পড়ন্ত বিকেল। উদয়কালের কোমলতা হারিয়ে, মধ্যদুপুরের প্রখরতা পাড়ি দিয়ে নিস্তেজ শেষ আলোটুকু আলতোভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে রক্তিমাভ সূর্যটি। গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা দিতেই যেন শেষ বসন্তের দিবাকর সারাবেলা অনল বর্ষণ করেছে। তাই তেজহীন রবিকিরণÑ সাথে মৃদুমন্দ বাতাসও তপ্ত দেহ শীতল করতে সক্ষম হচ্ছে না।
আমি বসে আছি আমাদের চিরচেনা ব্রিজের উপর। গ্রামে যা ‘জাগাঁল’ বলে পরিচিত। আশপাশের পাঁচ-দশ গ্রামের লোকদের ‘জাগাঁল’ বললে তারা এই স্থানটিকেই চিহ্নিত করে দেবে নির্দ্বিধায়। ব্রিজের এই রাস্তাটি চলে গেছে বিলের মধ্য দিয়ে। বিলের নাম গাজনা। মানুষের মুখে প্রসিদ্ধ ‘গাজনার বিল’ হিসেবে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে যতদূর চোখ যায়Ñ শুধু মাঠ আর মাঠ। না, ফসল নেইÑ সদ্য পেঁয়াজ তুলে পাটের বিজ বপনের প্রস্তুতি চলছে। বছরের এই সময়ে ফসলবিহীন শুধু মাটি-গোধূলির এই বেলায় দিগন্তজোড়া ধূসরতা। তাই চাষিদের আনাগোনাও খুব বেশি নেই। দু’পাশে খোলা মাঠÑ জনবসতিহীন এই জায়গাটি তনু-মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয় বলেই এখানে এসে বসা।
বর্ষাকালে যখন বন্যার পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠে বিলÑ পানির বুকে ভেসে বেড়ায় ছোট-বড় নৌকা তখন দর্শকমুখরিত হয়ে উঠে এই জায়গাটি। পাশাপাশি অবস্থিত ছোট-বড় উভয় ব্রিজ ভরে যায় জনসমাগমে। বিশেষ করে, ছুটির দিনগুলোতে ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো।
বন্যার পানির হিংস্রতা ও কোমলতার নীরব সাক্ষী এই দু’টি ব্রিজ। আগে যখন মাটির রাস্তা ছিল তখন প্রায় প্রতি বছরই রাস্তা ভেঙে যেত তরঙ্গাঘাতে। বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ত মেঠো পথে। রাস্তা ভেঙে গেলেও ব্রিজ দু’টি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকত নির্বিকার। এরপর কমে এলো পানির তীব্রতাÑ রাস্তাও পাকা হয়ে গেল। তাই এখন আর সেই ভাঙন চোখে পড়ে না।
বর্ষার দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া আমার দূরন্ত শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই ব্রিজের সাথে। কল্পনার পটে আজো ভেসে উঠে ব্রিজ থেকে পানির বুকে লাফিয়ে পড়ার সেই দৃশ্য! আজো শিহরণ জাগায়Ñ পুলকিত করে সেই স্মৃতি। দলবেঁধে আমরা আসতাম এখানে। একের পর এক লাফিয়ে পড়তাম পানিতে। সে কী আনন্দ! জোছনা রাতে এখানে এসে বসার মজাই আলাদা। চারপাশটা জোছনার স্নিগ্ধ আলোতে ভরে থাকে। সৃষ্টি করে মায়াময় এক পরিবেশ। বছরের প্রায় পুরোটা জুড়েই এখানে বাতাস বয়। মানুষ গরমের প্রচণ্ডতায় অতিষ্ঠ হয়ে ছুটে আসে এখানে। এমনকি লোডশেডিং হলেও এখানে ভিড় জমে লোকজনের।
পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডুবে গেছে। এখনই নেমে আসবে অন্ধকার। আমিও তাই পা বাড়ালাম বাড়ির পথে।