ঈদ মুসলমানদের জাতীয় সম্মেলন ও ঐক্যের প্রতীক। ইসলামী সংস্কৃতি ও সংহতিতে ঈদ সম্মেলন এক বিশেষ অনুষঙ্গ। সমাজের সক্ষম ও বিবেকসম্পন্ন সব মুসলিমের এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আর এ সম্মেলনে নেই কোনো শ্রেণী বৈষম্য। মন্ত্রী-আমলা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী, কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতী, কামার-কুমার, ধনী-দরিদ্র, ঈদ সম্মেলনে সবাই অভিন্ন। সৌহার্দ্য-সদ্ভাব এ সম্মেলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সহমর্মিতা-ভাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা ঈদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য। সম্মিলিতভাবে মহান আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন এ সম্মেলনের লক্ষ্য। কালের পরিক্রমায় প্রতি বছর ভাতৃত্ব ও সংহতির বার্তা নিয়ে এ সম্মেলনের আগমন ঘটে। ধনীর অট্টালিকায় ও দরিদ্রের জীর্ণ কুটিরে এ সম্মেলন ঐক্যের ডাক দিয়ে যায় সমভাবে। তাই শিশু-কিশোর আবালবৃদ্ধবনিতা সাধ্যমতো রঙ-বেরঙের নতুন পোশাক পরে ঈদ সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করে। ঈদের এ সম্মেলনে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সব মুসলমানই আনন্দ ও হাসি-খুশিতে মেতে ওঠে। অতীত দিনের দুঃখ-যাতনা ভুলে ভবিষ্যতের সুখ-সমৃদ্ধময় জীবন গড়ে তোলার আলোর নিশানা পাওয়া যায় পবিত্র ঈদ সম্মেলনে। তাই ব্যক্তি, সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা দিক দিয়েই মুসলিম বিশ্বের জন্য ঈদ সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব বহন করে।
ঈদ সম্মেলন মুসলমানদের সর্বজনীন। বিশ্বের সব দেশের ও সব পেশার মুসলমানের এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সমান অধিকার আছে। নির্দিষ্ট কোনো জাতি-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য এ সম্মেলন নির্ধারিত নয়। কিছু লোকের একক আধিপত্যও নাই ঈদের সম্মেলনে। সব মুসলমান ঈদের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে থাকেন স্বাধীনভাবে। এ সম্মেলনে কোনো নেতা-নেত্রীর বন্দনা নয়, দলীয় কোনো স্লোগান নয় বরং মহান স্রষ্টার মাহাত্ম্য ধ্বনি ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চকিত হয়। এতে দলীয় বিভাজন নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয় বরং জাতীয় ঐক্যের সুর ধ্বনিত হয়। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সব মুসলমান সমবেত হয় ঈদের পবিত্র সম্মেলনে। এক কাতারে সারিবদ্ধ হয়ে মহান আল্লাহর কাছে তারা প্রার্থনা করে অবনত মস্তকে। হাতে হাত, বুকে বুক রেখে পরস্পর কোলাকুলি করে পরম মমতা নিয়ে। পুরনো দিনের হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মুসলমানরা পরস্পরে আবদ্ধ হন ভালোবাসার বন্ধনে। ঈদ উপলক্ষে দূর-দূরান্তে অবস্থানরত মুসলিমরা প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ফেরে। এতে পুরনো অনেক বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়স্বজনের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। এ ছাড়া প্রবীণের সাথে নবীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ হয় পবিত্র ঈদের ময়দানে। ফলে মুসলিম সমাজের পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতি সুদৃঢ় হয়ে থাকে। এভাবে ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভাতৃত্ববোধ সুসংহত হয় ঈদের পবিত্র সম্মেলনে।
ঈদ সম্মেলনের প্রধান অনুষঙ্গ জামাতে নামাজ আদায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনৈক্য, সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও সব মুসলমান একত্রিত হন ঈদের পবিত্র সম্মেলনে। সেখানে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন জামাতে নামাজের মাধ্যমে। তাদের সমবেত কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে ঈদের ময়দান মুখরিত হয়ে ওঠে। মুসলমানসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে বিনম্র প্রার্থনা করা হয় ঈদ সম্মেলনে।
ঈদ সম্মেলনের অন্যতম অনুষঙ্গ ইমাম বা খতিবের ভাষণ। মুসলিম সমাজের করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা এ ভাষণের মূল লক্ষ্য। মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ সামগ্রিক বিষয় উল্লেখ করে জাতীয় চেতনার জাগরণ এ ভাষণের বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় অনুরাগ-অনুভূতি, সামাজিক শিষ্টাচার-সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য। কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ ইমাম বা খতিবের ঈদ সম্মেলনের বক্তব্য শুধু নামাজ-রোজা-হজ-জাকাতের মধ্যেই সীমিত। তাছাড়া অনেক সময় ঈদ সম্মেলনের বক্তব্য বা খুতবার বিষয়বস্তু হয় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত। এতে সম্মেলনের প্রকৃত শিক্ষা ও উদ্দেশ্য থেকে যায় উপেক্ষিত!
ঈদ সম্মেলন বড়দের জন্য হলেও এতে ছোটদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। বাবা-দাদা, মামা-চাচা, বড় ভাই-দুলাভাই প্রমুখ অভিভাবকের হাত ধরে শিশুরাও যায় ঈদের পবিত্র মহাসম্মেলনে। এতে সম্মেলনের আনন্দ বেড়ে যায় বহু গুণে। শিশুদের রঙ-বেরঙের পোশাক, খেলনা ঈদের ময়দানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। আর তাদের নিষ্পাপ মনের আলোকচ্ছটায় ঈদ সম্মেলনকেন্দ্র আনন্দে ভরিয়ে দেয়। এ ছাড়া ঈদ শুরু হওয়ার আগ থেকেই পাড়া-মহল্লার তরুণ-কিশোরদের মধ্যে আনন্দের ধুম পড়ে যায়। তারা বিপুল-উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সম্মেলনের জন্য ঈদের মাঠ সাজায়। অবশ্য সাম্প্রতিককালে শহুরে লোকজন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ঈদের ময়দান বা মসজিদ সাজিয়ে থাকে। এতে কারুকার্য-জৌলুশ বাড়লেও প্রাণের স্পর্শ কম থাকে। তবে গ্রামের সবুজ ঘাসের মাঠে ঈদ সম্মেলন মনকে ভরিয়ে তোলে। তাই শহরের চেয়ে গ্রামে ঈদের আনন্দ-স্বাদ বেশি অনুভূত হয়ে থাকে।
ঈদ সম্মেলনে শুধু আনন্দ-উল্লাস নয় বরং করুণ আর্তনাদও শোনা যায়! সমাজের অসহায়-দরিদ্র, বঞ্চিত মানুষও ঈদের ময়দানে যায়। তবে আনন্দে নয় বরং ক্ষুধার জ্বালা মিটাতে দু’মুঠো খাবারের আশায়! সম্মেলনে মানুষের কাছে তারা করুণা ভিক্ষা চায়! তাদের করুণ আর্তনাদে ঈদের ময়দান ভারী হয়। প্রতি বছর এ করুণ দৃশ্য পরিলক্ষিত হয় ঈদের ময়দানে। তাদের এ করুণ আর্তনাদ ঈদের আনন্দ ও মুসলিম ভাতৃত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ‘ধনীদের সম্পদে দরিদ্র-বঞ্চিতের অধিকার’ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তা ছাড়া ঈদের আনন্দ সর্বজনীন করতে ঈদগাহে যাওয়ার আগেই দরিদ্র-অসহায়দের ‘সাদকাতুল ফিতর’ প্রদান ওয়াজিব করা হয়েছে। যাতে ধনী-দরিদ্র, অসহায়-বঞ্চিত সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। আর তাদের এ অধিকার আদায়ের দায়িত্ব সরকার ও ধনী লোকদের ওপরই পড়ে।
ভৌগোলিক সীমারেখায় আর কালের গণ্ডিতে ঈদ সম্মেলন সীমিত নয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর নির্দেশনা অনুযায়ী হিজরী দ্বিতীয় সন অর্থাৎ ৬২৩ সাল থেকে মুসলিম সমাজে বছরে দুটি ঈদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। একটি সম্মেলন ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদের দিনে অপরটি ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদে অনুষ্ঠিত হয়। রমজান মাসের দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের পহেলা তারিখে ‘ঈদুল ফিতর’ এবং জিলহাজ মাসের ১০ তারিখে ‘ঈদুল আজহা’ উদযাপিত হয়। ইন্দোনেশিয়া-মালেশিয়া থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হয়ে আমেরিকাসহ সারা বিশ্বেই ঈদ সম্মেলন হয়ে থাকে। সংস্কৃতির ভিন্নতায় এবং ভৌগোলিক ব্যাপকতায় বিভিন্ন দেশে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নিজস্ব আঙ্গিকে। তবে এসব সম্মেলন হয় একই লক্ষ্য আর অভিন্ন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে। কী শোভনীয়! কী মোহনীয়! মুসলিম বিশ্বের জাতীয় এ সম্মেলনের দৃশ্য। কী মনোমুগ্ধকর, এ সংহতি ও ভাতৃত্ব! কী অপরূপ! মুসলমানদের এ সৌহার্দ্য। হায়! সম্মেলন পরবর্তীতেও যদি মুসলিম বিশ্বের এ ভাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও সংহতি অটুট থাকত! তাহলে বিশ্বমুসলিমের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব হতো।
প্রকৃতপক্ষে ঈদ সম্মেলন আল্লাহর কাছে সমবেতভাবে আত্মসমর্পণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক আনন্দঘন মহামিলন। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মুসলিম সমাজের ঐক্য-ভাতৃত্ব সুদৃঢ়করণ এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
