এক হিসেবে খুবই সার্থক এই ক্ষুদ্র জীবন। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্ররূপে ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়ন সূত্রে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সেই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে অংশীদারিত্ব অর্জন কিংবা ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরূপে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় নেমে পড়া সম্ভব হয়েছিল। জীবনবাজি রেখে লেবানন ও সিরিয়ায়, বাংলাদেশের প্রচারকার্য পরিচালনাও সম্ভব হয়েছিল একই সূত্রে।
কিন্তু তারও আগে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৬১ সালে সারা বিশ্বে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হয়েছিল। তখন প্যারিসে সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র অধ্যাপকরূপে আমি পেয়েছিলাম এক মর্যাদার আসন। ফলে আমাকে প্রভাষক রূপে বাংলা ভাষায় কোর্স চালু করার কথা ভাবলেন কর্তৃপক্ষ। বাংলা ভাষার অনুরাগী ছিল ফিলিবের এবং সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর বিশেষ উৎসাহ অবশ্যই ছিল। তাই চালু হয়ে গেল এবং আজ অবধি তা চালু আছে।
বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষা চর্চা চালু থাকার কথা আমি প্রথম জানতে পারি মনোজ বসুর একটি লেখায়। তিনি রুশ দেশ ও চেকোসøাভিকিয়া ভ্রমণ করে জানতে পারেন সেখানে বাংলা ভাষা চর্চার কথা। পরে সেখানকার বিশেষজ্ঞদের সাথে আমার যোগাযোগ ঘটে। তবে বিশেষভাবে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই প্রাগের পণ্ডিত দুশন জভাবিতেলের সঙ্গে। ১৯৬৫ সাল থেকে তাঁর সাথে ঘটে পত্রালাপ। ১৯৭৭ সালে সমূহ বিপদাশঙ্কা সত্ত্বেও আমি প্রথমে গিয়ে তার সাথে দেখা করি এবং একটি সাক্ষাৎকার টেপ করে নিই। তখন তিনি আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। তবু বহু বছর ধরে বাংলা পড়িয়েছেন এবং বাংলা সাহিত্যের বহু গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। ইংরেজিতে তার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। গ্রন্থটি রচনায় আমি তাকে একটু সহায়তা দান করি।
পরে ইউনেস্কো থেকে প্রকাশিত আমার ‘বাংলা মরমি গানের সংকলন’ গ্রন্থের সমালোচনা লিখলেন সেখানকার গবেষক মাদাম হাজা প্লেইন হেলটেরোভা। তখন জানতে পারি সেখানকার কোনো মহিলা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও গবেষণা করছেন।
অন্য দিকে ১৯৬০ প্রথমবার বিলাতে গেলে বাংলার অধ্যাপক ডব্লিউ সি ক্লার্কের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সে সময় তার সাথে আমার সহপাঠী মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ডক্টরেটের গবেষণা করেন। সেখানে তার এক সহকারী ছিলেন, যার নাম এখন মনে পড়ছে না; অথচ তার অনুরোধক্রমে বিবিসি আমার এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এদের দু’জনের অকাল মৃত্যুর পরও উইলিয়াম রাদিচে বেশ কিছুকাল শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা অনুবাদের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ দীর্ঘকাল এক গাড়ি এক্সিডেন্টের কারণে তিনি প্রায় জীবস্মৃত হয়ে আছেন। আমার সময়ে বাঙলা একাডেমি থেকে তার একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়। কয়েক বছর পর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এলে আমি আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই-বিÑ এমে তার একটি বক্তৃতার ব্যবস্থা করেছিলাম। এরপর মাদাম বাংলা পঠন-পাঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার কয়েকটা বই বাংলা একাডেমি থেকেও প্রকাশিত হয়।
মার্কিন মুল্লুকে বাংলা চর্চার ইতিহাস দীর্ঘ ও বিচিত্র। আমরা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে বাংলা ভাষা চর্চার আধুনিক কাল ধরতে পারি । এ সময় থেকে অভিধান ও ভাষা কোর্স প্রণয়ন হতে শুরু করে। ভাষার খ্যাতনামা ব্যক্তিত চার্লস ফার্গুসনের নাম শুনি। হার্ভার্ডের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। অধ্যাপক মুনির চৌধুরী তার সাহচর্যে কিছু গবেষণার কাজ করেন। ১৯৬২ আমি তাকে ওয়াশিংটনে ভাষা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক রূপে দেখতে পাই। সে সময় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. ডিমক বাংলা অধ্যাপনা ও গবেষণায় লিপ্ত থাকেন। ডিমক ক্যান্সার আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম পিএইচডি ছাত্র। সোলায়মান আলী সরকারের অন্যতম পরীক্ষক ছিলেন। তার অনেক ছাত্রের মধ্যে ক্লিন্ট সিলি খ্যাতি অর্জন করেছেন। কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে জোসেফ টি ও কনেশ ধর্মবিষয়ক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় ব্যতিব্যস্ত থাকলেও বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে তিনি অনেক কাজ করেছেন। তার স্ত্রী ক্যাথিও বাংলায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে টরেন্টোতে তারা দু’জনে বেঙ্গল স্টাডিজ কনফারেন্সের আয়োজনকালে আমি সেখানে যোগ দেই এবং জসীমউদ্দীনের ওপর একটি প্রবন্ধ পাঠ করি। পরবর্তী সময়েও জোসেফ টি ও কনেল বহুবার বাংলাদেশে আসেন। একুশ শতাব্দীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক রূপে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তার উদ্যোগে চরেন্টোর নৌ কলেজে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্রনাথের ওপর এক সম্মেলনে আমি দু’টি প্রবন্ধ উপস্থাপনের সুযোগ পাই। এটি ২০১৫ সালের ঘটনা। কিন্তু পরে অকস্মাৎ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বহির্বিশ্বের বহু অঞ্চলে এখন বাংলা ভাষা চর্চা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত সব খবর আমাদের কাছে যথাযথভাবে আসে না। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এ বিষয়ে অনেকটা তৎপর হতে পারে। একবার আফ্রিকার সিয়েরা লিওনের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা ‘বাংলা’ হয়েছিল বলে শুনতে পেয়েছিলাম। এখন কী অবস্থা জানি না। তবে জাতিসঙ্ঘের সামরিক বাহিনীতে আমাদের ব্যাপক অংশগ্রহণে বহির্বিশ্বে বাংলা চালু করার বিশেষ সুবিধা অর্জিত হয়েছে।
১৯৭৮ সালে বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের দেহ ভস্ম আনয়নের জন্য আমরা চীনে গেলে দেখি সেখানে বাংলা ভাষার অনুবাদক ও দোভাষীরূপে যারা কর্মরত তারা দু’ভাগে বিভক্ত। কেউ ঢাকা থেকে বাংলা একাডেমি বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আর কেউ কলকাতা বা শান্তি নিকেতন থেকে বাংলা শিখে গেছেন। বলাবাহুল্য, আমার বক্তৃতার তাৎক্ষণিক অনুবাদক ছিলেন ঢাকার প্রশিক্ষিত একজন।
পৃথিবীর বহু দেশে এভাবে বাংলা চর্চায় ধারা প্রবাহিত। তার সাথে আমাদের যোগাযোগ রাখা দরকার। বিশেষ করে আমাদের সাথে অনুবাদ কোথায় কী হচ্ছে তা জানা প্রয়োজন।
প্যারিস থেকে ১৯৬৮ সালে আমি চলে আসি। ১৯৭৮ সাল থেকে দীর্ঘকাল সেখানে মাদাম ফ্রঁস ভট্টাচার্য অধ্যাপনা ও গবেষণা করেন। অবসর নিয়েও তিনি এখনো অনেক অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ করছেন। বাংলা মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে ২০১৮ সালে আমি সস্ত্রীক তার বাসায় এক অপরাহ্ণ অতিবাহিত করি। ফ্রঁস (তিনি অবশ্য ভারতীয়দের অনুকরণে ফ্রাঁস লিখে থাকেন) প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেটের যে থিসিস জমা দেন তারই কিছু অংশ নিয়ে তার স্বামী ড. লোকনাথ ভট্টাচার্য ‘ঠাকুর মা ও ঠাকুর দাদার ঝুলি একটি পাঠ’ প্রকাশ করেন ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় (১৩ মার্চ, ৩-৪ সংখ্যা, ১-২৮ পৃ.)। উল্লেখ্য, তিনি ইতঃপূর্বে পথের পাঁচালীর ফরাসি অনুবাদ করেছিলেন। তা ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ও জীবনানন্দ দাসের অনুবাদ ছাড়া লালন ফকিরের একটি সঙ্কলনও প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ড. ফিলিপ বনোয়া নামে এক সজ্জন প্যারিসের বাংলা বিভাগ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে আমি সেখানে বক্তৃতা করেছি।