বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হলো দেশটি। এক বুক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে স্বাধীন করেছে দেশ। যদিও এরই মধ্যে এর বয়স পঞ্চাশটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে; তার পরও মনে হয় এত স্বল্প সময়ই বটে একটি দেশ ও জাতির জন্য। অথচ এ স্বল্প পরিসর সময়ের মধ্যেই কত না ঘটনা ঘটে গেছে। কত দুঃখকষ্টের কালস্রোত বয়ে গেছে বাংলাদেশ নামক ছোট দেশটির ওপর দিয়েÑ সেসবের সংখ্যা ও নেহায়েত কম নয়। তবে ছোট এ দেশটির ওপর এত ঘটনা কেনো ঘটেছেÑ তার হিসাব নিলে বুঝতে কষ্ট কমই হয়। আয়তনে ছোট তবে বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যে অপার সম্ভাবনার একটি ছবির মতো দেশ বাংলাদেশ। অর্থবিত্ত ও প্রাচুর্যে সীমিত যদিও তবে এ দেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুসমৃদ্ধ, উন্নত এবং আকষর্ণীয়-এতে সন্দেহ নেই বিন্দুমাত্র। এ দেশের জনসংখ্যা বিপুল কিন্তু উঠতি জনগোষ্ঠীর মেধা ও প্রতিভা সে তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের নয়; বরং বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ ও অ্যাকাডেমিক মাপ কাঠিতে তা উচ্চ পর্যায়েরই বটে। তবে নতুন প্রজন্মকে যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি কাজে লাগানো যায়, তবে এ দেশ হতে পারে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য একটি চমৎকার কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। সারাবিশ্বে একটি দৃষ্টান্তমূলক দেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। এটি একদম নিঃসন্দেহ ও নির্জলা সত্য। অন্য দিকে বাংলাদেশ ছোট্ট কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে অপার সম্ভাবনাসহ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে এ দেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রয়োজনে অনেকের নিকটই গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে বিধায় শকুনিদের শ্যেন দৃষ্টিরও আওতায় পড়ে গিয়েছিল; ফলে স্বাধীনতার স্বল্পকালীন সময়েই অনেক ঘটনা এবং দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ।
অবাঞ্ছিত যতসব ঘটনার পেছনে নিশ্চিতভাবে কলকাঠি নেড়েছেন আমাদের যারা বন্ধু সেজেছেনÑ সেসব মহাজনরা যারা আমাদের ভালো-মন্দের খবরাখবর নেয়ার প্রচণ্ড গরজ অনুভব করেন সর্বক্ষণ। আমাদের স্বার্থের চেয়ে তাদের স্বার্থ ও প্রয়োজন অত্যধিক বিধায় আমরা তাদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছি। তবে চিরদিন আমরা দাবার ঘুুঁটি হয়েই বেঁচে থাকব কি নাÑ সে বিবেচনা ও আত্মসমালোচনার সময় এখন সমুপস্থিত। সুতরাং আমাদের দেশের সব বিবেকবান মানুষের নিকট সবিনয় নিবেদনÑ আসুন দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসি। দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও দশের জন্য আত্মনিয়োগ করি সর্বান্তকরণে। দেশকে ধাপে ধাপে আরো উন্নতকরণের অভিযানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। কোনো অপশক্তিই যাতে আমাদের দেশকে নিয়ে তালবাহানা করার সুযোগ না পায়, সে দিকে কড়া দৃষ্টি রাখি। আমরা কারো হাতের পুতুল হতে চাইনে। চিরকাল যেন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ছায়াতলে অবস্থান করে দেশকে আরো বেশি ভালোবেসে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হইÑ এ জন্য যার যেখানে যতটুকু শ্রম ও মেধা প্রয়োগ অত্যাবশ্যক, তা দেয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে কোনো সামান্যতমও ছাড় নেই। দেশের প্রয়োজনে ইস্পাত কঠিন শপথে এগোতে হবে। সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়েÑ সব ভেদাভেদ পরিহার করে আজ সময় এসেছে দেশকে জাতিকে আরো এগিয়ে নেয়ার মহাকর্ম যজ্ঞে অবদান রাখার। ধর্ম-জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে তুচ্ছসব ব্যবধান ভুলে গিয়ে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তবেই আমাদের দেশকে বিশ্বের কেউ আর দাবিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না; বরং ধীর ধীরে উন্নত দেশরূপে আত্মপ্রকাশের সুযোগ যেন সৃষ্টি হয়। তার জন্য একদম ঠাণ্ডা মাথায় যার যার অবস্থানে অবস্থান করে স্ব স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অপরিসীম শ্রম সাধনা করতে হবে। পেছনে ফিরে তাকানোর সময় ও সুযোগ কোথায়? বিশ্বের প্রায় সব দেশ রাষ্ট্রের জনগণ এ ধরনের কর্মযজ্ঞে অংশ নিয়ে তাদের দেশকে উন্নত করছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তা হলে আমরা কেন হবো না আগুয়ান অগ্রসর? পিছিয়ে থাকার সময় কি আর আছে? যেহেতু নেই, সেহেতু আর নয় দ্বিধা-সঙ্কোচ, নয় অলসভাবে সময় বিনষ্ট করার সুযোগের ব্যবহার করা। বিশ্বের অনেক দেশই অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে সম্মিলিত বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে তাদের দেশগুলোকে অপূর্ব দক্ষতায় সুসজ্জিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা পারব না কেন? অন্যরা যদি পারে আমরা কিসের অভাবে পিছিয়ে থাকব অন্যদের চেয়ে? আমাদের কি নেই? সবই আছে তবে সততার অভাব যে খুবই বেশি ও প্রকটÑ এইটে অস্বীকার করব কেমন করে? অসততার মহাব্যাধি আমাদের জাতীয় জীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে এটি তো অসত্য নয়! তা না হলে পৃথিবীর বেশ ক’টি দেশ সততার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে তাদের পিছিয়ে পড়া দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা কেন পারব না? পারতেই হবে। এ পারার জন্য আসলে দরকার সৎ নেতৃত্বের। সৎ নেতৃত্বের অভাব পূরণ হলে বেশি সময় লাগবে না বাংলাদেশকে একটি অতি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সততার সবক গ্রহণের জন্য বেশি প্রয়োজন নৈতিকতার শরণাপন্ন হওয়া। নৈতিকতা যথাযথ ধর্মীয় অনুশাসন ছাড়া অন্য উৎস থেকে গ্রহণ একদম আত্মঘাতী বলেই প্রমাণিত হবে। ধর্মকর্ম বাদ দিয়ে বস্তুবাদী ও সেকুলার মতাদর্শ হতে যদি পাঠ গ্রহণ করা হয় তবে আমও যাবে ছালাও যাবে; বরং সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা শতভাগ।
সুতরাং এটি শতভাগই সত্য বিশ্বের যে দেশ বা জাতিই উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছেÑ সবাই তাদের ধর্মতত্ত্ব দর্শন হতেই সততার পাঠ গ্রহণ করেছে। বিশেষভাবে নেতৃত্বকে হতে হয় সততার মূর্ত প্রতীক। আর যারা সততাকে বিসর্জন দিয়ে দেশ ও রাষ্ট্রকে পরিচালিত করেছেÑ তারাই ধ্বংস ও বিনষ্ট হয়েছে। ইতিহাসে তারা চরমভাবে নিন্দিত ও ধীকৃত হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আমরা হারিয়ে যেতে চাইনে; বরং সর্ব দিক দিয়েই এগিয়ে যেতে চাই সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমে; যারা দেশকে কলুষমুক্ত করে, অসততার মূল ধরে টান দিয়ে সব কুহেলিকা, অসাধুতা ও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে দিয়ে দেশ ও জাতিকে আবিলতা মুক্ত করতে সক্ষম হবে। দেশকে স্থায়ী ও টেকসই স্পৃহা ও প্রণোদনা উপহার দিতে সমর্থ হবে। তবেই এগিয়ে যাবে দেশ। এগিয়ে যাবে আমাদের জাতি। আমরা সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই। সততার সাথে বাঁচতে চাই। নৈতিকতার সাথে বাঁচতে চাই। এ ছাড়া আমাদের সৌন্দর্য ও সাফল্য নেই।