করিম সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যা মিনা। বয়স ১২ বছর। দুষ্টু-মিষ্টি মিনা সবাইকে মাতিয়ে রাখে। পড়ালেখায় বেশ ভালো। সবার নয়নমণি। মিনা মাদরাসার কিতাবে রোজার ফজিলত সম্পর্কে পড়েছিল। সে নিয়ত করল এ রমজানে রোজা রাখবে। মাগরিবের একটু আগে সবাই চাঁদ দেখতে গেল। গত বছর আকাশ মেঘলা ছিল, তাই চাঁদ দেখা হয়নি। এবার রমজানের চাঁদ দেখে মিনার কি যে আনন্দ!
বাঁধভাঙা উল্লøাস আর সীমাহীন খুশি। মিনার দাদীর বয়স সত্তরের মতো। আবছা আবছা দেখতে পান। মিনা আঙুলের ইশারায় দাদীকে চাঁদ দেখাল, কিন্তু দাদী কিছুই দেখতে পেল না।
মিনা মাকে বলে রাখল তাকে যেন সাহরিতে ডাকে। রাতে মিনার চোখে ঘুম নেই। এই প্রথম রোজা রাখবে। কী উচ্ছ্বাস, কী উৎকণ্ঠা! দাদীর সাথে গল্প করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। ভোররাতে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। চোখ কচলাতে কচলাতে শয্যা ত্যাগ করল। হাত-মুখ ধুয়ে সবার সাথে খেতে বসল। সাহরি শেষ করে ফজরের নামাজ পড়ল। কুরআন তিলাওয়াত করল। কী সুন্দর সকাল! আজকের সকাল যেন অন্যরকম। মিনা প্রফুল্ল মনে গুনগুন করে গজল গাইতে লাগল। দূর থেকে ভেসে এলো পাখির কলকাকলি। আহা, কী মিষ্টি সুর! পাতার ফাঁকে উঁকি দিলো প্রভাতের সূর্য। একদল পিঁপড়া খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। মিনা বাড়ির আঙিনায় অনেকক্ষণ পায়চারি করল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হলো। হামদ পাঠ করে রবের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করল।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। গলা শুকিয়ে গেল, খুব তেষ্টা পেল। মিনা আমগাছ তলে মাদুর পেতে বসল। ঝির বাতাস প্রশান্তি এনে দিলো, তৃষ্ণা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রশান্তির বাতাস। মেঘ তুলতুল আকাশ। গাছের শাখে গুটিগুটি আম। মিনা মুগ্ধ হয়ে প্রজাপতি দেখল। এসব দেখে দেখে বেলা ফুরিয়ে গেল। আজ যেন তার ক্ষুধাই লাগল না।
বিকেলবেলায় মিনার খুব ক্লান্তি লাগল। রোজা রাখতে পারবে তো? ছোট্ট মানুষ, সারা দিন উপোস থাকা কষ্টের। কিন্তু মিনার কোনো কষ্টই নেই। প্রথম রোজা রাখার আনন্দে মশগুল। দাদী বললেন, কিরে, ক্ষুধা লাগছে বুঝি। রোজা না রাখতে পারলে কিছু খেয়ে নে। ছোটরা খাবার খেলেও রোজা ভাঙে না। মিনা হাসল। রোজা মানে সংযম, বিরত থাকা। আর আমি ছোট্টটি নেই, বুঝলে দাদী? দাদী বললেন, আমার চেয়ে বড় হয়ে গেছিস বুঝি! আমার বুড়ি নাতনী।
দাদী-নাতনী কিছুক্ষণ গল্প করল। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলো। মিনার মা নানা রকমের খাবার তৈরি করল। সবাই ইফতার করতে বসল।
মিনা বলল, আম্মু, তুমি বলেছিলে রোজা রাখতে পারব না। আমার তো একটি রোজা হয়ে গেল। ইনশাআল্লাহ, বাকিগুলোও রাখব।
মিনার মা বললেন, মাশাআল্লাহ। আল্লাহ তোমার রোজাকে কবুল করুন।
মিনা বলল, রোজা হলো বরকত ও রহমত স্বরূপ। রোজাদারকে আল্লাহ নিজ হাতে পুরস্কার দেবেন। রোজার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি হয়। তাই ছোটদেরও রোজা রাখা উচিত। একটি, দু’টি করে রোজা রাখলে পরের রমজানে রোজা রাখা সহজ হবে।
মাগরিবের আজান হলো। মিনা খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করল। শরবত পান করল। সারা দিনের তৃষ্ণা মিটে গেল। এক নিমিষেই ক্লান্তি কেটে গেল। সে এমন তৃপ্তি আগে কখনো পায়নি। মিনা রোজা রাখার সুখ অনুভব করল। অন্যরকম শান্তি। রবের সান্নিধ্য লাভের আনন্দ।