আয়ানদের বাড়ির পাশেই একটা বিশাল বড় পুকুর। পুকুরের দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে অনেক বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরনো সুপারি গাছ। সুপারি গাছটা অনেক লম্বা। গাছটার পাতাও বেশি নেই। ক’টা পাতা নিয়েই নিজেকে আঁকড়ে ধরে আছে। এখন আর বেশি সুপারি আয়ানদের দিতে পারে না। গাছটাকে অনেকবার কাটতেও এসেছিল আয়ানের বাবা। আয়ানের জন্যই কাটতে পারেনি। গাছটা আয়ানের খুব প্রিয়।
একদিন দুপুরবেলা গাছটা নীরব ছিল। হঠাৎ কোথায় থেকে দানবের মতো উড়ে এসে গাছটার বুকে বসল একটা কাঠঠোকরা। সাথে সাথে চমকে উঠল সুপারি গাছ। কোনো বলা কওয়া নেই কাঠঠোকরাটার। তার লোহার রডের মতো ঠোঁটটা দিয়ে গাছটার বুকে ফুটো করতে থাকল। সুপারি গাছ ব্যথায় কান্না করতে লাগল।
কাঠঠোকরাকে মিনতি করে সুপারি গাছ বলল, ‘দয়া করে আমার শরীরে ফুটো করো না। তা-না হলে আমি মরে যাব।’
সুপারি গাছের কোনো কথাই কানে দিলো না কাঠঠোকরা। সে আপন মনে গাছটার বুকে ফুটো করেই চলল।
কাঠঠোকরা বলল, ‘চুপ থাক তো বুড়ো গাছ। আমাকে আমার কাজ করতে দে।’
এই বলে সে আরও বেশি করে শক্তি দিয়ে ফুটো করতে থাকল। একপর্যায়ে সুপারি গাছ কান্নায় ভেঙে পড়ল। সুপারি গাছের কান্না শুনতে না পেরে কাঠঠোকরা উড়ে চলে গেল। এ দিকে সুপারি গাছ ব্যথার যন্ত্রণায় ছটফট করছে তখনো।
এভাবে বেশ কিছু দিন চলে গেল। সুপারি গাছটা আগের থেকে এখন অনেকটা সুস্থ হয়েছে। ওদিকে কাঠঠোকরা পড়েছে মহাবিপদে। দুষ্টু ছেলেরা তার পিছু নিয়েছে। যেখানেই তাকে দেখতে পাচ্ছে সেখানেই গুলতি দিয়ে মারার জন্য তেড়ে আসছে।
একদিন কাঠঠোকরা আমগাছের ডালে ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎ তার কানের কাছ দিয়ে কি যেন সাঁই করে চলে গেল। চোখ খুলতেই দেখতে পেল দুষ্টু ছেলেরা তার দিকে গুলতি ছুড়ছে। এডাল থেকে ওডালে উড়তে থাকে। তবুও দুষ্টু ছেলেরা তার পিছু ছাড়ে না। এ দৃশ্য দেখে দূর থেকে সুপারি গাছ ডাক দিয়ে বলল, ‘কাঠঠোকরা বন্ধু আমার কাছে এসে লুকাও। নইলে দুষ্টু ছেলেরা তোমাকে মেরেই ফেলবে।’
কাঠঠোকরা তাড়াতাড়ি সুপারি গাছের বুকের মাঝে ঢুকে পড়ল। সুপারি গাছটা অনেক লম্বা দেখে ছেলেগুলো সুপারি গাছে উঠল না। তারা চলে গেল। বেঁচে গেল কাঠঠোকরার প্রাণ।
সুপারি গাছ কাঠঠোকরাকে ডেকে বলল, ‘বন্ধু বের হয়ে এসো। দুষ্টু ছেলেরা চলে গেছে।’
কাঠঠোকরা বাইরে বেরিয়ে এলো। বের হয়েই হাতজোড় করে সুপারি গাছের কাছে ক্ষমা চাইল। আর বলল, ‘আমি তোমাকে আহত করেছি আর তুমিই আমার জীবন বাঁচালে?’
সুপারি গাছ হেসে বলল, ‘আমাদের কাজই তো সবার উপকার করা। চিরদিন সবার উপকার করেই যাবো।’
এ কথা শুনে কাঠঠোকরার চোখ ভিজে উঠল।
সুপারি গাছ বলল, ‘এখন থেকে তুমি আমার এখানেই থাকবে। আমরা দু’জন আজকে থেকে বন্ধু। আর সেই থেকেই সুপারি গাছ আর কাঠঠোকরা একসাথে থাকতে শুরু করল।