ফেব্রুয়ারি মাস এলে সচকিত হই ভাষা নিয়ে। উচ্চারণ, প্রয়োগ, উন্নতি ও বিস্তৃতি নিয়ে। বইমেলার পরিসর বাড়ছে। নেই কোনো পূর্বপরিকল্পনা, যেন স্টল বাড়লেই তরতর করে পৃথিবীর সাহিত্যের গগনে সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাবো। তা তো নয়। ছাত্রছাত্রীদের সাথে যোগাযোগ আছে, কারণ তাদের পড়াই। ফেব্রুয়ারি তাদের জন্য কোনো নতুন অর্থ বহন করে না। তারা কোনো নতুন বই কেনার জন্য প্রস্তুতি নেয় না। কেউ দিলেও তা পড়ে না। চিন্তায় অগ্রসর যাদের মনন, সেই বাঙালি কোথায় ধীরে ধীরে অপস্রিয়মান?
সৈয়দ মুজতবা আলির সাথে যখন আলাপ চলত, তার মান এমন উঁচুতে যে বোঝা যেত একজন বহু ভাষাবিদ মানুষ কোনো উচ্চতায় বিহার করেন। আজ কম লোকই পাই যারা গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন। পৃথিবী কোন পার থেকে কোন পারে চলে গেল, তা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। যারা পুরস্কার পেল তাদের কি কাজের জন্য পেল, তা তারা নিজেই জানে না। গুটিকয়েক লোক আপনাতে আপনি বিভোল। যেন এই পুরস্কারই তাদের নিয়ে যাবে নোবেলের কাছাকাছি। সে গুড়ে বালি। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের কথা বাদ দিলেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে আমাদের চিন্তার মান যেমন মধ্যবর্তী কোথাও থমকে গেছে, তেমনি ভাষার উৎকর্ষ ও ভাষা নিয়ে নতুন কিছু চিন্তা করার পরিবর্তে কিছু তাৎক্ষণিক চিন্তায় পর্যুদস্ত আমরা।
সংবাদপত্রগুলো ভাষা নিয়ে চিন্তা করছে তা নয়। কেমন করে পাঠকদের তারা নতুন বাংলার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তা নিয়ে সম্পাদকরা নন উদ্বিগ্ন। কলামগুলো পড়লে বোঝা যায় চিন্তার দৈন্য কিভাবে আমাদেরকে গ্রাস করেছে। আমরা নতুন কিছুই পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করতে পারিনি, যা নিয়ে আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে আমরাই শ্রেষ্ঠ। জাপানে যারা সাহিত্য চর্চা করেন তারা ইউরোপের দিকে তাকিয়ে নেই। তারা তাদের নিজেদের দিকেই তাকিয়ে। যখন দেখা গেল যে তাদের একেকটি বই লাখ লাখ লোক ট্রেনে বাসে স্টিমারে সর্বত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাঠ করছে, তখন নোবেলরা এগিয়ে এলো, ভাবল এ কোন জাতি যারা বাইরের দিকে তাকায় না।
নিজেদেরকে নিজেরাই সম্মানিত করে। এমন দিন কবে আসবে যখন দেখব প্রতিটি রেল স্টেশনে যাত্রীরা আপন কাজ ভুলে আমাদের নিজেদের লেখকদের বই নিয়েও নাড়াচাড়া করছে। দেখছি তাদের নামই এখনো ভালো করে রপ্ত হয়নি। কারা আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখক চেনে না।
রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতাও মুখস্থ করেনি। নজরুল কী লিখেছেন তাও কম ছাত্রছাত্রী জানে। জানে অমর একুশের দু’টি লাইন : ‘আমি কি ভুলিতে পারি’? পরের লাইন গাইতে বললাম, একজনও গাইতে পারেনি। গানটি খটমট, ওটির প্রথম দু’টি লাইন গান অন্তমিলিয়ে। পরের লাইনগুলো কবিতা। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে। এর জন্য হয়তো মামলাও জুটে যেতে পারে।
আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তার ক’টি বই ছেলেমেয়েরা পড়েছে, ক’টি বইপাঠ্য হয়েছে, এর জবাব কে দেবে? শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের বইগুলো কেন বাছাই করা হয়নি, যারা ব্যাংক থেকে পুরস্কার দিচ্ছে লাখ লাখ টাকা, তাদের পরিচয় কী? কেন তারা টাকা ছড়াচ্ছে, এতে জাতির কী উপকার হবে? সাহিত্যের কী উপকার হবে?
পরিকল্পক নেই। যারা পরিকল্পনায় নিয়োজিত তাদের দৃষ্টি অন্ধ। ভাষার জন্য দরদ নেই। গুলশান, বনানী, বারিধারা যেখানে আমার বাস, বাংলায় সাইনবোর্ড নেই বললেই চলে। কেন? কারণ পরিকল্পকরা কখনো এ দিকে দৃষ্টি দেয়নি। ব্যাংককে ইংরেজি নেই, নেই ইন্দোনেশিয়ায়, নেই জাপানে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বাংলাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে ইংরেজিতে। কারণ পরিকল্পকরা ঘুমিয়ে আছে। দেশ পুলিশের অধীনে, ব্যস্ত তারা নগদে। আগামীতে কী হবে, দেশের ছেলেমেয়েরা বাংলায় কথা বলবে কিনা, তার জন্য পুলিশের ঘুম হারাম হবে কেন?
ছেলেমেয়েরা কেন মিশেল ভাষায় ভাব বিনিময় করে। প্রমিত বাংলার চর্চা নেই। টেলিভিশন থেকে হয়েছে উধাও। সব আপনা আপনি হবে? মেলাতে যেতে ভয় পাই। সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ও অজানিত মৃত্যুর হাতছানি। এই কি এগিয়ে চলা? এ নিয়ে কি গর্ব করা চলে? সবাইকে মিলাতে পারছি না, এটাও কি গর্বের ব্যাপার? একে কি বলা চলে স্বার্থকভাবে এগিয়ে চলেছে সবকিছু? একটু থামুন। বিচার করুন উক্তিগুলো কতখানি সত্যি এবং কতখানি ব্যর্থতার গ্লানি এতে মিশে আছে। শহীদদের আত্মত্যাগ বিফলে যাবে না, স্থিরভাবে বিশ্বাস করি, যদি আমরা সত্যনিষ্ঠ হই। হ
