প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য ঋগ্বেদে ‘বঙ্গ’ বা বঙ্গদেশ সম্পর্কে কোনো কিছু উল্লেøখ নেই। তবে ঋগ্বেদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ঐতরেয় (১৪০০-১০০০ খ্রিষ্টপূর্ব)-এর একটি পদে ‘বঙ্গ’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ‘বঙ্গবাসী’ তথা ‘বঙ্গ’ জনপদবাসীকে পাখি আখ্যাত করে বলা হয়েছে বয়াংসি বঙ্গবগধবাশ্চের পাদা (২য়/১ম/১)। প্রাচীনকালে বৈদিক আর্যরা ‘বঙ্গ’ বা এ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে অনার্য দাস শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করতেন। তারা এ জনপদের অধিবাসীদের মানুষ না বলে পশু-পাখির সাথে তুলনা করতেন। এ জন্য তারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে বঙ্গবাসীকে মানুষ না বলে পাখি হিসেবে উল্লেøখ করেছেন এবং এ জনপদের ভাষাকে ‘পক্ষীর বুলি’ হিসেবে অবজ্ঞা করেছেন। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত বহিরাগত ব্রাহ্মণ সেনারা বাঙলা ভাষার বিরুদ্ধে তাদের এ অবজ্ঞা ও বিশ্বাস প্রচার করতেন।
ভারত উপমহাদেশে আর্যকরণ শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ বছর আগে থেকে। ইউরোপ থেকে আগত আর্যরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত পারস্য পেরিয়ে ভারতে আগমন করে। তৎকালীন দ্রাবিড় অধ্যুষিত সিন্ধু-পাঞ্জাব ও উত্তর ভারত আর্যদের দখলভুক্ত হওয়ার পর আর্যরা পূর্ব ভারতের দিক অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু স্বাধীন মনোভাবসম্পন্ন ও নিজ কৃষ্টি গর্বে গর্বিত বঙ্গবাসী আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে বাধা সৃষ্টি করে। এতে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত এসে আর্যদের সামরিক অভিযান থমকে দাঁড়ায়। তৎকালীন এতদঞ্চলের অধিবাসীদের প্রতিরোধের ফলে খ্রিষ্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত এ অঞ্চলে আর্যকরণ সম্ভব হয়নি। এ কারণে আর্যরা সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়ে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই দেখা যায় মৌর্য বংশ (খ্রিষ্টপূর্ব ৪ শতক) শাসনক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আর্যকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর খ্রিষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে বঙ্গ অঞ্চলে আর্যকরণ প্রায় সম্পন্ন হয়। গুপ্ত আমলে বঙ্গ অঞ্চলে আর্য-ব্রাহ্মণ্যবাদীদের প্রচণ্ড প্রভাব লক্ষ করা যায়। মৌর্য ও গুপ্ত রাজবংশের শাসনামলে আর্যভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। এর প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণ জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মকে আশ্রয় করে সংঘটিত হয়। এ সময় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতি বঙ্গ, রাঢ় ও গৌড় অঞ্চলের জনগণের আত্মরক্ষার সংগ্রামে শক্তির নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। আর জনগণের আর্যআগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধ শক্তিকে অবলম্বন করেই বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের প্রধান ধর্ম-সংস্কৃতি হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শুরুর দিকে গুপ্ত রাজাদের মহাসামন্ত ব্রাহ্মণ্য শৈবধর্মের অনুসারী শশাংক গৌড় অধিপতি হন এবং তিনি মুর্শিদাবাদের কর্র্ণসুবর্ণে গৌড়ের রাজধানী স্থাপন করেন। তার শাসনামলে এ অঞ্চলে অধিকসংখ্যক পশ্চিম ভারতীয় আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটে। শিবপূজারি রাজা শশাংক বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মূলের নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি গয়ায় বৌদ্ধধর্মের তীর্থ গাছ ‘বোধি বৃক্ষ’ ছেদন করেন। এ ছাড়া সেতুবন্ধ (মুর্শিদাবাদের ভাটির অঞ্চল) থেকে হিমালয় পর্যন্ত তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। রাজা শশাংকের পরে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শেষার্ধ থেকে অষ্টম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘মাৎস্যন্যায়ের’ এক শ’ বছর এতদঞ্চলে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করেছিল। ‘মাৎস্যন্যায়ের’ এ অন্ধকার যুগে বৌদ্ধধর্মের সাংস্কৃতিক আদর্শের ওপর আর্যসংস্কৃতির প্রভাব বেড়ে যায়। আর এ সময় এ অঞ্চলে সংস্কৃতি ভাষাও মাথা চারা দিয়ে ওঠে।
‘মাৎস্যন্যায়’ যুগের অবসান ঘটিয়ে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে গৌড়-বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল শাসনের সূচনা হয়। পাল আমলে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজস্ব সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এ সময় বিভিন্ন ‘বৌদ্ধবিহার’ ‘সংঘারাম’ শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিক্রমপুরের অতীশ দীপঙ্কর (৯৮০-১০৩৫) এ যুগের বিশ্ববিশ্রুত জ্ঞান সাধকের নাম। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শীলভদ্র ছিলেন একজন বঙ্গবাসী। তিনি চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের শিক্ষক ছিলেন। পাল বংশের শাসনামল প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। পাল রাজাদের উদারতার ফলে বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতির সমন্বয় লক্ষ করা যায়। কিন্তু তথাকথিত এ সমন্বয়ের কারণে সংস্কৃতসেবী ব্রাহ্মণরা বৌদ্বধর্ম-সংস্কৃতি দূর করার সুযোগ পায়। এ কারণে পরবর্তীতে বঙ্গ-গৌড় থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রায় নির্বাসনে যায়।
পাল যুগকেই বাংলা ভাষার আদি সৃহ্যমানকাল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। অর্থাৎ এ সময় বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ রচিত হয়। তবে চর্যাপদের ভাষার সাথে বাংলাভাষার হুবহু মিল পাওয়া যায় না, এর ভাষা অস্পষ্ট। এ জন্য সাহিত্যিকরা এর নাম দিয়েছেন ‘আলো-আঁধারি’ বা ‘সান্ধ্যভাষা’। চর্যাপদকে ‘মৈথিলী’, ‘হিন্দি’, ‘উরিয়া’ ও ‘অহমি’ ভাষার আদি ভাষা হিসেবেও দাবি করা হয়। ‘হিন্দি’ ও ‘মৈথিলী’দের দাবি ধোপে না টিকলেও ‘উরিয়া’ ও ‘অহমি’দের দাবি একেবারে অযৌক্তিক নয়। কারণ চর্যাপদের সাথে উরিয়া ও অহমি ভাষার অনেক মিল আছে। যেমন মিল আছে বাংলা ভাষার সাথে। এ জন্য ভাষা গবেষকদের মতে বর্তমান ভিন্নতার আগে বাংলা, উরিয়া ও অহমি ভাষার অভিন্ন রূপ থাকতে পারে। হতে পারে সে অভিন্ন রূপেই চর্যাপদের সৃষ্টি হয়েছে। চর্যাপদের ব্যাকরণ, ছন্দ-অলঙ্কারের কিছু কিছু ব্যতিক্রম দৃষ্টিগোচর হলেও সেগুলোতে বাংলার আদিরূপই বিধৃত হয়েছে। তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের বিধি-বিধান, সাধারণ মানুষের সুখ-দঃখ, জীবন-জীবিকা, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে এসব চর্যাপদে। অধিকাংশ চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে রচিত এবং এগুলো বাংলাভাষার নিজস্ব সম্পদ। তাই বলা যায় চর্যাপদই বাংলা ভাষার শৈশবকাল। কিন্তু চর্যাপদের ভাষা স্থায়িত্ব লাভের আগেই ভারতের দক্ষিণ কর্নাটক থেকে আগত সংস্কৃতভাষী সেন শাসকরা বাংলাভাষা চর্চাকে নিষিদ্ধ করেন এবং সংস্কৃতকে রাজভাষা করেন। অধিকন্তু তারা ‘রৈরব’ নামক নরকের ভয় দেখিয়ে বাংলা ভাষাকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখার কৌশল করেন। এ ভয়ে সরকারি কর্মচারী ও উঁচু বর্ণের মানুষরা বাংলাভাষা চর্চা বাদ দিলেও সাধারণ মানুষ তাতে কর্ণপাত করেননি। তারা ‘পক্ষীর বুলি’ তথা বাংলা ভাষাকে ছাড়েননি এবং বিদেশী ভাষা সংস্কৃতকে মন থেকে গ্রহণ করেননি।
১২০৩ সালে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে সেন শাসনের অবসান হলে এ দেশের অধিবাসীরা আবার নতুন করে বাংলা ভাষা চর্চা করার সুযোগ পান। তুর্কিরা বিদেশী হলেও তারা স্থানীয় বাংলা ভাষাকে অবমূল্যায়ন করেননি। ফার্সিকে তারা রাজভাষা করলেও বাংলাভাষা চর্চায় কোনো নিষেধাজ্ঞা-ভয় দেখাননি। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কারণে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্য নেই। তখন বাংলাদেশ কিংবা বাংলা ভাষাভিত্তিক কোনো অঞ্চল ছিল না। সুলতানি শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। ১৩৫২ সালে হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ড্রবর্ধন, লক্ষ্মণাবতী, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি বাংলাভাষী অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘সুবহি বাঙ্গালা’ নাম দেন। আর এর অধিবাসীদের নাম দেন ‘বাঙালি’। এতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায় এবং বাংলা ভাষার পুনর্জন্ম হয়। এ সময় বড়– চণ্ডীদাস ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ (১৩৫০) কাব্য রচনা করে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বন্ধ্যত্ব ঘুচান। আর শাহ্ মুহাম্মদ সগীর ‘ইউসুফ জুলেখা’ (১৩৮৯-১৪১০) রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রোমান্টিকতার আবির্ভাব ঘটান। পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ, জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্, রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ্, আলাউদ্দীন হুসেন শাহ প্রমুখ মুসলিম নৃপতিদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু, জৈনুদ্দীন, বিজয় গুপ্ত, কৃত্তিবাস, মুজাম্মিল, বিপ্রদাস পিপিলাই প্রমুখ কবি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। মূলত পাঠান বংশের স্বাধীন সুলতানদের শাসনামলে (১৩৩৮-১৫৭৫) বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ হয়। এরপর মোগল শাসনামলে সৈয়দ সুলতান, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আবদুল হাকিম, দৌলত উজির বাহারাম খান, কোরেশী মাগন ঠাকুর, সৈয়দ আলাওল, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর প্রমুখের সাহিত্য সাধনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি লক্ষ করা যায়।
প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসকরা শুধু ‘বাঙালা ভাষা’ ও ‘বাঙালি’ জাতিকে স্বতন্ত্র সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করেননি বরং তারা ‘বাঙালা ভাষা’ ও সংস্কৃতি চর্চাকে সমৃদ্ধ করতেও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। গৌড়ের মধ্যে প্রায় বিলীন হওয়া ‘বঙ্গ’ জনপদকে যেমন তারা শুধু রক্ষাই করেননি বরং প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি সেন শাসনামলে সংস্কৃতভাষা দিয়ে বাংলা ভাষাকে ঢেকে দেয়ার ষড়যন্ত্র থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করে তারা বিশ্বদরবারে অন্যতম মর্যাদাশীল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাল আমলে জন্ম নেয়া মুহ্যমান বাংলা ভাষাকে যখন সেন শাসকরা আঁতুড়ঘরেই গলাটিপে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল তখনই বাংলা ভাষার আশীর্বাদস্বরূপ মুসলিম শাসকদের আগমন ঘটেছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় এবং হিন্দু-মুসলিম সাহিত্যিকদের মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা-সাহিত্যের বিকাশ ও সমৃদ্ধি আসে। কিন্তু ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার শাসকের পরিবর্তনের সাথে ভাষা-সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়। এতে মুসলিম শাসনামলের বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং নিম্নমানের মিশ্রভাষার ‘পুঁথিসাহিত্য’ ও ‘কবিয়াল গানে’র আবির্ভাব ঘটে।
তবে ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাঘাত ঘটলেও পরে উন্নতি সাধিত হয়। ইংরেজ শাসনামলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্য সাহিত্য পাওয়া যায়, এ সময় বাংলা ভাষায় কোনো গদ্য সাহিত্য রচিত হয়নি। অন্য দিকে, ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি গদ্য-সাহিত্যের সূচনা হয়। এ সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, জীবনান্দ দাশ, জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ, আরও পরে শামসুর রাহমান, সুফিয়া কামাল, আল মাহমুদ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। ১৯১৩ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে নোবেল বিজয় বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে মুসলিম ও ইংরেজ শাসনামলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও ব্যাপ্তি বাড়লেও কখনো রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়নি। অথচ ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলে জাতীয় ভাষার উন্নতি ও মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসন অবসানের পর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অধিবাসীরা বাংলা ভাষা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন। তারা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। কিন্তু উর্দুভাষী শাসকরা বাঙালিদের দাবি উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ। জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন উপেক্ষা করে আন্দোলন করেন তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮ বাংলা) তারিখে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক, রফিক, শফিউদ্দীনসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে তৎকালীন সরকার পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ‘শহীদ দিবস’। আর তাদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় রাখতে নির্মিত হয়েছে আমাদের ‘শহীদ মিনার’। অধিকন্তু ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতিসঙ্ঘ ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে। তাই বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক রাষ্ট্র এ দিবসটি পালন করছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রহণ-বর্জন এবং অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার অবস্থান বিশ্বদরবারে আজ সুসংহত হয়েছে। হ