জোসনা স্নাত গভীর রাত। মহুয়াদের ছনের ছাউনির কুঁড়েঘরটি ভিজে একাকার। মহুয়া আরামের ঘুমে মজে আছে তার গরিব বিধবা মাকে জড়িয়ে। আসমানের তারাগুলো ফুল হয়ে যেন ঝরে পড়ছে তাদের গায়ে। হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানিতে পুরো ঘর আলোকময় হয়ে উঠল। কারণটা কী! ভয় পেয়ে গেল মহুয়া। দেখল একটা পরী এসেছে তাদের ঘরে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল- কে তুমি? কী চাও?
পরী পাখনা নেড়ে হেসে হেসে উত্তর দিলো- আমি পরীদের রানীর মেয়ে। আজ আমার ছুটির দিন। পৃথিবীতে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াই। এখান থেকে আমার পছন্দমতো কাউকে আমাদের দেশে নিয়ে যাই, আবার ফিরিয়ে দেই।
মহুয়ার মনে একটু সাহস হলো। মুখে একটুখানি হাসি মেখে বলল- আমাকে নেবে? আমার যেতে খুব ইচ্ছে হয় তোমাদের দেশে!
পরী খুশি হয়ে বলল- হ্যাঁ তোমাকেই আমার পছন্দ হয়েছে, তোমাকেই নিয়ে যাবো। চলো যাই তাহলে।
মহুয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। বলল- আচ্ছা ঠিক আছে, চলো যাই।
মহুয়া পরীর কাঁধে চড়ে উঠল। পাখনায় ভর করে পরী উড়ছে। নিচের দিকে তাকিয়ে কেমন ভয় ভয় করছে মহুয়ার! তার পরও খুব ভালো লাগছে। তেরো নদী, সাত সাগর পাড়ি দিয়ে অবশেষে তারা পৌঁছাল পরীর দেশে। মহুয়াকে দেখতে অন্যান্য পরীরা ভিড় জমিয়েছে। পরীর মা-বাবা মহুয়াকে দেখে খুব খুশি হয়েছেন। পরীর ভাই-বোনেরাও খুব আনন্দিত। মহুয়াকে নাস্তা খেতে দিলো। কত ধরনের ফল-মূল, মিষ্টি, শরবত। মহুয়া এর আগে কখনো এগুলো দেখেনি। যাই হোক, ইচ্ছেমতো সে খুব মজা করে খেলো। কিন্তু মা-কে ভোলেনি। একটা ব্যাগের ভিতর নাস্তার সব পদের একটু একটু রাখল। এটা দেখে পরীরা সবাই অবাক হয়ে বলল- কি ব্যাপার! এগুলো ব্যাগে পুরছ যে?
মহুয়া বলল- আমার মায়ের জন্য নিয়ে যাবো। আমার মা আমাকে খুব ভালোবাসে, আমিও তাকে ভালোবাসি খুব।
পরীর বাবা জিজ্ঞেস করল- কেন মা, তোমার বাবা নেই? ভাইবোন?
মহুয়ার মুখটা মলিন হয়ে গেল। বলল- না বাবা। আমার বাবা আমি ছোট থাকতে মারা গেছেন। মা পরের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে আমাকে খাওয়ান। লেখাপড়া করান। বড় হয়ে আমি আমার মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।
পরীরা সবাই মহুয়ার জীবনের কথা শুনে খুব দুঃখ পেল। পরীর বাবা বলল- মা তুমি আমাদের এখানে যতদিন ইচ্ছা থাকবে। যখন বাড়ি যেতে ইচ্ছে করবে, সেটা বলবে; আমরা তোমাকে তোমার মায়ের কাছে দিয়ে আসব।
মহুয়া হাসিমুখে বলল- বেশি দিন থাকতে পারব না আব্বু, স্কুল কামাই যাবে যে।
আচ্ছা মা তুমি তোমার সুযোগ মতো থেকো। এটা বলার পরই পরীর বাবা ছেলেমেয়েদের বলল- এই যা! তোরা একে নিয়ে খেলতে যা।
আর পরীর মা মহুয়াকে বলল- মা’মণি তুমি এসব পারলে এখন খেয়ে ফেল। তোমার মায়ের জন্য আমরা আরো অনেক রকম মজার মজার খাবারের ব্যবস্থা করে দেবো তুমি বাড়ি যাওয়ার সময়, তুমি কোনো চিন্তা করো না মা।
শুনে মহুয়া খুব খুশি হলো। বলল- না মা আমি এখন আর কিছু খেতে পারব না।
কথাটা বলেই ওদের সাথে খেলতে চলে গেল।
চার-পাঁচ দিন মহুয়া পরীর দেশে বেড়াল। সবার সাথে অনেক মজা করল। এবার বাড়ি ফিরবে। পরীর বাবা মহুয়াকে অনেক টাকা-পয়সা দিলো, গয়নাগাটি দিলো। মহুয়ারা সারা জীবন পায়ের ওপর পা তুলে খেতে পারবে, তাও ফুরাবে না।
মহুয়া বাবাকে বলল- বাবা, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলব?
বাবা বলল- হ্যাঁ মা বলো, কী বলতে চাও।
মহুয়া নরম কণ্ঠে বলল- বাবা, আমি এত টাকা পয়সা, গয়নাগাটি কিছুই নেবো না। এসবের বদলে আমাকে একটা জিনিস দেবেন?
বাবা অবাক হয়ে গেলেন! এত ধন-সম্পদ দিচ্ছি সেগুলো না নিয়ে সে কি না আরেকটা জিনিস চাচ্ছে। কী এমন জিনিস সেটা। যা হোক বাবা রাজি হয়ে গেলেন। বললেন- কী জিনিস বলো মা, দেবার মতো হলে অবশ্যই দেবো।
মহুয়া বলল- ধন-সম্পদের বদলে এই পরীর দেশের একটা শাড়ি দেবেন আমার মায়ের জন্য? শাড়ি দেখলে আমার আম্মু খুব খুশি হবেন।
পরীর বাবা অবাক হয়ে গেলেন মহুয়ার মায়ের প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসায়। হাজার ধন-সম্পত্তির চেয়ে মায়ের খুশির জন্য একটা শাড়ি তার কাছে এত দামি! বাবা অত্যন্ত খুশি হয়ে গেলেন মহুয়ার প্রতি। তাই তাকে পরীর দেশের সবচেয়ে দামি শাড়িটি দিলেন। আর বললেন- শোন মা, এই ধন-সম্পত্তি, গয়নাগাটি এসবও তুমি নিয়ে যাও।
মহুয়া শাড়িটি হাতে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চুমু খেতে খেতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখে, আমি জীর্ণশীর্ণ শাড়ি পরিহিতা মা-কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি।
