একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, সেবাখাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রের আশানুরূপ উন্নয়ন প্রয়োজন। প্রথমত, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদার জন্য পণ্য ও সেবার উৎপাদন দরকার। দ্বিতীয়ত, জনগণের সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক চাহিদার বাইরে অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে জনসম্পদ বা মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। প্রথমটি প্রবৃদ্ধির সাথে সম্পৃক্ত, দ্বিতীয়তটি মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎসের সাথে সম্পৃক্ত। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পরিচালিত ছোট ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহৎ শিল্প, সুবিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে অবদান রাখে। তবে পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই মোট দেশজ উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদানও কম না। বাংলাদেশে অবশ্যই এই অবস্থান থেকে দূরে, অর্থাৎ এসব শিল্প ও ব্যবসার অর্থায়ন কম এবং এগুলো কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালনে তেমন ভূমিকা রাখছে না।
এসএমই শব্দসংক্ষেপ দিয়ে সাধারণত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগকে বোঝালেও এর সংজ্ঞায় কটেজ ইন্ডাস্ট্রি বা কুটির শিল্প এবং মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রি বা অতি ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ জন্য। এসএমইকে অনেক সময় সিএসএমই কটেজ, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ, আবার কিছু ক্ষেত্রে কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বা সিএমএসএমইও বলা হয়। তবে মোটা দাগে আমরা এটাকে স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বা এসএমই বলে থাকি। যদিও সেবা খাত ও উৎপাদন খাতের জন্য এর সংজ্ঞায় কিছুটা পার্থক্য আছে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সার্বিকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ খুব একটা ঘটেনি। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অবদান এসএমই খাতের। কিন্তু আমাদের এসএমই খাত আদৌ ২০ শতাংশ অবদান রাখছে কি না আমার সন্দেহ আছে। ওইসিডিভুক্ত ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৫৫ শতাংশ। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এর অবদান ৪৫ শতাংশের মতো। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপিতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অবদান রাখছে এসএমই খাত। বেশির ভাগ কর্মসংস্থানও তাদের এসএমই খাতে। সুতরাং বৃহৎ শিল্প বা বৃহৎ বাণিজ্যের অবদানকে আমরা যেভাবে বড় করে দেখি বা নির্ভর করি তা ভুল। আর বৃহৎ শিল্পের প্রতি সাধারণ ঝোঁকটা এসএমই খাতের প্রতি অবহেলারও একটা কারণ। বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ শ্রমিক এসএমই খাতে জড়িত। সুতরাং এসএমই খাত যত বড় হবে, কর্মসংস্থান পরিধিও তত বড় হবে। তার পরও আমরা যেভাবে এসএমই খাতকে অবহেলা করি, তা উন্নত দেশগুলো করে না।
এবার আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সমস্যাগুলো কী, সেদিকে নজর দেয়া যাক। এ খাতে আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে অর্থায়ন সঙ্কট। এর উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ খুব কম পায়। বেশির ভাগ সময় তারা মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন তথা এনজিওর ওপর নির্ভরশীল। অবশ্য কিছু ব্যাংকের এসএমই সেক্টর কর্মসূচি তাদের কিছু সহায়তা করে থাকে। এর বাইরে গতানুগতিক ভাবধারায় চলা ব্যাংকগুলো তাদের অর্থায়ন করতে চায় না। তাদের ঋণ দেয়া ঝুকিপূর্ণ, অল্প অল্প করে অধিক মানুষকে ঋণ দিতে হয়, সুপারভিশন করতে প্রচুর সময় ব্যয় হয়। এ রকম নানা অজুহাত দেখিয়ে থাকে ব্যাংকগুলো। অথচ এই যুগে নানা তথ্যভাণ্ডার বিবেচনায় নিলে আধুনিক কৌশল ও সৃজনশীল উপায় চিন্তা করলে এসব যুক্তি মোটেও ধোপে টেকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক, পিকেএসএফ এবং এসএমই ফাউন্ডেশন মূলত এসএমইতে ঋণ বিতরণের কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে বিসিকেরও একটা ভূমিকা আছে। কিন্তু সার্বিকভাবে অর্থায়নের মেইন স্ট্রিম বা মূল স্রোতধারায় এসএমই আসতে পারেনি। এসএমই উন্নয়নের মূলধারায়ও আসতে পারেনি। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ২০২০ সালের জুলাইয়ে কোভিড-১৯ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্যাকেজ দেয়া হয়, সেটা একটা সমন্বিত পদক্ষেপ ছিল। সব সেক্টরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় ছিল এবং ছোট-বড় সবার অংশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রফতানি খাত, বিশেষ করে আরএমজি এক্সপোর্ট সেক্টর, তারপর বৃহৎ শিল্পের অন্যান্য সেক্টরে অতি দ্রুত প্যাকেজের টাকা শেষ হয়ে যায়; কিন্তু এসএমই খাতে ব্যাংকগুলো বরাদ্দ টাকা দিতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে তারা সে চেষ্টা করেনি। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া আর কিছু নেই। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা চেম্বার বডিগুলোতে তাদের সদস্য হিসেবে দেখা যায় না। ফলে অর্থনীতির মূলধারায় তারা আসে না।
এখানে কৃষিঋণের উদাহরণটা টানা যেতে পারে। আমাদের কৃষি খাত কিছুটা ঋণ পায়। এর কারণ হচ্ছে, এর সাথে খাদ্যনিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সরকারের নীতিগত অবস্থান ও মনোযোগ রয়েছে। কৃষিঋণ নিয়ে পাবলিক সেন্টিমেন্টের একটা ব্যাপারও আছে। আমাদের গণমাধ্যমগুলোও বেশ সজাগ। কিন্তু এসএমই খাতের ঋণ নিয়ে এখনো পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়নি, কেউই সোচ্চার নয় এবং মিডিয়াও খুব বেশি কথা বলে না। তাই সে জিনিসটা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সামনে যেহেতু কোভিড প্যাকেজগুলো রিনিউ করা হবে, তাতে নতুন ভাবনার প্রতীফলন থাকা উচিত। ব্যাংকের উচিত হবে, এই খাতে ঋণ প্রবাহে যেসব ব্যাংক ভালো করবে তাদের পুরস্কৃত করা এবং যারা খারাপ করবে তাদের তিরস্কারের ব্যবস্থা করা।
এসএমইতে আমরা কেন এত গুরুত্ব দেবো? এর কারণগুলো হচ্ছে প্রথমত, এসএমই খাতে বর্তমানে একটা বিশাল জনগোষ্ঠী জড়িত। দ্বিতীয়ত, এই খাতের দ্রুত বিকাশ লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃতীয়ত, এসএমই খাতের পণ্য গুণে-মনে কোনো অংশেই কম নয়। এটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। এ খাত আয়বর্ধক খাত হিসেবে চিহ্নিত। যারা চাকরি করতে চায় না বা করে না, শিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিতদের সবারই একটি সুযোগ থাকে এখানে কিছু করার। চতুর্থত, কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটা বড় সুযোগ ও ক্ষেত্র হচ্ছে এসএমই খাত। সার্বিকভাবে দারিদ্র্যবিমোচনের বড় একটা হাতিয়ার এটা। আমাদের সর্বশেষ কী পরিকল্পনা এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনায়ও এই খাতের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেই।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের করণীয় কী? আমি প্রথমেই বলব, যথাযথ নীতিকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। আমাদের রাজস্ব নীতিতে এসএমইকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হয় না। আমরা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতি, কর হ্রাসসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি। এটা ভালো; কিন্তু সাথে সাথে যদি এসএমই ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়, সেই হবে উপকারী। এ জন্য রাজস্বনীতি এসএমইমুখী করতে হবে। তদারকি ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ বাড়ানো মানে বড় বড় শিল্পে ঋণ বাড়াতে হবে, এমন চিন্তা থেকে ফিরে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, নীতিমালা ও পদ্ধতিগুলোর সহজীকরণ। অনেক সময় দেখা যায় সরকার ঢালাওভাবে কিছু নিয়ম করে, যা ছোটদের ওপরও একইভাবে প্রযোজ্য হয়। এটা করা যাবে না। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগকে যেন সহজেই এগিয়ে নেয়া যায়, সে ধরনের নীতিগত সহযোগিতা লাগবে। তৃতীয়ত, তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা। এ খাতে সরকারের কিছু নীতি ও প্রণোদনার বিষয় রয়েছে। কিন্তু সরকারের উন্নয়ন এজেন্সিগুলো- বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন বা বেসরকারি সংস্থা রয়েছে, এরা এসএমই-সংক্রান্ত তথ্যগুলো ঠিকঠাকভাবে প্রচার করে না। মানে ছোট ব্যবসায়ীদের সব তথ্য জানাতে হবে এবং তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত হলো প্রশিক্ষণ। একটা নতুন ব্যবসায় কি কৌশল লাগবে, ঝুঁকি বা সম্ভাবনা কেমন তা উদ্যোক্তাদের জানাতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে এসব বিষয়ে কিছু ব্যবস্থা রয়েছে বটে; তবে পর্যাপ্ত নয়। পঞ্চমত, বাংলাদেশে বড় শিল্পের সাথে ক্ষুদ্র বা কুটির শিল্পের ব্যবসায়ী সংযোগ গড়ে ওঠেনি। এটি তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই দেখবেন, ছোট শিল্পগুলো বড়দের থেকে সাবকন্ট্রাক্ট নেয়। এই অর্থে বড় বড় শিল্পের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠে। যেমন- টয়োটার মতো বড় বড় কোম্পানি বা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বড় কোনো কোম্পানি ছোট ছোট শিল্প-কারখানা দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেয়। আমাদের এখানে সে অর্থে এই যোগসূত্রটা তৈরি হয়নি। আরেকটা হলো বহির্বিশ্বের বাজারের সাথে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর সংযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশের হাজারের কাছাকাছি পণ্য বাইরে রফতানি হয়। কিন্তু এর পরিমাণ কম। বহির্বিশ্বের বাজারের সাথে লিংক স্থাপনের অভাবে এমনটা হয়। ওয়ালমার্টে একবার আমি একটি অত্যাধুনিক বড়শি দেখে এর উৎস জানতে চেয়েছিলাম। আমাকে জানানো হলো, এটা চীনের রুরাল ইন্ডাস্ট্রিতে তৈরি। চীনে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সাধারণত রুরাল ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পরিচিত। চীনে রুরাল ইন্ডাস্ট্রির জন্য ফরেন ট্রেড ও ফেসিলেশনের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের বহির্বাণিজ্যের এত ব্যাপকতার এটিও একটা কারণ। আমি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দেখার জন্য একবার ফিলিপাইনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছিলাম। সেখানে আলাপকালে এক নারী উদ্যোক্তা আমাকে জানালেন, পরের দিন তিনি সিঙ্গাপুর যাবেন। সেখানে তার একজন ক্রেতা আছে। তার কাছ থেকে সরবরাহ আদেশ আনতে যাবেন।
ভাবা যায়, একজন নারী উদ্যোক্তা গ্রাম থেকে সিঙ্গাপুরে ব্যবসা করছেন? আমাদের এখানে কয়েকটি চেইনশপ এবং সুপারস্টোর গ্রামে নারীদের দিয়ে পোশাক এবং অনেক সামগ্রী তৈরি করিয়ে নেয়। পণ্যের মূল্য সংযোজন প্রক্রিয়ায় এসব মহিলা কোনো আর্থিক সুবিধা পায় না। এভাবে আমাদের না হয় নারীর ক্ষমতায়ন, না হয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সত্যিকার উন্নয়ন; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া খুব দরকার। এর সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন নতুন সেবা তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।