু করা হয় নতুন বছরে পথ চলা। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই খ্রিষ্ট বছরের প্রথম প্রহরে পরস্পর বিনিময় করে শুভেচ্ছা। পেছনের বছরের জমে থাকা সব দুঃখ, সব কষ্টকে ভুলে গিয়ে শুভেচ্ছা আদান-প্রাদানের মাধ্যমে ভালো থাকার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে সবাই। গেল বছর যেভাবে যায় যাক, এ বছরটা যেন ভালোভাবে কাটে; এমন প্রত্যাশা থাকে সবার মনে। কিন্তু বিগত বছরের ভালোমন্দের অভিজ্ঞতা, তিক্ততা, ব্যর্থতা, তৃষ্ণা এ বছরের ভালো থাকাকে যে শঙ্কিত করবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে সেই অভিজ্ঞতা সবাইকে হয়তো সমানভাবে শঙ্কিত না-ও করতে পারে। কেননা গত বছর কেউ হয়তো সুখের আকাশে সপ্তরঙে রঞ্জিত হয়ে ফুরফুরে মেজাজে উথাল-পাতাল ঘুরেছে; নীল আকাশের নিচে প্রজাপতির মতো ডানামেলে উড়েছে। আবার কেউবা নিদারুণ দুঃখে বেদনাবিধুর হয়ে অথৈ সাগরে হাবুডুবু খেয়েছে। অথবা কেউ কেউ সুখে-দুঃখে মিলেমিশে গোটা বছরটাকে পৃষ্ঠদেশে বেঁধে অতিক্রম করেছে। সুখ-দুঃখের এই বিচিত্র রূপ অর্থনীতির ভাষায় যেভাবেই প্রকাশ হোক না কেন, সুখ ও দুঃখকে বেশির ভাগ মানুষ আপেক্ষিক হিসেবেই ভেবে নিয়েছে। অর্থাৎ সুখ ও দুঃখ এক এক জনের অনুভূতিতে এক এক রকমভাবে ধরা পড়েছে। একজন দুঃখের তীব্র বেদনায় মুষড়ে পড়েছে। আবার আর একজন হয়তো সেই একই রকম পরিস্থিতিকে সুখ ভেবে আনন্দে উচ্চস্বরে গান ধরেছে। এমন বিচিত্র সুখ, দুঃখের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের দু’টি চরিত্রে। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে দেখা গেছে, যে অপরাধে ম্যাকবেথ দুঃখে কষ্টে, অনুশোচনায় বিচলিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে; সেই একই অপরাধে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের ভিখু চরিত্র আনন্দে আত্ম-অহঙ্কারে উল্লম্ফ প্রকাশ করেছে। ম্যাকবেথ নাটকে ম্যাকবেথ ছিল জাতীয় বীর, প্রধান সেনাপতি। স্ত্রীর প্ররোচনায় রাজা ডানকানকে হত্যা করার অব্যাহতি পর ম্যাকবেথের মনে অনুশোচনা জন্ম নিয়েছে। বোধোদয় হয়েছে, এ অন্যায়। এ পাপ। এই পাপের কথা ডানকানের প্রেতাত্মা প্রত্যেক রাতে ম্যাকবেথকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। হত্যা করার পর ম্যাকবেথ রাজ্যক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েও অপরাধবোধে নিজেকে নিজেই সংগোপনে ভর্ৎসনা করেছে। আত্মপ্রবঞ্চনার কথা স্মরণ করে অবশেষে সে আত্মঘাতী হয়েছে। অথচ মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের ভিখু আজন্ম ডাকাত। মানুষ হত্যা করে সে জীবিকা নির্বাহ করত। এক একটি রাতে খুন না করে সে বাড়ি ফিরত না। খুন করার সময় যখন মানুষের শরীর থেকে ফিনকী দিয়ে রক্ত ছুটত, সেই দৃশ্য রোমন্থন করে ভিখুর মন আনন্দে নেচে উঠত। হত্যার পাপে ভিখু কখনো শঙ্কিত হতে পারেনি। নারীসঙ্গ ভোগ করার জন্য ভিখু রাতের অন্ধকারে পাঁচীর স্বামীকে হত্যা করে পাঁচীকে নিয়ে পালিয়েছে। এ রকম পশুবৃত্ত ভিখুর কাছে পরধন লুণ্ঠন ও সম্পদের মালিককে খুন করা ছিল পরম আনন্দের, পরিতৃপ্তির ও সুখের। এ জন্যই সুখ, দুঃখকে মানুষ অপেক্ষিক বলার চষ্টা করেছে। নতুন বছরে ভিখুর মতো দুর্বৃত্ত ও ম্যাকবেথর মতো আত্মানুসন্ধানী মানুষও শুভেচ্ছাবিনিময় করে। ভিখুদের শুভেচ্ছা ও ম্যাকবেথদের শুভেচ্ছার মধ্যে ব্যাকরণগত কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য যেটুকু দেখা যায়, তা সম্পূর্ণ নীতিগত। কয়েকজন ভিখু যখন একসাথে হয়ে পরস্পর নতুন বছরের শুভেচ্ছা আদান-প্রদান করে, তখন সেই শুভেচ্ছার অর্থ ম্যাকবেথদের শুভেচ্ছার অর্থের সাথে মিশে যায় না। ভিখুদের শুভেচ্ছার অর্থ হয়ে ওঠে, বিগত বছর যেভাবে গেছে গেছে; দস্যুপনা করতে গিয়ে এ বছর যেন কোনো ঝুট-ঝামেলা না ঘটে; পরের সম্পদ যেন নির্বিঘেœ লুট করে আনা যায় সেটির শুভবাসনা। এমন অবৈধ্য চাওয়া ও অন্যায় প্রত্যাশা হচ্ছে ভিখুদের নতুন বছরে শুভ-ইচ্ছার সার্বিক অর্থ। আর ম্যাকবেথরা যে শুভ-ইচ্ছাবিনিময় করে তার অর্থ হয়ে ওঠে সঙ্কল্প। বিগত বছরে যে ব্যর্থতা, গ্লানি, জরা, দৈন্য, হীনম্মন্যতা নিজেদের গ্রাস করেছিল সেসব থেকে ধুয়েমুছে ওঠার দৃঢ প্রতিজ্ঞা। এ প্রতিজ্ঞাও নতুন বছরে একপ্রকার শুভ-ইচ্ছা। উল্লিখিত দুই শুভ-ইচ্ছার উদ্দেশ্য এক রকম না হলেও নতুন বছরে শুভেচ্ছাবিনিময়ের বাক্য কিন্তু একটাই। সেটা শুভেচ্ছা।
শুভেচ্ছাবিনিময়ের ‘নতুন বছর’ ধারণাটা মানুষের তৈরি করা; কাল্পনিক। বছর সম্পর্কিত নতুন পুরনো আইডিয়াটা ভিন্ন কিছু নয়; সময়কে ধরে রাখা কিংবা কাল গণনার পদ্ধতিমাত্র। প্রকৃতির সেই চন্দ্রসূর্য, সেই দিনরাত্রি, সেই ঠাণ্ডাগরম, সেই শীতবসন্ত একইভাবে; অবিরতভাবে চলে এসেছে; চলতে থাকবে। অবিকৃত এই চলার ভেতরে পশুপ্রাণী, মানুষজন, গাছপালা, নদীসাগর, মরে যায়; আবার নতুনভাবে জন্ম নিয়ে পৃথিবীকে করে তোলে পরিপূর্ণ। কিন্তু সময়ের এ রকম কোনো জন্ম মৃত্যু নেই। অবিরত ছুটে চলাই সময়ের ধর্ম। ছুটে চলা সময়ের প্রতিটি পদক্ষেপকে গণনার জন্য আবিষ্কার করা হয়েছে নতুন দিন; পুরনো দিন; নতুন বছর পুরনো বছর; এ ধারণা। কাল্পনিক এ ধারণা আমলে নিয়ে মানুষ সাজাতে চায় তার নিজের জীবনকে। উপভোগ করতে চায় প্রকৃতিকে। জীবনকে আরো সুন্দর দেখতে পরিকল্পনার ছক আঁকে বছরের শুরুতে। সে জন্যই বছরকে স্বাগত জানাতে শুভ-ইচ্ছা বাক্যটি ব্যবহার করে। এই ইচ্ছা ব্যক্তিজীবনে যেমন থাকে তেমন থাকে জাতীয় জীবনেও। ব্যক্তিজীবনের তাৎপর্য আত্মকেন্দ্রিক হলে জাতীয় জীবনে ভাটা পড়তে থাকে। সে জন্য ব্যক্তিজীবনকেও জাতীয় জীবনের অংশ করা জরুরি হতে পারে। তা না হলে জাতীয় জীবনে অবহেলায় বেড়ে ওঠা ভ্রান্ত জীবনদর্শন একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থায় ঘুণ ধরাতে পারে। এ ঘুণপোকা জাতীয়জীবন থেকে ফিরে আবার ব্যক্তিজীবনেও সংক্রমিত হতে পারে। জাতীয় জীবনে এখন মানবতা বিনষ্টকারী ঘুণপোকা দ্রুত বংশবিস্তার করছে। নতুন বছরের শুরুতেই এই ঘুণপোকাকে প্রতিরোধ করার শুভ ইচ্ছা না থাকলে শুভেচ্ছাবিনিময় অনর্থকও হতে পারে।
বিগত বছরের তিক্তবিরক্ত অভিজ্ঞতায় পৃথিবীশুদ্ধ মানুষ আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। দেশে দেশে স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রনায়করা এবং পৃথিবীর তথাকথিত মোড়লরা মানুষের জীবনকে জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, আত্মাহমিকা, ঘৃণা, জিঘাংসা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্লের মোড়কে পুরে ফেলে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশ্ব মোড়লদের ইশারায় পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা, স্বজনহারা, মাতৃভূমি হারা হয়েছে। নেতাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যুদ্ধবিগ্রহ বাঁধিয়ে দিয়ে মানুষকে নরকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ নিভৃতে চোখের জল ফেলেছে। শিশুরা অভিভাবক হারা হয়েছে। নারী ইজ্জত আব্রু হারিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে চোখের সামনে। এসব দেখেও অবহেলায় পাশ কাটিয়ে গেছে বিশ্বরক্তচোষা হায়ানাদের স্বগোত্রীয় ইসরাইল ও পশ্চিমা জোট। তারা মানুষের রক্তে হোলিখেলার নেশা অব্যাহত রখেছে বছরের পর বছর। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ডোনাল ট্রাম আরো একধাপ এগিয়ে হিংস্রতা প্রদর্শনের উচ্চাসনে বসেছিল। অথচ বিশ্বনেতৃত্বধারী এই প্রবঞ্চকরাও বছর শেষে নতুন বছরের প্রারম্ভে বিশ্ববাসীর প্রতি শুভ ইচ্ছা জ্ঞাপন করে। এ বছরও তাদের এমন শুভ ইচ্ছার ব্যতিক্রম হবে না। ইতোমধ্যে স্বৈরশাসক ও অভিশপ্ত ডোনাল ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্টের মানুষ উপেক্ষা করতে পারলেও এখনো এশিয়ার অনেক দেশেই ডোনাল ট্রাম্পের প্রেতাত্মাদের উপেক্ষা করা যায়নি। স্বৈরশাসক ফ্যাসিবাদের এসব বুজর্গরা সমাজে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রক্ত শুষে নিজেদের অট্টালিকার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যস্ত রয়েছে। এতদসত্ত্বেও তারা নতুন বছরে শুভ ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করে। এ শুভ ইচ্ছার অন্তর্নিহিত অর্থ শোষণের কৌশল। নতুন বছরের প্রাক্কালে ফ্যাসিবাদদের শুভ ইচ্ছার এসব অর্থ বোঝতে ব্যর্থ হলে জাতীয়জীবনে বিরজমান হতাশা কেটে উঠতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হতে পারে। মানবতা চরম সঙ্কট অতিক্রম করছে। মানুষ এখন মানুষ কর্তৃকই নিগৃহীত হচ্ছে। অথচ এ সময়কে বলা হচ্ছে আধুনিক। আধুকিতার ছোঁয়া মানবতা স্পর্শ না করলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে তা মহাশূন্য ধরে ফেলেছে। আর মানবমুক্তি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে। আপাতত আর না এগিয়ে গেলেও চলবে। কিন্তু মানবতা না এগিয়ে নিতে পারলে বিজ্ঞানের উদ্ভাবন মানব ধ্বংসের জন্য দায়ী হতে পারে। কাজেই এখন চিন্তা ও অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে মানবতাবাদী দর্শনের পেছনে। খুঁজে বের করা যেতে পারে কোন পদ্ধতি প্রয়োগে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নিরসনে শতভাগ সাফল্য আসতে পারে। নতুন বছরে এ ইচ্ছা পৃথিবীব্যাপী অবমুক্ত হোক। হ