ভাষা বহতা নদীর মতো চঞ্চল। স্থীরতা এর স্বভাব বিরুদ্ধ। পরিবর্তন পরিবর্ধন ভাষার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে কালের গর্ভে কত ভাষা হারিয়ে গিয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নাই, আবার নতুন কত ভাষার জন্ম হয়েছে তারও কোনো হদিস নাই। ভাঙা-গড়ার এ বির্বতনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সব ভাষাই সমান নয়। কোনো ভাষায় বেশি লোক কথা বলে, আবার কোনো ভাষায় কথা বলে কম লোক। কোনো ভাষা আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে, আবার কোনো ভাষা আছে আঞ্চলিকতা পর্যায়ে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা। একাধিক দেশের কমবেশি ত্রিশ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষা বাংলা। এ ছাড়া ভারতের বিহার, আসাম, মনিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যের অনেক লোক বাংলাভাষাতেই কথা বলে।
ভাষা গবেষকদের মতে বর্তমান ভিন্নতার আগে বাংলা, উড়িয়া ও অহমি ভাষার অভিন্ন রূপ থাকতে পারে। হতে পারে সে অভিন্ন রূপেই চর্যাপদের সৃষ্টি হয়েছে। চর্যাপদের সময়কাল নিয়েও ভাষাগবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারো মতে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকে দশম শতক। আবার কারো মতে খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক। তবে তারা একমত হয়েছেন পাল শাসনামলের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ চর্যাপদ পাল আমলে রচিত হয়েছে, এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের বিধি-বিধান, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবন-জীবিকা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে এসব চর্যাপদে। চর্যাপদের ব্যাকরণ, ছন্দ-অলঙ্করণের কিছু কিছু ব্যতিক্রম দৃষ্টিগোচর হলেও সেগুলোতে বাংলার আদিরূপই বিধৃত হয়েছে। অধিকাংশ চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে রচিত হয়েছে এবং এগুলোতে বাংলার রূপ-সংস্কৃতি চিত্রিত হয়েছে। তাই বলা যায় চর্যাপদই বাংলা ভাষার শৈশবকাল এবং এ ভাষার নিজস্ব সম্পদ। কিন্তু চর্যাপদের ভাষা স্থায়িত্ব লাভের আগেই ভারতের দক্ষিণ কর্ণাটক থেকে আগত সংস্কৃতভাষী সেন শাসকেরা স্থানীয় বাংলাভাষা বা চর্যাপদের চর্চাকে নিষিদ্ধ করেন। আর সংস্কৃত ভাষাকে রাজভাষা করেন। অধিকন্তু তারা ‘রৌরব’ নামক নরকের ভয় দেখিয়ে বাংলাভাষাকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখার কৌশল করেন। এ ভয়ে সরকারি কর্মচারী ও উঁচু বর্ণের মানুষেরা বাংলাভাষা চর্চা বাদ দিলেও সাধারণ মানুষেরা তাতে কর্ণপাত করেন নাই। তারা ‘পক্ষির বুলি’ তথা বাংলা ভাষাকে ছাড়েন নাই এবং বিদেশী ভাষা সংস্কৃতকে মন থেকে গ্রহণও করেন নাই। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে ১২০৩ সালে সেন শাসনের অবসান হলে এ দেশীয়রা আবার নতুন করে বাংলা ভাষা চর্চা করার সুযোগ পান। কারণ তুর্কিরা বিদেশী হলেও তারা স্থানীয় বাংলা ভাষাকে অবমূল্যাযন করেন নাই। তারা ফার্সিকে রাজভাষা করলেও বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেন নাই বরং এ ভাষা চর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কারণে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্য নাই।
সুলতানী শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। তখন বাংলাদেশ কিংবা বাংলা ভাষা ভিত্তিক কোনো অঞ্চল ছিল না। হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ্ ১৩৫২ সালে বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুণ্ড্রবর্ধন, লক্ষ্মণাবতী, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি বাংলাভাষী অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘সুবহি বাঙ্গালা’ নাম দেন। আর এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। এতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হবার সুযোগ পায় এবং বাংলা ভাষার পুনর্জন্ম হয়। এ সময় বড়– চণ্ডীদাস ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ (১৩৫০) কাব্য রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বন্ধ্যত্ব ঘুচান। এর পর শাহ্ মুহাম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ (১৩৮৯-১৪১০) রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার আবির্ভাব ঘটান। পরবর্তীকালে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ, জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্, রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ্, আলাউদ্দীন হুসেন শাহ প্রমুখ মুসলিম নৃপতিদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু, জৈনুদ্দীন, বিজয় গুপ্ত, কৃত্তিবাস, মুজাম্মিল, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ কবি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। মূলত পাঠান বংশের স্বাধীন সুলতানদের শাসনামলে (১৩৩৮-১৫৭৫) বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ হয়। এরপর মোঘল আমলে সৈয়দ সুলতান, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আব্দুল হাকিম, দৌলত উজীর বাহারাম খান, কোরেশী মাগন ঠাকুর, সৈয়দ আলাওল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখের সাহিত্য সাধনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি লক্ষ করা যায়। কিন্তু ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসকের পরিবর্তনের সাথে ভাষা-সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়। এতে মুসলিম শাসনামলের বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং নিম্নমানের মিশ্রভাষার ‘পুঁথি সাহিত্য’ ও ‘কবিয়াল গান’র আবির্ভাব ঘটে। এ সময় ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজিকে রাজভাষা করা হয়। উল্লেখ্য, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষায় আরবি, ফার্সি, উর্দু, পর্তুগিজ, হিন্দিসহ অনেক বিদেশী শব্দের সমাবেশ ঘটে। আর ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজি, সংস্কৃত, ফরাসি, স্পেনিশসহ বিভিন্ন ভাষার অনেক শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ হয়েছে। এতে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, সৌন্দর্র্য ও বৈচিত্র্য বেড়েছে।
ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাঘাত ঘটলেও পরে উন্নতি সাধিত হয়। ইংরেজ শাসনামলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্যসাহিত্য পাওয়া যায়, এ সময় বাংলা ভাষায় কোনো গদ্য সাহিত্য রচিত হয় নাই। অন্যদিকে ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয়। এ সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, জীবনান্দ দাশ, জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবি সাহিত্যেকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। ১৯১৩ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নোবেল বিজয় বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে মুসলিম ও ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও ব্যাপ্তি বাড়লেও কখনো রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় নাই। অথচ ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলে জাতীয় ভাষার উন্নতি ও মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসন অবসানের পর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অধিবাসীরা বাংলা ভাষা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন। তারা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। কিন্তু উর্দু ভাষী শাসকেরা বাঙালিদের দাবি উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে আন্দোলন করেন তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বাংলা) তারিখে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, সালাউদ্দীন, শফিউদ্দীনসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন সরকার পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রথম বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ‘শহীদ দিবস’। আর তাদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে নির্মিত হয়েছে আমাদের ‘শহীদ মিনার’। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৯৯ সনে ইউনেস্কোর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়েও বিশ্বদরবারে বাংলা ভাষার অবস্থান আজ সুসংহত হয়েছে। আর এ ভাষার রার্ষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের জন্য আত্মত্যাগ করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষাশহীদেরা বিশ্ববরণীয় হয়েছেন। হ