নববর্ষের ধারণা-চেতনা দেশ-সমাজ-অর্থনীতি ভেদে আর্থসামাজিক পরিবেশ ও ভূগোল ভেদে, অবকাঠামো অবয়ব ভেদে, একেক ধরনের আবেগ-উৎকণ্ঠা, আনন্দ-উৎসব উপলক্ষের উচ্ছ্বাসে রণন তুলেই আসে। আমাদের এই বাংলাদেশে এবারের নতুন বর্ষপঞ্জির শুভ মহরত হচ্ছে এমন এক পরিবেশে বা অবয়বে সেখানে সনাতন ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান-অনুভূতি ভিন্নতর মেজাজ ও মর্জির ওপর ভর করে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই শীতে বিশেষ করে যখন ইংরেজি নববর্ষ আসে তখন পালা-পার্বণ পৌষের পিঠা পুলি খাবার ধুম, বেড়ানোর বহর সবই এবার করোনার অজানা আশঙ্কায় অবরুদ্ধ সময়ের সাম্পানে নিরুদ্দেশের পানে পাল তুলে যাত্রা করছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রদর্শনের মোক্ষম মুহূর্তগুলো নানা বাধার বাঁধনে আটকে যাচ্ছে। এক শ’ বছর আগে, স্পানিশ ফ্লু মহামারীর সময়, ১৯২০ সালের শুরুটাও যেমন প্রথম বিশ্ব সমরের অশুভ চলাচলে বিশ্ববাসীকে নিরামিষ-নিরানন্দময় করে তুলেছিল, এক শ’ বছর পরের করোনাক্লিষ্ট এই পৃথিবীতে এখানে-সেখানে এবারের নববর্ষ তেমনি এক যুথবদ্ধ দুর্ভাবনার দোসর হয়ে বিশেষ বিব্রতকর অবস্থায় হাজির।
তাকে কোথায় বসতে দেই কিভাবে বা করি সমাদর। ভরা মৌসুমেও বনভোজনের তেমন আয়োজন নেই, শীত বড্ড ধীর পায়ে, সুন্দরবনের পাখ-পাখালিরা পসরা সাজিয়ে বসে আছে সেখানে তাদের এবার তেমন কোনো অতিথি নেই। অসংখ্য চরের চোরাবালিতে স্রোতস্বিনী পদ্মা প্রাণান্তকর পরিবেশ কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে দিনাতিপাত করছে ঠিক যখন দুই হাজার একুশ আমাদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। বিগত বছরের অর্থনীতি আগামী বছরের দিনমানের হিসাব-কিতাব বেহিসাবের খাতায় অলস অস্থির কর্মহীনের হীনম্মন্যতায় মূকবধির হয়ে উঠছে।
বলাবাহুল্য, উপলব্ধিতে নতুনের আহ্বান জানানোর উপলক্ষ তৈরি করতেই নববর্ষ আসে। সব দিনই সমান সব রাত সমান কিন্তু কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণকে সময় গণনার সুবিধার্থে সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা, দিন-তারিখ-মাস-বছর বিচার ও হিসাবায়নের প্রথা চালু হয়েছে। সেই থেকে নিত্য প্রস্থানপরায়ণ কোনো দিন-তারিখকে পুরনো সাব্যস্ত করে পরের দিনকে নতুন তারিখ ধরে নিয়ে নতুনের নামাবলি পরিয়ে আনন্দ-আমেজ-আবেগ-আবেশ তৈরির চল চালু হয়েছে। ডিসেম্বরের পরই জানুয়ারি প্রকৃত প্রস্তাবে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার পাতায় নতুন একটি সাল সংযুক্ত হয়ে চিন্তা-চেতনার চৌহদ্দিতে নতুন যাত্রা শুরুর সুযোগ তৈরি হয়। পুরনোর প্রতিস্থাপনেই নতুনের আগমন ঘটে, সবাই ভাবে পুরনো গ্লানি, জরা, ব্যাধি ও ব্যত্যয়, দুঃখ ও বেদনা ঘুচে যাক আসুক নতুনের নববর্ষ, ঘটুক তার সৌন্দর্য শোভিত শুভাগমন। শুধু মানুষ কেন প্রকৃতিও এ ব্যাপারটি বোঝে। গাছে নতুন পাতা আসে পুরনো পাতাকে বিদায় করতে। ভোল পাল্টানোর এ ব্যাপারটি না থাকলে প্রকৃতির সৌন্দর্যবিলাস, তার সাজবদলের আর কোনো উপলক্ষ থাকে না। নতুন সব সময়ই নতুন, নতুনের সমাদর সম্ভাষণে পুরনোকে পাততাড়ি গুটিয়ে তাই চলে যেতে হয়। নতুনের এই শুভাগমন এই অনুপ্রবেশ নিঃশব্দ হয়ে সরবে, সময়ের অবসরে হয়েও নিয়মিত, অনিত্যতার মাঝে নিত্যতার নৈতিক নৃত্য, তাল ও লয় মিলিয়ে যেখানে সুর সাধন সাঙ্গীতিক পরিবেশ সৃজন করে।
নতুন-পুরনোর এই পালাবদল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে উপলব্ধির উপলক্ষ ভেদেও তারতম্য ঘটে। গভীর সমুদ্রে চার দিকে পানি থৈ থৈ করছে, সূর্য উঠছে আর ডুবছে। নাবিক সন্ধ্যাতাঁরা আর দিকনির্দেশক যন্ত্র দেখে তার গতিপথে হাল ধরে চলেছে, তার কাছে সব দিন-তারিখ সমান। ৩১ ডিসেম্বর ও ১ জানুয়ারির মধ্যে কোনো পার্থক্য ঠাহর হয় না তার কাছে। যদি না রেডিও বা বেতার তরঙ্গের দ্বারা দূরবর্তী কোনো লোকালয় থেকে তারিখ জ্ঞাপনকারী কোনো শব্দতরঙ্গ ঘোষণা কিংবা বার্তা তার কানে না আসে। সুদূরের বার্তা তাকে কাছের হিসাব-নিকাশকে, তার মনের আনন্দ-বেদনাকে বাঙ্ময় করে তোলে। দুর্গম পাহাড়ে, গভীরে জঙ্গলে নববর্ষের চেতনা একই রকম, দিনপঞ্জির পালাবদল মাত্র। এমন লোকালয় আছে তাদের জ্ঞান বিদ্যাবহরে পুরনো দিন আর নতুন দিনের কোনো পরিবর্তন কোনো অর্থ বহন করে না, আনে না উপলব্ধির কোনো চালচিত্র। অনুভব-অনুভূতি ভেতর থেকে যে সাড়া দেয় তা বাইরের তাগিদে, আলোর প্রতি অন্ধারের আকুতি যেমন, বেদনা বারির কাছে আনন্দের জলতরঙ্গ যেমন, ছায়ার কাছে প্রচ্ছায়া যেমন।
দুই হাজার বিশ সাল কেমন কেটেছে? একজন দিনমজুরের, ছা পোষা কেরানির, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীর, হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকের, ব্যবহারজীবীর, কলমসৈনিকের, সংস্কৃতিসেবীর, বড় মজুদদার সিন্ডিকেটের, স্টক মার্কেটের অর্থ লোপাটকারীর, ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ধুরন্ধর ব্যবসায়ীর, মুদ্রা পাচারকারীর? এসব কথা এমন একসময় ভাবা হচ্ছে যখন চার দিকে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ভোরের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ আর এর সমাজ। কুয়াশার ধোয়াটে পরিস্থিতিতে সবার চোখের ভিজিবিলিটি যথেষ্ট অস্পষ্ট। এই হালকা পাতলা কুয়াশারাও যে এত শক্তিশালী এ দেশের মানুষ এর আগে ঠাহর করতে পারেনি। এই কুয়াশা আকাশের বিমানকে মাটিতে নামতে দেয় না, লঞ্চ, স্টিমার এমনকি জাহাজকেও নদী-সাগর মাঝে নোঙর করতে বাধ্য করেÑ সড়কপথে গাড়ির গতিমাত্রা নামিয়ে দেয়। সবাই লক্ষ্য করে ভোরে-প্রদোষকালে কুয়াশা যতটা দেখা যায় বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেই কুয়াশা কেটে যাওয়ার পরিবর্তে তা যেন বেড়েই চলে। এসব কুয়াশারা কোথায় ছিল এতক্ষণ, এত দিন? আকাশে কি কুয়াশার চাষ হচ্ছিল বা রান্না হচ্ছিল? বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা পরিবেশিত হচ্ছে। ভোর দেখে দিনের অবস্থা (সড়ৎহরহম ংযড়ংি ঃযব ফধু) ঠাহর করার যে মহাজন বাক্য শিখেছিল সবাই এখন তা যেন আর খাটছে না। যাদের জন্য, যাদের দিয়ে, যারাই সেই ভোরে যেসব স্বপ্নজাগানিয়া গান শুনিয়েছিল ভৈরবী রাগে তা যত বেলা বেড়েছে, পশ্চিমের আকাশে ঢলেছে সূর্য, সামনে অস্তাচলের পথে এসে তার বাস্তবায়নের ভিজিবিলিটি তত অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যেন। সহজ সরল বিশ্বাসে, আস্থায় বুক বাধে সবাই বারবার আর তা কেন জানি খান খান হয়ে যায় অতি চালাকবাজদের, ধড়িবাজদের ধান্দায় । বেশ কয়েক বছর ধরে সবাই শুনেছে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে কোনো কোনো অতি চালাক-চতুররা এবং এখন একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে চালাকরা আরো বোকা সাজার ভান করছে। যেন কিছুই হয়নি, কেউ কিছু করেনি এমন একটা ভাব ভাবনা দিয়ে পার পাইতে চাইছে। ইস্যুর পর ইস্যু সৃষ্টি হয়ে আগেরটা বেমালুম ভুলে যাচ্ছে মানুষ। এর দোষ ওর দোষ যাই বলা হচ্ছে শেষমেশ গিয়ে যত দোষ তা তো নন্দ ঘোষের ঘাড়েই চাপছে। এর আগে ঝাড়ফুঁক দিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেটের টাকা নিয়ে গেছে অতিধান্ধাবাজরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পথেঘাটে বসিয়ে। আকাশছোঁয়া লাভের লোভ দেখিয়ে এমএলএম কোম্পানি নিচয়ের নিরীক্ষ-নিরীক্ষার ফাঁকফোকরে চলে গেছে কোটি কোটি টাকা। অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে সবার সামনে এই উনিশ-বিশেও, তবে সামান্য এ ক্ষতি নিয়ে এত হা-পিত্যেশ কেনÑ অতি নিরাপদ ভাবেন যারা নিজেদের তারাই বলেছেন এন্তার। মানুষের আয় তত্ত্ব¡ জিডিপির জাত্যাভিমান নিয়েও অনেক ব্যাখ্যান মিলেছে। জীবনমানের নৈমিত্তিকতায় তার উপস্থিতি না মিললেও বিদেশী সনদে পদকে প্রচার পেয়েছেÑ অর্থনীতি প্রমোশন পাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের রাশ টেনে ধরতে চেষ্টার কমতি ছিল না, কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। সরবরাহ ও চাহিদায় বল ব্যাটের মিল হয়েও হয়নি, সিন্ডিকেটের ছুড়ে দেয়া স্পিনিং বল বরাবরই রানআউট করে দিয়েছে ক্রেতাকে, নাকাল হতে হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে।
করোনাযুদ্ধের এই পর্যায়ে দেশে দেশে মানুষের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বেশ কয়েক মাস স্থবির হয়ে পড়ে থাকা ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় জীবন ও জীবকা সমন্বয় সাধনের অনিবার্যতা উপস্থিত। কিন্তু পণ্য ও সেবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি চাহিদা অনুযায়ী না বাড়ায় সরবরাহে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় বৈসাদৃশ্য ও বেমানান বাড়াবাড়িতে সমাজ ও অর্থনীতির দৈন্য ও দুর্দশা ফুটে উঠেছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই মহামহিম দূরত্বের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীরও দাম হু হু করে বাড়ে , চড়া আকাশচুম্বী দাম হাঁকা হয়ে থাকে। এ অবস্থায় সমাজে আর্থিক বৈষম্যের বিবর আরো বেদনাদায়কভাবে উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশ অর্থনীতির চালচিত্র, এর আবহমান সংস্কৃতি ও মূল্যবোধÑ করোনাকালে কিংবা করোনা-উত্তর পরিবেশে ভেদাভেদ ভুলে পুরনো দিনের বেদনা ও বৈষম্যের জঞ্জাল সরিয়ে নতুন বছরেও যেন গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও পরিতৃপ্তিকে উপভোগ করার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক না হয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির, ধর্ষণ ও প্রতারণা, সামাজিক অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির মতো নানা খাত ও ক্ষেত্রে অতি অস্বাভাবিক আচরণে।
প্রভূত পরিসংখ্যান, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও পটভূমিতে আজ এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, দূরত্ব বাড়ছে অনেক ক্ষেত্রে-সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের ও নাগরিকের মধ্যে, করদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে, শিল্পমালিক ও শ্রমিকের মধ্যে, নীতিনির্ধারকের সাথে পোষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, উৎপাদনকারীর সাথে খুচরা ক্রেতার, ব্যাংকের আমানতকারীদের সাথে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার, সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় প্রত্যাশার সাথে আর্থিক খরচে কর্মনৈপুণ্যের, ব্যয় সঙ্কোচন কৃচ্ছ্রতা সাধন পরিবেশেও বলগাহীন ব্যয়ের, সদাচার, সামাজিক ন্যায়নীতিনির্ভরতার সাথে অসদাচরণ ও নীতিহীনতার, সুশৃঙ্খলা বোধের সাথে উচ্ছৃঙ্খলতার, রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনার সাথে ব্যয় ব্যবস্থাপনার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর সাথে সাধারণ মানুষের। সামষ্টিক অর্থনীতিতে চড়াসুদ ও কড়া শর্তের ঋণের টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপব্যয়ের জৌলুসের চাকচিক্যের ডামাডোলকে মনে হতেই পারে এটি পুঁজিবাদী মানসিকতা প্রস্তুত এবং বৈষম্যবিলাসী উদাসীন ঊর্র্ধ্বতনদের ইচ্ছা ও অভিলাষ উৎসারিত। এই অগ্রগতি গুণগতমান উন্নয়ন ব্যতিরেকে শিক্ষার পাসের হার এবং পার ক্যাপিটা জিডিপি বৃদ্ধির মতো সাময়িক তৃপ্তিলাভের অগ্রগতি মনে হতে পারেÑ ভূত-ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করে নয়Ñ সাময়িকভাবে, নিজেদের মতো করে অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিতভাবে সীমাবদ্ধকরণের প্রয়াস উৎসারিত। অর্থনৈতিক বৈষম্য বিভাজন থেকে মুক্তির সংগ্রামে জয়ী যেখানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম অর্থনীতির প্রাণবায়ু, সেখানে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়নীতিনির্ভরতা, নৈতিক মনোবল ও মূল্যবোধ তার সার্বিক অবস্থান ও উপস্থিতিকে আপাত প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরে আসার অজুহাত অবয়বে নিরুৎসাহিত করা চলে না। সেগুলো ক্রমশ নির্বাসনে পাঠিয়ে সাময়িক এই প্রগলভতায় সমাজ প্রকৃতপক্ষে এগোচ্ছে না পিছাচ্ছে তার একটা সালতামামি ও আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন।
একে অন্যকে দুষছে নিরন্তর সহস্র ব্যর্থতা ও ব্যতিব্যস্ততার বিবরে চলৎশক্তিকে রহিত করে ছন্দপতন ঘটাতে চাইছে নিত্য পথ-পরিক্রমাকে স্বার্থবুদ্ধির উ™£ান্ত পথচলায় পথের পার্শ্বে পসার সাজাতে গজিয়ে ওঠা সুবুদ্ধিরা বদনামের ভাগীদার হয়ে দলিত-মথিত হচ্ছে। নাতিশীতোষ্ণতায় চরম গরম পরম প্রয়াসে প্রোথিত হচ্ছে, নিরপেক্ষতা পক্ষভূক্ত করে তার সনাতন ব্যক্তিত্ব বৈভবকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে। তবু জীবন থেমে নেই বসে নেই। বসে থাকতে পারে না। সারা দুনিয়ায় চলছে আলো-আঁধারির খেলা। এটি নতুন নয় সনাতন। এর ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে নিজেকে নিজের সংসার ও দেশকে। প্রকৃতির দিকে যদি তাকাই দেখতে পাই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখেও ঠায় দাঁড়িয়ে দিন গুজরানের প্রয়াস এবং টিকে থাকার সংগ্রাম। কেননা রাতের পর দিন আসে আলোর পর অন্ধকার, অন্ধকারের পর আলো। আজ যে দিনকে মনে হবে অচলায়তনের অবয়বে সে দিনও একদিন চলে যাবে নতুন সম্ভাবনা ও সুযোগের সকালে উদিত হবে নতুন সূর্য, নতুন বর্ষ। সুস্বাগতম ২০২১।
একুশ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। স্বাধীনতা যেহেতু যেকোনো জাতির পরম আকাক্সিক্ষত বিষয় সেহেতু একুশের প্রদোষকালে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ, গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজগঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, জানমালের নিরাপত্তা বিধান, ধর্ম পালন, নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-বিশ্বাসের অবারিত চর্চা নিশ্চিত করার বিষয়াবলি যা জাতীয় আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য তার প্রতি অয়োময় প্রত্যয় প্রত্যাশী হবো।
স্বাধীনতার মতো বিশেষ এ নিয়ামতকে সর্বোচ্চ মর্যাদাদান করা উচিত সবার। স্বাধীনতার অর্জন যাতে কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা তার চেয়ে বেশি কঠিন। করোনাকালে চলমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং দেশিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক শক্তির সমৃদ্ধি ছাড়া স্বাধীনতা টেকসই হতে পারেও না এই বিষয়টি নানাভাবে বিবেচিত হওয়ার অবকাশ দেখা দিয়েছে।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ উঠলে দেখা যাবে, বিগত অর্ধশতকে বাংলাদেশের অর্জন একেবারে কম না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। প্রায় পাঁচ দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, বাস্তবতার আলোকে তা বলার সময় আসেনি। সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ মেলে। সঙ্ঘাত-সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে এখনো বেরিয়ে আসা যায়নি। নাগরিকদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ চেতনা গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উদ্বেগ ও শঙ্কামুক্ত, ঐকমত্যের বলীয়ান শক্তির। প্রয়োজন আস্থাবান ও সততার নেতৃত্ব। স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এক রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ লড়াই, এ বিপুল আত্মত্যাগ নিছকই একটা ভূখণ্ড, জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। সুদীর্ঘকাল শোষণ ও বঞ্চনার, বৈষম্য ও বৈরিতার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো পেতে চেয়েছিল, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মধ্যে সেগুলো নির্বিঘœ চর্চার পরিসর তৈরি করবে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে টেকেনি। মুক্তির সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
বৃহত্তর চাওয়ার মাঝে যে ক্ষুদ্র চাওয়া এবং সঙ্কীর্ণ ক্ষুন্তাগুলো চাপা পড়েছিল সেটাই স্বাধীনতার পর মুখ্য হয়ে ওঠে। এতে গৌণ হয়ে ওঠে সর্বজনীন স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা। কখনো সখনো শক্তি ও ঔদ্ধত্যের কাছে পরাভূত হয় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা; গৌণ হয়ে ওঠে শান্তির অন্বেষণ। এ প্রক্রিয়ায় লুটেরা অর্থনীতির উদ্ভব হয় তা বদলে দেয় সমাজ চিন্তা এবং রাষ্ট্রের দর্শন। যাপিত জীবন, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, জীবনের নানা আকাক্সক্ষাসহ সাধারণের অর্থবিত্ত ও সম্পদের যে একুশ সালে এবং করোনা-উত্তরকালে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোতে নবতর আকাক্সক্ষা ও অভাবের জীবনে অধিকাংশ মানুষ হয়ে উঠবে এমন নুড়িপাথর, যার কাছে শ্যাওলা ও শেকড়ের গন্ধময় হারানো জীবনসমূহের এবং করোনায় ভোগা মানুষের দুঃসহ বেদনা ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট। ঠিক এ পরিস্থিতিতে লোভ ও ভোগের আবর্তে যদি সেই নি¤œগামী মধ্যবিত্ত এবং ঊর্ধ্বগামী নি¤œবিত্ত মানুষ (যারা জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৮৭ শতাংশ) হারিয়ে ফেলে উত্তরণের স্পৃহা, নিজের অজান্তে সে হয়ে ওঠে ক্ষমতাবানদের ক্রীড়নক এবং ভোগবাদী সমাজের পণ্য তাহলে সেটি হবে ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণ। এসব বিবাদের সময় যেসব মানুষ ইতিবাচক চিন্তা ও বিশ্বাসের মাঝে মুক্তি খুঁজে ফেরে, তারাও বা তাদের কেউ কেউ বিকৃত ও অসুস্থ চিন্তা এবং বিকৃত ও নেতিবাচক চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়তে পারে। সর্বোপরি প্রাধান্য পাওয়া স্বার্থচিন্তা ও ভোগবাদে অধিকাংশ মানুষ ভোগবাদী সমাজের ক্রীড়নক ও খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে। অদূরদর্শী চিন্তার কারণে গভীর চিন্তাগুলো ও আত্মার মৌলিক জিজ্ঞাসাগুলো গৌণ হয়ে উঠতে পারে।
আঁধারময় এই শূন্যতা ও হতাশার মাঝে স্বাভাবিকভাবে নড়বড়ে হয়ে ওঠে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। এতে করে বিপন্ন মানুষ সর্বশক্তি দিয়ে হাতড়ে বেড়ায় একটি আস্থার ভূমি এবং আশার সুবর্ণরেখা। নানা অপ্রাপ্তিতে হতাশ হয়ে ইহজাগতিক বিচার না পেয়ে মানুষ যুক্তির পথ ছেড়ে অদৃষ্টবাদিতা এবং নানা কুসংস্কারের দিকে ঝুঁঁকে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়টাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছিল সাধারণের মনের অবস্থা। যে ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে ইতিবাচক কাজে প্রণোদনা জোগায়, শুদ্ধ করে, সুন্দর করেÑ তাও নানা কারণে সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
সামাজিক ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক চিন্তা অবলম্বন করে, শান্তিকে চধৎধফরমস ড়ভ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ধহফ পরারষরুধঃরড়হ মনে করে যে রাষ্ট্রচিন্তা আবর্তিত হয় তা-ই হতে পারে আমাদের প্রার্থিত রাষ্ট্রদর্শন। বার্ট্রান্ড রাসেল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে যেমনটি উল্লেøখ করেছিলেন ওহ ফধৎশ ফধুং, সবহ হববফ ধ পষবধৎ ভধরঃয ধহফ ধ বিষষ মৎড়ঁহফবফ যড়ঢ়ব; যিরপয ঃধশবহ হড় ধপপড়ঁহঃ ড়ভ যধৎফংযরঢ়ং নু ঃযব ধিু.
আমরাও আলোর পথে আশার তরী বেয়ে একুশের হৃদমাঝারে ঠাঁই পেতে চাই।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব