১৯৭৪ সাল। ব্রিটেনে সাধারণ (হাউজ অব কমনস) নির্বাচন সামনে। টোরি (কনজারভেটিভ পার্টি) ও হুইগ (লিবারেল পার্র্টি) মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে। জেমস কোর্টে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তখন সৈয়দ আবদুস সুলতান । তার কাছে দ্য টাইমস এর সিনিয়র সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে এসে জানতে চাইলেন- মান্যবর, আপনি কোন পক্ষে- লেবার না কনজারভেটিভ? পেশাদার না হয়েও প্রাজ্ঞ কূটনীতিকের মতো সৈয়দ সুলতান বললেন- ‘আই অ্যাম আফটার ব্রিটেন’। রাষ্ট্রদূত বিচক্ষণ ছিলেন যেকোনো পার্টির পক্ষাবলম্বনের পরিবর্তে গোটা দেশ ও জাতির পক্ষ নেয়াই যুক্তিযুক্ত তাতে সুসম্পর্কের দীপ্তি ছড়ায়, সৌহার্দ্য বাড়ায়। এ সূত্র ধরেই বলা যায়, ‘জাতীয় সংহতি’র সরোবরেই সাফল্যের শাপলা প্রস্ফুটিত হয়, পারস্পরিক সমঝোতায় ঐকমত্যের যে ওজস্বিতা বাড়ে তা মতানৈক্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মাশুল গুনতে গুনতে নিঃশেষ হয় জাতির আত্মশক্তি। সমন্বিত শক্তি অর্জন ও বিকাশের জন্য যে প্রতিযোগিতা সেখানে পক্ষ-বিপক্ষ (যেমন ব্রিটেনে টোরি আর হুইগ, যুক্ত রাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান) থাকবে, সেটি ঐকবদ্ধ শক্তি অর্জনের জন্য, বিকাশের জন্য, জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল বা বিভক্ত করার কাজে নয়। জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও উভয়পক্ষেরই ক্ষতি। সুতরাং সে প্রয়াস প্রচেষ্টার দ্বারা জাতীয় ঐক্যের ধারণায় চেতনা পক্ষ-বিপক্ষের সর্বনাশা দ্বিধাবিভক্ত হওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। স্থান কাল পাত্রভেদে যে দেশ ও জাতিতে যত বড় সর্বনাশ সাধিত হয়েছে তার পেছনে ছিল অনৈক্যের সংক্রামিত ভাইরাস, যা প্রতিরোধের অবর্তমানে ক্রিয়াশীল থেকে গোটা জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
ভারতের মাটিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঠাঁই হয়েছিল এ দেশীয় নবাব ও রাজন্যবর্গের মধ্যেকার আন্তঃকলহ (অনৈক্য) এর সুযোগ নিয়ে । আবার এ দেশ ছাড়ার সময় ভারতে ব্রিটিশ সরকার তাদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল ভাইরাসে আক্রান্ত ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ চেতনার কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়ে যায় ভারত বর্ষের তিন প্রধান অঞ্চল-সম্পদ ও সৌন্দর্যের আধার, অকুতোভয় দেশ ও জাতি- পাঞ্জাব, বাংলা আর কাশ্মিরকে দ্বিখণ্ডিত করে দীর্ঘস্থায়ী আন্তঃবিবাদ বাড়ানোর বিবরে রেখে যায়। ১৯৪৫ সালে ভারত বিভাগের যে নীলনকশা এঁকেছিলেন উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪-১৯৬৫), র্যাডক্লিফ সাহেব ১৯৪৭ সালে তার চৌহদ্দি, খতিয়ান পর্চা জারি করেন মাত্র। ক্রমেই গবেষণায় এটা বেরিয়ে আসছে যে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, নিকৃষ্ট কূটচালে দক্ষ চার্চিল সাহেবকে ১৯৫৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়ার সময় নোবেল কমিটি যা বলেছিলেন, তা কতটা অসার ছিল। নোবেল কমিটির সাইটেশনে ছিল তাকে সাহিত্যে নোবেল খেতাব দেয়া হয় `for his mastery of historical and biographical description as well as for brilliant oratory in defending exalted human values' ইতিহাসের বিবরণ ও ব্যক্তিত্বের জীবনচরিত রচনায় তার মুনশিয়ানার এবং মানবিক মূল্যবোধের উচ্চ আকাক্সক্ষার সপক্ষে তার যে বাকচাতুর্য তা সময়ের অবসরে অসার প্রমাণিত হচ্ছে। ২০১৭ সালের ১০ মে গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত Churchill’s unmerited Nobel for Literature শীর্ষক নিবন্ধে Bruce Ross-Smith উল্লেখ করেন, His hatred of the peoples of the Indian subcontinent is a matter of record. As historian David Reynolds has detailed , the six volumes of Churchills history of the second world war were built upon selective memory forged out of ego, not least the “great man’s” fleeing memory of the 1943 bengal famine, in which more than 3.5 million people perished, to large extent as a direct consequence of Churchill’s policies and actions’.
ইতোমধ্যে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতিনিচয়ের মধ্যে বিভক্তি করণের স্বরূপ ও পরিণাম। ভারতবর্ষের বিভক্তিকরণের রাজনৈতিক পরিণাম যাই-ই দৃশ্যমান হোক না কেন এর মানবিক বিপর্যয়ের কান্না থামেনি এখনো বরং বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতার উদগ্র বাসনাবশত ইতিহাসের খলনায়করা লক্ষ কোটি মানুষকে অবদমিত করতে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে, চাটুকরের ভাষায় যা ‘দুরন্ত সাহসের পরিচয়’। প্রকৃত প্রস্তাবে, প্রকারান্তরে কতিপয় তারা, সব মানুষের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করতেই পক্ষ-বিপক্ষের বিভেদের দেয়ালের ভেতর আশ্রয় নেয় । নিরাপদভাবে নিজেকে। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না কারো, ইত্যাবসরে মানবিক মূল্যবোধের সমূহ ক্ষতি যা তা হয়ে যায়। সে ক্ষতি আর পূরণ হয় না।
বিশ্বের মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড। এ ভূখণ্ডে বসবাসকারী আমজনতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও সাধ, আত্মমর্যাদা বিকাশের অধিকার লাভের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত সুদীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনন্য ঐক্য গঠনের মাধ্যমে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবার, স্বাধীন আশায় পথ চলার এবং আপন বুদ্ধিমতে চলবার ক্ষমতা লাভ করে।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এই অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেয় না, কিংবা ছেলের হাতের মোয়ার মতো নয় তা সহজপ্রাপ্যও, তাকে অর্জন করতে হয়, আদায় করে নিতে হয়। আবার অর্জন করার মতো সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করাও কঠিন। কেননা স্বাধীনতার শত্র“র অভাব নেই। স্বাধীনতা হীনতায় বাঁচতে চায় কে? আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায় না কে? বেশি দামে কেনা কম দামে স্বাধীনতা বিক্রির নজির যে নেই তা তো নয়। আপাতত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, ইতিহাসের বহু পট পরিবর্তনে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে তারা পরিপূর্ণভাবে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জন তার যথা বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের যৌক্তিকতা ভিন্ন অর্থেই পর্যবসিত হতে পারে ।
ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপদেশে এ দেশে আগমন ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পার থেকে আসা ইংরেজদের। তাদের আগে মগ ও পর্তুগিজরাও অবশ্য এসেছিল এ দেশে। প্রতিদ্বন্দী বিবেচনায় এরা পরস্পরের শত্র“ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অত্যাচারী মগও পর্তুগিজদের দমনে ব্যর্থপ্রায় সমকালীন শাসকবর্গের সাহায্যে এগিয়ে আসে নৌযুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ইংরেজ বণিক। ক্রমে তারা অনুগ্রহভাজন হয়ে ওঠে সমকালীন বিলাসপ্রিয় উদাসীন শাসকবর্গের আর সেই উদাসীনতার সুযোগেই রাজপ্রাসাদ-অভ্যন্তরে কূটনৈতিক প্রবেশলাভ ঘটে ইংরেজদের। প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খাঁকে হাত করে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে। পরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যার এবং ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের প্রায় গোটা অঞ্চলের। মীর কাসিম খান, টিপু সুলতান প্রমুখ সমকালীন স্বাধীনচেতা রাজন্যবর্গ স্থানীয়ভাবে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাঙ্গা করেও ব্যর্থ হন- বলাবাহুল্য আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু সেখান থেকেই। বিদেশ বিভুঁই এ সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টি করতে আনুকূল্য প্রদর্শনার্থে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এ নীতির ফলে এ দেশীয় স্বাধীনতাকামী জনগণের মধ্যে পৃথক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয় এবং ব্রিটিশ শাসকের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে বৃহৎ দু’টি সম্প্রদায়।
হিন্দু জমিদাররা ইংরেজদের আনুগত্য পেতে থাকে; পক্ষান্তরে, রাজ্য হারিয়ে মনমরা মুসলমান সম্প্রদায় (যার অধিকাংশ পরিণত হয় রায়ত কৃষকে) দিন দিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেও ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বেশ কাজ করে, আরো দ্বিধাবিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয় উভয় সম্প্রদায়। এরপর স্যার সৈয়দ আহমদ, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারবাদী কর্মপ্রচেষ্টার ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলোক পেয়ে ক্রমান্বয়ে চাক্ষুষ্মান হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস। ভারত বর্ষের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে হিন্দুরা কর্তৃক পরিচালিত ও ভাবাদর্শ নির্মাণকারী এই প্লাটফর্ম স্বসম্প্রদায়ের সত্যই কোনো কল্যাণে আসবে না দেখে ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম লীগ’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠন। বৃহৎ ভারত বর্ষের ব্যাপারে না গিয়ে শুধু এই বাংলাদেশ বিষয়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে প্রধান ঘটনা স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে তা হলো ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এমন দ্বিধাবিভক্তির প্রেক্ষাপটে প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব থেকেই ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পূর্ববাংলার নেতা শের-ই-বাংলা ‘উপ-মহাদেশের মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের প্রস্তাব করেন। মুসলমান প্রধান পূর্ববাংলাবাসীরা ওই প্রস্তাবমতে একটি পৃথক রাষ্ট্রে গঠনের দাবিদার। ১৯৩০ সালে চৌধুরী রহমত আলী ‘পাকিস্তান’ (P for Punjab, A for Afghanistan, K for Kashmir, I for Indus valley and stan for Baluchistan) শব্দটির উৎপত্তি ও রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার কথা যখন প্রথম প্রকাশ করেন তখন তাতে বাংলা নামের কোনো শব্দ বা বর্ণ ছিল না, এমনকি ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের দার্শনিক ভাবনির্মাতা স্যার মুহাম্মদ ইকবাল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কল্পনা ব্যক্ত করেন, তাতে বাংলা অন্তর্ভুক্তির কোনো কথা ছিল না। এতদসত্ত্বেও ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রসমূহ গঠনের প্রস্তাবকে’ উপচিয়ে, পূর্ব বঙ্গবাসীদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সহস্রাধিক মাইল ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে একীভূত হয় এবং পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এটা যে পূর্ববঙ্গের প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ছিল না বরং উপনিবেশবাদের হস্তান্তর মাত্র তা পূর্ব বঙ্গবাসীরা ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়, যখন বোঝা যায় তাদের মাতৃভাষা ও আবহমান সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত আসছে। এটা বোঝা গিয়েছিল এর ফলে তাদের আত্মপরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তারা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং বিভ্রান্তি তাদের কেটে যায়। তারা বুঝতে পারে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয়নি। তারা তাদের সচেতনতার পরিচয় দেয় ১৯৫৪-এর নির্বাচনে, ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে। এত দিনে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানকে এক সময় তারা ব্যবহার করেছিল ইংরেজশাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের স্বার্থে, সেই আন্দোলনের অন্যতম উদগাতা ছিল পূর্ব পাকিস্তানিরা। একইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরোধও তেমনি তাদেরকে প্রথমে স্বাধীকার এবং পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে শুরু হয় চূড়ান্ত পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ। সুদীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর তার বিজয় সুনিশ্চিত হয়। তাই এই বিজয় দিবস ৯ মাসের কিংবা ২৫ বছরের সংগ্রামের বিজয় নয় পূর্ববঙ্গবাসীদের স্বাধীন মনোবৃত্তির, সুদীর্ঘকালের শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষার বিজয়। এটি ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনের ঘোষণা বাস্তবায়ন এবং সুদীর্ঘকালের ‘বিশ্বাসঘাতকা ও বিভ্রান্তির’ অবসানের পর বিজয়।
প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন কবীর তার ‘বাংলার কাব্যে’ লিখেছেন, ‘বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব বাংলার নিসর্গ হৃদয় তাকে ভাবুক করেছে বটে কিন্তু উদাসী করেনি। দিগন্ত প্রসারী প্রান্তরের অভাব সেখানে নেই কিন্তু সে প্রান্তরেও রয়েছে অহরহ বিস্ময়ের চঞ্চল লীলা। পদ্মা যমুনা মেঘনার অবিরাম স্রোতধারার নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনের ধ্বংস।’ পূর্ব বাংলায় নিসর্গ নন্দনকাননেই শুধু পরিণত করেনি তাদের (বাংলাদেশের জনগণকে) করেছে পরিশ্রমী, সাহসী-শান্ত-সুজন, আত্মবিশ্বাসী, ভাবুক, চিন্তাশীল, আবেগময় ও ঔৎসুক্যপ্রবণ। তাদের রয়েছে নিজস্ব নামে দেশ সৃষ্টির ইতিহাস, ঐতিহ্য, চলন বলন, শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। দৈহিক গড়ন গঠনে আবেগ অনুভূতিতে, রগে রক্তে তারা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় হতে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেও তারা পৃথক ভিন্ন প্রকৃতির। জাতিগত ভাবাদর্শে, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশে জাতীয়তাবোধে অন্যান্য রাষ্ট্র ও অঞ্চলে বসবাসকারী স্বধর্মী ও স্বভাষীদের থেকেও তারা স্বতন্ত্র প্রকৃতির। বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয়। তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রেণর অধিকার নিজেরাই অর্জন করতে জানে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় জনগণের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সচেতনতা জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়ে সমুন্নত করেছেন
স্বাধীনতা লাভে বাঙালির জাতীয় জীবনে যে নবদিগন্তের সূচনা হয়, তাতে সীমাহীন শোষণ ও সুদীর্ঘকালের অবজ্ঞায় নিষ্পেষিত ঔপনিবেশিক জীবনযাত্রা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং নিজেদের নিয়মে চলার, নিজে পায়ে নিজের দাঁড়াবার, বাঁচবার ও বিকশিত হওয়ার অধিকার তারা পেয়েছে। বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায়, সাংস্কৃতিক সঙ্কীর্তায়নে নতুন দিগন্ত উন্মেচিত হয়েছে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রশাসনের সুযোগ লাভ এবং নিজেরাই নিজেদের উন্নতি ও অবনতির নিয়ন্তা, হয়েছে সফলতা ও ব্যর্থতার দাবিদার।
স্বাধীন-সার্বভৈৗম বাংলাদেশে আমরা কিভাবে নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়াব, দীর্ঘ দিনের অবহেলা আর অবজ্ঞার ফলে ধ্বংসপ্রায় আমাদের অর্থনৈতিক জীবনকে আমরা কিভাবে চাঙ্গা করে তুলব, আমরা কিভাবে আমাদের সমাজজীবন থেকে বন্ধ্যানীতি কুসংস্কার আর অপয়া ভাবধারাকে অপসারিত করে আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়ে জাগ্রত জাতি সভায় আমাদের অবস্থান ও গৌরবকে আরো ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার সে চেতনা জাগাতে পারে সৃজিত মূল্যবোধগুলো। আমাদের ইতিহাস ও ঘটনা পরিক্রমা এই প্রতীতি জাগাতে পারে যে আমরা গণতান্ত্রিকমনা, আমরা আমাদের স্বাধীনতা রক্ষায় একাগ্র, আমাদের কর্তব্য পালনে আমরা নিরলস এবং অনন্য ঐক্যে বিশ্বাসী ও ধাতস্থ। সুতরাং যুদ্ধোত্তোর বাংলাদেশে আমাদের মূল্যবোধগুলো, মুক্তিযুদ্ধকালীন একাগ্রতা, আত্মত্যাগের সুমহান সঙ্কল্প নিশ্চয়ই একই ভূমিকা পালন করবে আমাদের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে সহায়তা করবে। কোনোক্রমেই এসব মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়ে বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়ায়, দায়িত্বহীনতায়, অলসতায়, একে অন্যের দোষারোপের অবয়বে নিজেদের বিলীন করে দেবার প্রবণতা যেন দেখা না দেয়।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ এই একাগ্রতার পরিচয় দিতে যে পিছপা হয়নি, সত্যই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়নি তার সাফল্যগাথা যেমন আছে, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে চরিত্রবলের অধঃপতন ও ন্যায়নীতিনির্ভর মূল্যবোধের অবক্ষয় জনিত কারণ থেকে উৎসারিত দুর্নীতি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মপ্রয়াস মন্থর করে দেয়ার, অদূরদর্শী পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিঘœ ও বিভ্রাট সৃষ্টি হওয়ার বিষয়গুলোকে যথাসচেতনতায় সজাগ দৃষ্টি দেয়ার অবকাশও রয়েছে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে থেকে নয়, বরং অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বিজয়কে জীবনের সর্বস্তরে উদ্ভাসিত করে তোলার জাগ্রত চেতনায়, সমাজকে পরিছন্ন করে তোলার ব্রত নিয়ে নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আলোকে দেশিক আশা-আকাক্সক্ষার ভিত্তিতেই এ দেশ গড়ে তোলার মহান অনুপ্রেরণার সঞ্চারী হোক সবার প্রত্যয়। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ, আমাদের বাংলাদেশ এই সমন্বিত ভাবনায়, চেতনায় ও মূল্যবোধে গড়ে উঠুক- এই প্রত্যাশা সবার।