রানী ভবানী, বনলতা সেন এবং কাঁচাগোল্লা খ্যাত নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার উত্তর পূর্বাঞ্চলের একসময়কার প্রবল স্রোতস্বিনী নদীর নাম বড়াল। এই বড়াল নদীর উভয় প্রান্তের বিস্তীর্ণ এলাকার সহজ সরল ও শান্তিপ্রিয় অগণিত মানুষ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীর সদস্য নিধনে। যেসব গ্রামের ছাত্র-যুবক শত্রু নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেসব গ্রামের মধ্যে লক্ষ্মীকোল, পারকোল, মৌখাড়া, খোকসা, মেরীগাছা, সরিষাহাট, চামটা, শ্রীরামপুর, দোগাছি, কুজাইল এবং মাড়িয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাক হানাদার বাহিনী যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছিল অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার বিস্তার ঘটে সারা দেশে। এরই একপর্যায়ে উত্তরবঙ্গের দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান এবং অফিসার উত্তরবঙ্গ চিনিকলের কাছে ওয়ালিয়ার ময়না নামক স্থানে আটকা পড়ে যায়। এ খবর দ্রুত বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়লে অগণিত উৎসাহী মানুষ লাঠি ও বন্দুক নিয়ে সে দিকে ছুটে যান এবং হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। পাক সেনারা যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত হন। আমি ও খবির সরকার তার বন্দুকসহ যুদ্ধ ক্ষেত্রে রওনা দিতে গিয়ে জানলাম যে, যুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা নিহত হয়েছে। যোদ্ধারা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসবে। আমরা ফিরে এসে বাজারে অপেক্ষা করতে থাকলাম বিজয়ীদের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ফিরে এলেন। উৎফুল্ল বিজয়ীদের কারো হাতে নিহত পাক সেনাদের হেলমেট। কারো হাতে বুট জুতা। বড়ালপাড়ের মানুষদের এটাই প্রথম বিজয়। এরপর যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হলে বড়ালপাড়ের বড়াইগ্রাম থানার অনেক ছাত্র-যুবক ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে পাড়ি জমান এবং ট্রেনিং শেষে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে দেশকে হানাদার মুক্ত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যেসব স্থানে এসব যোদ্ধা যুদ্ধ করেছেন তার মধ্যে চারঘাট, সারদা, হান্ডিয়াল, চাটমোহর, গফুরাবাদ, গারফা প্রভৃতি স্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব স্থানে পাকসেনাদের ৩৬ জন নিহত হয়। বড়াইগ্রাম থানার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা হলেনÑ শহীদ শাহজাহান ও আবদুল জলিল। শাহজাহান ছিলেন মুক্তিবাহিনীর থানা কমান্ডার। শাহজাহান বড়াইগ্রাম হাইস্কুলের ছাত্র। বয়সে আমার চেয়ে ছোট। তার অগ্রজ ডাক্তার ঈমান আলী আমার শিক্ষক। তিনি বড়াইগ্রাম হাইস্কুলের শিক্ষক। লক্ষ্মীকোল বাজারে তার একটি ঘর ছিল। যেখানে তিনি হোমিও প্র্যাকটিস করতেন। রোগী দেখতেন। রাতে ঘুমাতেনও সেই ঘরে। বাড়ি মেরীগাছা। স্কুলে চাকরির সুবিধার্থেই ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি আমাদের বাড়িতে রাতে ঘুমাতেন। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চারুকলা অনুষদের শেষ পর্বের অর্থাৎ বিএফএ পরীক্ষার্থী। কিছু দিনের জন্য বাড়িতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আটকা পড়েছিলাম। সেইসব ভয়াল দিনগুলোতে আমার শিক্ষক ঈমান আলীকে প্রায়ই বিমর্ষ দেখতাম। তিনি তার অনুজ মুক্তিযোদ্ধা রায়হান আলী, শাহজাহান আলী, আক্কাস আলী ও আবদুল আজিজের জন্য শঙ্কিত থাকতেন। যুদ্ধকালীন সময় ঈমান আলী স্যারের তিন ভাই নিহত হলেও শাহজাহান জীবিত ছিলেন। ফলে শাহজাহান এলাকার জন্য বেশ কিছু জনকল্যাণকর কাজ করতে সমর্থ হন স্বাধীনতার পরে। তার মধ্যে বড়াইগ্রাম হেলথ কমপ্লেক্স অন্যতম। এই হেলথ কমপ্লেক্স অর্থাৎ হাসপাতাল বড়াইগ্রামে প্রতিষ্ঠার জন্য শাহজাহান বার কয়েক ঢাকায় আসেন। প্রতিবারই ঢাকায় এসে আমার সাথে দেখা করে হাসপাতালের অগ্রগতির কথা জানাতেন। একপর্যায়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার তদবির ও তদারকির ভার আমার ওপর অর্পণ করে বলেন, আপনি তো ঢাকাতেই থাকেন। আমার পক্ষে সব সময় আসা সম্ভব নয়। সুতরাং বাকি কাজগুলো আপনি দায়িত্ব নিয়ে করেন। এরপর ঢাকায় যেসব কাজ বাকি ছিল সেগুলোর সমাধান করে ফাইলপত্র রাজশাহীতে প্রেরণ করি। বাকি কাজ শাহজাহান এবং এলাকার ব্যক্তিবর্গ সমাধান করেন। শাহজাহানের উদ্যোগেই বোনপাড়ার পরিবর্তে হাসপাতালটি বড়াইগ্রামে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, বড়াইগ্রাম আর বোনপাড়ার মধ্যে বহুকাল ধরে প্রতিযোগিতা চলে আসছিল। সেই প্রতিযোগিতায় থানার যাবতীয় অফিস বোনপাড়ায় স্থানান্তর সম্ভব হলেও শাহজাহানের কারণে হাসপাতালটি বড়াইগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাহান বেশি দিন বাঁচতে পারেননি। একপর্যায়ে লক্ষ্মীকোল বাজারের ঘরে গভীর রাতে দুষ্কৃতকারীরা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে শাহজাহান এবং আমার শিক্ষক শাহজাহানের অগ্রজ ঈমান আলীকে হত্যা করে।
জয়বাংলার বলি : বড়াল নদী পাড়ের বড়াইগ্রাম পাইলট হাইস্কুলে একসময় পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ক্যাম্প করে। এ সময় হানাদার বাহিনীর নজর কাড়ে এক পাগল। সে সব সময় ‘জয়বাংলা’ সেøাগান দিয়ে ঘুরে বেড়াত। সেøাগান তার থামত না। পাড়াময় জয়বাংলা সেøাগান দিয়ে ঘুরে বেড়াত। একদিন হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পাগলকে পাকড়াও করে। পাগলকে যত অত্যাচার করে পাগল ততই জয়বাংলা, জয়বাংলা বলে। নির্যাতন করে কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছিল না। ফলে একপর্যায়ে হৃদয়হীন সেনাসদস্যরা পাগলকে হত্যা করে। সেই পাগলকে পরে বড়াইগ্রাম পাইলট হাইস্কুলের মাঠের পশ্চিম উত্তর কোণে দাফন করা হয়। এভাবেই জয়বাংলা বলি হয় সরল মনা অবুঝ পাগল।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল সেøাগানই ছিল ‘জয়বাংলা’। মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জয়বাংলা ‘সেøাগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের ওপর। এমনি জয়বাংলা ধ্বনীতে একদিন আমার ঘুম ভাঙল গভীর এক রাতে। সে সময় আমি বড়াল নদীর ওপর নির্মিত বড়াল ব্রিজের পাদদেশে এক আত্মীয় বাড়িতে। রাতে হঠাৎ বোমার বিকট শব্দ ও জয়বাংলা সেøাগান। জানা গেল মুক্তিযোদ্ধা দামাল ছেলেরা বোমা মেরে বড়াল ব্রিজ ভেঙে ফেলেছে। যাতে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা যাতায়াত করতে না পারে। যেদিন রাতে এ ঘটনা, সে দিন দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা এসব ছেলের সাথে আমার কথা হয় যে বাড়িতে আছি সেই বাড়ির আত্মীয় চাচার শ্বশুরবাড়িতে। দুপুরে খাসি জবাই করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার আয়োজন করা হয়। সেখানেই তাদের সাথে দেখা। তবে বড়াল ব্রিজ ধ্বংসের বিষয়ে তারা সে সময় কোনো কথা বলেনি। পরদিন অর্থাৎ বড়ালব্রিজ ধ্বংসের দিন সকালে আমরা যখন বড়াইগ্রাম যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠেছি তখন ট্রলার ভর্তি পাক সেনারা এসে হাজির। নদীতে পাক সেনাদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে আমরা সেদিন বড়াইগ্রাম যেতে পারলাম না। পরিস্থিতি শান্ত হলে পরদিন আমরা বাড়ি ফিরি। কিন্তু মনে শান্তি নেই। সর্বত্র অশান্ত পরিবেশ। লক্ষ্মীকোল বাজারের হিন্দু পরিবারগুলো ভয়ে বাজার ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। কিন্তু তাদের অনেকে শান্তিপূর্ণভাবে থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে ভারতে পাড়ি জমালেন। যারা থাকলেন তাদের ছেলেদের কেউ আমার স্কুলের সহপাঠী, কেউ বা ছোট ভাইতুল্য। তারাও ভয়ে বাজারে থাকত না। কারণ বাজারের মধ্য দিয়ে পাকা রাস্তা। পাক সেনারা এ পথেই যাতায়াত করে। ফলে তারা ভয়ে আমাদের বাড়িতে অবস্থান করত। আর্মিরা এলে আমরা বড়াল নদী পার হয়ে দূর-দূরান্তের গ্রামাঞ্চলে চলে যেতাম। আর্মিরা চলে গেলে আবার ফিরে আসতাম। আমার বাড়ি লক্ষ্মীকোল বাজার থেকে সামান্য দূরে। ফলে আমরা সে সময় বাড়িতে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। বিকেল হলে বাজারে সকলে জমায়েত হতাম। দূর-দূরান্ত থেকে যারা বাজারে আসতেন তাদের কাছে খবর নিতাম কোন অঞ্চলের কি অবস্থা। একদিন সন্ধ্যায় এক ভারতীয় সেনা প্যারাসুট নিয়ে ভরতপুর অঞ্চলে নেমে এলেন। সেদিনও আমি বাজারেই উপস্থিত ছিলাম। ভারতীয় সেনার আগমনে বুঝতে বাকি রইল না যে, যুদ্ধের অবসান হতে চলেছে। সত্যি সত্যি কয়েক দিনের মধ্যেই এলো সেই কাক্সিক্ষত দিন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ বিজয়ীর বেশে বীরদর্পে রাইফেল উঁচিয়ে ফাঁকা গুলি করতে করতে রাস্তায় বের হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। জয়বাংলা সেøাগান দিতে দিতে সবাই এগিয়ে চলল থানার দিকে। আমরাও তাদেরকে অনুসরণ করলাম। থানা চত্বর লোকেলোকারণ্য। মুক্তিযোদ্ধার সদস্যরা কমান্ডার শাহজাহানের নেতৃত্বে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে জয়বাংলা সেøাগান দিচ্ছিলেন। সেই সুযোগে যারা যুদ্ধ করেননি তাদের কেউ কেউ দলে ঢুকে ঘুরতে ঘুরতে হয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা! উপস্থিত জনতার মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাউকে কাউকে কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিচ্ছিলেন। আমাকে দিতে চাইলে নিলাম না। ভাবলাম আমি তো সরাসরি যুদ্ধ করিনি। যেটুকু করেছি তার জন্য সার্টিফিকেট নিতে পারি না। আমি না নিলেও আমার সাথে থানা সম্ভুনাথ শীল নিলেন। এখনো সে সার্টিফিকেট তার কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের এই সমাবেশ এবং বক্তৃতা প্রদানের মাধ্যমে সবার কাছে স্পষ্ট হলো কারা ৯ মাস অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। জানালো কমান্ডার শাহজাহানের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও। বড়াল নদী পাড়ের এসব অকুতভয় দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখে আমাদেরকে এনে দিয়েছে স্বাধীনতা। উপহার দিয়েছে লালসবুজের গর্বিত পতাকা। আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ। যে বড়াল একদা স্রোতস্বিনী ছিল, যে বড়ালের বুকে ময়ূরপঙ্খী বজরা চলত, যে বড়ালের বুকে বড়ালপাড়ের সন্তানেরা জলকেলি করত সেই বড়াল আজ মৃতপ্রায়। বড়াল আজ জলকল্লোলহীন। বার্ধক্য জরাগ্রস্ত। মৃতপ্রায় আমাদের গর্বের বড়াল, অহঙ্কারের বড়াল নদী আজ মুক্তিযুদ্ধের নীরব সাক্ষী।