আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা, ফুল তুলিতে যাই
ফুলেরমালা গলায় দিয়ে, মামার বাড়ি যাই।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে, আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি, রঙিন করি মুখ।

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের এই কথা থেকেও আম জাম কাঁঠালের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। যদি গাছ থেকে কোনো আম থপ করে পড়ে আর সেটা সংগ্রহ করতে শিশু লোভ করবেই। করতে বাধ্য! ঠাসা ঠাসা আম টসটসে জাম লিচু কে না ভালোবাসে! আর যদি ফলগাছে ভরপুর মামার বাড়ি থাকে তাহলে তো কথাই নেই। অনায়াসে গাছে ওঠে গাছাম জাম খাওয়া- এ তো আনন্দের বিষয়! সেই সাথে কাঁঠালের লোভনীয় ঘ্রাণ মাতাল করে। বাংলার আরেক শ্রেষ্ঠ কবি লিখেছেন-
আম্মু বলেন পড়রে সোনা
আব্বু বলেন মনদে
পড়ায় আমার মন বসে না
কাঁঠাল চাপার গন্ধে।
আল মাহমুদের এই কথা থেকেও বুঝা যায় বাংলার ফলফলাদির আকর্ষণ। শুধু কী আকর্ষণ, পুষ্টিগুণেও ভরপর। এই যে আমাদের জাতীয় ফলের কথাই ধরা যাক! তার কোনো অংশই ফেলনা নয়। বিচির স্বাদ আলাদা এক পুষ্টিতে ভরা। তরকারি হিসেবেও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। তার চামড়া পশুদের শ্রেষ্ঠ খাবার। এ ছাড়া পৃথিবীর যত ফল আছে কাঁঠাল আকারে সব ফলের চেয়ে বড়। তাই তো মন থেকেই চলে আসে-
সকল দেশের ফলের চেয়ে
কাঁঠাল সবার বড়ো
সে তো আমার জাতীয় ফল
গর্ব সবাই করো।
আমের কথা শুনলেই প্রথমেই মনে আসে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম। তবে এই দু’টি জেলা ছাড়াও রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা এবং বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলোতেও প্রচুর আমের ফলন হয়। যা বেশ ভালো মানের এবং স্বাদের। ইদানীং খাগড়াছড়ির মতো পাহাড়ি এলাকাতেও বিস্তর আমের ফলন হচ্ছে। বগুড়ায় হরেক রকমের আমের ফলন হয় প্রায় শতাব্দীকাল আগে থেকেই। সেটা পঞ্চাশের শেষ ও ষাটের দশকের কথা। এই আধুনিক পদ্ধতিতে অনেক চাষ। শহরেও ছাদে ছাদে বা ছাদ বাগানের আম পাওয়া যায়।
আমাদের দেশেই হরেক প্রজাতির আম রয়েছে। ইউরোপ আমেরিকার আপেলের নাকি কমপক্ষে ৩০০ ধরন রয়েছে। সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আমের ধরন এর থেকে কম নয়। বেশি হবে বৈকি! এ থেকেই বুঝা যায় আম অনেক প্রজাতির আছে। এখন চলছে হিমসাগর, গোপাল ভোগ, রাণী প্রসাদ এবং লক্ষণ ভোগ জাতের আম। এছাড়া ল্যাংড়া, আম রূপালী ও ফজলি এবং আশ্বিনা আসবে জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুতে।
লিচুর কথা মনে হলেই টসটসে রসের কথা মনে হয়ে যায়। লিচু একটি নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের সুস্বাদু রসালো ফল। এ ফলটি সুস্বাদু ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর আদি নিবাস চীনে। বর্তমানে বিশ্বের বহু স্থানে লিচু চাষ করা হয়। এ ফল বাংলাদেশের সব স্থানেই কিছু না কিছু হয়ে থাকে। তবে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের লিচু প্রসিদ্ধ। এই এলাকার মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু আকারে বেশ বড় হয় এবং আকার ও সুস্বাদের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়। গ্রীষ্মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফল লিচু। এর আকর্ষণীয় টানে শিশুমন স্থির থাকতে পারে না। কী বিশ্বাস হয় না! তাহলে জাতীয় কবি নজরুলের লিচুচোর কবিতা থেকে ঘুরে আসা যাক-
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি...

তারপর কী হলো! সেটা সবারই জানা। এভাবেই আমাদের দেশজ ফল ফলাদি সবার নজর কাড়ে। এখন গ্রীষ্ম ঋতু মৌসুম। এর দ্বিতীয় মাস জ্যৈষ্ঠ। জ্যৈষ্ঠকে অনেকে আঞ্চলিক ভাষায় সব মাসের জেঠা বলে। দিন বা দিবসের দীর্ঘতার দিক থেকেই এর নামকরণ। ফলে এই মাসের ফল ফলাদি খাওয়া যায় ইচ্ছে মতো। তার আরেকটি বহুল প্রচলিত নাম আছে। আর সেটি হলো মধুমাস। আম জাম কাঁঠাল বা লিচুর সাথে সাথে আনারস, তরমুজ, ঢেউয়া, লটকন, কালোজাম, গোলাপ জাম, বেতফল, গাব, জামরুল, আতাফল, কাউ, শরিফা ও পিয়ারাসহ নানান ফল দেখা যায়। এই ফলগুলো মধুর মতো সুস্বাদু বলেই কেউ কেউ এর নাম দিয়েছে মধুমাস। এই মাসের স্বাদ মানুষের মুখে মুখে ফলাও হয়ে ঘুরতে থাকে। এই চর্চাটা শুরু হয় আশির দশকে। এ ছাড়া মধুমাস যায় যায় করার সময়ও হেসে উঠবে কামরাঙা, সফেদা, গাব ও আমড়া। তারাও তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে মানুষকে আকর্ষণ করে।
এ তো গেল ফলফলাদির কথা! এ সময়ে প্রকৃতিরও নানারূপ পাওয়া যায়। কখনো রোদ, কখনো মেঘ, কখনো শুধু বৃষ্টি। বৃষ্টিরও বিভিন্ন রূপ। এক পশলা বৃষ্টি, ঝুম বৃষ্টি আর মুষল ধারার বৃষ্টি। সাথে আবার বজ্র বা ঠাডার আনাগোনা থাকে। সেই সাথে আবার করোনার সময়! এগুলো মাথায় রেখেই আমাদের মধুমাসকে গুরুত্ব দিতে হবে।