এ মাসটি ভাষার। ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা মানসিকভাবে ভাষার অধিকার নিয়ে আবেগাক্রান্ত হই, ‘আ-মরি! বাংলা আমার’ বলে এমন ভাব করি আমরা, যেন এটাই আমার/আমাদের একমাত্র শক্তির উৎস। কিন্তু যখনই এ মাস ফুরালো, অমনিই আমরা ভুলে যেতে বসব বাংলা ভাষার গুণপনা, তাকে নিয়ে আমাদের মাসিক ‘প্রদর্শিত’ আহামরি!
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিজয়ের নিশান তুলে ধরি যখন মার্চ আসে। স্বাধীনতার মাস বলে চিত্তে ও কথায়-বার্তায় এমন ভাব-ভঙ্গি এমন করি যেন এ ছাড়া আমাদের পরম আর কিছু নেই। আবার এপ্রিল এলেই নতুন বছরের সাংস্কৃতিক চেতনায় ঢিল পড়ে আমাদের। আমরা বাঙালিয়ানা নিয়ে গড়িয়ে পড়ি সর্বত্র। বাংলা নববর্ষকে ছড়িয়ে দিই মেলার প্রাঙ্গণে। আর এ ভাবেই আমাদের চেতনার নৌপথ একের পর এক তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গতি-প্রকৃতি পাল্টে যেতে থাকে।
আমাদের রাজনৈতিক চেতনাও ঠিক এ ভাবেই পাল্টায়। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার রূপাদলও পাল্টে যেতে থাকে এভাবেই আন্তর্জাতিকতাবাদের আবহে। ব্যবসাকে যেভাবেই হোক এমন তরিকায় সাজাই যাতে মনে হয় দেশটা টেক্কা দিচ্ছে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রবাহের সাথে। ফলে উন্নয়নের ডামাডোলে পূর্ণ বাংলাদেশের রাজধানীতে ঘটে যেতে থাকে আরেক বিপ্লব। আর তাহলো বাংলা ভাষাকে পেছনে হটিয়ে দিয়ে ইংরেজির দাপুটে চেহারাকে জায়গা দিতে লজ্জিত ও ব্যথিত হচ্ছে না কেউ। আমরা যদি উন্নয়নমুখর ঢাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক চেহারার দিকে তাকাই, দেখতে পাবো সব জৌলুশপূর্ণ পণ্যের দোকানপাট, ব্যায়ামাগার (জিম), নানান রকম বিদেশী অক্ষরে লেখা দেশী এবং ইংরেজি, ফরাশি বা ইতালিয়ান নাম ও চেতনার রেস্তোরাঁ। ঢাকার আলো ঝলমল রাজপথের নিভৃতে ‘ভূতের’ রেস্তোরাঁ। এখন, যদি সমীক্ষা করা হয়, তাহলে বাংলা নামের ও বানানে লেখা দোকানের সংখ্যা কম আর ইংরেজি নামের দোকান হবে সংখ্যায় বেশি। বাংলা ভাষার প্রতি যে প্রেম, তা কিন্তু মুখের, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ‘বিগলিত’ ভঙ্গি নিয়ে উপস্থিত হয়। এই মননগত বৈপরীত্য, একে আমরা কী বলব? একে কি আমরা বলব আত্মপ্রবঞ্চনা? আমরা কি আত্মপ্রতারক জাতিতে পরিণত হয়ে পড়ছি?
আমাদের সরকার বাংলা, বাঙালি ও ভাষা-সাহিত্য বিষয়ে বেশ সজাগ-সচেতন। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা বিনির্মাণে করণীয় সব কিছু করছেন বলেই মনে হচ্ছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রকল্পের নানান বাংলা ভাষায় লেখা নামের মহিমাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। পূর্বাঞ্চল সিটি তার একটি। রাজউকের ডিয়াবাড়ি হাউজিং প্রকল্প আরেকটি। সেখানকার কমপ্লেক্সগুলোর নাম বাংলায় রাখা হয়েছে। যেমন কৃষ্ণচূড়া, মাধবীলতা ইত্যাদি, যা সরকারের সাংস্কৃতিক সচেতনতারই পরিচয় বহন করে। কিন্তু ঢাকা মহানগরে যে সব মার্কেট-মল তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে সেগুলোর নামকরণ তো অদ্ভুত! আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে সে গুলো যেতে পারে না। এসব দোকানের নাম কারা রেখেছে? আর সেগুলোর অনুমোদনই বা কারা দিয়েছে? আমার ধারণা, এগুলো সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন। দোকানের নাম ও ব্যবসায়িক অনুমোদন পত্র তো সিটিরই কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাহলে, এই সংস্থা দুটো কি দেশ ও সরকারের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অনুগত নয়? কিংবা তারা কি জানেন না যে দেশটি একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছে এবং রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা রাষ্ট্রের জন্য কায়েম করেছে? যারা আত্মোৎসর্গ করেছে ভাষার জন্য তাদের প্রতি আমাদের দায় ও দায়িত্ব-কর্তব্য কি আমরা ভুলে গেছি? তারা কি জানেন না যে বাংলাদেশ প্রায় দুই শ’ বছর ব্রিটিশদের হাতে পরাধীন থাকার পরও সে তার ভাষা হারাতে দেয়নি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার চেষ্টা করেছে ভাষা কেড়ে নেবার, ধর্ম কেড়ে নেবার, সংস্কৃতিকে কলোনাইজ করে ফেলার, সে জন্য নানা উপকণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ধোঁয়াশা (হেগেমনি) সৃষ্টিরও প্রয়াস তারা নিয়েছিল, সৃষ্টি করেছিল ইয়াংবেঙ্গল নামে ইংরেজি-তোষণ এক নব্য যুবকশ্রেণী, যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের মানুষকে, দেশের ভাষা-সাহিত্য আর সংস্কৃতিকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করেছিল। কিন্তু তারপরও তারা হেরে গেছে। কারণ সেটা ছিল আগ্রাসী দখলদার শক্তির চাপিয়ে দেয়া শেকড়বিহীন বিষয়। কিন্তু সেই শেকড়চ্যুতরাই আজ নতুন রূপে, নতুন উদ্যোগে, নতুন আবরণে এসে উপস্থিত হয়েছে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। করপোরেট ব্যবসার আড়ালে বা তাদের পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট ধনিক শ্রেণীকে গড়ে তোলা হয়েছে, যারা ইয়াংবেঙ্গলদের ব্যর্থ-পতিত কাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে আধুনিকতা ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমান স্তরে পৌঁছার সিঁড়ি হিসেবে দেখিয়ে সেই কাজটাই সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ কাজের প্রথম উদ্যোগ বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। আজকে দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়নি, কিন্তু ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ব্যবসা করার লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। এবং সেই সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। এবং আমরা জেনেছি সরকার থেকে তাদের নির্দেশ দেয়ার পরও তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠের জন্য কোনো বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট) খোলেনি। তারা দাপটের সাথেই শিক্ষার নামে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে দেশ ও জাতির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার পদদলিত করে চলেছে, তা প্রতিরোধের জন্য সরকারের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখতে পাচ্ছি না। অন্য দিকে সরকার পদ্মা সেতুর জন্য ব্যয় করে চলেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটি একটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ প্রকল্প, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাত্র ছয় বছরে এই টাকা সরকার নিজের তহবিল থেকে খরচ করে সেতু নির্মাণ করছে। আর ওই পরিমাণ অর্থ যদি ৮৫ হাজার গ্রামে একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করতে ব্যয় করা হতো ৬/৭/ কিংবা ১০ বছর পরিকল্পনায়, তাহলে শিক্ষার অন্তর্গত হতো প্রতিটি গ্রাম। শিশুরা পেতো তাদের সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড বলে আমরা যতই চিৎকার করি না কেন, এই রকম একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে তা দেশের গরিব মানুষের সন্তানেরা আলোকিত হওয়ার সুযোগ পাবে না। এ-দুইয়ের মধ্যে কোন বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য বলে আমরা মনে করি? সেই প্রশ্নটিই করতে হবে সবার আগে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বটি নাকি সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে স্থাপিত সেতু নির্মাণ জরুরি? আমরা লক্ষ করছি শিক্ষার ক্ষেত্রে তৃণমূল স্তরের জন্য বিদ্যালয় স্থাপনের কথা উঠলেই ‘আর্থিক সঙ্গতির সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়। কিন্তু ৪৬৪টি উপজেলার জন্য ৪০ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনে ১০ বছরের পরিকল্পনায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সরকারের জন্য দুঃসাধ্য হতো না। প্রাগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এ দায়িত্বটি সরকার করতে পারতেন। এতে কেবল সাংবিধানিক দায়িত্ব পালিত হতো না, লাখ লাখ শিক্ষিত মানুষের কর্মসংস্থানও হতো। গ্রাম স্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে গেলে, জ্ঞানের যে শক্তির কথা বলা হয়, তাতে আমরা সমৃদ্ধ হতে পারতাম। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জাতির উন্নয়ন তার ভাষার সমৃদ্ধি সাধনে অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যা একটি সেতুর আর্থিক উন্নয়নের চেয়ে কয়েক লাখ গুণ বেশি। দু’টি উদ্যোগের মধ্যে সেতু নির্মাণের চেয়ে শিক্ষা অধিকতর জরুরি। সরকার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেস রেলওয়ে বা রেল রোড স্থাপন করতে যাচ্ছেন, যা কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানো হবে। এতেও বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হবে। কিন্তু তুলনায় কৃষি সেক্টরে সরকারি বিনিয়োগ সামান্য। ঠিক একইভাবে ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে সরকারের প্রেম আছে, আবেগও আছে, কিন্তু বিনিয়োগ নেই। ভাষা উন্নয়নের জন্য যে পরিকল্পনা প্রয়োজন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে তার রূপাদল বারে বারে বিতর্কিত হয়েছে নানাভাবে। এখনো তা বিতর্কিত, কারণ এখন দেশে দুই বা ততোধিক শিক্ষা কারিকুলাম চলছে। বাংলা মিডিয়াম, ইংরেজি মিডিয়াম ও বাংলা ও মাদরাসাকেন্দ্র্রিক শিক্ষা। একটি একরৈখিক শিক্ষা কারিকুলাম না থাকায় যুবক শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞানার্জনের লক্ষ্য ঠিক করতে পারে না। শুনেছি, মাদরাসাগুলোতে চলছে সরকারের কারিকুলামসহ ধর্মীয় শিক্ষা। একটি শিশুর জন্য সেই শিক্ষাটা বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং তার মন ও মানসিকতা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরই ফলে আমরা লক্ষ করছি সমাজে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানবিক মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। আধুনিক ও পশ্চিমা শিক্ষা কারিকুলামে শিক্ষিত লোকেরা মাদরাসায় শিক্ষিত ‘লোকেদের হীনতর’ মানুষ ভাবেন। আবার মাদরাসায় শিক্ষিত মানুষেরা পশ্চিমা কারিকুলামে শিক্ষিতদের মনে করে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠা ‘ভিনদেশী’ মানুষ। তাদের মধ্যে দেশী সংস্কৃতির কিছু নেই। এক দিকে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী, অন্য দিকে ইসলামী শিক্ষা ও কালচারে লালিত-পালিত ও শাসিত শ্রেণীর দ্বন্দ্বে পড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অস্তগামী পর্যায়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। এরাই যে নব্য ইয়ংবেঙ্গল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরা দেশীয় কালচারকে নি¤œমানের ও বর্বর সংস্কৃতির বলে মনে করে। ইসলামী শিক্ষা ও কালচারকে অনগ্রসর মনে করে তাদের ঘৃণার চোখে দেখে। ইসলামী এবং পশ্চিমাদের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সেই ঔপনিবেশিক চেতনাই আজ করপোরেট বাণিজ্যের আওতায় আমাদের গ্রাস করতে চলেছে। বাংলা ভাষা তাই অবহেলিত নানা স্তরেই।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি যে গ্যাড়াকলের নিচে পড়েছে, তাকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রের নিজস্ব উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে বুঝতে হবে যে ভিনদেশী বা আন্তর্জাতিক সমাজের সাথে নিজেদের তুলে আনতে হলে তাদের ধারা অনুসরণ করে নয়, নিজেদের সমৃদ্ধ করে এগোতে হবে। আর সেটা কেবল বক্তৃতায় বললে হবে না। নীতিতে, আদর্শে ও তার বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়লগুলোতে বাংলা ভাষা সাহিত্যের ডিপার্টমেন্ট খুলে উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধস নামানো চলছে, তাকে থামাতে হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীর জন্য চাকরির ক্ষেত্র প্রস্তুতের পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থাৎ জব মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। আর তা বাস্তবায়নও করতে হবে।
এসব করা হলেই কেবল বাংলা ভাষার প্রতি প্রকৃত দরদি পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হবে। হ