স্বাধীনতা একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতাহীন জীবন শুধু কঠিন এবং সঙ্কীর্ণই হয়ে পড়ে তা নয়, বরং অসার ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। সঙ্কটমুক্ত, সভ্য, উন্নত সুন্দর একটা জীবনের জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্য। একটি সার্বভৌম দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য পরাধীনতা যেমন কিছুতেই কাম্য নয়, তেমনি মানুষের কল্যাণের জন্যেই স্বাধীনতারও একটা সীমানা অবশ্যই বিদ্যমান থাকতে হয়। তা না হলে সেই স্বাধীনতা রক্ষকদের মাধ্যমেই হয়ে উঠে একতরফা এবং নানা রকম দোষে দুষ্ট। যা সাধারণ জনগণের জন্য হয়ে পড়ে সঙ্কটপূর্ণ ও ক্ষতিকর। তাই এই স্বাধীনতারও একটা সীমানা এবং প্রয়োগ সঠিকভাবে হওয়া চাই।
আজ আবার নতুন করে স্বাধীনতার সংজ্ঞা জানার প্রয়োজন বোধ হচ্ছে। বর্তমানে মানুষের জীবন যাপনের ধরনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সহজে জানা যায় আমাদের সামাজিক অবকাঠামোর সঠিক চিত্রটি কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। সভ্য, সুশিক্ষিত ও রুচিশীল মানুষ যারা তাদের প্রতিনিয়ত মানসিক মোকাবেলা করে চলতে হয় এই বিপর্যয়। বিজ্ঞাপনময় দেশ উন্ননয়নের কতটুকু সত্যিকারভাবে এই দেশের জনগণের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে পুষ্ট করতে পেরেছে তা স্বাধীনতার এই অর্ধশত বছরে এসে একবার হলেও ভেবে দেখা উচিত। এই দেশের নাগরিকদেরই ভেবে দেখতে হবে, এই দেশের জনগণ আসলে সত্যিকার অর্থে কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে এবং সেই স্বাধীনতার সঠিক রূপরেখা কী।
একজন নাগরিক বা সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি স্বাধীনতা বলতে বুঝি, ‘একটি ভৌগোলিক অবকাঠামোর মাঝে একটি সুশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেখানকার প্রত্যেক নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ভোগ করবে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে নৈতিক উন্নতির সাথে তার বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অন্যায়ের প্রতিবাদসহ তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে।’ স্বাধীন সার্বভৌম যেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকবে ন্যায়বিচার ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা। জনগণ নিরাপদে নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করবে। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন অযৌক্তিক অশালীন বিনোদন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, মুক্তমনার নামে স্লোগান তুলে উগ্র মানসিকতার কিছু দলমতের কারণে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে, সমস্যায় পড়ছে পরিবার থেকে শুরু করে দফতর সমাজের আশপাশের অন্য ব্যক্তিরা। পারিবারিক আদর্শ, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের অপর্যাপ্ততা এবং অযোগ্যতা বা এর সঠিক প্রয়োগে বাধা এই সঙ্কটকে যে আরো বেশি হারে ত্বরান্বিত করছে, তা বলার লোক নেই। অল্পসংখ্যক যারা আছে তারাও মিনমিনে আওয়াজে মাঝে সাঝে উঁকি দিলেও ভেতরে বাইরে অসহায় বোধ করে বৈকি।
স্বাধীনতা অর্জন কোনো কালে, কোনো ক্ষেত্রেই সহজ ছিল না, এখনো নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কাজ সব সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হয়তো স্থান-কাল পাত্র ভেদে এর ধরনটা ভিন্ন ও কম বেশি হয়ে থাকলেও তা অর্জনটা কঠিনই হয়। তবু সত্য ও ন্যায়ের ধারক বাহকরা তা অর্জন লক্ষ্যে থেমে যান না, তারা এগিয়ে চলেন। বিবেকসম্পন্ন জনগণ সত্য ও ন্যায়ের সাথে থাকেন এবং কখনো কখনো ত্যাগ স্বীকার করে বৈষম্য নিপীড়ন ও অন্যায় অসভ্যতাকে প্রতিহত করে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করেন। যেমনটা উনিশ শ’ একাত্তরে প্রতিহত করেছিল আমাদের বীর সেনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনগণ। একটা দেশ স্বাধীন করা যতটুকু না কঠিন, তার চেয়ে কঠিন হচ্ছে সেই স্বাধীনতার লক্ষ্যকে জিইয়ে রেখে সেই দেশে নৈতিকতার সাথে জনগণের জন্য কল্যাণকর সভ্যতাকে বাস্তবায়ন করা।
আমাদের স্বাধীনতা চেতনার একটি মূল বিষয় ছিল বঞ্চনামুক্ত সমাজ গঠন এবং অন্যায় ও বৈষম্যের অবসান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের বাবা-দাদাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা যেন পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। শোষণ নিপীড়ন বৈষম্যের শাসন বিছিন্ন হলেও এর লক্ষ্য বিচ্চুতি ঘটেছে। এই স্বাধীনতা যেন শুধুই রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর স্বাধীনতা আর জনগণের শর্তসাপেক্ষ স্বাধীনতা। প্রায় সব অপরাধ সংঘটিত হয় নীতিহীন, দুনিয়ার বস্তুলোভী, আকাশচুম্বী উচ্চাকাক্সক্ষা ও বিবেকবর্জিত মানসিকতা থেকে। এমন মানসিকতার কেউ যদি তার ইচ্ছা পূরণের সুযোগ বা ক্ষমতা পেয়ে যায় তা হলে সে হয়ে উঠে আগ্রাসী। আর সেখানে যদি জবাবদিহিতার ভয় না থাকে অথবা থাকে অবাধ স্বাধীনতা তা হলে সে হয়ে উঠবে স্বেচ্ছাচারী অত্যাচারী শোষক। তখন সব খানেই একটা অরাজকতা ও ঔদ্ধত্য ভাব বিরাজ করে। এই লাগামহীন স্বাধীনতা তখন সমাজকে স্বেচ্ছাচারিতা বা অনৈতিকতা ছাড়া আর কী দিতে পারে? শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত নীতি ও এর প্রয়োগে স্বাধীনতা টিকানো যায় না। জনগণের সেবার জন্য কোনো একটা উঁচু পদ অর্জন করে যা খুশি তা করে যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার করার কেউ অধিকার রাখে না, তেমনি বাকস্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা সঙ্কোচনও জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতা হরণেরই নামান্তর। সভ্য ন্যায় সুন্দর সমাজের জন্য যেমন স্বাধীনতা অপরিহার্য তেমনি সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্যই ধর্মীয় অনুশাসনের বিকল্প কিছু নেই।
এই কষ্টার্জিত আমাদের স্বাধীনতাকে কোনো দল বা কেউ তার নিজস্ব সম্পদ মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এই দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নৈতিক সভ্যতা বাস্তবায়নের জন্য ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। সুস্থ স্বচ্ছ চিন্তা, পাপমুক্ত জীবন চর্চা, সভ্য সমাজ গঠন, দেশ ও দশের কল্যাণকামী বিবেক সম্পন্ন মানবসম্পদ আসে পরিশুদ্ধ ধার্মিকতার মাধ্যমে। এটা যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝব, ততই আমাদের মঙ্গল।
