নারী ও পুরুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতায়ই সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। উভয়ের সহযোগিতায় আসে সমৃদ্ধি, বিরোধ বা সর্বনাশ। সমগ্র পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। জাতীয় উন্নতির কাজ নারীকে বাদ দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাহিত্য বিজ্ঞানে নারীর অসামান্য অবদান রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-প্রজ্ঞায় নারী সমাজ পিছিয়ে নেই। দেশ বা জাতি গঠনে যদি নারীকে পেছনে ফেলে রাখা হয় তবে সে জাতি কখনোই উন্নতি করতে পারবে না।
আশার কথা, নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে। নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের অন্যতম দেশ বাংলাদেশ। ঘর থেকে বাহির এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ঘর সংসার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে তথা সব ক্ষেত্রেই নারীরা অপরিসীম ভূমিকা রাখছে। নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অগ্রণী। পুরুষের পাশাপাশি সব কাজে, খেলাধুলায় নারীরা অংশগ্রহণ করছে। নারী পর্বত জয় করেছে। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে অন্যান্য দেশের মধ্যে বংলাদেশ এগিয়ে আছে।
হার্ভার্ড ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ বিপোর্টে রাষ্ট্র ক্ষমতায়নে নারীর অবস্থান বিবেচনায় বিশ্বের এক নম্বরে উঠে আসে বাংলাদেশের নাম।
জাতিসঙ্ঘের ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করে বাংলাদেশ এখন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনের পথে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যার অন্যতম ধাপ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে পরপর দুই মেয়াদে নির্বাচিত হলেন একজন নারী। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীর, নৌবাহিনীর মতো সশস্ত্র পদে কাজ করছে নারীরা। কেবল সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে নয়, নারী আজ সব ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর পরিচয় দিয়েছে। সর্বশেষ বিজিএমইএ নির্বাচনে একজন নারীই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।
বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস শুরু হয়েছিল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের হাত ধরে। তার দেখানো পথে হেঁটে আমরা যেটুকু করতে পেরেছি তা নগণ্য নয়।
মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষের ব্যবধান নেই। মানবিক সভ্যতা ও মানবিক মূল্যবোধের উৎসমূলে নারীর অবস্থান সুদৃঢ়। নারী ব্যতীত পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ কল্পনা করা যায় না। তাই সমাজের নারী-পুরুষ প্রত্যেক মানুষের নিজেকে বিকশিত, ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত করে গড়ে তোলার সর্বজনস্বীকৃত অধিকার রয়েছে। এ অধিকার ব্যক্তি কোনো সমাজের বা দেশের নাগরিক হিসেবে সাংবিধানিকভাবে প্রাপ্ত হয়। সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেশের মানুষ নিঃশর্ত ও বাধাহীনভাবে মৌলিক অধিকারসহ আত্মবিকাশের সব অধিকার ভোগ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাধাবিপত্তি এলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয় এবং দেখা দেয় ন্যায্যতার সঙ্কট।
সমাজ সংসারে ও বৃহত্তর সভ্যতা বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সমান গুরুত্ব সম্যকভাবে বুঝাতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত একটি গাড়ির দুটি চাকার ভূমিকার কথা বলেছিলেন। গাড়ির একটি চাকা বিকল হলে গাড়িটি চলার কোনো সামর্থ্য রাখে না। তেমনি নারীকে বাদ দিয়ে কিংবা তাকে পিছিয়ে রেখে কোনো দিন জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দুঃখের বিষয়, সামাজিকভাবে নারীকে এখনো মনে করা হয় ুদ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে। এখনো একজন কন্যাশিশুকে হতে হয় নানামুখী অবহেলা ও নিগ্রহের শিকার। সমাজে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও নির্যাতনের চিত্র দেখে আমরা শঙ্কিত। নয় মাসের কন্যাশিশুটিও ধর্ষণের নির্মমতা থেকে রেহাই পায়নি। এসব ঘটনায় নারীর যে জীবন বিপর্যয়, তা কি নারীর ক্ষমতা বা উন্নয়নকে সত্যিই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়? রয়ে গেল প্রশ্ন।
কৃষি, শিল্প, ব্যবসায়- সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ আশা জাগানিয়া। কিন্তু এ শ্র্রমের সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে কিনা সে প্রশ্ন রেখে যাই সমাজের কাছে। বেশির ভাগ নারী আজ পোশাক শিল্পে শ্রম দিচ্ছে। তার পঁচিশ শতাংশ নারী যৌন হয়রানিসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, নারী-পুরুষ বৈষম্য, স্বীকৃতিবিহীন নারী শ্রম, পারিবারিক বোঝাপড়ার অভাব সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা সর্বাধিক অবহেলিত।
নেপোলিয়ান বলেছিলেন, তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেবো। এ কথাটি কারো অজানা নেই। তবে তার ভেতরের সত্যিটা হয়তো কেউ ভালো করে বুঝতেই পারেনি। তাইতো সমাজে নারীদের এখনো কেউ সম্মান দিতে শেখেনি।
মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে, নারীমুক্তির পথে শিক্ষার বিকাশই একমাত্র উপায়। এ কথাও সবার জানা। তবুও নারী সমাজের একটি বড় অংশ আজ লক্ষ্যহীন, সংসারের জালে আবদ্ধ, পাষণ্ড হাতের অত্যাচারে জর্জরিত, শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত, বাল্যবিয়ের শিকার, রক্ষণশীলতার আবদ্ধে আড়ষ্ট এবং লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতলে।
হয়েছে নারী উন্নয়ন, হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন। তা মিথ্যে নয়। কিন্তু সঙ্কট রয়ে গেল অনেক। রয়ে গেল নারী-পুরুষ সম্পর্ক ও ন্যায্যতার সঙ্কট, নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা, নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা, নারীর প্রতি সামাজিক অসঙ্গতিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি ও চিত্রজগতেও নারীর অবমূল্যায়ন, কর্মক্ষেত্রে নারীর অমর্যাদা ও নিরাপত্তাহীনতা, নারীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা।
মানুষ যত শিক্ষিত বা সভ্য হচ্ছে ততই যেন অসভ্যতাও বেড়ে যাচ্ছে। সমাজে কিছু কিছু খারাপ রীতি এখনো বিদ্যমান। ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সেসব রীতিনীতি সমাজে বহুদিন ধরে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। তার মধ্যে যৌতুক প্রথা বিশেষ অগ্রগণ্য। এই অমানবিক প্রথা মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে। বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা। নিয়ে আসছে মানব জীবনে বিপুল দুঃখ দুর্দশা। ধনীদের বেলায় এই প্রথা একটি শৌখিনতা বা বিলাস। কিন্তু দরিদ্রের জন্য এটা একটি অভিশাপ। ধনীরা ইচ্ছে করেই মেয়ে বিয়ে দেয়ার সময় বাড়ি গাড়ি পর্যন্ত দিয়ে থাকে।
ধনীদের দেখাদেখি সমাজে সর্বস্তরে যৌতুক বাধ্যতামূলক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সাধ্য থাক আর না থাক যৌতুক দিতেই হবে। কঠোর আইন আছে, সমাজের ঘৃণাও আছে। তবুও দুষ্ট ক্ষতের মতো যৌতুক প্রথা সমাজজীবনে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে আছে। যৌতুকের জন্য কত নিরপরাধ নারীর জীবন যে বিসর্জন দিতে হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যেন মেয়েরা পৃথিবীতে এক মহা অভিশাপ মাথায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মই যেন তার আজন্ম পাপ। যৌতুকের পরিমাণ সন্তোষজনক না হলেই নিরপরাধ বধূকে অসহ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়। পরিত্যক্তা হতে হয়, এমনকি জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়। আমাদের সমাজে অহরহ এরূপ হাজার হাজার গৃহবধূ স্বামী শ্বশুর ও শাশুড়ির নির্যাতনে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ ঘটনা আমাদের গ্রামেই ঘটতে দেখেছি।
যে গৃহবধূ স্বামীর কাছে সোহাগ স্নেহ ও ভালোবাসা পাওয়ার কথা সেই আজ যৌতুকের কারণে লাঞ্ছনা গঞ্জনা তিরস্কারসহ শত সহস্র যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। যৌতুকের ভার যত বেশি কন্যার সমাদরও তত বেশি, এমন একটা প্রত্যাশা মাতা-পিতাকে উদ্দীপ্ত করে। যৌতুকের পরিমাণের সাথে সাথে পাত্রের যোগ্যতার সম্পর্কও বিদ্যমান। আবার কন্যার যোগ্যতার অবলুপ্তির জন্য যৌতুক শূন্যস্থান পূরণে সহায়তা করে। যৌতুকের সুযোগ আছে বলেই উত্তম পাত্র ধরার ফাঁদ হিসেবে তা ব্যবহার হয় অনেক ক্ষেত্রে। অধঃপতিত সমাজের বর বা বরপক্ষ মনে করে যৌতুক তার ন্যায্য পাওনা এবং স্বীকৃত শর্তের যদি এক তিলও কম পড়ে তাহলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। আর তার সর্বনাশা পরিণতি ভোগ করতে হয় নিরপরাধ বউটিকেই। ঘর ভাঙা তো অতি সাধারণ ব্যাপার। মানুষিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার বউটির বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতাই থাকে না। যৌতুকের সর্বনাশা রীতিতে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে কন্যা হয় ক্রয়-বিক্রয়ের বস্তু আর কন্যার অক্ষম অসহায় পিতা হয় একজন নতজানু ব্যক্তিমাত্র। সব অত্যাচার প্রয়োগ করে প্রাগৈতিহাসিক মানসিকতার পরিচয় দেয় বরপক্ষ। কিভাবে কন্যাটিকে বিদায় করা যায় প্রয়োজনবোধে পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের ব্যবস্থা করে যৌতুক লোভী মনের ক্ষোভ মেটাতে হয়। প্রতিদিনের খবরের কাগজের পাতা খুললেই এমনই অনেক ঘটনা চোখের সামনে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। নারী পুরুষের সুন্দর সম্পর্কের মধ্যে কেন যৌতুকের দাবি ওঠে তা বিবেচনা করলে নারীকে বস্তুর সাদৃশ্যে বিচার, শোষণবৃত্তি প্রভৃতিকে কারণ হিসাবে লক্ষ করা যায়। সমাজে নারীর অবমূল্যায়ন যৌতুক প্রথার উৎপত্তির উৎস। কন্যাকালে পিতার, যৌবনে পতির, আর বার্ধক্যে পুত্রের অধীনরূপে নারীর মূল্য দেয় আমাদের সমাজ।
ইসলামে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা হারাম। মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বানোয়াট অজুহাত দেখিয়ে নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। চেষ্টা চলছে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন এক্টিভিটিস থেকে নারীকে দূরে রাখার। কিন্তু ইসলাম নারী শিক্ষার বিরোধী নয়। কুরআনের কোথাও শিক্ষার যোগ্যতা বা জ্ঞান সাধনা করার অধিকার এককভাবে পুরুষকে দেয়া হয়নি। জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। এটা হাদিসের কথা। এখানে কাউকে আলাদা করে বলা হয়নি। অতএব নারী পুরুষ সবারই জ্ঞান অর্জন করা বাধ্যতামূলক। ইসলাম কখনো মেয়েদের অবরুদ্ধ করে রাখেনি। কিন্তু ইসলামের দোহাই দিয়ে মোল্লা প্রকৃতির একদল অশিক্ষিত পুরুষ নারী জাতির বেশ একটি অংশকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
হ্যাঁ, সামনের দিকে এগিয়ে গেছে অনেকে। কিন্তু সে সংখ্যা খুবই কম। বাকিরা তো মানুষ, তাদের কথাই বলছি। তারা কতভাবে বঞ্চিত।
শিক্ষাই জাতির উন্নতির চাবিকাঠি। এই শিক্ষা থেকে বহুলাংশে বঞ্চিত থেকে নারীরা সমাজকে পশ্চাৎমুখী করে রেখেছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের উন্নতিতেই জাতির উন্নতি। জাতীয় জীবনে পুরুষের মতো নারীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মেধা ও যোগ্যতায় নারীকে পেছনে ফেলে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
জাতির জন্য দরকার শিক্ষা-দীক্ষায় কৃষ্টি সংস্কৃতিতে উজ্জ্বল পরিবার। সে আদর্শ পরিবার গঠনে নারীর ভূমিকাই সর্বাধিক বলে নারী শিক্ষা প্রসারের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রসমাজের অব্যবস্থার কারণে নারীকে কেবল ব্যথা বেদনার নির্মম অভিশাপ বহন করতে হয়েছে। আর তা এখনো অব্যাহত আছে। তার যথার্থ জীবন বিকাশের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। নারী সমাজ মুক্তির পথ দেখেনি বরং শাসন নির্যাতনের শিকার হয়ে চরম দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে।
মায়ের হাতেই সন্তান বড় হয়ে ওঠে। মায়ের কাছেই তার শিক্ষার শুরু। মা নিজে যদি শিক্ষিত হয় তাহলে তার সন্তানও সুযোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। মায়ের সন্তানরাই একদিন বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই মাকে উপযুক্ত যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। শিক্ষা তাকে সে যোগ্যতা দান করবে। উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন বলিষ্ঠ জাতি গঠনের কাজে প্রয়োজন নারী জাতির শিক্ষা। তাই সর্বত্র নারী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক।
নারীকে মানবতা জাগ্রত করার সাধনায় ব্যাপৃত হতে হবে। অন্তরের সৌন্দর্যে মহিমান্বিত ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ার প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে নারীকেই। গৃহকে শান্তির নীড় হিসেবে গড়ার দায়িত্ব নারীর। সামাজিক অনাচার অবদমিত হবে শিক্ষায় নারীকে যোগ্য করে গড়ে তোলার মাধ্যমে।
মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা তথা ইভটিজিং আমাদের সমাজে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বলা যায় এটি একটি বহু পুরাতন সামাজিক ব্যাধি। এটা কোনো দোষের কিছু নয় উঠতি বয়সের চপলতা বিষয়টি এমন হালকাভাবে দেখার প্রবণতা রয়েছে আমাদের অনেকের মধ্যে। আমাদের দেশের নারী জীবন হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। এর মাঝে আবার শুরু হয়েছে বিড়ম্বনার আরেক উপদ্রব। যার নাম ইভটিজিং। কিছু দিন আগেও আমরা এই শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম না। কিছু মানুষের বিকৃত মানসিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের অভাব এর প্রধান কারণ। সভ্য সমাজের সুস্থতা পরিমাপ করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো, একটি মেয়ে সমাজে কতটা সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বাস করতে পারছে, তার ওপর। যেকোনো রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ভেতরে বাস করা নারী বিচ্ছিন্ন মানুষ নয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন আমাদের সংবিধানে ২৭, ২৮ নম্বরে বলা হয়েছে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন। সংবিধানে নারীর সহাবস্থানের কথা উল্লেখ থাকলেও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর জন্য ভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রথা তৈরি করে রেখেছে আমাদের দেশে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নারীর সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীকে ঠেলে দেয়া হয় বৈষম্যের ভেতরে। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা অনিয়ম এবং আইনের ফাঁকফোকরে মুখ থুবড়ে পড়ছে নারীর জীবন। নারী তার আপন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মনগড়া কিছু ধর্মীয় অনুভূতির দ্বারা। সেসব অনুভূতি ধর্মকে ব্যবহার করছে স্রষ্টার মহিমা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়। বরং ধর্মের বিষয়ে অজানা এমন এক শ্রেণীর মানুষের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পাশবিক লোভে। নারীর প্রতি বিরাজমান বঞ্চনা বৈষম্য থেকেই আজকের অসম্মানজনক উত্ত্যক্তকরণ বা ইভটিজিংয়ের সূত্রপাত। ইভটিজিংয়ের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে পরিবারে। সমাজে নিরাপত্তাহীনতার উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
ইভটিজিং আসলে কোনো হালকা রসিকতা নয়। এটা এক ধরনের নারী নির্যাতন। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেজন্য ইভটিজিংয়ের শাস্তি বিধানের জন্য কঠোর আইনের খুব প্রয়োজন। বর্তমানে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে নারীদের, একটি বিপদ থেকে উদ্ধার হতে না হতেই আরেকটি বিপদ এসে হাজির হয়।
বেগম রোকেয়া থেকে বেগম সুফিয়া কামাল পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হয়েছে সে সময়ে যে তারা বাংলার নারীর স্বীয় মর্যাদা, অধিকার, নারীমুক্তির অবিচ্ছেদ্য সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন তা আজ আমাদের কাছে নারী মুক্তি আন্দোলনের উদাহরণ ও প্রেরণা। কিন্তু দুঃখজনক যে আজো আমাদের দেশের মেয়েরা সমাজের অবহেলিত। এ দেশের আর্থসামাজিক পরিবেশে গোঁড়ামি, ধর্মীয় মিথ্যা ফতোয়ার প্রবলতা। ফলে নারী অধিকার লঙ্ঘিত হয় সবচেয়ে বেশি। নারী পুরুষের সম-অধিকার ও নারী মুক্তির কথা জোর গলায় বলা হয় কিন্তু নারীর অবস্থানের প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। আজো অসংখ্য নারী এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ আর নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গৃহ পরিচারিকার ওপর অমানবিক নির্যাতন চলে। যদিও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারী সমাজের অংশগ্রহণ লক্ষণীয় তথাপি আমি বলব সামগ্রিকভাবে আজো নারী, সমাজে অবহেলিত।
আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নারীর অবস্থানের কতটা পরিবর্তন হয়েছে তা আমার জানা নেই। বস্তুত উন্নত-অনুন্নত উন্নয়নশীল নির্বিশেষে সব দেশেই নারীরা কমবেশি বৈষম্যে শিকার। বিশ্বব্যপি নারী জাতীর অগ্রগতি দ্রুত সাধন করা দরকার। সেজন্য দরকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ইতিবাচক সচেতনতা সৃষ্টি।
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্র“বারি
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিলো তাহে রূপ- রস- মধু-গন্ধ সুনির্মল।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন। তিনি সাম্যের কথা বলেছেন। তিনি নারী-পুরুষের সমান যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। কিন্তু তার মতো কয়জন বুঝতে পারে। যদি বুঝত তাহলে আজ নারী এত বিপদগ্রস্ত নির্যাতিত হতো না। অসম্মানিত হতো না পদে পদে।
আমাদের দেশে উন্নয়নের রূপকল্প দেখাতে আমরা পুরুষকে কিংবা নারীকে বাদ দিতে পারি না। আর তা উচিত নয়। দুজনকেই দরকার।
যেখানে আধুনিকতায় জ্ঞান-বিজ্ঞান -প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় গোটা বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে সমাজের নিত্য নতুন কাঠামো, বিকশিত হচ্ছে সভ্যতা। পরিবর্তনের হাওয়া বইছে মানুষের জীবন-যাত্রায়, আর তার সাথে ধারাবাহিক ভাবে হচ্ছে নারীদের ওপর নির্যাতনের নিত্যনতুন বর্বতার আর্বিভাব।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নারীরা অসম্মানিত হয়। কিন্তু গুণীজনরা নারীকে সম্মানের চোখেই দেখে। হজরত মুহাম্মদ সা: নারী জাতিকে সম্মান করেছেন। তাছাড়া আরো অনেক গুণীজনরা নারীকে সম্মান করেছেন। একজন নারীর কতটা ক্ষমতা আছে তা বুঝানোর জন্য আমি দু’টি উক্তি উপস্থাপন করলাম।
If you want something said, ask a man;If you want something done, ask a woman.
Margaret Thatcher.
অর্থাৎ তুমি যদি কিছু বলতে চাও তাহলে পুরুষকে দিয়ে বলাও যদি কোনো কাজ সম্পন্ন করাতে চাও তাহলে নারীকে দিয়ে করাও। মার্গারেট থেচার।
Women are the real architect of society.
Harriet Beecher Stowe
অর্থাৎ নারী হলো সমাজ গড়ে তোলার স্থপতি। হ্যারিয়েট বেচার স্টোও।
সমাজের নারী-পুরুষের বৈষম্য ও নারী নির্যাতন প্রতিকার করতে হলে দরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। একদিকে আইনের পাকাপোক্ত শাসন প্রতিষ্ঠা করা, এবং নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া দ্রুত করার মাধ্যমে সামাজিকভাবে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে। সমাজ থেকে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূরীকরণের প্রয়োজনে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় হাত দেয়া খুব দরকার। নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে কঠোর ও সক্রিয়ভাবে।
একাট যৌতুক মুক্ত সমাজ, বাল্যবিবাহ মুক্ত দেশ এবং নারী নির্যাতন মুক্ত বিশ্ব এখন সময়ের দাবি। নারী সুরক্ষার বিষয়টি সমাজের এবং পুরুষের চেতানায়, ধারণায়, জ্ঞানে, বিশ্বাসে, কর্মে ও জীবন চর্চায় স্থায়ী ও সুদৃঢ় করতে হবে। নারীর প্রতি ন্যায়বিচারের সঠিক আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার প্রবর্তন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পিতা বা স্বামী হিসাবে নিজ মেয়ে বা স্ত্রীর যথাযথ মর্যাদা সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব কাজে আইনের অনুগত থাকার চর্চা করতে হবে। নারী শিক্ষার অগ্রগতি নারীর মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রধান হাতিয়ার নারী শিক্ষা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিকতার পরিবর্তন, মর্যাদাবোধের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
আমি সবশেষে বেগম রোকেয়া গাড়ির দু’টি চাকার কথা বলেছিলেন সে কথাই মনে করিয়ে দিতে চাই। সমাজ নামক গাড়ির যে দুটি চাকা তা হলো পুরুষ ও নারী।