আরণ্যক। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মহিমান্বিত ছায়াশীতল একটি রিসোর্ট। চারিধারে বনজঙ্গল বেষ্টিত গগনছোঁয়া পাহাড়। একপাশে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত বেলাভূমি। কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে টেকনাফ যাওয়ার পথে ছোট একটা জনবসতি আছে। এ জায়গার নাম ইনানী। এখানেই আরণ্যকের অবস্থান। প্রতি বছর কক্সবাজার বেড়াতে এসে এখানেই ওঠেন হুরাইনের বাবা-মা। পাহাড়ের গা-লাগা রিসোর্টটির ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সাগর দেখা যায় । শোনা যায় আন্দোলিত জলরাশির গর্জন। ঝাউ-পাইন-জারুলসহ চেনা অচেনা গাছগুলোতে প্রায় সময় লেগে থাকে বাতাসের ডাকাতিয়া স্পর্শ। গাছে গাছে রয়েছে হাজারো পাখির বিচরণ। কী বিচিত্র তাদের কাকলিধ্বনি! কী মনোরূপ তাদের চঞ্চলতা! সাগর-অরণ্যের এই নিসর্গে চোখ ও মন জুড়ানোর সব উপদানই বিদ্যমান। চারদিকে মায়াময় প্রশান্তি। প্রতিবারই ফেরত যাওয়ার সময় আরো কিছু দিন থেকে যাওয়ার বায়না ধরে মেয়ে হুরাইন। কোনো লাভ হয় না। একবুক কষ্ট নিয়ে ফেরত যেতে হয় তাকে। ছোট মানুষ হলেও তার মনের আকাশে যে মেঘ জমতে পারে, এটা বুঝতেই চায় না মা-বাবা। বড় হলে হুরাইন এখানে একটা রিসোর্ট বানাবে। তারপর মা-বাবাকে নিয়ে বেড়াতে আসবে। আর ফিরে যাবে না। ফুপি বলেছে- সে বড় হলে মা-বাবা তার মতো ছোট হয়ে যাবে। ফিরতে চাইলে তাদেরকে তখন বকে দেবে সে। বলবে- কিছুতেই এখান থেকে যাওয়া চলবে না।
বেশি রাত হয়নি। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা পালাক্রমে ড্রাইভ করেছে যে! শুধু ঘুম নেই হুরাইনের চোখে। পাহাড়ি ফুলের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। শোনা যাচ্ছে সাগরের গর্জন। পর্দার ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে চাঁদের আলো। এমন রাতে কেউ ঘুমায়! সেটি বললে তো হবে না! দীর্ঘপথ পালাক্রমে ড্রাইভ করে খুব ক্লান্ত হয়ে আছে মা-বাবা। ফুরফুরে মেজাজের হুরাইন বাইরের নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারল না। বিছানা থেকে নেমে পড়ল। দরজা লক্ড ছিল না। সন্তর্পণে ছোট ছোট পা ফেলে ব্যালকনিতে আসতে কোনো বাধা পেতে হলো না ওকে। ব্যালকনিতে এসেই চমকে উঠল ছোট্ট মেয়েটা।


জোছনা থই থই রাত। ফুলগাছের সাথে সাথে রিসোর্টের আঙিনায় বেশ কিছু নারকেলগাছ আছে। আছে একটা বটবৃক্ষ। বাতাসে পাতাগুলো স্থির থাকতে পারছে না। কাঁপতে থাকা পাতাগুলোর সাথে চাঁদের আলো যেন গোল্লাছুট খেলছে। খানিক দূরে দুরন্ত সাগরে দোলায়মান ঢেউমালা, চাঁদের কিরণে ধোয়া অরণ্যানী! মনকাড়া এই প্রকৃতি হুরাইনকে নিয়ে গেল আদিম যুগে। সে যেন প্রাচীন যুগের এক রাজকন্যা। ব্যালকনিতে রাখা আরাম চেয়ারে বসে রূপকথার মতো সুন্দর এই রাতটাকে চোখ ও মন দিয়ে গিলতে লাগল মেয়েটা। পিৎজা হাটের পিৎজাও এত স্বাদযুক্ত নয়।
কেন যে এখন এখানে ধীমতি আপুটা নাই! থাকলে খুব মজা হতো। ধীমতির সাথে আপনাদের পরিচয় হয়েছে। তাই না? এখানে বেড়াতে এসে বছর দুই আগে হুরাইনেরও পরিচিতি ঘটেছে ধীমতির সাথে। এ তল্লাটের সবায় ধীমতিকে চেনে, ভালোবাসে। তার অনেক বুদ্ধি। হুরাইনের সব প্রশ্নের উত্তর দেয় ধীমতি। প্রশ্ন শুনে বড়দের মতো বিরক্ত হয় না। গত বছর এই আপু তাকে পরীদের গল্প শুনিয়েছে। গল্পটা এত ভালো লেগেছে হুরাইনের যে, সে সেটা ভুলতেই পারে না। হুরাইনের কেবলই মনে হয় নিশ্চয়ই পরী আছে।
কী ওগুলো? আকাশ থেকে উড়ে আসছে! রিসোর্টের আঙিনায় মাঝারি আকৃতির বটগাছের নিচে নেমে এসেছে ধীমতি আপুর গল্পে বলা পরীগুলো। লাল শাড়িতে লালপরী, নীল শাড়িতে নীলপরী। এরকমভাবে বিভিন্ন রঙের শাড়িতে বিভিন্ন রঙের পরী। এত পরী! তাহলে সত্যি সত্যি পরী আছে! খুশিতে বাকবাক হুরাইন তাকিয়ে দেখে বেগুনি রঙের শাড়ি পরে তাদের সাথে ধীমতি আপুও আছে। ধীমতি আপু হাতছানি দিয়ে হুরাইনকে ডাকল- ‘নিচে নেমে আয় হুরু। আমরা একসাথে নাচব। খেলব।’
‘দাঁড়াও আপু আমি আসছি’।
আঙিনায় নেমে এলে সব পরীরা একে একে হুরাইনকে জড়িয়ে ধরল। নিমিষে সবার বন্ধু হয়ে গেল হুরাইন। কোত্থেকে জানি গান ভেসে এলো। কী সুন্দর গায়কি! কী তার মেলোডি! পরীদের সাথে সাথে হুরাইনও নাচল। নাচল ধীমতি আপু। অনেক গান হলো। অনেক নাচ হলো। তারপর সবাই মিলে ছুটল সাগরসৈকতে।
সেখানে দলবেঁধে খেলছে লাল কাঁকড়ার দল। একটা ধেড়ে কাঁকড়া ধীমতির কাছে মিনতি করল, ‘তোমরা কি আমাদের মাড়িয়ে দেবে?’
‘না গো তোমাদের মাড়াব কেন? তোমরা একটু সরে গিয়ে আমাদেরও খেলতে দাও।’


তখনই কাঁকড়াগুলো একপ্রান্তে সরে হুরাইনদের খেলার জায়গা করে দিলো। হুরাইন জানে, ধীমতি আপুর কথা সবাই শোনে। তাই কাঁকড়াগুলোও হুরাইনদের খেলার জায়গা করে দেবে এটাই স্বাভাবিক। বউচি, গোল্লাছুট, ছি কুৎ কুৎ খেলা খেলল পরীরা। এই খেলাগুলো জানত না হুরাইন। ধীমতি আপু এবং পরীরা আদর করে ওকে শিখিয়ে দিলো খেলাগুলো। সময় তো থেমে থাকে না। গড়িয়েই চলে। ধীমতি আপু বলেছে এ জন্য একসময় মানুষ বুড়ো হয়ে যায়। পরীদের দেশে সময় প্রায় থেমেই থাকে। এ জন্য পরীরাও তাড়াতাড়ি বুড়ি হয় না। পৃথিবীতে তো সময়ের থেমে থাকার উপায় নেই। সকাল হতে চলল। পরীদের যাওয়ার সময় হলো। কান্নাকাটি শুরু করেছে হুরাইন। পরীদের যেতে দেবে না সে। কী একটা সমস্যা হলো! কিন্তু পরীদের যে যেতেই হবে। নইলে সূর্যের আলোয় তো ওরা পুড়ে মরবে। ধীমতি একটা উপায় খুঁজে পেল। সব পরীর পেখম থেকে কিছু কিছু করে পালক খুলে নিয়ে হুরাইনের জন্য দু’টি পেখম তৈরি করে দিলো।
আর বলল, ‘যা হুর-পরীদের দেশ থেকে ক’দিন বেড়িয়ে আয়। সে দেশ খুব সুন্দর। সেখানে সবসময় চাঁদের আলো থাকে। সুন্দর সুন্দর ফুল আছে। সুমিষ্ট সব ফল আছে। হ্রদ আছে। হ্রদে রঙিন সব মাছ আছে। সেসব মাছ কথা বলতে পারে। পরীদের রানী তোকে সুস্বাদু সব খাবার দেবে। কত রকমের চকোলেট দেবে। যা ঘুরে আয়।’
‘আমি চলে গেলে মা-বাবা কাঁদবে যে! ফুপিও কাঁদবে। দাদা-দাদী, নানা-নানীও কাঁদবে। আকিব ভাইয়া খেলবে কার সাথে?’
‘দূর বোকা! সামনে পূর্ণিমায় তো চলে আসবি আবার। আমি তোর বাবা-মাকে বলে দেবো। তারা দুশ্চিন্তা করবে না।’


এবার শান্ত হলো হুরাইন। পরীদের সাথে যাবে সে। তার জন্য তৈরি পেখম পিঠে লাগিয়ে উড়ে চলল উপর দিকে। বাবা কতই না উড়তে হলো। পেখম দুটো ব্যথা করতে লেগেছে যখন তখনই উড়ান শেষ হলো। সামনেই দেখা গেল পরীরাজ্য। আকাশের গায়ে একটা চকমকি পাথরের দরজা। ওটা খুলে দেবে গেটম্যান। ওপারে পরীরাজ্যে ঢুকে পড়বে হুরাইন। সেখানে অন্য কোনো বাহন নেই। শুধু ঘোড়ার গাড়ি। ধীমতি আপু বলেছে ঘোড়াগুলোর পিঠে পেখম আছে। ইচ্ছে হলে তারা উড়তেও পারে। কী মজা! কি মজা! খুশিতে কাঁপছে হুরাইন।
‘কী রে হুরু! কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছিস কেন? কখন থেকে ব্যালকনিতে ঘুমাচ্ছিস?’
কে বলছে এসব? এটা কি পরী রানী? না না এটা তো মা!
চোখ মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হুরাইন। সে ব্যালকনির আরাম কেদারায় বসে আছে। সামনে মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে আছে ধীমতি আপু।
‘হুরু, ধীমতি তোর সাথে দেখা করতে এসেছে। সূর্য উঠেছে। চল চল ধীমতিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি নাশতা সেরে নে। আমরা বিচে যাবো।’
মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল হুরাইনের। সবটাই তাহলে স্বপ্ন!
তাড়া দিয়ে মা চলে গেলেন। ধীমতি বলল, ‘স্বপ্ন দেখছিলি হুরু?’
‘হুম! ধীমতি আপু সত্যি সত্যি পরী আছে?’
‘হয়তো আছে রে হুরু। ওই যে সূর্য দেখছিস না, ও আমাদের তাপ দেয়। তাই আমরা বেঁচে আছি। এ রকম অনেক সূর্য আছে। সেগুলোও পৃথিবীর মতো অনেক গ্রহকে তাপ দেয়। সেগুলোতে তো পরীদের মতো কিছু থাকতে পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক।’
ধীমতি আপুর অনেক বুদ্ধি। ধীমতি আপু যা বলে সেটি সত্যি না হয়ে পারে না। ধীমতি আপু বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবে নিশ্চয়ই।
‘কই রে তোরা ধীমতি-হুরু!’
মায়ের ডাকে সাড়া দিতে নাশতার টেবিলে ছুটল ওরা।