বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার আড়াই কোটি মানুষের জন্য দুঃসংবাদ। বিগত ২২ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম বায়ুদূষণের নগরী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শুষ্ক মওসুম আসার এখনো এক মাসের অধিক বাকি। এই মওসুমে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ধূলিকণা বাতাসে উড়ে বেড়ায়। তার সাথে যোগ হয় ঢাকার সাত লাখ মোটরযান থেকে নির্গত কার্বন-মনোক্সাইড, নগরীতে স্থাপিত কলকারখানার সৃষ্ট গ্যাস এবং এই মহানগরীর চারপাশে থাকা ইটের ভাটা থেকে বয়ে আসা কালো ধোঁয়া। ইটের ভাটাগুলো শুষ্ক মওসুমেই ইট পোড়ানোর কাজ করে। এই চারটি ফেক্টর এক হয়ে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ঢাকা নগরীকে কার্যত একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত করে।
কথা উঠতে পারে বায়ুদূষণের এই চারটি কারণ আগেও ছিল কিন্তু ঢাকার স্থান কখনো বিশ্বের বায়ুদূষণমাত্রায় এত নিচে নামেনি। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, কিছুদিন ধরে আগের চেয়ে অনেক বেশি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে বিভিন্ন নির্মাণ এবং মেরামত কাজের জন্য। বেড়েছে মোটরযান ও ছোট-বড় কলকারখানা এবং ইটভাটার সংখ্যা। সর্বোপরি রয়েছে বৈশ্বিক দূষণের কারণে বাংলাদেশের বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি। বিগত কয়েক বছর বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের নিম্নতম স্থানগুলোর মধ্যে আবর্তিত হয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর সকাল সোয়া ৯টায় ঢাকায় বায়ুর মানের সূচক ছিল ১৯৫। যা মারাত্মক ছিল অস্বাস্থ্যকর। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা এবং মোম্বাই নগরীর অবস্থান ছিল প্রথম ও তৃতীয় নিকৃষ্টতম। ওই দুই মহানগরীতে বায়ুর মানের সূচক ছিল যথাক্রমে ১৯৩ এবং ১৫৮। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অবস্থা বায়ুদূষণের দিক থেকে বেশ খারাপ ছিল। সে বছর ঢাকা এবং দিল্লি পালাক্রমে বেশ কিছুদিন বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম স্থান নিয়েছিল।
স্পর্শকাতর গ্রুপের মানুষের জন্য বায়ুর মান মাত্রার সূচক ১০০ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর। ২০০ থেকে ৩০০ সূচকের বায়ু ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত, ৩০০ থেকে ৪০০ সূচকের বায়ু রীতিমতো বিপজ্জনক। ঢাকায় বায়ুর মানের সূচক নির্ধারণের জন্য ধূলিকণা (পিএম ১০ এবং পিএম ২.৫), নাইট্রিয়াস অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড ও সালফার-ডাই অক্সাইড এবং ওজোনের পরিমাণ মাপা হয়। এগুলো বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। গত বছর শুষ্ক মৌসুমের বেশির ভাগ সময় ঢাকার বায়ুদূষণ ছিল বিপজ্জনক পর্যায়ে। যে কারণে ট্যাঙ্কার দিয়ে বেশ কিছু রাস্তায় ধুলা নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি ছিটানো হয়েছিল।
আমাদের দেশে কত মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করছে বা কত মানুষের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বায়ুদূষণের জন্য বিশ্বে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, লাইচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজেকে সাথে নিয়ে আমেরিকার হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পাদিত এক গবেষণার ফলাফলে জানা গেছে, ১৯১৮ সালে শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে সৃষ্ট দূষণে বিশ্বে ৮০ লাখ লোক মারা যায়। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর একটির কারণ বায়ুদূষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত বায়ু গ্রহণের জন্য মারাত্মক শ্বাসযন্ত্রের রোগ, শ্বাসনালিতে প্রদাহ ও শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ হয়। তার সাথে ক্যান্সার এবং হৃদরোগ। এক হিসাবে জানা গেছে, বাংলাদেশে অ্যাজমা রোগীর সংখ্যা ২০১৫ সালে তিন হাজার ৩২৫ জনের জায়গায় ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৮০৬। দেশের ডিসপেনারিগুলোতে এখন শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ওষুধের ছড়াছড়ি। ন্যাজাল ড্রপ, ন্যাজাল ¯েপ্র, ব্রডিল, কন্টিন, দাকোপা, নেবুলাইজারসহ বেশ কিছু ওষুধ চাহিদা বাড়ার কারণে যত্রযত্র পাওয়া যাচ্ছে। ভীতিকর ব্যাপারটা হচ্ছে, বায়ুদূষণের কারণে সৃষ্ট রোগ দেখা দেয়ার আগে বেশির ভাগ মানুষ বোঝতেই পারে না যে, তাদের শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্যহানির অবস্থা বোঝাতে ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের এক গবেষক দিল্লির এক মৃতব্যক্তির শ্বাসযন্ত্রের ফটো প্রদর্শন করে। শ্বাসযন্ত্রটির রঙ ছিল কুচকুচে কালো। পাশাপাশি দেখানো গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী অন্য এক মৃত ব্যক্তির শ্বাসযন্ত্রের রঙ ছিল গোলাপি। বাংলাদেশের একজন গবেষক ঢাকার একটি বিড়াল ও গ্রামাঞ্চলের একটি বিড়ালের শ্বাসযন্ত্রের ছবি দেখিয়ে একই ফলাফল বর্ণনা করেন।
দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বায়ুদূষণের বর্ণিত কারণগুলো কমবেশি সবারই জানা। অনেকেই স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাবের ব্যাপারেও জ্ঞান রাখেন। কিন্তু তা প্রতিকারের জন্য যে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা দেখা যাচ্ছে না। আমাদের বেশির ভাগ মানুষ আজকের প্রয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। আগামীকাল কী হবে বা ভবিষ্যতে আমাদের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে ভাবার সময় নেই।
যেমন ধরুন, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য মোটরযান থেকে নির্গত ধোঁয়া বেশি দায়ী এ তথ্য জানা থাকলেও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমণকারী মোটরযান চলতে না দেয়ার পদক্ষেপ সচরাচর দেখা যায় না। বায়ুর মান সহ্যসীমার মধ্যে রাখার জন্য নেই কোনো প্রেক্ষিত পরিকল্পনা। উন্নত দেশে কোনো শহর বা নগরে কোন কোন ধরনের কত মোটরযান চলবে তা নির্ধারিত থাকে। যেমন- কত বাস, ট্রাক, ট্যাক্সিক্যাব, প্রাইভেট কার, ডেলিভারি ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স, পানি ও পেট্রল ট্যাঙ্কার চলবে তা সবার জানা থাকে। ইচ্ছামাফিক কেউ নতুন গাড়ি নামাতে পারে না।
আমাদের দেশের অবস্থা কী? রাস্তায় যানজট এবং বায়ুদূষণ বাড়ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটরযানের সংখ্যা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ সালে যেখানে ঢাকায় মোটরযানের মোট সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৯ হাজার ৭৭টি সেখানে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৪ টিতে। এ সংখ্যা থেকে চার লাখ ৬৯ হাজার ৮৮৮টি মোটরসাইকেল বাদ দিলে তখন এই মহানগরীতে ছোট, মাঝারি ও বড় গাড়ির সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৬। তার মধ্যে বাস মাত্র ২৮ হাজার ৬২৮ এবং মিনিবাস ১০ হাজার ২৮২। প্রাইভেট কার দুই লাখ ৪৭ হাজার ৩২৪; ট্যাক্সিক্যাব ৩৬ হাজার ৫১৩; জিপ ৩৪ হাজার ১০; মাইক্রোবাস ৬৯ হাজার ৫৮৮ এবং অটোরিকশা ৯ হাজার ৩০৮। বর্তমানে এ সংখ্যাগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আরো অনেক বেড়েছে।
ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকার বাইরে যত্রযত্র ছোট ও মাঝারি কলকারখানা গড়ে ওঠেছে। পুরান ঢাকায় এ রকম কলকারখানা রয়েছে অনেক আবাসিক এলাকার ভেতরে। এগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই নেই।
উন্নয়নের নামে এই মহানগরীর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলে সারা বছর ধরে। ভবন ও অন্যান্য কনক্রিটের নির্মাণকাজের সময় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্দা ব্যববার করা হয় না বললেই চলে।
তা ছাড়া ঢাকার চারপাশে গড়ে ওঠা ইটের ভাটাগুলো এখনো সনাতন পদ্ধতিতে ইট পোড়ায়। ইটের ভাটাগুলো আধুনিকীকরণ করলে কালো ধোঁয়া নির্গমন কমানো যেত। সাথে সাথে মহানগরীর আড়াই কোটি মানুষ রক্ষা পেত এ ধোঁয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার আড়াই কোটি মানুষের জন্য দুঃসংবাদ। বিগত ২২ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম বায়ুদূষণের নগরী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শুষ্ক মওসুম আসার এখনো...
