তোমরা কি কখনো গরুর গাড়ি দেখেছো? হয়তো দেখেছো। কেউ জাদুঘরে থাকা সংরক্ষিত ছবিতে। কেউবা আবার বইয়ের পাতায়। আবার কারো কারো হয়তো ভ্রু কুঁচকে গিয়েছে! এ কেমন কথারে! গরুর আবার গাড়ি হয় নাকি?
গরুর গাড়ি আমাদের রূপময় পল্লীবাংলার এক ঐতিহ্যবাহী বাহন। মাত্র তিন যুগ আগেও এ গরুর গাড়িতে চড়ে বর-বধূ পাড়ি দিত পল্লীর মেঠোপথ। গাঁও গ্রাম আর বহু দূরের ছোট ছোট হাটবাজার। ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল নিয়ে রওনা হতো শহরতলির উদ্দেশে। গ্রামবাংলায় যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য সবার কাছে ছিলো এটি গুরুত্বপূর্ণ যান।
বর্তমানে যান্ত্রিক উন্নতির এ যুগে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধীরগতির পরিবেশবান্ধব এ বাহন এখন বিলুপ্ত। গরুর গাড়ির ইতিহাসের দিকে তাকালে যে কারোরই চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হতে পারে।
ইতিহাস আমাদেরকে জানায় সভ্যতার প্রায় প্রথম দিকেই গরুর গাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এবং পরিবহনের জন্য ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ যান। এমনকি প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগ ও হরপ্পা সভ্যতাতেও গরুর গাড়ির প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদদের ধারণা খ্রিষ্টীয় সূচনার ৩১০০ বছর আগে এ বাহনটির প্রচলন ছিলো।
বহুকাল আগে ১৩০০ সালের দিকে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে যে মোঙ্গল আক্রমণ হয় সেখানে প্রতিরোধের জন্য গরুর গাড়ির দুর্গের ব্যবহার হয়েছিল।
গরুর গাড়ি দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা একপ্রকার যান। একটি অক্ষ থাকে তার। যাতে যুক্ত করা হয় গোলাকার কাঠের চাকা। এ কাঠের তৈরি চাকা জোড়া দিয়ে গরুর গাড়ি কত পথ আর কত বন্দর পাড়ি দিয়েছে তা বলা দুষ্কর।
এ গাড়ির সামনের দিকে একটি জোয়ালের সাথে জোড়া গরু বা বলদ জুড়ে দিয়ে টানা হয়। এ গাড়ির সাধারণত দুইটি ধরন থাকে। যাত্রীবাহী গরুর গাড়ি এবং কিছু মালবাহী গরুর গাড়ি। তবে গরুর গাড়ি যে ধরনেরই হোক না কেন, তাতে যাত্রী এবং মালামাল উভয় একসাথেও পথ অতিক্রমের সুবিধা নিতে পারে।
বিশেষ যাত্রীবাহী গরুর গাড়িগুলোতে বাঁশকে ইংরেজি ইউ আকৃতি দিয়ে তার চারদিকে চাটাই দিয়ে একপ্রকার ছাউনি বা চাল তৈরি করা হয়। সে বিশেষ ছাউনি যাত্রীদের প্রখর রোদের তীব্রতা কিংবা শীতের টুপ করে ঝরে পড়া কুয়াশা থেকে নিরাপদ রাখে। সেখানে পা জড়িয়ে বসে থাকে কেউ। কেউবা শীত সকালে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুনতে থাকে গরুর গাড়ির ক্যাচর ক্যাচর শব্দ।
সে বিশেষ ছাউনিকে বলা হয় ছাপ্পর। তবে এটি হিন্দি শব্দ।
তাহলে কি গরুর গাড়ি কেবল দুই গরু আর দুই চাকার সাহায্যে এমনি এমনি চলে? এর কোনো চালক নেই তাহলে! ব্যাপারটা এমন নয়। উড়োজাহাজ কন্ট্রোলের জন্য যেমন রয়েছে ক্যাপ্টেন, বাসগাড়ির যেমন ড্রাইভার ঠিক তেমন গরুর গাড়ির রয়েছে গাড়িয়াল। তার মানে যিনি গরুর গাড়ির ক্যাপ্টেন তাকেই গাড়িয়াল বলে। আর গরুর গাড়ির এ গাড়িয়ালকে নিয়ে ভাওয়াইয়া সম্রাট কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের এক বিখ্যাত গান রয়েছে। যে গান চৈত্রের কড়া দুপুরে ঘরে ফেরা জোয়ান কৃষকরা এখনো গেয়ে ওঠে কাতর সুরে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই
কতো রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়ারে
ও কি গাড়িয়াল ভাই
কতো রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়ারে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরেরে।
তোমরা কি কখনো গরুর গাড়ি দেখেছো? হয়তো দেখেছো। কেউ জাদুঘরে থাকা সংরক্ষিত ছবিতে। কেউবা আবার বইয়ের পাতায়। আবার কারো কারো হয়তো ভ্রু কুঁচকে গিয়েছে! এ...
