ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ আরবি শব্দ, যার অর্থ ফিরে আসা। বছর ঘুরে বছর আসে। আসে মুসলমানদের আনন্দবার্তা নিয়ে। আসে নতুন করে জীবনের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে। ঈদুল ফিতর। পবিত্র রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে সেই আকাক্সিক্ষত মহিমান্বিত দিন। সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য এ দিনটি বিশেষ মর্যাদায় আসীন। এক মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায় আকাশজুড়ে। সেই চাঁদের উজ্জ্বলতা সারা পৃথিবীকে আলোকোদ্ভাসিত করে তোলে। চিকন রেখার চাঁদটি যেন মুচকি হেসে বলে ওঠে- এই যে আমি। অপেক্ষা শেষ করতে এসে গেছি। একটি একটি দিন করে শেষ হয় ত্রিশটি দিন। এরপরই আসে প্রতীক্ষিত দিনটি। আসে মুচকি হাসির সাথে। আনন্দের মহিমায় যুক্ত হয় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। মাঠে মাঠে ঈদের নামাজ আদায়ের দৃশ্য হৃদয় জুড়িয়ে দেয়। ঝড়-বৃষ্টি কোনো কিছুই সেদিন বাঁধা হয়ে উঠে না। কেবল হাসিমুখের ছবি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ছোট থেকে বড় সবার মধ্যে কোলাকুলি ও করমর্দনের মুহূর্ত বড় হয়ে উঠে। থেমে থেমে আতশবাজির শব্দে মুখরিত হয় অঞ্চল। মেয়েদের সাজ সাজ রব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে। সারিবেঁধে তারা ঈদ আয়োজন দেখতে বের হয়। সেলফি তোলার ধুম পড়ে যায়। আকাশজুড়ে রঙ বেরঙের বেলুন উড়ে বেড়ায়। মুরব্বিজনরা সারা মাস রোজা পালন শেষে আরাম করে পান চিবুতে চিবুতে গল্পে মেতে ওঠে। কেউবা প্রকৃতির আনন্দে মন ডোবায়। যেমন করেই হোক ঈদ বলে কথা।
ঈদুল ফিতরের সর্বজনীনতা ও ব্যাপকতা এতটাই বিস্তৃত যে মুসলিম জাতি তথা অন্যান্য জাতির কাছেও এর গুরুত্ব অধিক। শবেবরাতের পর থেকেই মূলত ঈদ আয়োজনের একটি আলাদা আবহ তৈরি হয়। মুসলমানদের প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রস্তুতি শুরু হয় সিয়াম সাধনার। ছোট থেকে বড় বাদ যায় না কেউই। ছোটদের মধ্যে এর উত্তেজনা দৃষ্টি কাড়ে। বাবা-মায়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা প্রস্তুতি নেয় রোজা রাখার। ইফতার, সাহরি ও তারাবিহ নামাজের আয়োজন চলে বিপুল উৎসাহে। এভাবেই ঈদ আয়োজনের প্রস্তুতি চলে ঘরে-বাইরে সর্বত্র। সিয়াম সাধনার এ সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি হৃদস্পর্শ করে। সারা দিন রোজা শেষে ইফতারের যে আনন্দ তা ভাগ করে নিতে চায় সবাই। গরিব থেকে ধণী সবাই সবার প্রাণের হয়ে উঠে। সুখ যেখানে রয় দুঃখ তার সঙ্গী হয়ে পাশেই থাকে। বর্তমান যে সময়ে আমরা আজ দাঁড়িয়ে তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ঈদ আয়োজনে চলে চাপা অস্থিরতা। জীবন চালানোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আয়ই মানুষকে অসহায় করে তোলে। একদিকে অনেকের ঘরেই যেমন থাকে বাহারি খাবারের আয়োজন। অন্যদিকে কারো ঘরে দেখা মেলে পান্তা ভাত বা শুকনো রুটি। যারা এ আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে তারাও সামাজিকভাবে নিজেদের লুকিয়েই পথ চলে। রাস্তার পাশে থাকা খাবারের দোকানের সামনে বড় করে পর্দা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। ব্যস্ত শহর হোক বা গ্রাম সর্বত্রই ঈদের আমেজ বিরাজ করে।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক-অর্থনৈতিক মূল্যবোধ ও সাম্যতা গঠনে ঈদুল ফিতর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অনাদিকালের সাক্ষী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঈদের আনন্দ মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি। নিয়ম মেনে চলতে শেখায়। শৃঙ্খলার মধ্যেও যে আনন্দ আছে তা জানায়। একসাথে দলবেঁধে তারাবিহ নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মনে হয় ঈদ যেন প্রশিক্ষণের মাস। পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে মানুষের মন। হিংসা-বিদ্বেষের স্থলে মানুষের মনে স্থান করে নেয় ভালোবাস-সম্প্রীতি-মায়া। আত্মীয়-স্বজন, ব›ধু-বান্ধব সবার সাথেই নতুন করে যেন সম্পর্ক তৈরি হয়। কোনো কষ্ট, রাগ, অভিমান সব ভুলে ঈদের আনন্দ হয়ে ওঠে সবার । এ আনন্দে সাহায্য সহযোগিতার একটি বিষয় বড় হয়ে ওঠে। সারা বছর সেভাবে খোঁজ-খবর না রাখলেও রোজার এ সময়টাতে তা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। প্রতিবেশী কেউ কষ্ট করছে কি না। নিকটের আত্মীয়দের মধ্যে কারো সমস্যা আছে কি না। এবং তা জেনে তাদের পাশে দাঁড়ানো। তাদেরকে ভালোবাসার মাধ্যমে আপন করে নেয়াই মূলত ঈদের আনন্দ। ঈদের শিক্ষাও। সামাজিক গুরুত্বের এটি একটি বড় অংশ। রোজার এ সময়ে অনেকেই আছেন যারা নিয়মিত ইফতার দিয়ে থাকেন। তাদের এ ভূমিকায় অনেকেই সারা দিন রোজা রেখে তৃপ্তি সহকারে ইফতার করেন। তাদের দোয়ায় যে আনন্দ তা আর কিছুতেই পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সামাজিক ও পারিবারিকভাবে রোজার মাসে ঈদ আনন্দের অংশ হিসেবে সবারই সাধ্যমতো এগিয়ে আসা প্রয়োজন। এমন উদ্যোগে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবে। মনের আকাশে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষকে নতুন করে জানবে। নতুন করে মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসবে। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!
ঈদ আনন্দের একটি বড় অংশ ঈদ কেনাকাটা। ছোট-বড় সব দোকানে নতুন নতুন জামা-কাপড়ের বাহারি আয়োজন। আনন্দ হয় তখনই যখন ঈদের মেলা বসে। একটা সময় ছিল যখন শুধু গ্রামেই এমন মেলার দেখা মিলত। এখন শহরেও বিভিন্ন জায়গায় নানান অফারে পণ্য বিক্রির কৌশল করে বিক্রেতারা। ঈদ মেলার আয়োজন করে জামজমকপূর্ণভাবে। ঈদের জন্য পোশাকের মূল্য ছাড় থাকে। থাকে হরেক রকম উপহার। গরিব থেকে ধনী এই আয়োজনের অংশ সবাই। তবুও কিছু কষ্ট রয়েই যায়। করোনার ভয়াবহতায় অনেকেরই চাকরি নেই। তিন বেলা ঠিকমতো খাবারই অনেক কষ্টের। ন্যূনতম চাহিদা মেটানোই দুঃসাধ্য। ভাবনার জায়গা এখানেই। ঈদের খুশির ভাগিদার তো তারাও। তাদের ঈদ কেনাকাটা হয়ে উঠে বেদনার। ফুটপাত থেকে শপিংমলে মানুষ আর মানুষ। প্রতিদিনের একই চিত্র। কেউ দেখে দেখে আনন্দ নিচ্ছে। কেউ পাবার সুখ কুড়াচ্ছে। এত কিছুর ভিড়ে কাউকেই যেন কারো দেখার সময় নেই। শুধু ছোট ছোট বাচ্চাদের বোঝানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তাদেরই সমবয়সী বন্ধুদের মাঝে তারা হয়ে পড়ে অসহায়। তাই ঈদ আনন্দ নিয়ে ছোট ছোট কচিমনে প্রশ্নরা খেলা করে ভীষণভাবে। প্রত্যেকেই চায় ঈদের বিশেষত্ব। চায় নতুন কিছু। একদম সবার থেকে আলাদা। তাহলেই তার ঈদ হবে আনন্দের। ছোটমন কৌতূহলী সর্বদা। তারা জানতে চায় না। বুঝতেও চায় না। তারা চায় শুধু পেতে। তাইতো কেন তারা ভাববে। মন উদাসী হবে। তারা নতুন জামার গন্ধ নিবে। নতুন নতুন উপহারে মুগ্ধ হবে। এইতো ঈদ।
ঈদুল ফিতর। ইসলাম সবার জন্য ঈদ আনন্দের পথ তৈরি করে দিয়েছেন। জাকাত আদায়ের শিক্ষা দিয়েছেন। সমাজের গরিব, মিসকিন ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে থেকে তাদের অংশ হবার তাগিদ দিয়েছেন। এটি আদায়ে সমাজের নিরন্ন অসহায় মানুষের মুখে অনাবিল হাসির রেখা দেখা যাবে। অর্থনৈতিক দৈন্যতা ঘুচিয়ে ঈদের আনন্দ হবে সবার। সমাজে বিদ্যমান অর্থনেতিক বৈষম্যতা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। কিন্তু তা যদি হয় লোক দেখানো তাহলেই কষ্টের। যার যা প্রাপ্য তা দেয়ার মধ্যে যে সুখ নিহিত তা আর কিছুতেই পাওয়া সম্ভব না। ঈদের দিনটি আসার আগেই ফিতরা আদায় প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য জরুরি। এ থেকে বাদ যায় না সদ্য জন্মলাভকারী শিশুটিও। এর মাধ্যমেও অসহায় মানুষ তাদের ঈদ আয়োজন করে থাকে। তাই এটি আদায়ে সচেতন হলে ঈদের আনন্দ হয়ে উঠবে সবার। কারণ কোনো গরিব রোজাদার যেন এ সুযোগ থেকে বাদ না পড়ে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। পবিত্র এই সিয়াম সাধনায় অর্জিত সৎ গুণাবলি ও ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারাতেই সার্থকতা। সবারই এই চেষ্টা অব্যাহত থাকুক। যেন ফুলের মতো সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি সমাজের অংশ হয়ে উঠি সবাই।
ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ আরবি শব্দ, যার অর্থ ফিরে আসা। বছর ঘুরে বছর আসে। আসে মুসলমানদের আনন্দবার্তা নিয়ে। আসে নতুন করে জীবনের...
