শৈশবস্মৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে আমার সবুজ গ্রাম, দাদা-দাদী, চাচা-ফুপু, মা-বাবা, ভাই-বোনের কলকাকলিতে মুখর আমাদের গ্রামের বাড়ি। আমাদের বাড়ি আমার স্মৃতির পাতায় আমার হৃদয় দরজায় এক ভালোবাসার স্বর্ণমন্দির। ফুল ও ফলের গাছে ছায়াঘেরা ছিল সুবিশাল বাড়িটা।
দক্ষিণমুখো বাড়িটার সামনেই ছিল অবারিত সবুজ শস্যের মাঠ। বাড়িতে বেশ কিছু ঘর ছিল। আমার দাদা-দাদীর ঘরটি ছিল সবচেয়ে বড় আর সুন্দর। শানবাঁধানো লাল রঙের বারান্দার নিচে ছিল বড় বড় সিঁড়ি। সিঁড়ির দু’পাশে বসার জায়গা। সকাল বিকাল ওখানটাতেই জটলা হতো, গল্প হতো। সেই বারান্দাটা আমার মনে এক বিশাল জায়গাজুড়ে আছে।
আমার স্মৃতির পাতায় জেগে থাকা কোনো মানুষের কথা বলতে হলে প্রথমেই একজন মানুষের কথা বলতে হয়। তিনি হলেন, আমার দাদা ভাই। আমার দাদাভাই ছিলেন সুশিক্ষিত পরিমার্জিত এক ব্যক্তিত্ব। দশ গ্রামের একজন ছিলেন তিনি। একই সাথে তিনি ম্যারিজ রেজিস্ট্রার এবং মাধ্যমিক স্কুলের সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, আরবি, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আমি নিজেই শুনেছি, তার মুখে বিভিন্ন ভাষায় দু-একটি বাক্য। তিনি আমার সাথেই বেশি গল্প করেছেন। বলেছেন, তার ছাত্রজীবনের কথা, বিয়ের পর আমার দাদীর সাথে নতুন ঘর বাঁধার কথা। জীবনের নানা সুখ ও দুঃখের কথা বলতে গিয়ে কখনো দু- একটি গানের কলি গেয়েছেন। কখনো কোরআনের আয়াত, কখনো দুটো হাদিস, কখনো শেকসপিয়ারের লেখা দুটো লাইন তার মুখে শুনেছি।
আমার দাদাভাই ছিলেন শিক্ষানুরাগী এক ধার্মিক মানুষ। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরতেন তিনি। সবসময় ধবধবে পরিপাটি পোশাকে থাকতে পছন্দ করতেন।
আমার দাদাভাই মাঝে মাঝে আমার স্কুলে যেতেন। আমার শিক্ষকরা তাকে স্যার বলতেন। অনেক সম্মান করতেন। আজ আমার দাদাভাই বেঁচে নেই। স্মৃতি হয়ে গেছেন। মনে পড়ে দাদাভাই নিজে সাথে নিয়ে আমাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। হোস্টেলে সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কলেজের অনেক স্যার আমার দাদাভাইকে স্যার বলতেন। এ ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ মজার ছিল।
আমার মা-বাবার কথা বলার আগেই দাদাভাইয়ের কথা বলা হয়ে গেল। আমার স্মৃতির জানালা ধরে আজও অম্লান তিনি।
আমার স্মৃতির মধ্যমণি আমার আব্বা। আমার আব্বা আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর আদরের একটি টুকরো। তার কথা লেখার শুরুতেই আমার দু’চোখ ভিজে উঠেছে। আমি সবসময় বলতাম আম্মার চেয়ে আব্বা আমাকে বেশি ভালোবাসে। আর আমার আম্মা বলতেন, আমি নাকি আম্মার চেয়ে আব্বাকে বেশি ভালোবাসি।
আমাদের বাড়িতে ছিল অনেক ফল ও ফুলের গাছ। কিছু কিছু গাছ ছিল অনেক পুরনো আর প্রকাণ্ড। আমরা ভাইবোনেরা গাছে উঠে আম, জাম, ফুল এসব পাড়তাম। বাড়িতে প্রচুর আমগাছ ছিল। ঝড়ের দিনে আম পড়ে সারা বাড়ি বিছিয়ে যেত। বাড়ির সবাই আম কুড়াত। আব্বা বাড়িতে থাকলে আমার আম কুড়ানো হতো না। বৃষ্টি ঝড় বাদলে আব্বা আমাকে কখনো বাইরে বের হতে দিতেন না।
ঝড়ে পড়া আমগুলো আমার আম্মা আমার দাদাবুজি কাটতে বসতেন। তখন কাঁচাআম কাটা, শুকানো আর আচার বানানোর ধুম লেগে যেত সারা বাড়িতে। আর আচারের মসলার সুগন্ধে চারিদিক ভরে যেত। তারপর আম পাকার পালা। আমাদের বাড়ির প্রত্যেকের ঘরেই তখন প্রচুর পাকা আম থাকত। সকাল বিকেল দু’বেলা তখন গাছে উঠে আম পাড়ার ধুম। আমিও সে সময় গাছে উঠে আম পেড়েছি। পাকা পাকা আম পেড়ে খুব মজা পেতাম।
শীতের কুয়াশাভেজা সকালের কথা মনে পড়ে। আমরা ছিলাম গ্রামের ছেলেমেয়ে। খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠতাম। ফজরের সময় দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসতো আজানের ধ্বনি। আমার আব্বা আম্মা উঠে নামাজ পড়তেন। আমাদেরও ডাকতেন। উঠতে চাইতাম না। চুপ মেরে শুয়ে থাকতাম আরো কিছুক্ষণ। আম্মা আবার ডাকতেন। নিরুপায় হয়ে উঠে বাইরে যেতাম। কুয়াশায় ঢাকা পরিবেশ। হালকা অন্ধকার। গেটের বাইরে ছিল টিউবওয়েল। ওখানে অজু করতে গিয়ে আমি অন্যমনস্ক হয়ে যেতাম। প্রকৃতির এক অপূর্ব নীরবতা আর শুভ্রতায় আমি মুগ্ধ হতাম। দূরের গ্রাম দেখা যেত না। কিন্তু আবছায়ার মধ্যে মনে হতো কী যেন নড়াচড়া করে। আর কেমন যেন শব্দও হয়। আমি বেশ কয়েকদিন খেয়াল করে একদিন আবিষ্কার করলাম- নড়াচড়া করা বস্তুগুলো আসলে মানুষ আর হালের গরু। খুব ভোরে কৃষক চাচারা মাঠে গরু নিয়ে হাল চাষ করত। সেদিনের সেই শীতের ভোরের শুভ্রতা অমলিন হয়ে আছে আমার হৃদয়পটে। তারপর ধীরে ধীরে লাল সূর্যের মিষ্টি রোদে সারা উঠোন ভরে যাওয়া। সেকি মজার ব্যাপার, বলে বুঝানো সম্ভব নয়। শীতের দিনে সম্ভবত মাঠে গমের বীজ ছড়ানো হতো। আমাদের পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা ক্ষেতের পাশে বসে ছোট্ট ঝুড়িতে করে মুড়ি খেত আর বাঁশের লম্বা কঞ্চি হাতে কাক, বাবুই, শালিক তাড়াত। আর মুখে বলত- হ্যারো--দুরো।’ শব্দগুলো শুনতে আমার বেশ লাগতো। আমরাও আমাদের বাড়ির উঠোনে শীতের রোদে মাদুর পেতে ভাইবোন নিয়ে পড়তে বসতাম। সাথে পেয়ালায় নিতাম মুড়ি আর সন্দেশ।
শীতের দিনে আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের পিঠা বানানো হতো। সেই সময় কমবেশি সব বাড়িতেই পিঠার আয়োজন হতো।
শীতের মৌসুমে আমাদের বাড়ির রাখাল গনিকাকা বাড়ির আঙিনায় সবজির চাষ করত। নতুন সবজির চারা আমার মনে নতুন আনন্দের দোলা দিয়ে যেত।
গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড রোদ আর গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠত। স্কুলে যেতে তখন আমাদের খুব কষ্ট হতো। আমার আব্বা বলতেন এত গরমের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। আমরা তার চোখ এড়িয়ে স্কুলে যেতাম। শস্যক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতাম স্কুলে। একসময় ধানক্ষেতে পানি সেচের জন্য ডিপ মেশিন বসানো হলো। স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফেরার সময় সেই মেশিনের কাছে দাঁড়িয়ে পানি পড়া দেখতাম। দুপুর বেলায় রোদে পুড়ে কৃষক চাচারা আমাদের বাহির বাড়ির গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করত। আমার দাদাভাই তাদের জন্য শরবত বানিয়ে দিতে বলতেন। আমরা বিরক্ত হতাম কিন্তু শরবত বানাতেই হতো।
মনে পড়ে, গরমের সময় স্কুল থেকে ফিরলে এবং কখনো খেলাধুলা করে ঘরে ফিরলে আম্মা নিজের হাতে পাতা দধি দিয়ে মাঠা তৈরি করে খাওয়াতেন।
আমার আম্মা আমাদের খুব যতœ করতেন। আর শাসনও করতেন। তিনিই আমাদের আসল শিক্ষক। তার কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি। নামাজ শিক্ষা। কোরআন শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষা। আমার আব্বা কিচ্ছু শিখাননি। শাসনও করেননি। কোনো দিন বকা দেননি। কখনো রাগ করেননি। শুধু ভালোবেসেছেন। আগলে রাখতে চেয়েছেন সবসময়। তার কাছেই ছিল আমার সব আবদার।
ছোটবেলায় প্রকৃতির ছয়টি ঋতুই উপভোগ করতাম। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই ঋতু বৈচিত্র্য যেন এক এক করে ম্লান হয়ে গেল। এখন প্রকৃতি অন্যরকম। ফিরে পেতে ইচ্ছে করে সেদিনের সেই বসন্তকাল। শীতের শেষে যখন গা একটু একটু ঘেমে উঠত আর দক্ষিণা বাতাসের শীতল পরশে কী যে আরাম আর ভালোলাগা অনুভব করতাম, তা শুধু অনুভবই করা যায়, প্রকাশ করা যায় না। সে সময় সজীবতায় ভরে যেত চারিদিক। সবুজ ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যেত আর সেদিকে তাকালে মনে হতো সবুজ কোমল ঢেউয়ের মাতন লেগেছে। কী অপূর্ব সাজে সেজে উঠত চারিদিক। আমাদের বাড়িতে গাছের তো অভাব ছিল না। তাই নানা রকমের পাখিরও অভাব ছিল না। নানারকম পাখির ডাকে মুখরিত ছিল আমাদের সেই স্মৃতিঘেরা বাড়িটা। বাড়িতে নির্দিষ্ট ফুলের বাগান ছাড়াও এখানে সেখানে বড় বড় ফুলের গাছ ছিল। ছিল কাঠমালতি, বকুল, গন্ধরাজ, হাজারি গোলাপ, হাসনাহেনা, বেলি, কামিনী, সন্ধ্যামালতি, সন্ধ্যামণি, কুঞ্জলতা, রঙন, রক্তজবা ইত্যাদি। ছিল রঙবেরঙের পাতাবাহারের গাছ। আমার আম্মা ফুলগাছের যতœ করতেন। আম্মা প্রতিদিন ফুলদানিতে কাঁচাফুল সাজিয়ে ঘরে রাখতেন। ছোটবেলা আমার আম্মা আমাকে বিভিন্ন ঢংয়ে চুল বেঁধে তাতে কাঁচা ফুল লাগিয়ে দিতেন।
আমার আব্বা ছিলেন একজন সুদর্শন ও কর্মঠ মানুষ। কোনো কোনো সময় দশজনের দায়িত্ব তিনি একাই পালন করেছেন। আমার দাদা-দাদী, চাচা-ফুফু, আমাদের এককথায় বাড়ির সবার দায়িত্ব আমার আব্বা এক হাতে পালন করে গেছেন। সেসব আমি নিজের চোখেই দেখেছি। তিনি তার ভাইবোনদের খুব ভালোবাসতেন। আমি খুব কাছে থেকে তার আবেগভরা মনের খবর রেখেছি।
প্রতি বছর কোরবানির সময় আব্বা প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। অনেকেই সে কাজে হাত লাগিয়েছে। কিছুক্ষণ কাজ করে উঠে গেছে। আব্বা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করতেন।
আমাদের বাড়িতে কোরবানির জন্য বড় গরু কেনা হতো। কখনো সাথে কয়েকটি ভেড়াও থাকত। খুব মজা হতো তখন। আব্বাই কোরবানির গরুগুলো নিজ হাতে জবাই করতেন। আব্বা যখন মাংস নিয়ে কাজে ব্যস্ত হতেন তখন আমি শরবত বানিয়ে খাইয়ে দিতাম। মাংস বিলানোর সময় অনেক লোকের ভিড় হতো। আসলে আমাদের বাড়িটা ছিল অন্যরকম। সাটুরিয়া উপজেলার মধ্যে একটি বিশেষ বাড়ি। ঐতিহ্যবাহী সেই বাড়ির খ্যাতি ছিল। আর এখনো আছে। তবে আগের মতো আনন্দঘন জৌলুশ এখন আর নেই। এখন তেমন কেউ বাড়িতে থাকে না। থাকেন আমার আম্মা আর আমার দুই কাকা। যার যার আলাদা বাড়ি।
ছোটবেলায় ছিল জনমানুষে গমগমে আনন্দঘেরা হাসি উচ্ছলতায় ভরা পরিবেশ। এখন নির্জন, শান্ত। সে বাড়িতে আমার আব্বা নেই। সবাই একসাথে বাড়িতে যায় কোন কোন সময়। গেটের কাছে দশ বারোটা প্রাইভেট কার ভিড় করে কিন্তু সেদিনের সেই প্রীতিঘন পরিবেশ আর উপস্থিত হয় না।
আমার আব্বাই আমার শৈশবের প্রধান স্মৃতিঘেরা মানুষ। আজ তিনি নেই। আমি কখনো বিশ্বাসই করতাম না যে আব্বা পৃথিবীতে একদিন থাকবে না। খুব মনে পড়ে তার কথা। আমার আব্বা আমাদের বাড়ির জন্য অনেক খেটেছেন। নিজের অফিসের দায়িত্ব পালন করেও এত বড় একটি বাড়ির দায়িত্ব, এতগুলো মানুষের দায়িত্ব, বাড়িটা ঠিক রাখার দায়িত্ব এক হাতে পালন করে গেছেন নীরবে। তার ভাই বোনদের বিয়ে-শাদির সময়ে দশজনের কাজের দায়িত্ব একাই সামলে নিয়েছেন। আমাকে তার সব স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে নিজেই চলে গেছেন।
শৈশবস্মৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে আমার সবুজ গ্রাম, দাদা-দাদী, চাচা-ফুপু, মা-বাবা, ভাই-বোনের কলকাকলিতে মুখর আমাদের গ্রামের বাড়ি। আমাদের বাড়ি আমার স্মৃতির পাতায় আমার...
