বই তুমি কার, যে পড়ে তার। আমাদের কৈশোর-যৌবনে বই ছিল বিনোদনের একমাত্র উপকরণ। তারুণ্যের স্পর্ধায় টগবগ, সেই স্পর্ধা ভাষায়, বিন্যাসের কৌশলে, চিন্তাকে উস্্কে দিয়ে সাজিয়ে নেয়ার আশ্চর্য কৌশল ছিল। সে সব বইয়ে ঘুরে ফিরে আসতো-আমাদের শৈশব-কৈশোর, নিবিড় নির্জন প্রকৃতি, কখনো পার্বত্য শহর কিংবা অরণ্য, কখনো আটপৌরে গ্রামগঞ্জ কিংবা দিগন্ত বিস্তৃৃত সমুদ্রের বেলাভূমি। অধরা প্রকৃতির হাতছানি প্রাণমনকে টেনে নিয়ে যেত ঘরের বাইরে। কেটেছে কত হতভম্ব দিন। কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু বই ভেতরের জগৎটাকে দিত আমূল বদলে। যাকে বলে মধুরেন সমাপয়েৎ! এখনো তাদের স্বর ভেসে আনে পুরনো হাওয়া। সে যুগের ইতিহাস বুকে ঐ তো পড়ে আছে আমাদের চল্লিশ-পঞ্চাশ দশক। সস্নেহে বলছি, আজকের নোটসর্বস্ব শিক্ষার যুগে তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
মগজের চর্চা তো এক ধরনের খেলা এবং সেই খেলাটিই জীবন। সে কারণে মনের একটা জানালা খোলা থাকবে, খোলা বাতাসে শ্বাস নেয়ার জন্য, সেই জানালাটির নাম বই।
বলাবাহুল্য, শিক্ষা বিস্তারের প্রধান মাধ্যম বই। প্রাথমিক শিক্ষার উপাদান থেকে সর্বোচ্চ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ফসল বইয়ের পৃষ্ঠাতেই বিধৃত। বিশ্ববিখ্যাত কোন এক মনীষী বলেছেন, জীবনের জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। ১. পড়া ২. পড়া ৩. পড়া। কেন না সঞ্জীবনী আজো যে বই-বই-বই। যারা মনের জানালা বন্ধ রেখে বইয়ের প্রতি উদাসীনতা ও অবজ্ঞা দেখান তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কী বা করা যায়।
বর্তমানে প্রযুক্তি নির্ভর অর্থকরী বিদ্যার চর্চা প্রজন্মকে সমৃদ্ধি দিচ্ছে ঠিকই; কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে যেন এক অন্তঃসারশূন্য সমাজের সৃষ্টি হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক পড়া তো বাধ্যতামূলক। এখানে বই পড়ার অর্থ সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই। পত্রপত্রিকাও নয়। দরকার মানববিদ্যা নির্ভর উপযুক্ত মূল্যবোধের শিক্ষার প্রসার।
অধুনা শিক্ষিত যুবসম্প্রদায় অবসর বা অবকাশ পেলে টিভি খুলতেই বেশি আগ্রহী, বই পড়া নয়। যুব-মানসে টেলিভিশনের প্রভাব অনেক বেশি গভীর। বই পড়তে চায় এমন যুবক-যুবতীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অবসর পেলে ঘুমাতে চায়। এটি হলো যুবসম্প্রদায়ের বাসনা বা ইচ্ছের কথা। যুবসমাজকে বইমুখী করার কী নিদান তাতো জানা নেই। বইবিমুখ এই প্রবণতার অভিমুখ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কি তাও বলতে পারি না। কেননা বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টারনেট এবং বৈদ্যুতিক মাধ্যম, অর্থাৎ টিভি। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোবাইল ফোনেরও উল্লেখ করা যায়।
অবশ্য সত্যিকারের বই পড়ার ক্ষেত্রে ছবিটা তত নৈরাশ্যজনক নয়। কেউ কেউ সময় পেলে বই-টই পড়ে। সেটা পড়ার বই বা অন্যতম বই, যাই হোক। কেউ কেউ বই পড়তে বসে মাসে একবার কি দুবার। আবার কেউ অফিসের কাজে ফাঁকি দিয়ে বই পড়ে।
বর্তমানে কম্পিউটারের কল্যাণে টেক্সটের সাথে হাইপারটেক্সট-এর জড়িয়ে যাওয়া এক বিপ্লব বৈকি! সেটা হলো ই-কাগজ আর ই-কালিতে ছাপা ‘ই-বই’। কয়েক বছর হলো উন্নত দেশগুলোতে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ‘ই-বইটির’ কোন বাস্তব কলেবর নেই। এটা একটা ডিজেটাল সত্তা। ‘ই-বই’ প্রকাশনা ছাপা বই প্রকাশনার সমান্তরাল ক্রমশ বাড়ছে। ই-পৃষ্ঠায় যে মেমোরি থাকে তাতে অনেক বই ধরে রাখা যায়। ব্যাপারটা একটা ছোটখাটো লাইব্রেরির সাথে ঘুরে বেড়ানোর মতো। দুষ্প্রাপ্য বইও ইন্টারনেটে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
কিন্তু কম্পিউটারে বই পড়া অসম্ভব না হলেও খুব সুখকর নয়। একটানা পড়া তো বেশ কঠিন। যে প্রক্রিয়ায় কম্পিউটারে হরফ ফোটে, ছবি ফোটে তা চোখের পক্ষে ভালো নয়। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা বেশ কষ্টকরই বটে। হইহইসহ এ প্রযুক্তি কেবল আমাদের দেশে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে না। কারণ কাগজে পড়ার অনুভূতির সাথে পাল্লা দেয়ার মতো সূক্ষতায় এটা পৌঁছতে পারেনি।
সে যাই হোক, অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক ভাষাদিবসের মাস ফেব্রুয়ারি। অনেকে বলেন বাংলা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা, কারো কারো মতে ষষ্ঠ ভাষা। তবু একটি আত্মজিজ্ঞাসা-বাংলাভাষা কার? কত দূর পর্যন্ত তার ব্যপ্তি? নতুন প্রজন্ম কি চায় মাতৃভাষাকে? বাংলাভাষাভাষীরা যদি বাংলা বই পড়তো, তা হলে বাংলা বইয়ের বাজার অনেক উন্নত দেশকেও হার মানাতো। অবশ্য সাক্ষর বাঙালির সংখ্যা নেহাত কম। জনসংখ্যার তুলনায় বই পড়ুয়ার সংখ্যাও নগণ্য। আসলে ভাষার উন্মেষ যেখানে হয় না, স্বচ্ছ ভাবনার উন্মেষও সেখানে অধরাই থেকে যায়। বই তো শূন্যতার বিরুদ্ধে জয়, চোখ ঝলসানো রঙিন তাৎক্ষণিকতার বিরুদ্ধে জয়। অধুনা বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটা আশঙ্কা। বই গেলো, ‘ই-বই’ এলো। আমরা কিন্তু আজও গ্রন্থলোকের অনন্ত আকাশের নিচে দাঁড়াই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিশ্বের সর্বপ্রথম ছাপা বইয়ের নাম জানতে চাইলে অনেকেই ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’-এর কথা বলবেন। আধুনিক মুদ্রণ অর্থে উত্তরটা ঠিক। কিন্তু ৮৬৮ সালে ছাপা ‘ডায়ামন্ড সূত্র’র একটা সংস্করণ পাওয়া গেছে। এখনও সংরক্ষিত ছাপা বইয়ের মধ্যে এটাই কিন্তু সর্বপ্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।
কেউ পড়–ক বা না পড়–ক তাতে কিবা যায় আসে। না, অনেক কিছু এসে যায়। তথ্য জ্ঞান পেরিয়ে যাওয়া এক বিরল প্রজ্ঞারই পরিচয় পাওয়া যায় আমাদের বইমেলায়।
তবে যে যাই বলুক, সময় কাটানোর জন্য উপন্যাস পড়া কালের নিয়মেই যেন দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যদিও বইয়ের বাজারে ঔপন্যাসিকদের খাতির এখনও সর্বাধিক। কিন্তু পাঠ-অভিজ্ঞতা আমাদের বলে দেয়, বেশির ভাগ বই-ই শিল্পরসহীন, একঘেয়ে ক্লান্তিকর। ভিতরের আবেগের জায়গাটাকে মানে ‘আমি’-কে সেভাবে ছুঁতে পারে না। অপর দিকে ছাপার ভুলের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ‘র’ ও ‘ড়’-এর কোনো তফাৎ থাকে না। ‘বই পরা’ আর ‘জামা পড়া’-র মতো ভুল হামেশাই দেখা যায়।
ইদানীং অবশ্য বিদেশী লেখকরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। তাদের উপন্যাসে যেন গবেষকসত্তা এসে মিশে যাচ্ছে লেখক-সত্তায়। নতুন প্রজন্মের পাঠক স্বাগত জানাচ্ছেন এই সব উপন্যাসকে। নতুন পাঠকদের জন্য ঝুঁকি নিতে জানা এমন নতুন সাহিত্যিকেরও আবির্ভাব ঘটছে নিয়ত। কারো কারো রচনা যেন মাটির জীবনগাঁথা। ভূগোল, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর উপাখ্যান। যা কেবল ভেবে ভেবে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও কবিতার অনিশ্চিত যাত্রা যেন আয়ত্ত করছে নব্য উপন্যাস।
প্রসঙ্গত, মুদ্রিত গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা যখন উচ্চ চূড়ায়, তারই মধ্যে, গত শতকের শেষ দশকে হঠাৎ শোনা গেল, ছাপাখানা ও প্রকাশনানির্ভর বইয়ের দিন শেষ হয়ে আসছে। গ্রন্থবিহীন সব রকম রচনা এখন প্রকাশের দায়িত্ব নিচ্ছে কম্পিউটার। অবশ্য গ্রন্থের মৃত্যু সম্পর্কে এমন সতর্কবাণী এখনও তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। কেননা মুদ্রিত বইয়ের সংখ্যা একটুও কমছে না। যারা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন সে রকম অনেক মানুষের কাছে এখনও প্রিয় লেখকের বই অনেক বেশি প্রিয়। নিরালায় বসে একটি কাব্যগ্রন্থ পাঠের যে-আনন্দ, তা কখনও কম্পিউটার থেকে পাওয়া যেতে পারে না। আমাদের বাংলাভাষায় অদূর ভবিষ্যতে কম্পিউটারের এই আগ্রাসনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ফিরে আসি আগের কথায়। উপন্যাসে বাস্তবতা থাকবে, একটু বেশিই থাকবে। জীবনে যা কিছু ঘটে তা থাকাই ভালো। কেননা উপন্যাসকে তো জীবিতদের জগৎ হতে হবে। হ
