তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি। বয়স আর কত হবে? পাঁচ। আমি তখন দুধ-ভাত খেতে খুব পছন্দ করতাম। প্রতিবেলাই খেতাম। এক বেলা যদি না পেতাম, তবেই কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম। তখন মা আমাকে বাধ্য হয়েই দুধ-ভাত খেতে দিত। এ জন্য আমার বড়বোন আমাকে ‘দুধ পাগলা’ বলে ডাকত।
একদিন দুপুরে খাটের ওপর বসে দুধ-ভাত খাচ্ছিলাম। হঠাৎ নিচে একটা বিড়ালছানা দেখতে পেলাম। কিন্তু বিড়ালছানাটি খুব শুকনো ও রোগা ছিল। হয়তো অনেক দিন ধরে খেতে পায়নি। তাই সে আমাকে দেখেই চিকন সুরে ‘মিউ মিউ’ করে ডাকা শুরু করল। এতেও যখন কাজ হলো না, তখন সেই ছানাটি খাটের ওপর লাফিয়ে উঠল। আর আমার হাত ডিঙিয়ে খাবারের প্লেট থেকে দুধ-ভাত খেতে চাইল। আমার তখন জেদ চেপে যায়। ইস! কত্তোবড় সাহস! আমার খাবার থেকে ভাগ নিতে চায়। তাই বিড়ালছানাটিকে ধাক্কা দিয়ে খাট থেকে নিচে ফেলে দিলাম। তবুও ছানাটি নিচে বসে ‘মিউ মিউ’ করে ডাকছিল। সেই বিড়ালছানাটির চোখে তখন ছিল পানি। আমার খুব মায়া হলো। তাই কিছু দুধ-ভাত একটা থালায় করে খেতে দিলাম। এতে সে খ্বু মজা করে খেল। আমিও তার সাথে পাল্লা ধরে খেলাম। এভাবেই প্রতিদিন তাকে খেতে দিতাম। সে-ও খেত, আমিও খেতাম। সেই ছানাটি সারা দিন আমাদের বাড়িতে থাকত। আমার কোলের মাঝে বসে থাকত। আমারও তাকে খুব ভালো লাগত। এভাবে সে আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। তাকে ছাড়া আমার ভালো লাগত না। তাই সবসময় তার সাথে থাকতাম। আমাদের বাড়ির সব তেলাপোকা, ইঁদুর দৌড়ে দৌড়ে ধরত আর গপাগপ গিলে ফেলত। সে যখন ওসব শিকার করত, তখন আমিও তার পেছন পেছন ছুটতাম। এতে সে খুব আনন্দ পেত আর বেশি ছোটাছুটি করে শিকার ধরত। এমন করেই সেই বিড়ালছানাটি বড় হচ্ছিল। একদিন আমাদের বাড়িতে সেই বন্ধু বিড়ালছানাটি দুধ-ভাত খেতে আসেনি। তখন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তার কোনো বিপদ হলো নাতো? আমার শিশু মন বন্ধু হারানোর ভয়ে হো হো করে কেঁদে উঠল। এক দিন যায়, দুই দিন যায়, তার কোনো খোঁজ নেই। তাই একদিন আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, যদি তাকে পেয়ে যাই! এই আশায়।
হঠাৎ আমার বিড়াল বন্ধুটিকে রাস্তার পাশে এক মরা ডোবায় দেখতে পেলাম। এতে আমি খুব খুশি হয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আমার বন্ধু বিড়ালছানাটি তখন বেঁচে নেই। কারা যেন তার গলায় রশি বেঁধে ফাঁস লাগিয়ে দিয়েছে। আমি তাকে নাড়া দিয়ে বন্ধু! বন্ধু! বলে ডাকলাম। কিন্তু সে আমাকে তাকিয়ে দেখলোও না। কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, আর উঠবে না! আমি বন্ধু হারিয়ে কাঁদতে থাকলাম।