সাত বা আট বছরের মেয়ে টুকি। সারাদিন মায়ের সাথে বাড়ির কাজ করে। মা টুকিকে মানি বলে ডাকেন। কখনো কাজে ফাঁকি দেয় না টুকি। টুকি এক বছর বয়সে তার বাবাকে হারায়। বাবার আদর কেমন কিছুই জানা নেই ওর। বাবা বলতে মাকেই বোঝে টুকি। মা সব সময় চেষ্টা করেন বাবার শূন্যতা পূরণ করতে। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সবটা দিতে পারেন না তিনি। এ জন্য মায়ের খুব কষ্ট হয়। অনেক স্বপ্ন ছিল টুকির বাবার। ভালো একটি স্কুলে পড়াশোনা করাবে টুকিকে। কিন্তু প্রাণঘাতী ট্রাকের চাপায় জীবন দিতে হয় টুকির বাবাকে। এরপর থেকেই সংসারে আঁধার নেমে আসে। টুকিকেও আর পাঠানো হয় না স্কুলে।
সেদিন বিকেলবেলা টুকি ওর সমবয়সীদের হৈ-হুল্লোড় করে খেলতে দেখে। সবার সাথে সেও খেলতে চায়। কিন্তু কেউ তাকে খেলায় নিতে চায় না। সবার একই কথা টুকি লেখাপড়া করে না। তাই ও আমাদের বন্ধুও নয়। এ কথা শোনার পর টুকির দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। খুবই কষ্ট পায় টুকি। মনে মনে ভাবে আজ যদি লেখাপড়া করতাম তাহলে আমারও অনেক বন্ধু থাকত। কত আনন্দ, হইচই করে খেলাধুলা করতে পারতাম! এসব ভাবতে ভাবতে অশ্রু ভেজা চোখে বাড়ি চলে আসে টুকি। মায়ের মন সন্তানের ব্যথা বুঝতে দেরি হয় না। তাই মা টুকির বিষণœ মুখ দেখে স্থির থাকতে পারেন না। মা বারবার টুকিকে প্রশ্ন করেন। কী হয়েছে লক্ষ্মী মা? কিন্তু টুকির মুখে কোনো কথা নেই। কারণ টুকি ভালো করে জানে, মা জানতে পারলে অনেক কষ্ট পাবেন। তাই চুপচাপ থাকে টুকি। রাতে খাওয়া শেষে ঘুমাতে যাবে এমন সময় আবার মা টুকিকে প্রশ্ন করেন। কি হয়েছিল বিকেলবেলা? টুকি মাকে বলল, আচ্ছা, আমি সব বলব। কিন্তু তুমি কষ্ট পাবে না তো। মা টুকির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-না, আমি কোনো কষ্ট পাব না। টুকি হাসি মুখে বলল- মা, আমি স্কুলে যেতে চাই। লেখাপড়া করতে চাই। লেখাপড়া করলে অনেক বন্ধু হয়। জানো, মা! আজ বিকেলবেলা সবাই মাঠে খেলাধুলা করছিল। আমিও সবার সাথে খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি লেখাপড়া করি না বলে কেউ আমাকে খেলায় নেয়নি। সবাই বলছিল লেখাপড়া না করলে ওদের সাথে খেলতে দিবে না। ওরা কত মজা করে খেলাধুলা করে! আমারও খুব ইচ্ছে হয় লেখাপড়া করতে। সবার সাথে হৈ-হুল্লোড় করে খেলাধুলা করতে।
টুকির একথা শোনামাত্র মা, টুকিকে বুকে জড়িয়ে নেন। কপালে চুমু দিয়ে বললেন- নিশ্চয়ই, তুমি স্কুলে যাবে। বাড়ির সব কাজ থেকে তোমার ছুটি। আজ থেকে তোমার হাতে বইখাতা থাকবে। তুমিও লেখাপড়া করবে। আনন্দ, হইচই করে খেলাধুলা করবে। তোমারও অনেক বন্ধু হবে। মায়ের কথা শুনে টুকির আনন্দের সীমা নেই। নিমিষেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। হাসির ঝলকে আলো ছড়ায় সারা বাড়ি।