নিঃসন্দেহে বলা যায়, বর্তমান বিশ্ব অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার এক আঁতুড়ঘর। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, সমাজে সমাজে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে নৈরাজ্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দুর্বলের যেন এই গ্রহে কোনো স্থান নেই। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে চরম মাৎস্যন্যায়। যে যেভাবে পারছে শোষণ, তোষণ, জোরজবরদস্তির মাধ্যমে কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত আছে। অথচ সৃষ্টিকুলের সেরা জীব হিসেবে মানুষের এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। শান্তি এবং শৃঙ্খলার সাথে পারস্পরিক সহাবস্থান, মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ‘একবিশ্ব, এক পরিবার’ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মানুষ হিসেবে বিশ্ববাসীর প্রধানতম মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃজন করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন; এরপর তাদের উভয় থেকে বহু নর ও নারী সম্প্রসারণ করেছেন (সূরা নিসা)।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দেখানো আদর্শে এবং তাঁর মহান জীবন দর্শন অনুসরণের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের এই তাগুতি অবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত সহজেই করা যায়। পবিত্র কুরআনে বলা যায়, ‘হে নবী, নিশ্চয়ই আপনাকে আমি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ উপরিউক্ত আয়াতের মর্মমূলে প্রবেশ করলে অতি সহজেই বিষয়টি অবশ্যই অনুমেয়। তৎকালীন আরব সমাজে বিদ্যমান আইয়্যামে জাহিলিয়াতের মতো দুঃসহ স্মৃতিকে পেছনে ফেলে মহানবী সা: সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির যে রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করে গেছেন, সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল বর্তমান বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ বিষয়ে জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, ‘আমাদের মধ্যযুগীয় পাদ্রিরা হয় অজ্ঞতার কারণে, না হয় দুঃখজনক বিদ্বেষের ফলে পয়গম্বরের মহান ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর প্রচারিত ইসলাম ধর্মকে কালো অবয়বে উপস্থাপন করেছেন। আমি পূর্ণ দিবাদৃষ্টিতে এ কথা ঘোষণা করতে চাই যে, হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তিদাতা। বরং আরো স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিশ্বের শাসন ও একনায়কত্ব যদি আজ মুহাম্মদ সা:-এর মতো কামেল পুরুষের হাতে সোপর্দ করা হয়, তবে এই পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যার এভাবে সমাধান হয়ে যেত যে, গোটা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার দোলনায় পরিণত হতো’।
এবার আসা যাক বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:এর জীবন দর্শন প্রসঙ্গে। সবারই জানা আছে, পবিত্র কাবাগৃহে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন এর ঘটনা। আরব উপদ্বীপের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোকে সাথে নিয়ে কেবল প্রখর বুদ্ধিমত্তা দিয়েই শিশুনবী সা: রক্তপাতহীনভাবে এ কাজটির চমৎকার সমাধান করেছিলেন। সে দিন কেউ প্রতিবাদ করা দূরের কথা, বরং সবাই খুশি হয়েছিলেন এবং শিশু আল আমিনকে বাহবা দিয়েছিলেন।
মহানবী সা:-এর জীবনের তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে যা আজো মানবজাতিকে শান্তির পথ দেখায়। যার নাম হচ্ছে ‘হিলফুল ফুজুল’। এর অর্থ শান্তিসঙ্ঘ। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মহানবী সা: এ গুরুত্বপূর্ণ শান্তিসঙ্ঘ গঠন করেছিলেন। আরব সমাজের সব অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে তাঁর সমবয়সী কিছু যুবককে নিয়ে এ শান্তিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আসুন জেনে নিই ‘হিলফুল ফুজুল’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য- ১. মজলুম ও অসহায়দের সাহায্য করা। ২. সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা। ৩. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী ও প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করা। ৪. পথিক ও মুসাফিরের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৫. কোনো জালেমকে মক্কায় প্রবেশ করতে না দেয়া এবং দুষ্কৃতকারীদের অন্যায় আগ্রাসন প্রতিরোধ করা। তৎকালীন আরব সমাজ থেকে অন্যায়, অপরাধ, জুলুম, অবিচার এবং বৈষম্য দূরীকরণে এ সংগঠনের অবদান ছিল অসামান্য।
মহানবী সা: কেবল একজন ধর্মপ্রচারকই নন; বরং তিনি বিশ্ব ইতিহাসের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বিপ্লবী মহাপুরুষ ছিলেন। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ মদিনা সনদ বা চার্টার অব মদিনা। মদিনায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত ৪৭ ধারা সংবলিত মদিনা সনদ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। এর আগে এরূপ কোনো মৈত্রী সংবিধান ছিল না। এই সনদের ধারাগুলো পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায় যে, শুধু তৎকালীন মদিনা নয়, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায়ও শান্তিশৃঙ্খলা এবং সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় মদিনা সনদের কার্যকারিতা এবং উপযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে (মার্চ ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনা শহরবাসী এবং কুরাইশ গোত্রের মধ্যে সম্পাদিত হয় একটি ঐতিহাসিক সন্ধিচুক্তি। যা হুদাইবিয়া সন্ধি হিসেবে সমধিক খ্যাত। আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হলেও ইহা শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:-এর একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং প্রজ্ঞার ফসল। পবিত্র আল কুরআনে এই চুক্তিকে প্রকাশ্য বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘(হে নবী) নিশ্চয়ই আপনাকে আমি একটি সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।’ আল কুরআনের এই বাণী কিছু দিন পরেই সত্যে পরিণত হয়। মক্কার কাফেররা এই সন্ধিচুক্তিটি ভঙ্গ করে প্রকারান্তরে মক্কা বিজয়কেই ত্বরান্বিত করেছিল। শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় হুদাইবিয়া সন্ধির গুরুত্ব এখনো অনস্বীকার্য।
এরপর আসা যাক দশম হিজরী (৬৩২ খ্রিঃ) এর বিদায় হজের ভাষণ সম্পর্কে। এই ভাষণটি সমগ্র মহাবিশ্বে শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য দলিল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে যথাযথ সম্মান এবং মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় এই ভাষণ সর্বকালের সব মানুষের জন্য একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। জীবনের এই শেষ ভাষণে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানান, ‘হে মানব সকল! সাবধান! সব ধরনের জাহেলিয়াতকে আমরা দু’পায়ের নিচে পিষ্ঠ করে যাচ্ছি। নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত চিরতরে হারাম ঘোষিত হলো। প্রথমে আমি আমার বংশের পক্ষ থেকে রাবিয়া বিন হারেস বিন আবদুল মোত্তালিবের রক্তের দাবি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। সে বনি লাইস গোত্রে দুধ পান করেছে, হুজাইল তাকে হত্যা করেছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ‘সুদ’কে চিরদিনের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। আমি আজ আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালিবের যাবতীয় সুদের দাবি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। হে লোক সকল! বল আজ কোন দিন? সকলে বলল ‘আজ মহান আরাফার দিন, আজ হজের বড় দিন’ সাবধান! তোমাদের একের জন্য অপরের রক্ত, তার মাল সম্পদ, তার ইজ্জত-সম্মান আজকের দিনের মতো, এই হারাম মাসের মতো, এই সম্মানিত নগরীর মতো পবিত্র আমানত। সাবধান! মানুষের আমানত প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেবে। হে মানব সকল! নিশ্চয়ই তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ একজন, তোমাদের সকলের পিতা হজরত আদম । আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার ওপর কালোর আর কালোর ওপর সাদার কোনো মর্যাদা নেই। ‘তাকওয়াই’ শুধু পার্থক্য নির্ণয় করবে। হে লোক সকল! পুরুষদেরকে নারী জাতির ওপর নেতৃত্বের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তবে নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করো। নারীদের ওপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে তেমনি পুরুষদের ওপরও রয়েছে নারীদের অধিকার।
মানবসমাজে শান্তিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় এর চেয়ে উত্তম বাণী আর কী হতে পারে? ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈশ্বিক জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়েও মহানবী সা:- এর জীবন দর্শন সমগ্র মানবজাতির জন্য আলোর দিশারি। আর এ জন্যই হয়তো জাতি, ধর্ম, মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সব বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, রাসূল মুহাম্মদ সা: সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সাফল্যে উদ্ভাসিত। এ জন্য বিশিষ্ট ঐতিহাসিক লেখক মাইকেল এইচ হার্ট তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘দি হান্ড্রেড’ এ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ১০০ জন মনীষীর তালিকায় সর্বাগ্রে মহানবী সা:-কে স্থান দিয়েছেন। আর এতে করে বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি মহানবী সা:-কে ধন্য করেছেন, মহানবী সা:-এর নাম সর্বাগ্রে দিয়ে বরং তিনি নিজেই ধন্য হয়েছেন। আসুন, আমরা জীবনের সব স্তরে মহানবী সা:-এর জীবন দর্শন অনুসরণ করি। তাহলে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হবে নিরবচ্ছিন্ন সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি। হ