বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্চ মাস এক অনন্য সময়। ১৯৭১ সালের এ মাসেই তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, বঞ্চনা, শোষণ ও আক্রমণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ-সংগ্রাম তথা মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। আর এ দেশের সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধিকার অর্জনের শপথ নেয়। মার্চ থেকে শুরু করে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের গৌরবময় স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ইতোমধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। স্বভাবতই স্বাধীনতা অর্জনের সময়কালের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে।
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন উদ্দেশ্য হলেও জনগণের মুক্তি অর্জন ছিল মূল লক্ষ্য। মুক্তি ও স্বাধীনতা পারস্পরিক সম্পর্কিত হলেও মুক্তি অগ্রগণ্য। এ জন্য ’৭১-এর ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারিত হয়েছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ স্বাধীনতার সাথে মূলত রাজনৈতিক অধিকার জড়িত। আর মুক্তির বিষয়টি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক উন্নতি সম্পর্কিত। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জিত হয়েছে; কিন্তু অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক মুক্তি উপেক্ষিত হয়েছে। উন্নয়ন হলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে। তবে সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাবে শাসকগোষ্ঠীর শোষণনীতি-স্বজনপ্রীতি, সর্বস্তরের দুর্নীতি, নেতৃত্বের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন রকমের সমস্যার কারণে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত উন্নতি না হলেও উন্নয়নের পথেই চলছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও সত্তর দশকে দেশটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না; কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় না, খাদ্যাভাবে মানুষও মারা যায় না। ‘মঙ্গা’ শব্দটিও দেশ থেকে প্রায় নির্বাসিত। অধিকন্তু বাংলাদেশ এখন খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অভিযোগ থেকেও মুক্ত। আমাদের মৎস্য উৎপাদন ও রফতানি অর্থনৈতিক উন্নয়নসূচকে ইতিবাচক বিবেচ্য। আমাদের তৈরী পোশাক বিশ্ববাজারে অনন্য। আমাদের দেশের অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ তৈরী পোশাক শিল্পে নিয়োজিত। দেশের অর্থনীতির নবযাত্রায় তৈরী পোশাক শিল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য। যাদের পরিশ্রমে আয় হয় দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিকি উন্নয়নের বড় শক্তি প্রবাসী জনশক্তি। আগে জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে জনশক্তি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল করতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স অনন্য ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের জাতীয় জীবনে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই যখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১০০ ডলারের নিচে বর্তমানে তা বেড়ে দুই হাজার মার্কিন ডলারের অধিক হয়েছে। এ দিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অথচ সত্তরের দশকে এ হার ছিল মাত্র ১ শতাংশের কাছে। অর্থনৈতিক এ প্রবৃদ্ধি দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হয়েছে। যাতে বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়নের (এমডিজি) লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথেই এগিয়ে চলছে। অধিকন্তু সম্প্রতি আমাদের দেশ উন্নয়শীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও শিক্ষার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এ সময় স্বাস্থ্য খাতেও বাংলাদেশ অনেক উন্নতি লাভ করেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। পোলিও-কলেরাসহ বিভিন্ন মহামারী রোগ দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। চলমান বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯-এর ব্যাপক বিস্তার রোধও সম্ভব হয়েছে। এসব কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে আর শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম হলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ বেশ অগ্রসর হয়েছে। এ দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে। সরকারি উদ্যোগে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির সুবাদে দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে ইন্টারনেট সুবিধা আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সড়ক ও পরিবহন যোগাযোগেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। পাড়াগাঁয়ের বেশির ভাগ রাস্তা পাকা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতু, লালন শাহ সেতু, মেঘনা সেতু, ভৈরব সেতুসহ ছোট-বড় অসংখ্য সেতু দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত করেছে। আর দীর্ঘ প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর অগ্রগতিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণসহ সমগ্র জাতি আশান্বিত হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীতে অনেকগুলো উড়াল সেতু নির্মিত হয়েছে এবং মেট্রোরেলের কাজও শেষের দিকে। রামপালের চলমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সমালোচনা-বিরোধিতা হলেও রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে এ প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা-অবকাঠামো, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি বৈষম্যমূলক হলেও এতে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। আমাদের তরুণরা ইতোমধ্যে ক্রিকেটে বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। তারা ক্রিকেট-বিশ্বের বিভিন্ন রেকর্ড ভাঙছে ও গড়ছে। এমনকি বিশ্বসেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় তালিকায় বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের নাম শীর্ষে থাকছে। খেলাধুলায় ছেলেদের সাথে মেয়েরাও এগিয়ে চলছে। দেশের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় নিশ্চিত হয়েছে এবং নারীর অধিকার-উন্নয়নের কাজও এগিয়ে চলছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্ধশতাব্দীতে প্রচার ও গণমাধ্যমের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। স্বাধীনতাকালে শহরের মানুষ ছাড়া গ্রামের মানুষ পত্রিকা দেখত না বললেই চলে। সংবাদ-গণমাধ্যমের ওপর সরকারি খড়গ সত্ত্বেও বর্তমানে শতাধিক দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা, বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সব খবর মানুষের হাতের নাগালে। ফেসবুক-ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে। এসব কারণে দেশের মানুষ অনেক সজাগ-সচেতন হয়েছে।
উল্লিখিত প্রাপ্তির সাথে অপ্রাপ্তিরও দীর্ঘ তালিকা আছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও ধনবৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়েছে। পাকিস্তানি ২২ পরিবার না থাকলেও কিছুসংখ্যক ব্যক্তিই দেশের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত করেছে এবং শোষণের ধরন অপরিবর্তিতই আছে। সুষম বণ্টনব্যবস্থা না থাকায় আকাশচুম্বী ভবনের পাশাপাশি বস্তির সংখ্যাও বাড়ছে। বিদুৎ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা অপূর্ণই রয়েছে। বেকারত্ব জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। অপরিকল্পিত পরিবহন ও সড়কব্যবস্থায় যানজট বাড়ছে। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকছে। সরকারের মদদপুষ্টরা নদী-খাল ও সরকারি জায়গা দখলের যেন প্রতিযোগিতা করছে! জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি কমছে। সর্বস্তরের দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন, অপহরণ-ধর্ষণ, বিরুদ্ধমত দমন আমাদের স্বাধীনতাকে বিপর্যস্ত করছে। স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দী পরেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য গণতন্ত্র অস্ফুটই রয়েছে। অধিকন্তু গণতন্ত্রের আবরণে চরম স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভোটারবিহীন নির্বাচনব্যবস্থা দেশের গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে মানবতা-মানবাধিকার পিষ্ট হয়েছে। সামরিক শাসনের দীর্ঘ পরিক্রমা, স্বৈরতান্ত্রিকতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথ বন্ধুর করেছে। অধিকন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা-প্রতিহিংসায় বাংলাদেশের রাজনীতি অসহিষ্ণু ও কলুষিত হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে আমাদের জাতীয় আদর্শ-মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে। এসবের সাথে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক সমস্যা এবং আধিপত্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি আমাদেরকে আতঙ্কিত-উদ্বিগ্ন করছে।
দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চললেও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে এখনো পৌঁছেনি। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পরেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এ দেশের মানুষ হতাশ হয়নি এবং হালও ছাড়েনি। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে তাদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। এ জন্য সব বিভেদ ভুলে আইনের শাসন, বৈষম্য নিরসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। আর এ ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় সমস্যা-সমাধানের পথ নির্ণয় করা যাবে। অধিকন্তু সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ পরিহার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে হবে। আর মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতি এসব প্রত্যাশাই করে।
