কেউ-ই ভাবেনি ২০২১ সালটা এভাবে যাবে। পুরো বছর মৃত্যুভয়ে মানুষকে সন্ত্রস্ত থাকতে হয়েছে। এখনো থাকতে হচ্ছে। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে প্রত্যেকটা মানুষ কতটা একা। এ যাবত মানুষ বড়াই করেছে আত্মীয়-প্রিয়জন নিয়ে। বড়াই করেছে নিজের শক্তি-সামর্থ্য-জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে, ধনসম্পদ-সম্পত্তি নিয়ে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কিছু মানুষ করতে পারল না করোনার বিরুদ্ধে। তবে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ যেটা করল, তা হলো- করোনাআক্রান্ত মানুষকে কেউ স্পর্শ করতে পারল না। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিকে কেউ দাফন করতে চাইল না। চাই সে মানুষ যত কাছেরই আপনজন, প্রিয়জন হোক না কেন? এ দৃশ্য মানুষ এর আগে অনুভব করেনি, দেখেনিও কখনো। সে জন্যই বলতে হয়, আল্লাহ ব্যতীত মানুষের আপন বলতে কেউ নেই। বোধ হচ্ছে, আমরা মানুষ আল্লাহকে এখনো আপন করতে শিখিনি। আল্লাহকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন ও মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞা থেকে মহামারী আসে। বিজ্ঞান এ কথাকে অস্বীকার করতে পারে কিন্তু পবিত্র কুরআনে এটিই বলা হয়েছে। ‘মহামারী মানুষের কর্মের ফল’। সে জন্যই হয়তো করোনা নিয়ে বিজ্ঞানের বক্তব্য মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। পারেনি বলেই ২০২০, ২০২১ সাল পুরোটাই মানুষকে মৃত্যুভয়ে সন্ত্রস্ত, শঙ্কিত ও আতঙ্কে থাকতে হয়েছে। এরই মধ্যে করোনার আরেকটি ধরন ‘ওমিক্রন’ মানুষকে আক্রমণ করেছে। এর চেয়েও ভয়াবহ ধরন ‘ডেলমিক্রন’ ইউরোপে বিস্তার হতে চলেছে। আল্লøাহ ভালো জানেন, মানুষের ভাগ্যে আরো কী কী ঘটতে যাচ্ছে।
মানুষ ২০২১ সালের প্রথম প্রহরে যেভাবে পুরো বছরের স্বপ্ন দেখেছিল, সেভাবে ২০২২ সালের প্রথম প্রহরেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। স্বপ্ন দেখা মানুষের থেমে থাকে না, থেমে থাকবে না। কিন্তু ২০২১ সালে মানুষ যেসব স্বপ্ন দেখেছিল, সেসব স্বপ্নের বেশির ভাগই পূরণ হয়তো হয়নি। বরং যা স্বপ্নেও ভাবেনি তাই হয়তো ঘটে গেছে। আদতে মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। মানুষ ২০২২ সালের প্রথম দিনে আগামী এক বছরে যা যা করার কথা ভাবছে, তা তা করতে পারবে কি না তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। না পারার কারণ, করোনা ছাড়াও নানাবিধ প্রতিকূলতা। এসব প্রতিকূলতার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- রোগ-শোক-জরা ও মৃত্যু। মৃত্যু এমন একটি জিনিস, যা মানুষের সব স্বপ্নকে মুছে দেয়। সেই মৃত্যুভয় দেখাতে আমাদের সামনে উঁকি দিচ্ছে ওমিক্রন, ডেলমিক্রন। তবুও আমরা ভালো থাকার আশা করতে চাই, ভালোবাসায় ভাসতে চাই। এই ভালো থাকা, ভালোবাসা আগামী দিনের, আগামী বছরের। ২০২২ সালের আশা, সুখের আশা; স্বস্তির প্রত্যাশা।
মানুষের আগামীর আশা-প্রত্যাশা দুই ধরনের। এক ধরনের আশা-প্রত্যাশা হচ্ছে- ব্যক্তির নিজের জীবনের। আরেক ধরনের আশা-প্রত্যাশা হচ্ছে- ব্যক্তির জাতীয় জীবনের। ব্যক্তির নিজের জীবন চিরস্থায়ী তো হয়ই না, এমনকি দীর্ঘস্থায়ীও হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য ব্যক্তি জীবনের আশা-আকাক্সক্ষার অপূর্ণতা থেকে যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির জাতীয় জীবন চিরস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি হতে পারে। কাজেই প্রত্যাশা পূরণের বিষয়ে, স্বপ্ন দেখার বিষয়ে ব্যক্তি জীবনের চেয়ে জাতীয় জীবনের গুরুত্ব বহু গুণ বেশি। জাতীয় জীবনে স্বপ্নের গুরুত্ব এ কারণেও বেশি যে, প্রত্যেকটি মানুষের অতীত আছে, বর্তমানও আছে কিন্তু ব্যক্তি মানুষের ভবিষ্যৎ মৃত্যুর কাছে পরাভূত। মানুষ এই বেঁচে আছে; এই নেই। এক সেকেন্ড পরই মৃত্যু হতে পারে। কাজেই এই এক সেকেন্ডে ব্যক্তির ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। ভবিষ্যৎ তৈরি হয় একটি পরিবারের, একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রের, একটি জাতির। ভবিষ্যৎ রয়েছে কোনো প্রতিষ্ঠানের, কোনো দর্শনের। যে সবের ভবিষ্যৎ রয়েছে, সে সবের জন্য স্বপ্ন দেখারও প্রয়োজন আছে। কেননা, একটি পরিবার, একটি সমাজ, রাষ্ট্র, জাতি, দর্শন যুগ যুগ টিকে থাকতে পারে। টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেন মানুষের কল্যাণে সঠিক কাজটি করে যেতে পারে সে জন্য প্রতিষ্ঠানের উন্নতি কল্পনা করে স্বপ্ন দেখা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করা যেতে পারে; ভবিষ্যৎকে সুন্দরভাবে সাজানো যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা মানবতাবাদী হতে পারবে, ব্যক্তি জীবন এক সেকেন্ড বাঁচলেও ততটাই স্বস্তির সাথে বাঁচতে পারবে।
বিগত বছরগুলোতে লক্ষ করা গেছে, মানুষ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে সবচেয়ে বেশি। অথচ নিজের বেঁচে থাকার বিষয়ে মানুষের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও মানুষ নিজের স্বার্থে অটুট থাকতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্বস্তি ও যন্ত্রণার বিষফোঁড়া করে ফেলেছে। মহামারী যা ক্ষতি করেছে তো করেছেই; তার চেয়ে বেশি ক্ষতি মানুষ নিজেরা নিজেদের জন্য করেছে। একুশ সালের শেষপ্রান্তে এসে দেখা গেল, ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে আগুন লেগে চল্লিশের অধিক মানুষ পুড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। লঞ্চের মালিকপক্ষ যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখলে কখনোই এমন ঘটতে পারত না। মালিকপক্ষ স্বপ্ন দেখেছে, কোনোরকমে যাত্রী পারাপার করতে পারলেই কেল্লাফতে। তারা নিজেদের স্বার্থ ভেবেছে; যাত্রীদের কল্যাণের কথা মাথায় রাখেনি। কিন্তু এ ঘটনায় লঞ্চের মালিকপক্ষও তো বাঁচতে পারল না।
এতগুলো মানুষের মৃত্যুর দায় নিয়ে মালিকপক্ষের বেঁচে থাকাকে বাঁচা বলা যাবে না। এর আগেও নৌরুটে নানাবিধ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিড়ম্বনা তো রয়েছে অবিরত। এসব দুর্ঘটনা ও বিড়ম্বনা ঘটার পেছনের কারণ হলো- কেউ নৌবিভাগের স্বার্থ দেখেনি, লঞ্চ মালিকপক্ষ নিজেদের স্বার্থে অন্ধ থেকেছে। কক্সবাজারে নারী পর্যটককে ধর্ষণ ঘটনাও একই সূত্রে গাঁথা। কেউ পর্যটনশিল্পর স্বার্থ দেখেনি। ধর্ষক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, হোটেল মালিক সবাই নিজেদের স্বার্থে দৃঢ় থেকেছে। রাষ্ট্রকেও আজ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের স্বার্থে। নির্বাচন কমিশনকেও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের জন্য অস্বস্তির আড়তদারে পরিণত হয়েছে। এতে দেশের প্রত্যেকটি মানুষ অস্বস্তিতে নিপাত যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে তারাও যে স্বস্তিতে আছে এমনটা বলা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে তাদের জীবনে স্বস্তি লক্ষ করা গেলেও ভেতরে ভেতরে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও সম্মান নিঃশেষ হতে চলেছে। ফলে তারাও যে অস্বস্তির বিষবাষ্পে জ্বলতে যাচ্ছে তা সমাজের দিকে তাকালেই চোখে পড়ছে। অন্যকে অস্বস্তির মধ্যে রেখে নিজের স্বস্তি আশা করা যায় না। তবুও মানুষ এতটা আত্মকেন্দ্রিক হলো যে, অন্যের সমস্যাকে কেউ আর পাত্তাই দিতে চাইছে না। সবাই ব্যস্ত নিজের পাতে ঝোল টানতে। এতে করে যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা অব্যাহতভাবে জাতি, সমাজ, রাষ্ট্রকে অন্ধকার গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই অন্ধকার গহ্বরটি এমন যে, প্রত্যেকটি মানুষ নিজের অন্যায্য স্বার্থে অবিচল থেকে অন্যের কাছে স্বার্থ ত্যাগের প্রত্যাশা করছে। যেমন- এক পকেটমার অন্য একজনের পকেট মেরে টাকা গণনার সময় খেয়াল করল যে, মেরে দেয়া নোটগুলোর মধ্যে দু’টি নোট জাল রয়েছে। এই জাল নোট দেখে পকেটমারের আক্ষেপ হলো। সে ভাবতে থাকল- হায় আফসোস; দেশের মানুষ এত অসৎ হয়ে গেল যে, আজকাল জাল নোটও পকেটে করে ঘোরে। পকেটমারের এই চেতনা আজ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নামের প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে ফেলেছে। ২০২২ সালে যেন এই পকেটমারদের চেতনা আর অগ্রসর না হতে পারে তার প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যাশা দু’টিই রাখতে পারলে জাতীয় জীবনে মঙ্গল আসতে পারে।
কেউ-ই ভাবেনি ২০২১ সালটা এভাবে যাবে। পুরো বছর মৃত্যুভয়ে মানুষকে সন্ত্রস্ত থাকতে হয়েছে। এখনো থাকতে হচ্ছে। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে প্রত্যেকটা মানুষ কতটা একা। এ যাবত...
