ইতিহাসের দর্শন ও বিজ্ঞানের দর্শনকে যদি আমরা ব্যবহার করি তাহলে কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানী উভয়েই জ্ঞানের সাধনা করেন। অনুসন্ধান চালান। সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। হোন তিনি সমাজবিজ্ঞানী বা পদার্থবিজ্ঞানী। অনেক ঐতিহাসিকের জ্ঞান মিলে একটি প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয়। কোনো ঐতিহাসিক হয়তো জাতিতাত্ত্বিক ভিত্তিতে, কোনো ঐতিহাসিক হয়তো ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ইতিহাস রচনা করেন। প্রকৃত ইতিহাস হবে এ দুটো অথবা অনেক দৃষ্টিভঙ্গির জ্ঞানের সমন্বয়।
কোনো বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টাকে হয়তো অন্য কোনো বিজ্ঞানী দুই এক শত বছর পরে তার তথ্য ও তত্ত্বকে এগিয়ে নিয়ে যান। প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন স্টিফেন হকিং ১৯৮০ সাল থেকে চেষ্টা করছিলেন : মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন তত্ত্বের যোগসূত্র খুঁজে বের করতে। এ তত্ত্বের একটি নাম দেন তিনি মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। ‘অ ইৎরবভ যরংঃড়ৎু ড়ভ ঞরসব’ এ তিনি বিজ্ঞানের সেই তত্ত্বকেই সমন্বিত করেন। মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে স্থান ও কালের জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের জ্ঞানকে তিনি সমন্বয় সাধন করেন। এটিকে আমরা নাম দিতে পারি বিজ্ঞানের দর্শন।
ইতিহাস পুনর্গঠনের সমস্যা হলো আমরা ইতিহাসকে গুরুত্ব দেই কিন্তু ইতিহাসের দর্শনকে গুরুত্ব দেই না। নিজ নিজ ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট জাতি সম্মানের সাথে দেখে। যারা আক্রান্ত হয় তারা আবার সেই ইতিহাসকে নির্যাতনের ইতিহাস বলে। ইতিহাসকে সমন্বয় করা যাবে তখনই যখন স্বার্থ নিরপেক্ষ জ্ঞানের দৃষ্টিতে সেটিকে বিবেচনা করা যাবে।
উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবর্তনের ব্যাপারে প্রজাতির বিবর্তন তত্ত্ব রয়েছে। বিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেক সাধনা এতে সংযুক্ত হয়েছে। আধা মানুষ ও আদিম মানুষ কিন্তু এক কথা নয়। কিছু নৃবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে অস্ট্রালোপিথেকাস নামক আধা মানুষ হলো মানবজাতির আদি উৎস। তারপর এসেছে হোনো হ্যাবিলিস, হোনো ইরেক্টার্স, নিয়াল্ডারটাল এবং সর্বশেষ হোমো স্যাপিয়েন্স।
অস্ট্রালোপিথেকাস একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ দক্ষিণের বানর। দক্ষিণ আফ্রিকায় এর জীবাশ্ম পাওয়ায় এর এ ধরনের নাম হয়েছে। হোমো হ্যাবিলিসকে বলা হচ্ছে হাতওয়ালা মানুষ যাদের মাড়ির দাঁত ছিল প্রায় মানুষের মতো এবং তার চেহারাও ছিল অনেকটা মানুষের মতো। হোমো ইরেক্টানরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতো বলে এদের নাম হোমো ইরেক্টাস বা খাড়া মানুষ। স্মর্তব্য অস্ট্রালোপিথেকাসের মগজ কোষের (ইৎধরহ ঈধংব) পরিমাণ ৩৯০-৫৫০ সিসি হোমো হ্যাবিলিসের ৮০০ সিসি হোমো ইরেক্টাসের মগজ কোষ ১১৫০ ঘন সেন্টিমিটার। আধুনিক মানুষের মগজ কোষের গড় পরিমাণ ১৩৫০ সিসি। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, আধুনিক মানুষের সাথে নিয়ান্ডারটাল মানুষের অনেক সাদৃশ্য থাকলেও এদের আধুনিক মানুষের পূর্বসূরি বলা যায় না।
বিবর্তনের ব্যাপারে আমার দৃষ্টিতে বিজ্ঞানের দর্শন হলো দক্ষিণের বানররূপী আধা মানুষ বানর প্রজাতিরই উৎস। মানুষ প্রজাতির (ঐঁসধহ ঝঢ়ববরপং) উৎস নয়। প্রথম থেকেই মানুষের হাত ছিল এবং মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত। সে জন্য হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো ইরেক্টাস এর পরবর্তী প্রজন্ম মানুষ নয়। এগুলো স্বতন্ত্র প্রজাতি। মানুষ থেকেই মানুষের সৃষ্টি। প্রথম মানুষ ও নবী আদম আ: এবং তার স্ত্রী হাওয়া (বাইবেলের ব্যবহৃত নাম ঊাব) থেকেই সমস্ত মানুষের সৃষ্টি। হাওয়াকে হিব্রুতে ঐধাধ বলা হয়, যার অর্থ খরারহম বা নৎবধঃযরহম। অথবা পযধাধ এর হিব্রু অর্থ জীবন। আদম হাওয়াকে ওংযধও বলতেন আরবিতে যার অর্থ একটি মেয়ের নাম। অথবা ঈশার নামাজ। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০০-৫০০০ বছর পূর্বে হিব্রু ও আরবি বা নিরিখ আরামাইক একই ভাষাভুক্ত ছিল। মানুষ প্রজাতি থেকেই মানুষের উৎপত্তি হয়েছে। মানুষের মগজ কোষ যথাক্রমে ৩৯০-৫৫০ সিসি, ৮০০ সিসি এবং ১১৫০ সিসি ছিল নাÑ প্রথম থেকেই মানুষের মগজ কোষ গড়ে ১৩৫০ সিসি ছিল। হরিণ ঘোড়া উভয়েরই মেরুদণ্ড আছে; উভয়েরই নির্দিষ্ট পরিমাণ মগজ কোষ আছে এই সাদৃশ্যের অর্থ হরিণ ও ঘোড়া একই উৎস থেকে এসেছে তা বলা যায় না। উৎপত্তির উৎস ভিন্ন; প্রজাতির, বিভিন্ন উপকরণের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য থাকতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, হরিণ ও ঘোড়ার একই পূর্ব উৎস (ওহযবৎরঃধহপব অর্থে) থেকে সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, আধুনিক মানুষ আসার পর প্রায় দশ হাজার বছর পর্যন্ত ইউরোপে নিয়ান্ডারটাসরা টিকে ছিল। এরপর তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এতে বোঝা যায়, অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো হ্যাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস ও নিয়ানডারটাল আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ নয়। বরং স্বতন্ত্র প্রজাতির পূর্বপুরুষ তারা। বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষ তারা। এতে বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা সম্মানিত হয় এই অর্থে যে, মানুষ প্রজাতি থেকেই মানুষের সৃষ্টি এর মধ্য দিয়ে পুরো মানবজাতিই মর্যাদার আসন লাভ করে।
ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডাম (১৮৮১) ঐঁমড় ফব ঠৎরবং (১৮৪৮-১৯৩৫) হল্যান্ডের অধিবাসী এবং চষধহঃ ঢ়ংুংরড়ষড়মু অধ্যাপনা করেছেন। তার গঁঃধষরড়হ ঞযবড়ৎু মূলকথা হলো নতুন বৈচিত্র্য ও প্রজাতি সংগঠিত থাকে, বিচ্ছিন্ন বৈচিত্র্যের (ফরংপড়হঃরহঁড়ঁং ঠধৎরধঃরড়হ) ঝাঁকুনির মাধ্যমে। বিবর্তনের আরো দুটো ধারা আমরা উল্লেখ করছি। একটি হলো ঈড়হাবৎংবহঃ ঊাড়ষঁঃরড়হ এবং ফরাবৎমবহঃ বাড়ষঁঃরড়হ ঈড়হাবৎংবহঃ বাড়ষঁঃরড়হ এ দুটো প্রজাতি ক্রমান্বয়ে এককেন্দ্রিক হয় বা সমপ্রজাতিতে সমন্বিত হয়। ফরাবৎমবহঃ বাড়ষঁঃরড়হ এ দুটো প্রজাতি ক্রমান্বয়ে আলাদা হয়ে যায়। বিবর্তনবাদী জ্ঞানের মাধ্যমে বিবর্তনের ইতিহাস আমরা জানতে পারি। একটি মূল প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতি সৃষ্টি এটিই বিবর্তনের দার্শনিক তত্ত্ব।
ইতিহাসের ক্ষেত্রে পুরনো প্রস্তর যুগ (চধষবড়ষরঃযরপ অমব) এবং নবোপলীয় যুগকে (ঘবড়ষরঃযরপ অমব) আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি। ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক যুগকে আমরা পুরোপলিস ও নবোপলিস হিসেবে চিহ্নিত করি। পুরোতত্ত্ববিদদের (অৎপযধবড়ষড়মরংঃ) মতে, প্রাচীন ও নতুন প্রস্তর যুগের মোট স্থায়িত্ব কাল প্রায় ২৫ লাখ বছর যা মানবসমাজের ইতিহাসের নিরানব্বই শতাংশেরও বেশি। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পরের সময়কে আমরা ঐতিহাসিক যুগ (ঐরংঃড়ৎরপধষ অমব) বলি। ঐতিহাসিক যুগের পরিধি হলো আজ হতে আট থেকে দশ হাজার বছর পর্যন্ত। খ্রিষ্টপূর্ব দশ হাজার বছর থেকে ৪৭৬ সাল পর্যন্ত হলো ইতিহাসের প্রাচীন যুগ। এ যুগেই সৃষ্টি হয়েছে সভ্যতার ইতিহাস। মেসোপটমীয় সভ্যতা, মিসরীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, আর্য সভ্যতা, চীনা সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা, গ্রিক ও রোমান সভ্যতা এবং মায়াআজটেক ও ইনকা সভ্যতাগুলোই মূলত বিশেষ সভ্যতা।
তার শাসকগণ সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর আদমের সন্তান নবী হজরত শিশ আ:, ইদ্রিস (ঊহড়পয) নূহ আ:, হুদ আ:, ইব্রাহিম আ: ও আইয়ুব আ: দ্বারা সুমেরু, ব্যবিলনীয় মিসরীয়, আশেরীয়, ইসাবেলীয়, সিরীয়, অ্যাসিবীয় ও রোমান সভ্যতা গড়ে ওঠে।
ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক যুগের স্থায়িত্ব প্রায় ২৫ লাখ বছর। এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যকার প্রাচীন যুগের পরিধি হলো ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার বছর। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের এই বিবর্তন মানবজাতির অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করেছে। এক্ষেত্রে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের সমন্বিত দর্শন হলো ইতিহাসের ধারাকে আমরা মানবজাতির নেতৃত্বে পরিচালিত করতে চাই। ইতিহাসের সংঘর্ষকে এড়াতে চাই। অন্য সমস্ত প্রজাতি ও সৃষ্টিকে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্যই আমরা ব্যবহার করছি। ইতিহাসকেও আমরা মানব মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করি। বিবর্তনের ইতিহাসকে উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর ক্রম উন্নয়ন হিসেবে দেখতে চাই। মানবপ্রজাতি থেকে মানুষের উৎপত্তিÑ এই সম্মানজনক অভিধাকে বিবর্তনের ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে মানবমর্যাদাকে সমুন্নত করতে চাই। এভাবে ক্রমেই অনুসন্ধানের মাধ্যমে রচিত হবে ইতিহাসের পুনর্গঠন (ঞযব জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ ড়ভ ঐরংঃড়ৎু)। হ্যান্টিংটম কথিত ঈষধংয ড়ভ পরারষরুধঃরড়হ নয় বরং সভ্যতার জ্ঞানধর্মী সমন্বয় চিন্তাকেই আমি ইতিহাস পনর্গঠনের মাপকাঠি মনে করি। হ
ইতিহাসের দর্শন ও বিজ্ঞানের দর্শনকে যদি আমরা ব্যবহার করি তাহলে কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানী উভয়েই জ্ঞানের সাধনা করেন।...
